ঈদযাত্রা সরকার প্রতিশ্রুতি রাখেনি, এসি বাসে যথেচ্ছ ভাড়া

0
7

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব ১১৩ কিলোমিটার। ৪০ আসনের বাসে সরকার নির্ধারিত ভাড়া ৩৩০ টাকা। একই দূরত্বে এসি বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ৪৫০ টাকা। ঈদে তা হয়েছে ৫০০ টাকা। সরকারের নির্দেশনায় এ ভাড়া নির্ধারণ করেছে বাস মালিকদের সংগঠন। আমদানি শুল্ক এবং গাড়ির বডিভেদে মালিকরা ব্যাখ্যা ছাড়াই বিজনেস এবং ইকোনমি ক্লাস নামে তা নির্ধারণ করেছেন। অথচ সরকারের আশ্বাস ছিল, ঈদুল আজহার আগে এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। তা না হওয়ায় এবার ঈদযাত্রাতেও স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে এসি বাসে।

সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, নন-এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে সরকার। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভাড়া নির্ধারণ কমিটি দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে ১২টি ব্যয় বিশ্লেষণ করে ভাড়ার সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়কে। মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। গত মাসে ডিজেলের দাম বাড়ার পর দূরপাল্লায় ৫১ আসনের বাসে ভাড়া নির্ধারণ করা হয় কিলোমিটারে দুই টাকা ২৩ পয়সা। ৪০ আসনের বাসে তা ২ টাকা ৮৪ পয়সা।

এসি বাসের জন্য এ নিয়ম প্রযোজ্য নয়। দূরপাল্লার পথে কোম্পানি মালিকরা নিজেদের মতো করে ভাড়া ঠিক করেন। বাসের আসন ও সুবিধা অনুযায়ী তা নির্ধারণ করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা নন-এসি ভাড়ার তিনগুণ পর্যন্ত।

ঈদে ভাড়া বাড়ে এসিতে
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে নন-এসি বাসের ভাড়া ৭০৪ টাকা। এসি বাসে ভাড়া ঈদের সময়ে এক হাজার ৪০০ থেকে দুই হাজার ৫০ টাকা পর্যন্ত। স্বাভাবিক সময়ে এ রুটে এসি বাসে ভাড়া থাকে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত। ঈদে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে এসি বাসের ভাড়া।

ঢাকা-কুড়িগ্রাম রুটে নন-এসি বাসের ভাড়া ৯৫০ টাকা। এসি-বাসে ঈদের আগে এখন তা এক হাজার ৬০০ থেকে দুই হাজার ৯০০ টাকা। স্বাভাবিক সময়ে এসব ভাড়া ছিল এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত। সর্বোচ্চ স্তরে ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

একাধিক মালিক সমকালকে বলেছেন, নন-এসি বাস ৪০ আসনের। আরামদায়ক যাত্রার জন্য এসি বাসগুলো ২৮, ৩২ আসনেরও হয়। ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ৪০ আসনের এসি বাসের ভাড়া ৫০০ টাকা হলেও ২৮ আসনের ক্ষেত্রে তা ৭০০ টাকা। কুড়িগ্রাম, চট্টগ্রামের মতো দূরবর্তী জেলাগুলোতে স্লিপার কোচে শুয়ে যাওয়ার সুবিধা রয়েছে; সেগুলোতে ভাড়া নন-এসি বাসের চার গুণ।

বিআরটিএ-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মে মাস পর্যন্ত সারাদেশে নিবন্ধিত বাসের সংখ্যা ৫৮ হাজার ৫৮৯ এবং মিনিবাসের সংখ্যা ২৮ হাজার ৬৯৬। যদিও এর অধিকাংশ সচল নেই। দূরপাল্লার রুটে ৩০ হাজারের মতো বাস চলে বলে ধারণা করা হয়। সারাদেশে নিবন্ধিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের মোট সংখ্যা দুই হাজার ৭৮৩। বিআরটিসির ৪১৩টি বাসের কয়েকটি বাদে প্রায় সব এসি বাস দূরপাল্লার পথে চলে।

ঢাকা-বরিশাল রুটে নন-এসি বাসের ভাড়া কোম্পানিভেদে ৫৯০ থেকে ৬২০ টাকা। এসি বাসে তা এখন এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা। যদিও ঈদের আগে এ ভাড়া ছিল ৮৫০ থেকে হাজার টাকা। ঢাকা থেকে কক্সবাজার রুটে এসি বাসের ভাড়া এখন তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। স্বাভাবিক সময়ে যা এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত ছিল। স্লিপারে ছিল দুই হাজার ২০০ টাকা। আবার ঈদের সময়ে ঢাকা থেকে রংপুরের স্লিপারের ভাড়া জনপ্রতি তিন হাজার টাকা পর্যন্ত।

কর্তৃপক্ষ ‘না’ বললেও আইনে সুযোগ আছে 
ঈদুল ফিতরেও এসি বাসে যথেচ্ছ ভাড়া নিয়ে সমালোচনা হয়। গত ৯ এপ্রিল সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, এসি বাস ও মিনিবাসের ভাড়া তালিকা শিগগিরই তৈরি করা হবে।

গত ২১ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান রহমান জানিয়েছিলেন, ঈদুল আজহার আগেই এসি বাসের ভাড়া বিআরটিএ নির্ধারণ করবে। প্রয়োজনে ভাড়া দুই বা তিন স্তরে নির্ধারণ করা হবে।

এই বিষয়ে সড়ক পরিবহনমন্ত্রীর মন্তব্য জানতে পারেনি সমকাল। বিআরটিএ’র ঊর্ধ্বতন কর্তকর্তারাও নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ভাড়া নির্ধারণ কমিটিতে যুক্ত একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেছেন, এসি বাসকে সরকারি ভাড়ার আওতায় আনতে হলে আইন ও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে।
সড়ক পরিবহন আইনের ৩৪ (১) ধারায় বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ সরকারের অনুমোদনে গণপরিবহনের ভাড়ার হার ও সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ বা পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে। তবে শর্ত থাকে যে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল ও বিশেষ সুবিধাসংবলিত গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে না।

তবে একই উপধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকার বা কর্তৃপক্ষ, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পেলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল ও বিশেষ সুবিধাসংবলিত গণপরিবহনের ভাড়া যুক্তিসংগতভাবে নির্ধারণের ব্যবস্থা নিতে পারবে।’

এ শর্তের উদাহরণ দিয়ে যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী সমকালকে বলেন, এসি ভাড়া নিয়ে জনগণের অভিযোগ রয়েছে। সুতরাং সরকারের ক্ষমতা রয়েছে, ভাড়া নির্ধারণের। এ জন্য আইন সংশোধনের প্রয়োজন নেই। যারা তা বলেন, তারা আসলে কোম্পানিগুলোকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের সুযোগ করে দিচ্ছেন।

মালিকদের দায়িত্ব দিয়েছে সরকার!
গত ১৫ এপ্রিল সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের যুগ্ম সচিব আব্দুস সোবহানের সভাপতিত্বে এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ সম্পর্কিত অনুষ্ঠিত ওই সভা থেকে ঈদের আগে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিকেই ভাড়া নির্ধারণ করতে বলা হয়। সমিতি উচ্চস্তর এবং নিম্নস্তর নামে চার ধরনের ভাড়া নির্ধারণ করে। বিজনেস ক্লাসে দুটি ভাগ রয়েছে–বিদেশে নির্মিত বাস বডি (সিবিইউ) এবং দেশে এনে সংযোজন করা (সিকেডি) বডি। সিবিইউ বাসের আমদানি শুল্ক বেশি। তাই মালিকরা এসব বাসের ভাড়াও নির্ধারণ করেছেন বেশি। সিকেডি বাসের আমদানি শুল্ক কম। তাই ভাড়া কিছুটা কম।

দেশে তৈরি বডির বাসকে ইকোনমি ক্লাস দিয়ে ভাড়া নির্ধারণ করেছে সমিতি। আবার শুয়ে যাত্রার সুযোগ রয়েছে–এমন ‘স্লিপার’ বা ‘স্যুইট ক্লাস’ বাসের ভাড়া আলাদা। মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, মালিকদের ভাড়া নির্ধারণের সুযোগ দেওয়ায় তারা বিজনেস, ইকোনমি ক্লাস নাম দিয়ে নিজেদের মতো ভাড়া নির্ধারণ করেছেন।

তবে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, বাড়তি ভাড়া যাতে কেউ আদায় করতে না পারে, এ জন্য সমিতি একটি তালিকা করেছে মাত্র। ঈদের পর চূড়ান্ত হবে ভাড়ার তালিকা হবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদীউজ্জামান বলেন, মালিকরা যদি নিজেরাই ভাড়া নির্ধারণ করেন, তাহলে তো তাদের মতো করে নির্ধারণ করবেন। ভাড়া নির্ধারণের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। মালিকরা নির্ধারণ করলে বিশৃঙ্খলা হবে।

শুয়ে ভ্রমণের সুবিধা রয়েছে যেসব বাসে, সেগুলো আসলে একতলা বাস হিসেবে আমদানি করা হয়েছে। এগুলোর মাঝখানে পার্টিশন দিয়ে খোপ তৈরি করে দ্বিতল বানানো হয়েছে। হাদিউজ্জামান বলেন, নকশা বহির্ভূতভাবে একতলা বাসকে দ্বিতল বানানোয় বাসের ভরকেন্দ্র নষ্ট হচ্ছে। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কারণ, এসব বাসের চ্যাসিস তৈরি হয়েছে একতলা বাসের জন্য। দেশে আমদানি করে মাঝখানে পাটাতন বসিয়ে দোতলা বানিয়ে ফেলা অবৈধ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here