উদ্ভাবন শুঁটকি ও খাদ্য সংরক্ষণে লাগবে না রোদ

0
1

কৃষি ও মৎস্যপণ্যের উৎপাদন বাড়লেও সংগ্রহ-পরবর্তী সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ঘাটতির কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পণ্য নষ্ট হয়। বিশেষ করে মাছ, শুঁটকি, ফল ও সবজি শুকানোর ক্ষেত্রে বৃষ্টি, অতিরিক্ত আর্দ্রতা, ধুলাবালি ও পোকামাকড়ের কারণে পণ্যের মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রচলিত পদ্ধতিতে রোদে শুকাতে গিয়ে বৃষ্টি, ধুলাবালিসহ নানা সমস্যা পোহাতে হয়। এসব সমস্যা সমাধানে সৌরশক্তি, সেন্সর ও ইন্টারনেট অব থিংস প্রযুক্তির সমন্বয়ে স্মার্ট ড্রায়ার উদ্ভাবন করেছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ।

গতকাল শুক্রবার শেকৃবি সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তাঁর এ উদ্ভাবন সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন ওই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ রানা। উদ্ভাবকদের দাবি, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এই ড্রায়ারে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে দ্রুত ও নিরাপদে মাছ, শুঁটকি, ফল, সবজি ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য শুকানো সম্ভব।

দেশে দীর্ঘদিন ধরে মাছ ও অন্যান্য কৃষিপণ্য খোলা জায়গায় রোদ ও বাতাসের সাহায্যে শুকানো হয়। কম খরচের এই পদ্ধতিতে বৃষ্টি, ধুলাবালি ও পোকামাকড়ের সংস্পর্শে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে শুকানোর প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে পচনও শুরু হতে পারে। শুঁটকি তৈরিতে অনিরাপদ রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে, যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ।

এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে স্মার্ট ড্রায়ারে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা শুকানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দিনের বেলায় সৌরশক্তি ব্যবহার করে তা ব্যাটারিতে সঞ্চয় করা হয়। রাতে সেই সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করে ইনফ্রারেড হিটারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তাপ উৎপাদন করা যায়। ফলে বাইরে বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া থাকলেও ড্রায়ারের ভেতরে শুকানোর কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব।

ড্রায়ারটির ভেতরে রয়েছে চারটি এক্সজস্ট ফ্যান ও আটটি রোটেটিং ফ্যান। এক্সজস্ট ফ্যান পণ্য থেকে বের হওয়া আর্দ্রতা দ্রুত বাইরে সরিয়ে ড্রায়ারের ভেতরের আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। অন্যদিকে রোটেটিং ফ্যান ভেতরের তাপ সমভাবে ছড়িয়ে দেয়। ফলে বিভিন্ন স্তরে থাকা পণ্য তুলনামূলকভাবে সমান পরিবেশে শুকানোর সুযোগ পায়। প্রযুক্তিটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ইন্টারনেট অব থিংস ও সেন্সরভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। ড্রায়ারের ভেতরের বিভিন্ন পরিবেশগত বিষয় সেন্সরের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা যায়। পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দূর থেকেও এর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে।
উদ্ভাবকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত পদ্ধতিতে দিনে প্রায় পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা কার্যকরভাবে মাছ শুকানো যায়। বিপরীতে স্মার্ট ড্রায়ারে ২৪ ঘণ্টা শুকানোর সুযোগ থাকায় শুকানোর সময় প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এতে একই সময়ে বেশি পরিমাণ শুঁটকি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

শুধু মাছ বা শুঁটকি নয়, এই প্রযুক্তিতে ফল, সবজি, সি-ফুড ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য শুকিয়ে মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরি করা যায়। আম, বিটরুট, রোজেলা, লেমন, কাঁঠাল, কলা, করলা, কাঁচামরিচ ও ধনিয়াপাতাসহ বিভিন্ন পণ্য থেকে পাউডার, চা ও জার্কি তৈরিও সম্ভব এই ড্রায়ার ব্যবহার করে।

উদ্ভাবক ড. মাসুদ রানা বলেন, লক্ষ্য শুধু একটি শুকানোর যন্ত্র তৈরি করা নয়; বরং কৃষক ও মৎস্যজীবীদের উৎপাদিত কাঁচামাল স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তরের সুযোগ তৈরি করা। দেশের বিভিন্ন কৃষি ও মৎস্যপ্রধান এলাকায় প্রযুক্তিটি সম্প্রসারণ করা গেলে খাদ্য অপচয় কমানো, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকের আয় বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here