ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরা আগেই বন্ধ করে রেখেছিল দুর্বৃত্তরা। ফলে প্রকাশ্যেই ঠিকাদার কাজী নাসির উদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আট বছর পেরিয়ে গেলেও হত্যারহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অবশেষে মামলার বাদীপক্ষকে না জানিয়েই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ। মামলাটির সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক আলতাফ হোসেন সম্প্রতি এই প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নিহতের পরিবার।
স্বজনদের প্রশ্ন, একজন মানুষকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হলেও খুনি এবং পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা গেল না কেন? খুনের পেছনে কারণ কী, সেটিও জানতে পারলেন না তারা। হত্যারহস্য উদ্ঘাটন না করেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। অথচ তদন্ত কর্মকর্তা এ বিষয়ে তাদের অবহিত করেননি।
নাসিরের মেয়ে ও মামলার বাদী নার্গিস আক্তার নিপু সমকালকে বলেন, বাবা হারানোর বেদনা কতটা গভীর, তা শুধু আমরাই অনুভব করতে পারি। খুনিরা বাবার বুকে গুলি চালিয়ে পার পেয়ে গেল। বিচার পাওয়ার অধিকার কী আমাদের নেই? কেন, কী কারণে কারা বাবাকে হত্যা করল, সেই উত্তর পেলাম না। বাবা প্রাণনাশের হুমকিতে ছিল। কাদের শত্রুতা ছিল, সে বিষয়ে পুলিশকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। তবে পুলিশ সেটিকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে হয় না। নিপুর দাবি, তাঁর বাবাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করলে হয়তো তারা বিচার পেতেন।
জানা যায়, নাসিরের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার মাদুয়াখালী এলাকায়। তিনি পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকতেন। ভবনের টাইলস ফিটিংয়ের ঠিকাদারির কাজ করতেন। ২০১৮ সালের শুরু থেকে মহাখালীর দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের টাইলস ফিটিংয়ের কাজ চলছিল তাঁর অধীনে। ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টার দিকে তিনি কাজের তদারকি করতে যান দক্ষিণপাড়ায়। সেখানে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শুধু ঘটনাস্থলেরই নয়, ওই এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানার মোট ২৬টি সিসি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল দুর্বৃত্তরা।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সিসি ক্যামেরা বন্ধের বিষয়ে একাধিকার জিজ্ঞাসাবাদ করেও তথ্য পাওয়া যায়নি। একটি এলাকায় একযোগে কে বা কারা এই ক্যামেরাগুলো বিচ্ছিন্ন করল, সেটিও তদন্তকারীরা সিসি ক্যামেরা পরিচালনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বের করতে পারেননি।
হত্যার ঘটনায় নাসিরের মেয়ে নিপু অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা করেন। প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। কোনো কুলকিনারা না পেয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কাছে মামলাটি স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘদিন তদন্ত করে ডিবিও জড়িতদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। এরপর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্তের দায়িত্ব পায়। তদন্ত সংস্থাটি ২০২২ সালে ১৮ সেপ্টেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। তাতে উল্লেখ করা হয়, হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই ঘণ্টা আগে কে বা কারা পূর্বপরিকল্পিতভাবে সিসি ক্যামেরার প্রধান লাইন কেটে দেয়। ফলে হত্যার সময়ের ফুটেজ পাওয়া যায়নি। সিসি ক্যামেরা পরিচালনাকারীসহ আশপাশের লোকজন সংযোগ বিচ্ছিন্নকারীদের সম্পর্কে তথ্য দিতে পারেনি। চূড়ান্ত প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়, নাসির হত্যার ঘটনাটি সত্য বলে প্রতীয়মান হলেও জড়িতদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
পিবিআইর এই বক্তব্য গ্রহণ না করে আদালত সিআইডিকে পুনর্তদন্তের দায়িত্ব দেন। ২০২৩ সালের ৩ মে সিআইডির সে সময়ের পরিদর্শক মহসিন উদ্দিন তদন্ত শুরু করেও কিছুই বের করতে পারেননি। ২০২৪ সালের মে থেকে সিআইডির ঢাকা মহানগর উত্তরের পরিদর্শক আলতাফ হোসেন পঞ্চম তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান। সম্প্রতি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তিনি।
আলতাফ হোসেন সমকালকে বলেন, খুন হয়েছে এটা সত্য। তবে জড়িতদের সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।
বাদীপক্ষকে না জানানোর কারণ কী, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের বাসার ঠিকানায় চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে ঠিকানায় তাদের পাওয়া না যাওয়ায় সেটি ফেরত এসেছে। এ ছাড়া তাদের ফোন করেও পাওয়া যায়নি।
তবে তদন্ত কর্মকর্তা আলতাফ ফোন করেননি বলে দাবি করে বাদী নার্গিস আক্তার নিপু বলেন, কয়েক মাসের মধ্যে আমাদের সঙ্গে কোনো মাধ্যমেই যোগাযোগ করা হয়নি। আমরা আগের ঠিকানাতেই আছি। চিঠি পাঠানো হলে অবশ্যই আমাদের পাওয়ার কথা।




