ডিজেল সংকটে উপকূলের লাখো জেলে কর্মহীন

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বর এলাকার জেলে রণজিৎ চন্দ্র দাস সাত দিন ধরে নৌকা ঘাটে বেঁধে বসে আছেন। নদী আছে, জাল আছে, ইঞ্জিনও আছে; কিন্তু নেই ডিজেল। এই অভাবই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।

নিজের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে রণজিৎ বলেন, ‘নদীতীরের হাটবাজারে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে লিটারপ্রতি ৬০-৭০ টাকা বেশি দামে কিনে নদীতে যাচ্ছে। কিন্তু সেই খরচ তোলা সম্ভব না।

রণজিৎ বলেন, ‘সাত দিন ধরে নৌকা বন্ধ। পরিবার আর শ্রমিকদের নিয়ে খুব বিপদে আছি। ছেলেমেয়ের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দেওয়া কঠিন হয়ে গেছে।’ রণজিৎ একা নন; একই চিত্র দেশের প্রায় সব নদী ও উপকূলীয় এলাকায়। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের মৎস্য খাতে। ডিজেলের সংকটে মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার নদী কিংবা সাগরে যেতে পারছে না।

মৎস্যজীবীদের ভাষ্য, এ অবস্থা চলতে থাকলে মাছ ধরা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।

জেলে ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, ইতোমধ্যে নদনদীতে মাছ আহরণ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে উপকূলীয় মৎস্যবন্দর ও মোকামগুলোতে। অনেক জায়গায় কার্যক্রম প্রায় স্থবির। ফলে শুধু জেলে নয়; আড়তদার, পাইকার, শ্রমিক, বরফকল মালিক, পরিবহনকর্মীসহ পুরো মৎস্যভিত্তিক অর্থনীতি চাপে পড়েছে। এই খাতের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের কর্মসংস্থান এখন ঝুঁকির মুখে।
এই সংকটের মধ্যেই সামনে আসছে আরেক বড় চাপ। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শুরু হচ্ছে টানা ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। এর লক্ষ্য– মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও প্রজনন নিশ্চিত করা। জেলেরা বলছেন, জ্বালানি সংকটে কাজ বন্ধ, তার ওপর দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা; সব মিলিয়ে তারা চরম দুশ্চিন্তায়।

সামনে নিষেধাজ্ঞা, জীবিকা হুমকিতে
খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হিসাব বলছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সমুদ্রগামী ট্রলার পরিচালনার ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি, জেলেদের খাবার, বরফ, মজুরি– সব মিলিয়ে খরচ এত বেড়েছে যে মাছ বিক্রি করে সেই টাকা তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একাধিক নিষেধাজ্ঞা; ৬৫ দিনের সমুদ্র নিষেধাজ্ঞা, ২২ দিনের মা ইলিশ রক্ষা কর্মসূচি, অভয়ারণ্যে দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ, আট মাস জাটকা ধরায় নিষেধাজ্ঞা। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১৪৮ দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হয়।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ তিন হাজার। তবে বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি। পরিবারসহ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ লাখেরও বেশি। প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার নদী ও সাগরে যায়। ছোট নৌকায় দৈনিক ৫-২০ লিটার, মাঝারি নৌকায় ২০-৫০ লিটার এবং বড় ট্রলারে প্রতিদিন ১০০-৩০০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল লাগে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২৫ লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়।

বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশন জানায়, দেশে ২১৫টি শিল্প ট্রলার রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১৮০টি নিয়মিত সাগরে মাছ ধরে। এসব ট্রলারকে একটানা ২২ থেকে ২৫ দিন সাগরে থাকতে হয়। কিন্তু জ্বালানি সংকটে এখন অনেক ট্রলারই ঘাটে পড়ে আছে।

বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, আগে ১২ মাস মাছ ধরতাম। এখন নানা নিষেধাজ্ঞায় বছরে প্রায় ছয় মাস কাজ বন্ধ থাকে। কিন্তু ব্যাংকের সুদ তো থামে না। এ পরিস্থিতিতে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে গেছে। সরকার সমুদ্র অর্থনীতির কথা বলছে; কিন্তু জ্বালানি সংকটে সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সহজ শর্তে ঋণ, জ্বালানিতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা না দিলে আমরা টিকে থাকতে পারব না।

উপকূলজুড়ে স্থবিরতা
উপকূলজুড়ে নদীর ঘাটে সারি সারি নৌকা, খালে নোঙর করে থাকা ট্রলা, আর তীরে বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন জেলেরা। খুলনা অঞ্চলের সমুদ্রগামী জেলেদের অবস্থা সবচেয়ে সংকটজনক। জাল, নৌকা, ট্রলার– সব প্রস্তুত থাকলেও জ্বালানির অভাবে সমুদ্রে যেতে পারছেন না তারা। কয়রা উপজেলার কালনা গ্রামের জেলে সাইদুল শেখ বলেন, ‘সংকটের শুরুতে বেশি দামে হলেও তেল পাওয়া যেত। এখন দুই-তিন গুণ দাম দিলেও তেল নেই। এক সপ্তাহ ধরে ঘরে বসে আছি।’

একই উপজেলার আটরা গ্রামের ট্রলার মালিক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ট্রলারে ১০ জন জেলে। তেল না পেলে আমরা কীভাবে চলব? এভাবে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে।’

কয়রা মৎস্য আড়ত সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব আলী জানান, এক সপ্তাহ ধরে আড়তে মাছ আসছে না বললেই চলে। জেলেরা যেতে পারছে না, আবার গভীর সুন্দরবন থেকে মাছ আনাও বন্ধ।
বঙ্গোপসাগরের দুবলার চর, আলোর কোল, শ্যালার চর, নারকেলবাড়িয়া– এসব শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্রে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় এখন। নভেম্বর থেকে এপ্রিল– এই পাঁচ মাসেই পুরো মৌসুমের আয় নির্ভর করে। কিন্তু মৌসুমের শেষ মুহূর্তে এসে তেল সংকটে ভেঙে পড়েছে পুরো কার্যক্রম। দুবলার চর ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘একটি ট্রলারে ৩০ লিটার ডিজেল লাগে, সেখানে পাচ্ছি দুই-তিন লিটার। ৪৫০-৫০০ ট্রলার বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। দূরে পাঠানো যাচ্ছে না, খরচ ওঠানো কঠিন হয়ে গেছে।’

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে ডিজেল সংকট যেন দীর্ঘ হচ্ছে। পেট্রোল পাম্পে লম্বা লাইন। অনেক জায়গায় ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড সাঁটানো। কোথাও সীমিত রেশনিং। এই উপজেলার প্রায় ২৫ হাজার জেলের মধ্যে ১২ হাজারের বেশি ইঞ্জিনচালিত নৌকা রয়েছে। প্রতিদিন এসব নৌকায় ৩০-৪০ হাজার লিটার ডিজেল লাগে। কিন্তু এখন মাত্র ১০ শতাংশ জেলে কোনোভাবে তেল জোগাড় করে নদীতে নামছেন। দক্ষিণ তারাবুনিয়া, কাচিকাটা, দুলার চর ঘুরে দেখা যায়, নৌকায় বসে জেলেরা জাল বুনছেন, কেউ লুডু খেলছেন, কেউবা চায়ের দোকানে সময় কাটাচ্ছেন। উপজেলার কাচিকাটার জেলে করিম হাওলাদার বলেন, ‘এক লিটার ডিজেল ১৭০ টাকা দিয়ে কিনেছি। কিন্তু সেই তেলে নদীতে নামার সাহস পাইনি। আমার নৌকা ১০ মিনিটও চলবে না।’

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই অভিযোগ– পাম্পে তেল নেই, কিন্তু খোলাবাজারে বেশি দামে পাওয়া যাচ্ছে। যেখানে আগে লিটারপ্রতি ১০০-১০৫ টাকা ছিল, এখন ১৫০-১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যারেলপ্রতি তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। জেলেরা বলছেন, টাকা দিলেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আবার বেশি দিলেই পাওয়া যায়।

পটুয়াখালী ও আশপাশের উপকূলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। জেলেদের দাবি, মাছ আহরণ ৭০-৮০ শতাংশ কমে গেছে। মহিপুর-আলীপুর মৎস্যবন্দরে শত শত ট্রলার ঘাটে বাঁধা। প্রতিদিন ৩০-৩৫ হাজার লিটার চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র চার-পাঁচ হাজার লিটার। ট্রলার মালিক মনু খান বলেন, ‘এক সপ্তাহের জন্য ১ হাজার ২০০ লিটার তেল লাগে। কিন্তু ৩০০ লিটার নিয়ে গিয়ে দুদিনেই ফিরে আসতে হয়েছে।’

বরগুনার বদরখালী এলাকায় জেলেরা গতকাল মঙ্গলবার মানববন্ধন করেছেন। তাদের অভিযোগ, বোতলে তেল বিক্রি বন্ধ থাকায় ছোট নৌকার জেলেরা তেল পাচ্ছেন না। জেলে ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘আমরা নৌকা নিয়ে পাম্পে যেতে পারি না। বোতলে তেল না দিলে আমরা কীভাবে নেব?’

পটুয়াখালীর মহিপুর মৎস্যবন্দরের এফভি ‘মা-বাবার দোয়া’ ট্রলারের মালিক মো. মনু খান জানান, এক সপ্তাহ সাগরে থাকতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু তিনি মাত্র ৩০০ লিটার নিয়ে গিয়ে দুই দিনের মধ্যেই ফিরে আসতে বাধ্য হন। বর্তমানে ডিজেল না পেয়ে ট্রলার, ১৮ জন মাঝিমাল্লাসহ বন্দরে নোঙর করে আছেন। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের ভরণপোষণ তাঁকেই করতে হচ্ছে। মহিপুর ও আলীপুর মৎস্যবন্দরের ব্যবসায়ীরা জানান, এ দুটি বন্দরে ১২০টি আড়তে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ শ্রমিক কাজ করেন। এসব আড়তের মাধ্যমে সারাদেশে মাছ সরবরাহে প্রায় ৩০০ পাইকার যুক্ত। পাশাপাশি বরফকল, হোটেল, ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ পুরো অর্থনৈতিক চক্র এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ডিজেল সংকটে সবখানেই স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। মহিপুর ও আলীপুর হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার সরদার জানান, তাঁর সংগঠনের প্রায় ৭৫০ শ্রমিক এখন কর্মহীন। ঈদের আগ থেকেই কাজ বন্ধ। সামনে আবার নিষেধাজ্ঞা, তাতে সংকট আরও বাড়বে। মহিপুর মৎস্য আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুমন দাস বলেন, ট্রলার চলাচল ৭০-৮০ শতাংশ কমে যাওয়ায় আড়তের শ্রমিকদের কাজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আগে প্রতিদিন কোটি টাকার মাছ সরবরাহ হলেও এখন তা প্রায় বন্ধ। মহিপুরের একটি ফিলিং স্টেশনের ডিলার মো. রাজু আহমেদ জানান, প্রতিদিন ট্রলারের চাহিদা ৩০-৩৫ হাজার লিটার হলেও তিনি পাচ্ছেন মাত্র চার-পাঁচ হাজার লিটার। ফলে সবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. জিয়া হায়দার চৌধুরী বলেন, ঈদের আগ পর্যন্ত জেলেদের জ্বালানি পেতে সমস্যা হয়নি। তবে ঈদের পর নদীতীরবর্তী হাটবাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, কিছু এলাকায় জেলেরা তেল পাচ্ছেন না– এমন তথ্য আমরা পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই সংকট কেটে যাবে।

চিলমারীতে জেলেদের অবস্থান কর্মসূচি
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ডিজেল সংকটে বিপাকে পড়েছেন নদীনির্ভর জেলে পরিবারগুলো। জ্বালানি না পেয়ে ও অতিরিক্ত দামে কিনতে বাধ্য হওয়ায় সোমবার ইউএনও কার্যালয়ের সামনে অর্ধশতাধিক জেলে অবস্থান নেন। তাদের অভিযোগ, নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি দিলেই কেবল ডিজেল মিলছে। ফলে অনেক জেলে নদীতে নামতে পারছেন না; বন্ধ হয়ে গেছে আয়ের পথ।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, শতাধিক পরিবার কর্মহীন হয়ে পড়েছে। ইউএনও মাহমুদুল হাসান বলেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বেশি দামে বিক্রি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর