পঁচিশ বছর আগে রাজধানীর রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলাটির দুই ধাপ পার হয়েছে। এখন এটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর গত বছর মে মাসে হাইকোর্টে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আপিল নিষ্পত্তি হয়েছে। অন্যদিকে, ওই ঘটনায় ঢাকার আদালতে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের আরেক মামলার বিচার চলছে অত্যন্ত ঢিমেতালে।
২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান চলাকালে হুজি জঙ্গিদের বোমা হামলায় ১০ জন নিহত ও অনেকে আহত হন। অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূলে আঘাত হানতে জঙ্গিগোষ্ঠী ওই হামলা চালিয়েছিল বলে মামলার তদন্তে বেরিয়ে আসে।
এ ঘটনায় রাজধানীর নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র চন্দ ওই দিনই রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা দায়ের করেন। এর পর ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর দুই মামলায় ১৪ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ২০১৪ সালের ২৩ জুন হত্যা মামলায় রায় দেন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক রুহুল আমিন। রায়ে বিচারিক আদালত নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ আটজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
মুফতি হান্নান ছাড়াও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্যেরা হলেন– মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, মাওলানা আকবর হোসেন, মুফতি আব্দুল হাই, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মুফতি শফিকুর রহমান ও মাওলানা আরিফ হাসান সুমন। এর মধ্যে মুফতি আব্দুল হান্নানের সিলেটের এক মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন– হাফেজ মওলানা আবু তাহের, মাওলানা সাব্বির ওরফে আব্দুল হান্নান সাব্বির, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মাওলানা আব্দুর রউফ ও শাহাদত উল্লাহ ওরফে জুয়েল। বিচারিক আদালতের রায়ের পর মামলাটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসে। ওই রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে আসামিরা পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতে আপিল করেন।
দীর্ঘ শুনানির পর গত বছর ১৩ মে বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি নাসরিন আক্তার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। রায়ে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মো. তাজউদ্দিনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন এবং বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত শাহাদাতউল্লাহ জুয়েলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষ, যা আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায়।
এদিকে, হত্যা মামলার রায় বিচারিক আদালত ও উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হলেও বিস্ফোরক মামলাটি ঢাকা মহানগর ১৫ নম্বর বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এখনও বিচারাধীন। ২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এ মুফতি হান্নানসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিস্ফোরক আইনে করা মামলার বিচার শুরুর
আদেশ দেন।
২০২২ সালের ২১ মার্চ বিস্ফোরক মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। রাষ্ট্রপক্ষে মোট ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ৫৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন আদালত। ওই বছরের ৩ এপ্রিল আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের দিন ধার্য ছিল। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য ১১ আগস্ট দিন ধার্য করেন বিচারক। কিন্তু ২০২২ সালের ২৮ জুলাই ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল মামলাটি মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ফেরত পাঠান। এরপর পাঠানো হয় ১৫ নম্বর বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। মামলার বিচার একই স্থানে রয়েছে।
বিস্ফোরক আইনের মামলার বিষয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিশেষ পিপি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ২০০১ সালে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলায় দুটি অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। হত্যা মামলা বিচারিক আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে। বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় ৫৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪৮ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। কিন্তু বিভিন্ন আসামি হাইকোর্টে বিভিন্ন ধরনের আবেদন করার কারণে মামলার কার্যক্রম কিছুদিন স্থগিত ছিল। বর্তমানে স্থগিতাদেশ আর নেই। আগামী ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।




