কয়েকটি ইউনিয়ন নিয়ে সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা হাব প্রতিষ্ঠা, ২৪ ঘণ্টা প্রাথমিক ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করা, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা চালু করে মা ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবার গুণগতমান অর্জন ও টেকসই করা সম্ভব।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল সভাকক্ষে গতকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ‘মা ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা: গুণগতমান ও টেকসই উন্নয়নে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তা ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা এ সুপারিশ করেন।
আলোচনায় বক্তারা সরকারি সেবা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার, কৌশলগত ক্রয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে ২৪ ঘণ্টা রোগী পরিবহন সেবা চালুর পরামর্শ দেন। এসবের পাশাপাশি দক্ষ জনবল নিয়োগ ও ধরে রাখা, জরুরি সেবায় সমন্বিত যোগাযোগ ও কমান্ড ব্যবস্থা, নিয়মিত পরিবীক্ষণ ও জবাবদিহির ওপর জোর দেন।
সমকাল ও জননী প্রকল্প যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করেছে। কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (কোইকা) অর্থায়ন, সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তা এবং আরডিআরএস বাংলাদেশের মাধ্যমে রংপুর ও লালমনিরহাটে জননী প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জননী প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ডা. উজ্জ্বল কুমার রায়। আলোচনায় অংশ নেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও সমন্বিত থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিচালক ডা. সৈয়দ কামরুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও গবেষণা) ডা. শাহনেয়াজ দেওয়ান, সেভ দ্য চিলড্রেনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. গোলাম মোদাব্বীর, আইসিডিডিআর,বির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ডা. শামস আল আরেফিন, ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক ডা. এমদাদুল হক, ইউএনএফপিএর এসআরএইচআর কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ আবু সাইদ মোহাম্মদ হাসান, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও জেপাইগো বাংলাদেশ এমসিজিএল প্রকল্পের সিওপি ডা. ইখতিয়ার উদ্দিন খন্দকার, আরডিআরএস বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরুল কায়েস মুনিরুজ্জামান, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রোগ্রাম মনিটরিং, আইইএম ইউনিট) ইসরাত জাবীন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাবিনা আশরাফী লিপি, রংপুরের পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক বিকাশ কুমার দাস, রংপুরের কান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ আজাদ জুয়েল, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও প্রধান মো. সাইফুল ইসলাম এবং লালমনিরহাটের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহজালাল।
আলোচনায় অংশ নিয়ে জননী প্রকল্প পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী মাসুমা রহমান নাবিলা। উপস্থিত ছিলেন জননী প্রকল্পের উপদেষ্টা নারে কিম ও তদারকি ও মূল্যায়ন পরিচালক সেই অয়ন কিম। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।
আলোচকরা বলেন, জননী প্রকল্পের উদ্ভাবনী অভিজ্ঞতা সরকারি নীতিমালায় যুক্ত করা গেলে প্রান্তিক সেবার মান আরও বাড়বে। জননী প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে শুরু থেকেই সরকারি মালিকানা প্রতিষ্ঠা এবং প্রকল্পের সফল মডেলগুলো জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যুক্ত করার সুপারিশ করেন তারা।
মূল প্রবন্ধে ডা. উজ্জ্বল কুমার রায় বলেন, রংপুর বিভাগের দুর্গম এলাকা ও চরাঞ্চলের মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি চিহ্নিত করে তা দূর করাই জননী প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। বর্তমানে রংপুর ও লালমনিরহাটের ১৩টি উপজেলার ৪০টি ইউনিয়নে প্রথম পর্যায়ের কাজ চলছে। এ প্রকল্পের আওতায় ১৯ হাজারের বেশি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে।
প্রকল্পটি ‘চার বিলম্ব মডেল’-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এগুলো হলো– একজন প্রসূতির স্বাস্থ্যসেবা নিতে দেরি করা, সেবা নেওয়ার জায়গায় পৌঁছানোর সমস্যা, সময়মতো মানসম্মত চিকিৎসার অভাব এবং জবাবদিহিতার অভাব। এই চারটি স্তর একসঙ্গে মোকাবিলা করে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই জননী প্রকল্পের কাজ।
রংপুরের পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক বিকাশ কুমার দাস বলেন, মাঠ পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের প্রায় ৩০ শতাংশ পদ শূন্য থাকায় কার্যকর তদারকি করতে সমস্যা হচ্ছে। তিনি প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন ও কনসালট্যান্টের সহায়তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন।
ডা. আ. ন. ম. মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, সারাদেশে তিন হাজার ২৯০টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে মাত্র একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা দিয়ে ২৪ ঘণ্টা সেবা চালানো বাস্তবে সম্ভব নয়। তিনি জানান, প্রতিটি কেন্দ্রে চারজন করে মিডওয়াইফ পদায়নের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
ডা. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আঞ্চলিক চাহিদা অনুযায়ী ‘স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং’ বা কৌশলগত ক্রয় পরিকল্পনা জরুরি। প্রান্তিক পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এবং কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে অনাকাঙ্ক্ষিত সিজারিয়ান কমানো সম্ভব।
ডা. সাবিনা আশরাফী লিপি বলেন, ২০২৫-২০২৯ মেয়াদের নতুন প্রকল্পের আওতায় প্রসূতি ও নবজাতকের পুষ্টি নিশ্চিত করতে আয়রন বড়ির পাশাপাশি ‘মাল্টিপল মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সাপ্লিমেন্ট’ চালু করা হবে। একই সঙ্গে লেবার রুম সংস্কার ও ফ্যাসিলিটি রেডিনেসের কাজও হাতে নেওয়া হয়েছে।
ডা. শামস আল আরেফিন বলেন, মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবায় পরিবর্তন আনতে জননী প্রকল্পের উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলো কীভাবে অন্য এলাকায়ও সম্প্রসারণ করা যায়, সে বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কী কী সীমাবদ্ধতা আছে, সেগুলোও চিহ্নিত করতে হবে। প্রকল্পের উদ্যোগগুলো সম্প্রসারণে সরকারের সঙ্গে একটি কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করা জরুরি। কারণ সরকারেরও নানা সীমাবদ্ধতা আছে; সবকিছু চাইলেই পাওয়া যায় না।
চলচ্চিত্র অভিনেত্রী মাসুমা রহমান নাবিলা রংপুরের প্রত্যন্ত এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, কেন্দ্রগুলোর দেয়ালে গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সেবা সম্পর্কে সহজ ভাষায় তথ্য দেওয়ায় মায়েরা উপকৃত হচ্ছেন। ‘জননী বন্ধু’ ও স্বজনদের উৎসাহে প্রসূতিরা বাড়িতে প্রসবের বদলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসছেন এবং বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট পাচ্ছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও জেপাইগো বাংলাদেশ সিওপি-এমসিজিএল প্রকল্পের ডা. ইখতিয়ার উদ্দিন খন্দকার বলেন, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। উন্নয়ন সহযোগীরা সরাসরি জনবল না দিলেও প্রশিক্ষণ ও মেন্টরশিপের মাধ্যমে বিদ্যমান কর্মীদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তিনি বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাতৃত্বকালীন ভাতা শুধু প্রথম গর্ভকালীন সেবা বা এএনসি-১-এর সঙ্গে যুক্ত না রেখে চতুর্থ এএনসি বা এএনসি-৪-এর সঙ্গেও যুক্ত করা দরকার।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) এসআরএইচআর কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ আবু সাইদ মোহাম্মদ হাসান বলেন, দুর্গম এলাকায় সেবা নিশ্চিত করতে চারটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শূন্য পদ দ্রুত পূরণ ও নতুন জনবল নিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, রেড-ইয়েলো-গ্রিন জোনভিত্তিক কার্যকর রেফারেল ও পরিবহনব্যবস্থা এবং মাতৃমৃত্যু নিরীক্ষার মাধ্যমে সেবার মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. সৈয়দ কামরুল ইসলাম বলেন, রেফারেল ব্যবস্থার জটিলতার কারণে তৃতীয় স্তরের হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি ‘হাব ফ্যাসিলিটি’ এবং আশপাশের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে ‘স্পোক’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তিনি জননী প্রকল্পে স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিংয়ের মাধ্যমে অফিস সময়ের পরও গাইনি বিশেষজ্ঞ ও অ্যানেস্থেসিস্টদের সমন্বিত সেবা দেওয়ার উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
আরডিআরএস বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরুল কায়েস মুনিরুজ্জামান বলেন, সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য ভালো ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। ‘বন্ধু সেবা নেটওয়ার্ক’কে টেকসই করতে স্বেচ্ছাসেবীদের সামাজিক স্বীকৃতি এবং পারিবারিক সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার। রেফারেলের পর রোগীর পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে মাঠকর্মীর কাছে তথ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা চালু করার পরামর্শ দেন তিনি।
ডা. গোলাম মুত্তাব্বির বলেন, স্বাস্থ্য খাতে শুধু জনবল নিয়োগ করলেই হবে না; তাদের পদায়ন, স্থায়ীকরণ এবং নীতিগত সংস্কারেও গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার আইনি জটিলতা কমানোর পাশাপাশি শহর ও প্রান্তিক এলাকার জনবল বৈষম্য দূর করতে হবে।
ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক ডা. এমদাদুল হক বলেন, নবজাতকের মৃত্যু কমাতে হলে সবার আগে মাতৃস্বাস্থ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ২০০৩ সাল থেকে হাসপাতালগুলোতে সমন্বিত জরুরি প্রসূতি সেবা চালুর পরিকল্পনা থাকলেও তা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। নিরবচ্ছিন্ন জরুরি প্রসূতি সেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি হাসপাতালে অন্তত ছয়জন গাইনি বিশেষজ্ঞ ও চারজন অ্যানেস্থেসিস্ট প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।


