একসঙ্গে ছড়াচ্ছে হাম ও ডেঙ্গু, বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের উদ্বেগ

0
7

দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা হামের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না এলেও মৃত্যুর হার কিছুটা কমেছে। এর মধ্যেই বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই ডেঙ্গুর বিস্তার নতুন করে তৈরি করেছে উদ্বেগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম ও ডেঙ্গুর ফলে জনস্বাস্থ্যে একসঙ্গে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। সংখ্যাটি এখনও উদ্বেগজনক। অন্যদিকে ডেঙ্গুতেও প্রতিদিন ৫০ জনের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে দুই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। ফলে সংক্রামক এই দুই রোগের চাপ সামাল দিতে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বাড়তি সতর্কতার মধ্যে থাকতে হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রীও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় বর্ষা মৌসুমে দুই রোগের চাপ আরও বেড়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সংকট তৈরি হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ঈদের ছুটিতে দুই দিনের স্বস্তির পর গতকাল আবারও হামের উপসর্গযুক্ত রোগী ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। এতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গতকাল রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২০-তে। তাদের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৫২৯ জন এবং হামে ৯১ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ৮৮ হাজার ৬৯৮ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে আরও ৬৬ জনের। এতে মোট নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৬৮৬-তে। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৮ হাজার ২৬৩ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৬০ হাজার ৮৪ জন।

টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি

হাম-রুবেলা নির্মূল জাতীয় যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, কভিড-১৯ মহামারির সময়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রতিদিন বৈঠক করে করোনার তথ্য বিশ্লেষণ করত এবং জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হতো। তবে সরকার এখনও হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবকে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা না করায় সে ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ছে

এদিকে হাম পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৭ জেলায় ইতোমধ্যে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১০৭ জন। চলতি বছর এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে তিন হাজার ৭১১ জন এবং মারা গেছে ছয়জন। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে আক্রান্ত ছিল এক হাজার ৮১, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০, মে মাসে ৭১৪ ও জুনের প্রথম সপ্তাহে আক্রান্ত হয়েছে ৫১৪ জন।

ডেঙ্গু আক্রান্তদের প্রায় ৭৬ শতাংশই ঢাকার বাইরের বাসিন্দা। সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে বরিশাল, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ভোলা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও কক্সবাজারে। পরিসংখ্যান বলছে, শুধু চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও পিরোজপুর– এই পাঁচ জেলাতেই ঢাকার বাইরের মোট রোগীর প্রায় ৪১ শতাংশ শনাক্ত হয়েছে।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার শঙ্কা

ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। ডেঙ্গু মোকাবিলার চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি একদম আপনাদের কসম কেটে বলছি, আমি খুব নার্ভাস হয়ে গেছি। খুব দুর্বল হয়ে গেছি। আমি কীভাবে এটা ফাইট করব? প্রস্তুতি নিচ্ছি, কিন্তু চিকিৎসায় মৃত্যুর বিষয়ে আমার কোনো হাত নেই।’

গতকাল বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) আয়োজিত ‘ডেঙ্গুর ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার আয়োজনে ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের সহযোগিতায় কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয়।

মন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু এখন আর সাধারণ কোনো রোগ নয়; এটি পুরো জাতির জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এ সংকট মোকাবিলা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা হাসপাতালের দায়িত্ব নয়, বরং দেশের প্রত্যেক নাগরিককে এতে সম্পৃক্ত হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আমরা সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসকদের ওপর চাপ দিতে পারি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে বলতে পারি। কিন্তু শতভাগ মশা বা লার্ভা ধ্বংস করা সম্ভব কি না, তা নিশ্চিত করতে পারি না। মশা ২০০ মিটার পর্যন্ত উড়তে পারে। যে কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে ঘরে ঢুকে যেতে পারে। তাই এটি অত্যন্ত কঠিন একটি লড়াই।

ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে সমন্বিত যুদ্ধ আখ্যা দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি নালা-নর্দমা, ডোবা, জলাবদ্ধ এলাকা ও কচুরিপানায় ভরা স্থান পরিষ্কার না করলে এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ। চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপরই বেশি গুরুত্ব দেন তিনি।

পূর্বপ্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর

একই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় এবার ‘রিঅ্যাকটিভ’ নয়, বরং পূর্বপ্রস্তুতিমূলক কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি বড় আকার ধারণের আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে।

বর্তমানে ডেঙ্গুর উপসর্গেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক রোগী ডায়রিয়া ও বমি নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। এতে দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি হয়ে শকের ঝুঁকি বাড়ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here