হামে আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন ৪৩ বছর বয়সী হাফিজ উদ্দিন। কয়েক দিনের মধ্যে নিজেই হয়ে যান রোগী। প্রথমে জ্বর, পরে সারাশরীরে লালচে দানা। এরপর শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাঁকেও ভর্তি করা হয় রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হামের সংক্রমণ তাঁর ফুসফুসে প্রভাব ফেলেছে, এমনকি হৃদযন্ত্রেও জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। হাফিজের বাড়ি কেরানীগঞ্জে। তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার ছেলের হাম শনাক্ত হয়। বাসায় আলাদা করে রাখতে পারিনি। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ছেলের সঙ্গে কাটছে দিনরাত। ভাবিনি আমারও হাম হবে। এখন চিকিৎসক বলছেন, অবস্থা জটিল হতে পারে।
শুধু হাফিজ উদ্দিন একা নন, সাম্প্রতিক সময়ে শিশুর পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যেও বাড়ছে হামের সংক্রমণ। ডিএনসিসি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৫০০ রোগীর মধ্যে সাড়ে ১৮ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের বেশি। সেখানে ৫০ বছর বয়সী রোগীরও চিকিৎসা নেওয়ার নজির রয়েছে। হাসপাতালটিতে এরই মধ্যে ২৪ বছর বয়সী এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে ১২ বছরের বেশি বয়সীর জন্য আলাদা ‘ইনফেকশাস ব্লক’ চালু করা হয়েছে। এখন সেখানে ৭৪ রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ৯৩ জন, রংপুরে ছয়জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি চিকিৎসা নিচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে বয়সভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্য না থাকায় দেশে কতজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি হামে আক্রান্ত হয়েছেন, এর সঠিক সংখ্যা জানতে পারেনি সমকাল।
সংক্রমণ ছড়াচ্ছে পরিবার থেকেই
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের ডা. আসিফ হায়দার বলেন, ‘প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ পরিবারের শিশুসদস্যদের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া। কোনো শিশু আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে সঠিকভাবে আইসোলেশনে না রাখলে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও দ্রুত এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই মনে করেন হাম শুধু শিশুদের রোগ। তবে এখন আমরা নিয়মিত প্রাপ্তবয়স্ক রোগী পাচ্ছি। তাদের কারও নিউমোনিয়া হচ্ছে, কারও শ্বাসকষ্ট বাড়ছে।’ তিনি জানান, যারা শিশুকালে টিকা নেননি, টিকার পূর্ণ ডোজ সম্পন্ন করেননি, আগে কখনও হামে আক্রান্ত হননি কিংবা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। ক্যান্সার, যক্ষ্মা, দীর্ঘমেয়াদি অসুখ বা স্টেরয়েড সেবনের কারণে যাদের শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, তাদের ঝুঁকি আরও বেশি।
চট্টগ্রামেও শতাধিক প্রাপ্তবয়স্ক রোগী
চট্টগ্রামেও বড়দের শরীরে মিলছে হামের উপস্থিতি। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে শতাধিক প্রাপ্তবয়স্ক রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। অধিকাংশ রোগীর বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। আক্রান্তের মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল সূত্র জানায়, সেখানে অন্তত ৪০ জন প্রাপ্তবয়স্ক রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে ভর্তি আছেন ছয়জন। ৫৩ বছর বয়সী এক নারীও চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অনেক রোগীকেই পাঁচ থেকে সাত দিন হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। ১৯ বছর বয়সী কুলসুমা বেগম কয়েক দিন জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে বাড়িতে ছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁর স্বামী আলী আফসার বলেন, ‘বড়দের হাম হয় জানতাম না। প্রথমে গুরুত্ব দিইনি। পরে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায় হাসপাতালে আনতে হয়েছে।’ ১৬ বছর বয়সী জান্নাতুল আক্তারের বোন আয়েশা আক্তার বলেন, ‘এক দিনের মধ্যে শ্বাসকষ্ট অনেক বেড়ে যায়। হাসপাতালে এনে জানতে পারি, হাম হতে পারে।’

হাম ও হামের লক্ষণ নিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক অনেকে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। গত রোববার চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য খোলা হাম ব্লক থেকে তোলা সমকাল
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, কয়েক দিন ধরে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। শিশুদের সংক্রমণ কমেনি, এর মধ্যে বড়দের আক্রান্ত হওয়া উদ্বেগের। জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী বলেন, একসময় হাম মূলত শিশুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন বড়রাও আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকেই টিকার পূর্ণ ডোজ নেননি। আবার অনেকের ধারণা, হাম শুধু শিশুদের রোগ, ফলে দেরিতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির মধ্যে সংক্রমণের হার তুলনামূলক কম এবং অধিকাংশ রোগী চিকিৎসায় সেরে উঠছেন।
টিকাদানের ঘাটতিতে বাড়ছে ঝুঁকি
টিকাদানের ঘাটতি, কভিড-পরবর্তী নিয়মিত ইপিআই কার্যক্রমে ব্যাঘাত এবং অপুষ্টির কারণে দেশে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা এ তথ্য জানান। বক্তারা বলেন, হাম শুধু জ্বর ও শরীরে র্যাশের রোগ নয়; এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এনসেফালাইটিস, অন্ধত্ব এমনকি দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক জটিলতার কারণও হতে পারে।
শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জেসমিন মোর্শেদ তাঁর উপস্থাপনায় বলেন, হাম সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও টিকা কভারেজের ঘাটতির কারণে দেশে আবারও প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, টিকাদান, দ্রুত শনাক্তকরণ, আইসোলেশন ও সময়মতো চিকিৎসাই হাম নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায়।
ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শারমিন সুলতানা ‘হাম: নির্মূলের স্বপ্ন থেকে প্রাদুর্ভাবের বাস্তবতা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন, একসময় বিশ্বজুড়ে টিকাদান কর্মসূচির সফলতার কারণে হাম নির্মূলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে টিকা নিতে অনীহা, কভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়া, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও অভিবাসনের কারণে বহু শিশু টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে সমাজে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি আরও বলেন, হাম শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলার মতো জটিলতা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে অপুষ্ট শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি।
ভাইরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এস এম রাশেদ উল ইসলাম তাঁর প্রবন্ধে বলেন, টিকাদান ঘাটতির কারণে শিশুর মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে। আক্রান্ত শিশুর মধ্যে প্রায় ৩৯ শতাংশ নিউমোনিয়ায় এবং ২৯ থেকে ৩৮ শতাংশ ডায়রিয়ায় ভুগছে। এ ছাড়া এনসেফালাইটিস, কানের সংক্রমণ ও ভিটামিন এ ঘাটতিজনিত অন্ধত্বের ঘটনাও দেখা যাচ্ছে।
আরও পাঁচজনের মৃত্যু
সারাদেশে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর দুই মাসে হাম ও এই রোগের উপসর্গে ৪৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক হাজার ৪০৫ জন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এই নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ১৮ মে পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ৯১১। ২৪ ঘণ্টায় ৮৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ১৮ মে পর্যন্ত নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা সাত হাজার ৮৫৬। আর হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪২ হাজার ৮৬৮ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩৮ হাজার ৯৮০ জন। ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৫ মার্চ থেকে ১৮ মে পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে মোট ৩৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। হামে মারা গেছে ৭৫ জন।




