কৃষি মন্ত্রণালয়ের এয়ার-ফ্লো মেশিন ভুল পরিকল্পনা, পেঁয়াজ চাষির বিপদ পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই প্রযুক্তি বিতরণ

0
6

পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার গত দেড় বছরে পেঁয়াজ সংরক্ষণে নতুন প্রযুক্তি হিসেবে ‘এয়ার-ফ্লো মেশিন’ ব্যবহার শুরু করে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন জেলায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করায় সংরক্ষিত পেঁয়াজ দ্রুত পচে যাচ্ছে। অনেক মেশিন নষ্ট হয়ে পড়েছে। আবার কোথাও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে মেশিন চালানোই যাচ্ছে না। এতে কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগের সুফল পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা।

তাদের অভিযোগ, এয়ার-ফ্লো মেশিন বিতরণের আগে দেশের দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। অপরিকল্পিত প্রকল্প এবং ভুল নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষতির বোঝা বহন করতে হচ্ছে কৃষকদের।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন পেঁয়াজ উৎপাদনকারী এলাকায় ৮ হাজার আধুনিক এয়ার-ফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে আরও ৩ হাজার ৭০০টি মেশিন বিতরণ করা হয়। দুটি কর্মসূচিতেই একটি করে মেশিন ও সংরক্ষণ অবকাঠামো তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২৭ হাজার টাকা এবং কৃষকদের দিতে হয়েছে ১৩ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে ১১ হাজার ৭০০টি মেশিন বিতরণে সরকারি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। কৃষকদের অংশ যোগ করলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৪৭ কোটি টাকা।

এয়ার-ফ্লো মেশিন বিতরণের আগে প্রশিক্ষণে কৃষকদের জানানো হয়েছিল, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ৯ মাস পর্যন্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। প্রতিটি মেশিন ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলেও দাবি করা হয়। কিন্তু দেশের বিভিন্ন জেলায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করায় সংরক্ষিত পেঁয়াজ দ্রুত পচে যাচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, গ্রামাঞ্চলে দিনে ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে পেঁয়াজে পচন ধরছে।

মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলায় আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পেঁয়াজ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বেশ জোরেশোরে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, ঘর নির্মাণ করা হয় এবং ভর্তুকিতে মেশিন সরবরাহ করা হয়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সংরক্ষিত পেঁয়াজে পচন ধরতে শুরু করে।

মুজিবনগরের ভবেরপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল আউয়াল পাঁচ বিঘা জমির পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য একটি মেশিন নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ভালো দামে বিক্রির আশায় পেঁয়াজ রেখেছিলাম। এখন প্রতিদিন পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে।

রামনগর ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ও কৃষক সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রশিক্ষণে শেখানো নিয়ম মেনেও তাঁর কয়েকশ মণ পেঁয়াজ নষ্ট হয়েছে। কৃষি অফিসে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কার্যকর সমাধান পাননি।

মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সনজীব মৃধা বলেন, নতুন প্রযুক্তি হওয়ায় এর কার্যকারিতা অনেকটাই ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে। বিদ্যুৎ সমস্যা, তাপমাত্রা ও রোগাক্রান্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণের কারণেও পচন হতে পারে।

ফরিদপুরে পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে। চলতি অর্থবছরে জেলায় ৭ লাখ ৫১ হাজার ৬৩৫ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফরিদপুরে পেঁয়াজ চাষিদের ১ হাজার ৪৩০টি এয়ার-ফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। চলতি বছর আরও ৭০০টি মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু সংরক্ষণে দেখা দিয়েছে বড় সংকট।

জেলার সালথা উপজেলার কৃষক মোহাম্মদ আলী জানান, সরকারি এয়ার-ফ্লো মেশিন ব্যবহারের পর পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না হওয়ায় প্রতিদিন সংরক্ষণ করা পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যায়।

কৃষকদের অভিযোগ, রাত-দিন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ থাকে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। এই বিদ্যুৎ দিয়ে কোনোভাবেই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব নয়।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, এয়ার-ফ্লো মেশিন কার্যকর রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ জরুরি। বিদ্যুৎ না থাকলে মেশিনের কার্যকারিতা বজায় রাখা সম্ভব নয়।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কৃষকের হাতে প্রযুক্তি তুলে দেওয়ার আগে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি। দেশের গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং চলাকালে বিদ্যুৎনির্ভর সংরক্ষণ প্রযুক্তি বিতরণ করা ছিল বড় ধরনের পরিকল্পনাগত দুর্বলতা। প্রতিটি মেশিনের সঙ্গে যদি সোলার প্যানেল সংযুক্ত করা হতো, তাহলে বিদ্যুৎ না থাকলেও বাতাস চলাচল অব্যাহত থাকত এবং পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যেত।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব রায়হান কাওছার বলেন, মেশিনগুলোর সঙ্গে সোলার ব্যবস্থা যুক্ত করা প্রয়োজন ছিল। প্রকল্পটি সংশোধন করে সোলার সংযুক্ত করার সুযোগ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here