রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ করে ‘ট্যাগ’ বা লেবেল ব্যবহার করার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে জনজীবনকে বিষাক্ত করে তুলছে বলে মন্তব্য করেছেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, এ ধরনের প্রবণতা শুধু রাজনৈতিক বিভাজনই বাড়াচ্ছে না, বরং রাষ্ট্রীয় শাসন ও নীতিনির্ধারণের বাস্তব ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নকেও বাধাগ্রস্ত করছে।
গতকাল শনিবার ‘নতুন সরকারের ৩ মাস: একটি প্রাথমিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক ওয়েবিনারে তিনি এ কথা বলেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জুমে অনুষ্ঠিত এ আলোচনার আয়োজন করে পিপিআরসি। এতে নীতি বিশ্লেষক, আইন বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অংশ নেন।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের নাগরিক আলোচনাকে আবেগনির্ভর রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে বের করে প্রমাণভিত্তিক ও তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণের দিকে নিয়ে যেতে হবে। রাজনৈতিক বিরোধীদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিন্দাসূচক লেবেল দেওয়া এখন একটি শিকড়গাড়া সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে, যা জনআলোচনাকে দূষিত করছে এবং নীতি বিশ্লেষণের স্বচ্ছতা নষ্ট করছে। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক ও ব্যবসায়িক অংশীজনদেরও গঠনমূলক জনআলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার তিন ধরনের ‘বোঝা’ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। এগুলো হলো উত্তরাধিকারের সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতা এবং জনপ্রত্যাশা পূরণে দলীয় প্রতিশ্রুতি। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের কারণে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক ক্ষত গভীর হয়েছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কার্যসম্পাদনে ঘাটতির কারণে নতুন সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে হোসেন জিল্লুর বলেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের কারণে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে, যার প্রভাব আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে। তিনি আরও বলেন, নতুন সরকার দীর্ঘ সময় নিয়ে তৈরি ইশতেহারে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ দর্শনের কথা বললেও তা বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, নতুন সরকারের প্রথম তিন মাস একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়, যেখানে সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, বাজার স্থিতিশীলতা এবং নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। বক্তাদের মতে, এই সময়টি অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে কাঠামোগত সংস্কারের জটিলতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনীতিকরণ থেকে কতটা বের হওয়া গেছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তিনি আরও বলেন, প্রশাসনিক নিয়োগে পুরোনো ধারা অব্যাহত রয়েছে এবং পুলিশি মনোবল এখনও পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জনতার সহিংসতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, বর্তমান সরকারকে একদিকে আগের প্রশাসনের দুর্বলতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির চাপও সামাল দিতে হচ্ছে। এতে রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং ঋণপ্রবাহে চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, রপ্তানি খাতে ধীরগতি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সামরিক ও কৌশলগত বিশ্লেষক ডা. মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ এখন বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বঙ্গোপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি এবং পানিসহ আঞ্চলিক সম্পদের নিরাপত্তাবিষয়ক চাপ দেশের কৌশলগত অবস্থানকে জটিল করে তুলছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান বলেন, জাতীয় ঐক্য ছাড়া আন্তর্জাতিক আলোচনায় শক্ত অবস্থান নেওয়া কঠিন। তিনি আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার ওপর গুরুত্ব দেন এবং অতীতের সব উদ্যোগকে রাজনৈতিক কারণে বাতিল না করার আহ্বান জানান।




