Home Blog Page 120

কর্মশালায় আলোচকরা তামাক কর সংস্কারে ৮৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হবে

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের মূল্যস্তর বর্তমান ৪টির পরিবর্তে ৩টিতে নামিয়ে আনা, প্রতি ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের ওপর ৪ টাকা করে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করাসহ বাজেটারি বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বাজেটের এসব সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলে বর্তমানের অতিরিক্ত ৪৪ হাজার কোটি রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব। এতে বিদ্যমান তামাক করের রাজস্বসহ মোট ৮৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় সম্ভব।

‘তামাক কর ও মূল্য পদক্ষেপ: বাজেট ২০২৬-২৭’ বিষয়ক এক কর্মশালায় রাজস্ব বাড়াতে এই আশাবাদ এবং তামাকের কর কাঠামো সংস্কারে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়। রোববার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিএমএ ভবন মিলনায়তনে যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া এলায়েন্স (আত্মা)। কর্মশালায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ডেপুটি এডিটর সাজ্জাদুর রহমান, আত্মা’র কনভেনর লিটন হায়দার, কো-কনভেনর নাদিরা কিরণ ও মিজান চৌধুরী, প্রজ্ঞা’র নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের, হেড অব প্রোগ্রামস মো. হাসান শাহরিয়ার প্রমুখ।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন তথ্য–উপাত্ত তুলে ধরা হয় কর্মশালায়। এতে বলা হয়, তামাকবিরোধীদের বাজেট প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে তরুণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী তামাক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হবে, অকাল মৃত্যু কমবে এবং রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়বে।

কর্মশালায় জানানো হয়, বর্তমানে সিগারেট ব্যবহারকারীর অধিকাংশই নিম্ন এবং মধ্যম স্তরের সিগারেটের ভোক্তা, যারা মূলত দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষ। নিম্ন এবং মধ্যম স্তরকে একত্রিত করে দাম বাড়ানো হলে স্বল্প আয়ের মানুষ সিগারেট ছাড়তে বিশেষভাবে উৎসাহিত হবে। তরুণ প্রজন্ম ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে। পাশাপাশি, সুনির্দিষ্ট কর-এর প্রচলন তামাক কর ব্যবস্থায় জটিলতা কমাবে এবং প্রশাসনিক সুবিধা বাড়াবে। নিম্ন স্তর এবং মধ্যম স্তরকে একত্রিত করে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটর খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ; উচ্চ স্তরে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ১৪০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা নির্ধারণ; প্রিমিয়াম স্তরে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ১৮৫ টাকা থেকে ২০০ বা তদূর্ধ্ব টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। একইসঙ্গে খুচরা মূল্যের ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রেখে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের প্যাকেটের ওপর ৪ টাকা পরিমাণ সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়।

বিড়ি, জর্দা এবং গুলের ওপর এনবিআর কর্তৃক নির্ধারিত হারে সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয় কর্মশালায়। এছাড়া সকল তামাকপণ্যের খুচরা মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়। এই সংস্কার করা হলে আগামী অর্থ বছরে তামাক কর ও মূল্য প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে তামাক খাত থেকে ৮৫ হাজার কোটি টাকার অধিক রাজস্ব আয় অর্জিত হবে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় চুয়াল্লিশ হাজার কোটি টাকা বেশি। পাঁচ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত হবে এবং তিন লাখ বাহাত্তর হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে এক লাখ পঁচাশি হাজার তরুণসহ তিন লাখ সত্তর হাজারের অধিক মানুষের অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।

সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন বিএনপির দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ১২০০ ছাড়িয়েছে

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা ১২০০ ছাড়িয়েছে। গত তিন দিনে রাজধানীর নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন নেত্রীরা। রোববার মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার শেষ দিন থাকলেও এই সময়ের মধ্যে ৯ শতাধিক ফরম জমা পড়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামীকাল সোমবারও মনোনয়ন ফরম জমা নেওয়া হবে।

বিএনপির দপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত তিন দিনে ১২ শতাধিক মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে ফরম পূরণ করে জমা দিয়েছেন ৯ শতাধিক নেত্রী। আজ বিকেল ৫টা পর্যন্ত মনোনয়ন ফরম জমা নেওয়ার কথা থাকলেও এদিন রাত ৯টা পর্যন্ত জমা নেন দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা।

এদিকে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ১০ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত সংরক্ষিত নারী আসনে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও জমা নেয় বিএনপি। এতে রাজধানীসহ সারাদেশ থেকে আসা দলীয় নেত্রীর পাশাপাশি শিক্ষক, আইনজীবী, শিল্পী, উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা মানুষ মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন।

দীর্ঘদিনের ত্যাগী হেভিওয়েট নেত্রীর পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেক পরিচিত মুখ। বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা নেই, এমন অনেকের মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়া নিয়ে নেতাকর্মীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। ত্যাগী নেত্রীরা বলছেন, আন্দোলনের কঠিন সময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, তাদের উপেক্ষা করা হলে সংগঠনের ভিত দুর্বল হতে পারে।

এদিকে রোববার দুপুরে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় এবার সংগঠন করার দক্ষতা, মেধা ও মননশীলতা– সব মিলিয়ে প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। দলে সেলিব্রিটি আসা অস্বাভাবিক নয়। তবে তাদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্বের বহু দেশে সেলিব্রিটিরা রাজনীতিতে আসেন।

তিনি আরও বলেন, মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিতে সক্রিয় না হলেও একজন বড় শিল্পীর রাজনৈতিক সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, সবাইকে কি রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হবে? একজন বিখ্যাত শিল্পী যদি দলের পক্ষে অবস্থান নেন, সেটাও বড় অবদান। কিছু ক্ষেত্রে সেলিব্রিটি প্রার্থীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করা হয়েছে, যা দলে গ্রহণযোগ্য নয়।

এলপিজির সংকট ও চড়া দামে ভোগান্তিতে সাধারণ গ্রাহক কৈলাশটিলা গ্যাস প্লান্ট

সিলেটের গোলাপগঞ্জে এলপি গ্যাসের সরবরাহ সংকট এবং সিলিন্ডারের অস্বাভাবিক বাজারমূল্যের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহক। তারা বলছেন, বৈশ্বিক জটিলতার কারণে একদিকে জ্বালানি তেলের সংকট, অন্যদিকে গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় বিপাকে পড়েছেন।

স্থানীয় গ্রাহকদের অভিযোগ, এলপিজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে বাজার সিন্ডিকেটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এক সময় স্থানীয় কৈলাশটিলা গ্যাস প্লান্ট থেকে সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ করা হতো। তখন বাজার সিন্ডিকেটের সুযোগ না থাকায় গ্রাহক ভোগান্তি ছিল না। বর্তমানে সেই সুযোগ নেই। সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে সরাসরি কোনো সরবরাহ না থাকায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মূল্য বাড়ানো হয়েছে।

জানা গেছে, গোলাপগঞ্জে বিভিন্ন কোম্পানির ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডার এক হাজার ৭৫০ থেকে এক হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।

স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্লান্ট সচল থাকলেও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ওই চক্র প্লান্ট থেকে সিলিন্ডার সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করছে এবং ব্যবসায়ীরা তা অধিক দামে বিক্রি করছেন। এতে করে এক সময় সাধারণ গ্রাহকের নাগালে থাকা এই প্ল্যান্টের গ্যাস এখন সিন্ডিকেটের পকেটে চলে গেছে। ফলে তারা ইচ্ছেমতো বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সাধারণ ভোক্তাদের দুর্ভোগ বাড়চ্ছে বাড়তি মুনাফার জন্য।

ভুক্তভোগী একাধিক গ্রাহক জানান, আগে তারা সরাসরি প্লান্ট থেকে স্বল্পমূল্যে গ্যাস পেতেন। বর্তমানে সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এতে সংসারের খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে এবং রান্নার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজও কঠিন হয়ে পড়েছে। চলমান সংকটে জর্জিত সাধারণ ভোক্তারা গত বুধবার কৈলাশটিলা প্লান্টের সামনে বিক্ষোভও করেন। সেখানে তারা সাধারণ গ্রাহকের জন্য সরাসরি সরকারি দামে গ্যাস সরবরাহের দাবি জানান।

উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, শুধু স্থানীয় প্লান্টের গ্যাস নয়, বাজারে থাকা অন্যান্য কোম্পানির এলপিজি সিলিন্ডারও চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। গ্রাহকদের কয়েকজন জানান, এক সময় উপজেলার মানুষ সরাসরি প্লান্ট থেকে গ্যাস সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে পারতেন। মাঝে হঠাৎ প্লান্ট বন্ধ হয়ে যায়। পরে আবার ২০২৪ সাল থেকে প্লান্টটি চালু হলেও আগের মতো সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা আর চালু করা হয়নি।

এদিকে গ্যাস লাইন সংযোগের প্রতিশ্রুতি নিয়েও ক্ষোভ বিরাজ করছে স্থানীয়দের মাঝে। উপজেলার কয়েক হাজার পরিবার গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন ও নির্ধারিত ফি জমা দিলেও দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরেও সংযোগ প্রাপ্তির কাজে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ভুক্তভোগীরা দ্রুত সংযোগ প্রদান এবং জমা দেওয়া অর্থের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাবে একটি সিন্ডিকেট এলপিজি বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

গোলাপগঞ্জে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট নিরসনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। তারা কৈলাশটিলা গ্যাস প্লান্ট থেকে সরাসরি গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত, বাজার মনিটরিং জোরদার এবং অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাপগঞ্জের কৈলাশটিলা এলপিজিসিএলের উপব্যবস্থাপক (প্রকৌশলী) আব্দুল মুমিন খান বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের নির্দেশে স্থানীয়ভাবে গ্রাহক পর্যায়ে সরাসরি সিলিন্ডারে গ্যাস বিক্রি বন্ধ রয়েছে। তাছাড়া এই প্লান্ট পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা গ্রুপের ডিলারদের মাধ্যমে সিলিন্ডার গ্যাস সরবরাহ করে থাকে। গত বুধবার স্থানীয়রা আন্দোলন করেছে সেটা শুনেছেন। কিন্তু তাঁর কাছে কোনো ব্যাপারে কেউ যায়নি।

কৈলাশটিলা গ্যাস প্লান্টের একটি সূত্র জানায়, সরাসরি গ্যাস সরবরাহ করা হলে সে ক্ষেত্রে সহজলভ্যতার কারণে প্রচুর অপচয় হয় গ্রাহক পর্যায়ে। আবার কোম্পানির মাধ্যমে বাজারে গ্যাস সরবরাহ করার প্রক্রিয়া সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এতে ভোগান্তি হয় ভোক্তাদের।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আগের মতো সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব নয়। তবে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারমূল্য নাগালের মধ্যে রাখা গেলে গ্রাহকরা স্বস্তি পাবেন। এ ব্যাপারে সরকারের বিশেষ নজরদারির কথাও বলা হয়েছে।

জ্বালানি সংকট পালা করে চলছে পণ্য ও যাত্রীবাহী নৌযান

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া জ্বালানি তেলের সংকটের বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে দেশের নৌপরিবহন খাতে। চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় অধিকাংশ নৌযান বসে থাকছে। বাকিগুলো চালাতে হচ্ছে পালা করে। এতে যাত্রীসেবার চেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায়। সারাদেশে পণ্য সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ইরানে হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ডিজেলের সরবরাহ সীমিত হয়ে গেছে। ডিপো থেকে চাহিদার অর্ধেকের বেশি তেল সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে পণ্য পরিবহনের গতি কমে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ গন্তব্যগুলোতে নৌ চলাচল অনেক কমে গেছে।

পাশাপাশি সারাদেশে ৪০টির লঞ্চের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অনেক বন্ধ হওয়ার পথে বলে আমাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। রাজধানীর চিত্রও প্রায় একই রকম। ঢাকার সদরঘাট থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩৮টি নৌপথে রোটেশনের মাধ্যমে লঞ্চ চলাচল করতে হচ্ছে। কোনো কোনো রুটে ট্রিপ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন লঞ্চ মালিকরা।

লঞ্চ মালিকদের সংগঠনের তথ্যমতে, সারাদেশে লঞ্চ চলাচলে চার লাখ টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। লঞ্চ মালিকরা বলছেন, সড়কপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে বেশ কয়েক বছর ধরে নৌপথে যাত্রী সংকট। তাই আগে থেকেই নৌরুটগুলোতে লঞ্চের সংখ্যা কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল সংকট হওয়ায় আরও ধস নেমেছে এই খাতে। পরিস্থিতির উত্তরণ না ঘটলে স্থায়ীভাবে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে পারেন অনেকে।

বন্দর পরিস্থিতি

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বেসরকারি অপারেটর ও শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মালিকানাধীন প্রায় আড়াই হাজার লাইটার জাহাজ চলাচল করে দেশের বিভিন্ন নৌপথে। এগুলো পরিচালনার জন্য দৈনিক গড়ে প্রায় আড়াই লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু ৫০ হাজার লিটারের মতো সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিআইডব্লিউটিসিসি) সূত্র জানায়, জ্বালানি তেল সংকটের কারণে জাহাজ পরিচালনার দৈনন্দিন পরিকল্পনাও ব্যাহত হচ্ছে। সংস্থাটির অধীনে থাকা প্রায় এক হাজার ৫০টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সারাদেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পরিবহন করে থাকে। দৈনিক ৮০টি জাহাজ পণ্য পরিবহনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতিদিন বরাদ্দ সভা করে জাহাজ নির্ধারণ করা হতো। কিন্তু তেল সংকটের কারণে দুদিন পরপর বরাদ্দ সভা করা হচ্ছে। যেসব জাহাজ তেল পাচ্ছে, পালা করে সেগুলোকে পণ্য পরিবহনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে গভীর ড্রাফটের বিদেশি বড় জাহাজ নোঙর করার পর সেখান থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করা হয়। বন্দরের বহির্নোঙরে পণ‍্য খালাসের এই কাজে নিয়োজিত ১০০ থেকে ১৫০ লাইটার জাহাজ। এখান থেকে পণ‍্য নিয়ে দেশের ৫২টি ঘাটে যায় আরও পাঁচ শতাধিক লাইটার। এসব ছোট জাহাজে প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ লিটার ডিজেলের চাহিদা আছে। কিন্তু মিলছে ৬০ হাজার লিটারের মতো। পাশাপাশি জ্বালানি সংকটের কারণে বন্দরে আসা বিদেশি বড় জাহাজগুলোকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে বহির্নোঙরে। এই অপেক্ষার জন‍্য প্রতিদিন তাদের ক্ষতি গুনতে হচ্ছে কমপক্ষে ২০ হাজার ডলার বা ২২ লাখ টাকা। বন্দরের বহির্নোঙরে গতকালও এমন বড় জাহাজ ছিল অর্ধশত।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে আসা পণ‍্যের ৭০ শতাংশের বেশি খালাস করা হয় বহির্নোঙরে। জেটিতে ড্রাফট কম থাকায় বড় জাহাজগুলো সেখানে লাইটারের মাধ‍্যমে পণ‍্য খালাস করে। চাহিদামতো লাইটার জাহাজ না মেলায় তার প্রভাব পড়ে বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমে। ক্ষতির মুখে পড়ে জাহাজ মালিক ও আমদানিকারকরা।

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের মাধ্যমে লাইটার জাহাজের বুকিং নেওয়া হয় প্রতিদিন। শিল্প মালিকদেরও লাইটার জাহাজ আছে। তারা নিজেদের পণ্য আনা-নেওয়া করতে সেগুলো স্বতন্ত্রভাবে পরিচালনা করে। লাইটার জাহাজ দিয়ে বন্দরের বহির্নোঙর থেকে পণ‍্য নেওয়া হয় চট্টগ্রামের বেসরকারি ১৬টি ঘাটে। পণ‍্য যায় নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, নিতাইগঞ্জসহ দেশের ৫২টি ঘাটে। চাল-ডাল-তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যায় এগুলোতে। নেওয়া হয় সিমেন্ট ক্লিংকার, কয়লাসহ শিল্পকারখানার কাজে ব‍্যবহৃত কাঁচামালও। সারাদেশে সচল থাকা এমন লাইটার জাহাজ আছে সহস্রাধিক।

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের মুখপাত্র মিউচুয়াল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভেজ আহমেদ বলেন, চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি পাচ্ছি আমরা। অথচ নৌ বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালনা করতে হয় আমাদেরই। চাহিদামতো জ্বালানি না পাওয়াতে প্রত্যাশা অনুযায়ী দিতে পারছি না বুকিং। এতে পুরো বাণিজ‍্য বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

লঞ্চ পরিস্থিতি

লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত মার্চের শুরু থেকে তেল সংকট দেখা দেওয়ায় ঈদুল ফিতরের সময় নৌপথে ঘরমুখো যাত্রীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারেননি তারা। সংকট সমাধানে নৌপরিবহন এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ছাড়াও নৌপথে তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়ামের নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপো কর্তৃপক্ষকে জরুরি চিঠি দিয়েছিল লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল সংস্থা এবং নৌযানে তেল সরবরাহকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিভার ফুয়েল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন। কিন্তু সংকট নিরসন হয়নি। তাই ঈদের সময়ই রাজধানীর সদরঘাট টার্মিনালসহ বিভিন্ন টার্মিনাল ও লঞ্চঘাট থেকে কয়েকটি রুটের চলাচল বাতিল করতে হয়।

ঢাকা নদীবন্দরের সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩৮টি রুটে চলাচলকারী ১৪০টি আন্তঃজেলা ও ছোট-বড় লঞ্চ চলাচল করে। লঞ্চ মালিকদের দুটি সংগঠনের অধীন চলাচলকারী এসব লঞ্চের ডিজেলের চাহিদা রয়েছে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন লাখ লিটার। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, চাঁদপুর, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, ভৈরব, আরিচা ইত্যাদি লঞ্চ টার্মিনাল অথবা ঘাট থেকে চলাচলকারী লোকাল (স্থানীয়) অর্ধশতাধিক লঞ্চের জন্য ডিজেলের চাহিদা প্রতিদিন এক লাখ লিটারের মতো। সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় চার লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে সদরঘাটের ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় ৬০ ভাগ ডিজেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।  অন্যান্য জায়গায় চাহিদার তুলনায় অর্ধেক সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।

এরই মধ্যে সদরঘাট ছাড়াও বেশ কয়েকটি লঞ্চ টার্মিনাল ও ঘাট থেকে আন্তঃজেলা ও লোকাল লঞ্চের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে পাঁচটি ও বরিশাল থেকে চার থেকে ছয়টিসহ ৪০টির মতো স্থানীয় ও ছোট লঞ্চের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাপ) সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বদিউজ্জামান বাদল সমকালকে বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে প্রায় এক মাস ধরে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না তারা। কোথাও কোথাও চাহিদার অর্ধেক তেলও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকে স্থানীয় পাওয়ার টিলারের তেলের ডিলারসহ খুচরা দোকান থেকে ডিজেল কিনে লোকসান দিয়ে হলেও যাত্রীসেবা চালু রাখার চেষ্টা করছেন। তেলের অভাবে অনেক রুটের লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাধ্য হয়ে কয়েকটি রুটে চালু করা হয়েছে রোটেশন পদ্ধতি।

যাপের মহাসচিব সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে গত শনিবার জরুরি বৈঠক করেছে তাদের সংগঠন। কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির এই বৈঠকে ঈদুল আজহার সময় আগামী জুনে তেল সংকট আরও বাড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন মালিকরা। কেননা সে সময় সারাদেশে তেলের চাহিদা পাঁচ লাখ লিটার ছাড়াবে। এই কারণে বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদুল আজহায় আগাম সতর্কতা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে চিঠি দেবেন তারা।

ঢাকা-বরিশাল রুটের সুন্দরবন নেভিগেশনের মালিক আকতার হোসেন বলেন, রাউন্ড ট্রিপে (যাওয়া-আসা) একটি লঞ্চে ছয় থেকে সাত হাজার লিটার তেল লাগে। নিয়মিত চলাচলকারী তিনটি লঞ্চে দৈনিক গড়ে ১৮ থেকে ২১ হাজার লিটার তেল লাগলেও বর্তমানে ১২-১৪ হাজার লিটারের বেশি পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে রোটেশন করে একটি বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। সংকট না কমলে লঞ্চ চালানো অব্যাহত রাখতে পারব কিনা সন্দেহ হয়।

ঢাকা-ভোলা রুটে চলাচলকারী গ্রিনলাইন ওয়াটার ভেসেলের জিএম আবদুস সাত্তার বলেন, প্রতিদিন তাদের দুটি ওয়াটার বাস চলাচল করে এই রুটে। জ্বালানি সংকটের কারণে ঈদের আগে-পরে একটি ওয়াটার বাস চালাতে হয়েছে তাদের। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়া পর্যন্ত জাহাজ চালানো সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশ রিভার ফুয়েল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশেনের সভাপতি জি এম সরোয়ার বলেন, ডিপো থেকে তেল পাওয়ার পর অ্যাসোসিয়েশনের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ১৬-১৭টি মিনি ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে লঞ্চগুলোতে ডিজেল সরবরাহ করা হয়। নিয়মিত চলাচলে সদরঘাট থেকে দেশের ৩৮টি রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলোর প্রতিদিন দরকার পড়ে দুই-তিন লাখ লিটার ডিজেল। কিন্তু ডিপো থেকে এই চাহিদার তুলনায় অনেক কম তেল পাচ্ছি আমরা। এ নিয়ে ঈদুল ফিতরের আগে ডিপো কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। তারপরও বাড়েনি তেল সরবরাহ। সংকট না কাটলে আমাদের পক্ষে ব্যবসা চালিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।

মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ফতুল্লা ডিপোর সুপারভাইজার জালাল উদ্দিন বলেন, নৌপরিবহনসহ সব খাতে জ্বালানি তেলের সংকট নিরসনের বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা চলছে। আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।

সুনামগঞ্জের দেখার হাওর হাজারো কৃষকের চেষ্টায় বাঁধ রক্ষা

হাজারো কৃষকের ঐক্যবদ্ধ চেষ্টায় আপাতত রক্ষা পেল সুনামগঞ্জের দেখার হাওর। গতকাল শনিবার সকালে পানির তোড়ে ভেঙে যায় গুজাউনি এলাকার এ বাঁধ। কৃষকদের চার ঘণ্টার প্রাণান্তকর চেষ্টায় রক্ষা
পেল লাখো মানুষের প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে সদর উপজেলা, শান্তিগঞ্জ, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলার মানুষের জমি আছে। এই হাওরে মোট জমির পরিমাণ ৪৫ হাজার ৮৫৯ হেক্টর। এর মধ্যে আবাদি জমি আছে ২৪ হাজার ২১৪ হেক্টর। হাওরে এবার অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ঝাওয়া, শেয়ালমারা, গুমরাসহ কয়েকটি জায়গায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, দেখার হাওরের ভেঙে যাওয়া গুজাউনি বাঁধে বাঁশ পুঁতে, মাটি-বন ও বালুর বস্তা স্রোতের মধ্যে ফেলে বাঁধ মেরামতের চেষ্টা করেন শত শত কৃষক। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাজারো কৃষক তাতে যুক্ত হলেন। সকলের চেষ্টায় একপর্যায়ে মহাবিপদ থেকে রক্ষা পায় দেখার হাওর।

গুজাউনি বাঁধের প্রায় পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে জনসবতি নেই, কেবল ধানের জমি এবং বিল। বাঁধ রক্ষার জন্য দূরের গ্রাম থেকে আসছিলেন কৃষকরা। কারও কাঁধে বাঁশ, কেউ বা কোদাল, কেউ টুকরিসহ বাঁধ রক্ষার কাজে যার কাছে যা আছে সঙ্গে নিয়ে বাঁধের দিকে আসছেন।

এই হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান নিয়ে গেল এক সপ্তাহ ধরে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন কৃষকরা। তারা বলেছেন, অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হাওরের সবচেয়ে বড় বাঁধ উতারিয়া এখন তাদের গলার কাঁটা হয়েছে। এই বাঁধের কারণে গেল কয়েক দিনের বৃষ্টিতে দরিয়াবাজ অংশের ফসল ডুবে গেছে। শনিবার হাওরের গুজাউনি বাঁধ ভেঙে আরেকাংশ (মেলাউনি হাওর) ডুবতে থাকে। আপাতত বাঁধের ভাঙন ঠেকানো গেলেও একাংশে জলাবদ্ধতার যে পরিমাণ পানি আটকা আছে, তাতে অপরাংশ রক্ষা করা কঠিন জানিয়েছেন কৃষকরা।

হাওরসংলগ্ন মদনপুরের কৃষক আমিন উদ্দিন বললেন, পূর্ব পাশে বড়দৈ বিল, এই বিলের আশপাশের জমি ডুবে গেছে জলাবদ্ধতায়। ডান পাশের এক মেলানির হাওরেই তিন হাজার একর জমি আছে, ভাঙন ঠেকাতে না পারলে দেখতে দেখতে এই অংশ ডুবে যাবে। অপর হাওরেও পৌঁছাবে পানি।

কৃষকরা জানান, শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দেখার হাওরের মাঝখানে গুজাউনি বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ শুরু হয় ডান দিকের জয়কলস, শান্তিগঞ্জ ও পশ্চিম পাগলা অংশের দেখার হাওরে। এ সময় কৃষকরা চিৎকার কান্নাকাটি শুরু করেন। চার ঘণ্টার চেষ্টায় বাঁধের ভাঙন রোধ এবং ভাঙা অংশ দিয়ে নিচের দিকে পানি নামা বন্ধ হওয়ার পর স্বস্তির খবর ছড়ায় হাওরতীরে।

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সুনামগঞ্জের সভাপতি ইয়াকুব বখ্‌ত বহলুল বলেন, ফসল কীভাবে রক্ষা করা যায় আরও ভাবতে হবে সকলের। যে বাঁধে হাওরে জলাবদ্ধতা তৈরি করে, তা দিয়ে লাভ কী হলো?
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, যে বাঁধটি ভেঙেছে সেটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফসল রক্ষা বাঁধের আওতায় ছিল না। বৃষ্টিতে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে বাঁধ কাটার খবর পাওয়া গেছে। এই বাঁধের বিষয়ে কৃষকদের পক্ষ থেকে আগে থেকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। আগে থেকে জানা গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতো।

 

সংসদ অধিবেশন ঘটনাবহুল অধিবেশন, কিছু সংস্কার থমকে গেল

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টির অনুমোদন দেয়নি জাতীয় সংসদ। অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদিত না হওয়ায় ১৩টি অধ্যাদেশ অকার্যকর হয়ে গেছে। বাকি সাতটি অধ্যাদেশ চারটি বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে সংসদের ঘটনাবহুল প্রথম অধিবেশনের এক মাসে গুম প্রতিরোধ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদ্যোগ থমকে গেছে।

সংসদের বিরোধী দল বিষয়টিকে জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে প্রতারণা বলে আখ্যা দিয়েছে। নাগরিক সমাজ সমালোচনা করছে। তবে সরকারি দল বলছে, সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। সংবিধান অনুযায়ী, আইনে রূপান্তরিত করতে সংসদে বিল উত্থাপন না করায় ১৩টি অধ্যাদেশ গতকাল শনিবার প্রথম প্রহরে অকার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে গণভোট, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন, তথ্য অধিকার, পুলিশ কমিশন, রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত সংস্কারের সাতটি আলোচিত অধ্যাদেশ রয়েছে।

এ ছাড়া বিল পাসের মাধ্যমে বাতিল করা অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগ আইন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার কমিশন সংস্কারের মতো বিষয় রয়েছে।

৮৭টি বিলের মাধ্যমে সরকারি দল অন্তর্বর্তী সরকারের যে ১১৩টি অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে তার মধ্যে কিছু অধ্যাদেশ রয়েছে যেগুলো জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে জারি করা হয়েছিল। সেই অধ্যাদেশগুলো সরকারি দল বিল আকারে পাস করেছে। যেমন স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কারণ দর্শানো ছাড়াই অপসারণ এবং প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা দিয়ে চারটি অধ্যাদেশ পাস করা হয়েছে।

এ ছাড়া ওয়াসার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কর্মচারীদের কারণ দর্শানো ছাড়াই ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে বা জনস্বার্থে’ অপসারণের ক্ষমতা সরকারকে দিয়ে জারি অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতে বিল পাস করানো হয়েছে। আন্দোলন দমনে সরকারি কর্মচারীদের দ্রুততম সময়ে বরখাস্ত করার অধ্যাদেশগুলোও সংসদ অনুমোদন করেছে।

তিন ফসলি জমিতে তামাক চাষ নিষিদ্ধের ভূমি ব্যবহার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ সংশোধন করে পাস করানো হয়েছে। ফলে এসব জমিতে তামাক চাষ করা যাবে। আবার তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ সংশোধন করে ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণকে শিথিল করা হয়েছে।

বাক্‌স্বাধীনতা ও সরকারের সমালোচনার সুযোগ তৈরি সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ হুবহু পাস করা হয়েছে। ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা, বাণিজ্যিক আদালত, আইনগত সহায়তা, ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন এবং দেওয়ানি কার্যবিধি সংশোধনের সংস্কারমূলক অধ্যাদেশগুলোকেও আইনে পরিণত করতে বিল পাস করা হয়েছে।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, জনগণের অধিকার আবার পায়ের তলায় পিষ্ট করার পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। সংসদে ফিরব। তবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তির আন্দোলন গড়ে তুলব। চুল পরিমাণ ছাড় দেব না।

বিএনপির বিরুদ্ধে ওয়াদা ভঙ্গের অভিযোগ করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম গতকাল সরকারকে সতর্ক করে বলেছেন, ছাত্র-জনতার রক্তের সঙ্গে ওয়াদা ভঙ্গের পরিণতি তাদের অচিরেই ভোগ করতে হবে।

প্রশ্ন গণভোট নিয়ে
বিরোধীদের অব্যাহত দাবির মুখেও গত ২৫ নভেম্বর জারি করা গণভোট অধ্যাদেশ পাস করেনি বিএনপি সরকার। এই অধ্যাদেশের অধীনেই গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ওপর গণভোট হয়েছে।

জুলাই আদেশকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল বলে আখ্যা দিলেও অধ্যাদেশ পাস না করানোর ব্যাখ্যায় তিনি ৪ এপ্রিল বলেছেন, গণভোট যেহেতু হয়ে গেছে, অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের প্রয়োজন নেই।

১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ হ্যাঁ ভোট পেয়ে জুলাই আদেশ এবং জুলাই সনদে বর্ণিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো অনুমোদন পায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও নির্বাচনের প্রচারে হ্যাঁ ভোট চেয়েছিলেন। সংসদে মুলতবি প্রস্তাবে দুই দফা বিতর্ক হলেও বিএনপির কেউ স্পষ্ট করেননি– গণভোটের ফল মানবেন কিনা। দলটির মন্ত্রীরা বারবার বলেছেন, গত বছরের ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী সংস্কার করা হবে।

গণভোটের ফল অনুযায়ী সংস্কারের দাবিতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আন্দোলন নেমেছে। অধ্যাদেশ পাস না করার বিষয়ে ১১ দলের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেন, যে গণভোট সরকারের বৈধতা, সেই অধ্যাদেশ বাতিল করা হলো। এখন হয়তো বলা হবে, গণভোটও অবৈধ।

ঐকমত্য কমিশনের পরামর্শক কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক বলেন, অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল শুধু গণভোট আয়োজনে, যা হয়ে গেছে। ফলে অধ্যাদেশ পাস না হলেও গণভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন নেই।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশগুলো বাতিল হলেও এসবের অধীনে যেসব কাজ অতীতে হয়েছে, সেগুলোর বৈধতা দিতে বিল পাস করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান সিদ্দিক বলেন, গণভোট অধ্যাদেশের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা যেত। তা না হওয়ায় কিছু আইনি প্রশ্ন হয়তো উঠবে।

গত বছরের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই আদেশও তোলা হয়নি সংসদে। সরকার ও বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির ক্ষমতা নেই। সুতরাং আদেশটি শুরু থেকেই অবৈধ ছিল। ইমরান সিদ্দিক বলেছেন, আদেশ পাস করার প্রয়োজন নেই। আদেশের ওপর গণভোট হয়ে গেছে।

অধ্যাদেশ অকার্যকরে যা হবে
অধ্যাদেশ অকার্যকর হওয়ায় এতে গুম প্রতিরোধে পৃথক আইন আর থাকছে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে হবে গুমের বিচার। অধ্যাদেশ অকার্যকর হওয়ায় দুদকের ২০০৪ আইনে ৩২(ক) ধারা শনিবার রাত থেকে ফিরেছে। ফলে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা করতে হলে অনুমতি নিতে হবে।

সরকারি নথিকে তথ্য হিসেবে ঘোষণা করায় প্রকাশের যে বাধ্যবাধকতা করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার, অধ্যাদেশ অকার্যকর হওয়ায় তা আর থাকছে না। তাই সরকারকে এসব তথ্য প্রকাশ করতে হবে না।

পুলিশের যে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে নাগরিকের অভিযোগ তদন্ত এবং পুলিশের সুরক্ষায় সুপারিশের দায়িত্ব দিয়ে কমিশন গঠনের যে বিধান করা হয়েছিল, অধ্যাদেশ অকার্যকর হওয়ায় সেটিও থাকছে না। ফলে পুলিশ কমিশন গঠনের আগেই বিলোপ হয়ে গেল।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কারে গত বছর সংস্থাটিকে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। এই সুপারিশ কয়েক দশক ধরে থাকলেও এনবিআরের কর্মকর্তারা এই সংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে কর আদায় বন্ধ করেছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশটি অকার্যকর হওয়ায় এনবিআর আগের ব্যবস্থায় ফিরবে।

অধ্যাদেশ বাতিলে যা হবে
মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন ফিরিয়েছে সরকার। ফলে মানবাধিকার কমিশনে চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের বাছাই কমিটিতে আবার সরকারের প্রাধান্য ফিরছে। কমিটির ছয় সদস্যের পাঁচজনই হবেন সরকার এবং সরকারি দলের। ফলে সরকারের পছন্দে নিয়োগ হবে।

অধিকাংশ মানবাধিকার লঙ্ঘন সরকারি ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী সংস্থার বিরুদ্ধে থাকলেও ২০০৯ সালের আইনের ১৮ ধারায় বলা হয়েছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্ত করতে পারবে না মানবাধিকার কমিশন। মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযোগ পেলে কমিশন শুধু সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে। এরপর প্রয়োজন মনে করলে কমিশন শাস্তির সুপারিশ করতে পারবে।

অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় পুরোনো এ বিধান আবার ফিরেছে। অধ্যাদেশে কমিশনকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সরকারি কর্মচারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত, সরকারের অনুমতি ছাড়া গ্রেপ্তার এবং শাস্তির সুপারিশের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।

অধ্যাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণ হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পক্ষ হয়ে কমিশনকে ক্ষতিপূরণ বা জরিমানার টাকা আদায়ের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, কমিশনের আদেশ যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মানতে বাধ্য থাকবেন। না মানলে সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে অদক্ষতা ও অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে। চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে কমিশন। অধ্যাদেশ বাতিলে এসব ক্ষমতা আর থাকছে না কমিশনের।

অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগও আগের নিয়মে ফিরছে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কাউন্সিল নয়, প্রধানমন্ত্রী পরামর্শে আবারও বিচাপতি নিয়োগ হবে। সচিবালয় বিলুপ্তের ফলে আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে ফিরছে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরি, বদলি, পদোন্নতি ও শাস্তির ক্ষমতা। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশে এ ক্ষমতা প্রধান বিচারপতি নিয়ন্ত্রণাধীন বিচার বিভাগ সচিবালয়কে দেওয়া হয়েছিল। অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর উদ্বোধন করা সচিবালয় আইনিভাবে গতকাল বিলুপ্ত হয়েছে।

সুসাশনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যে অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহির মতো আসল সংস্কার হতো, সেগুলোই বাদ দেওয়া হয়েছে। যেসব অধ্যাদেশে সরকারের ক্ষমতা বেড়েছে, সেগুলো আইনে পরিণত করা হয়েছে। উল্টোপথে যাত্রা শুরু হয়েছে।

জ্বালানি সংকট পাম্পে দুর্ভোগ, ফুয়েল পাস অ্যাপেও বিড়ম্বনা

রাজধানীর আসাদগেট। শনিবার সকাল সাড়ে ৭টা। ওই এলাকার একটি পেট্রোল পাম্প ঘিরে ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি আর মোটরসাইকেলের জটলা। ট্রাকচালক রিয়াজুল ইসলাম স্টিয়ারিংয়ে মাথা রেখে ঝিমাচ্ছেন। গত শুক্রবার রাত ২টা থেকে লাইনে তিনি।

রিয়াজুল বললেন, আগে রাতে ঢাকার বাইরে থেকে যাত্রা করে ভোরে কারওয়ান বাজারে কাঁচামাল নিয়ে পৌঁছাতাম। আর এখন ভোর হয় তেলের লাইনে। ট্রিপ মারব কখন, আর ঘুমাব কখন? শরীরের ওপর দিয়ে যে ধকল যাচ্ছে, তাতে যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

একই এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ে তেলের জন্য অপেক্ষায় থাকা ব্যাংকার রবিউল হাসান ঘড়ি দেখছেন বারবার। সকাল ৯টায় অফিস, তাঁর সামনে এখনও অন্তত ২০টি মোটরসাইকেল। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এক মাস ধরে আমার রুটিন পাল্টে গেছে। যেদিন মোটরসাইকেলের তেল শেষের দিকে থাকে, তখন শুরু হয় দুশ্চিন্তা। কখন, কীভাবে তেল মিলবে।

তেলের জন্য লাইনে দাঁড়ালে অফিসে পৌঁছাতে পারব কিনা? কয়েকবার অফিস ছুটি নিয়ে তেল সংগ্রহ করতে হয়েছে। সারাদেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট এখন আর শুধু সংকটের গল্প নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক শৃঙ্খলাকে বদলে দিয়েছে। কর্মঘণ্টার সিংহভাগ এখন ব্যয় হচ্ছে রাস্তায় তপ্ত রোদে ফিলিং স্টেশনের লম্বা লাইনে। মানুষের যাতায়াত, বাজার করা, এমনকি পারিবারিক সময় কাটানোর সুযোগও এখন কেড়ে নিচ্ছে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা।

স্থবির কর্মজীবন
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইকবাল কবির জানান, শনিবার অফিসে সাপ্তাহিক বৈঠক দুপুর ১২টায়। বৈঠক ধরতে সাড়ে ১১টায় বছিলার বাসা থেকে বের হলেই হতো। আজ (শনিবার) মোটরসাইকেলের তেল নিতে সকাল ৭টায় বাসা থেকে বের হয়েছি, তার পরও সময়মতো বৈঠক উপস্থিত থাকতে পারিনি। ইকবাল বলেন, এই অনিশ্চয়তা মানসিক স্বাস্থ্য আর কাজের মনোযোগ– দুটোই শেষ করে দিচ্ছে।

গতকাল রাজধানীর মালিবাগ, তেজগাঁও, রামপুরা ও কল্যাণপুর এলাকার প্রতিটি পাম্পের চিত্র এখন একই। তেলের সংকটে রাইড শেয়ারিং অ্যাপের চালকদের জীবন-জীবিকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পল্টন এলাকায় উবার চালক লুৎফর রহমানরে কণ্ঠে ঝরল হতাশা। বললেন, ‘ভাই, অ্যাপ চালু করলে কাস্টমার ডাকে, কিন্তু গাড়িতে তেল নাই। সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে যা পাই, তা দিয়ে তেলের দাম ওঠে না। পরিবারের বাজার করব, নাকি পাম্পে এসে লাইন দেব?’

এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে দীর্ঘ লাইনের কারণে যানজট প্রকট হচ্ছে। মতিঝিলের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপণন বিভাগের কর্মকর্তা লতিফুর রহমান বলেন, বাইকের চাকা না ঘুরলে আমাদের চাকরি থাকে না। তেলের লাইনে দাঁড়ালে চার-পাঁচ ঘণ্টা ব্যয় হচ্ছে।

ই-কমার্স খাতের মেরুদণ্ড হলো মোটরসাইকেলে পণ্য সরবরাহ। ধানমন্ডির এক ক্ষুদ্র অনলাইন শপের উদ্যোক্তা শাহনাজ বেগম জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানের ছয়জন ডেলিভারি ম্যানের তিনজনই এখন প্রতিদিন তেলের লাইনে ৪-৫ ঘণ্টা বসে থাকেন। আগে গ্রাহককে বলতাম, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য পৌঁছাবে, এখন তিন দিন সময় নিচ্ছি। তেলের অভাবে শুধু যাতায়াত না, পুরো ব্যবসার রুটিনটাই পাল্টে গেছে। গ্রাহকরা অর্ডার বাতিল করছেন।

সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার রুটিনও এখন তেলের লাইনের কাছে জিম্মি। অনেক বেসরকারি স্কুলবাসও তেলের সংকটে সময়মতো ট্রিপ দিতে পারছে না, ফলে অনেক শিক্ষার্থীকে গরমে হেঁটে বা রিকশায় স্কুলে যেতে হচ্ছে। মিরপুরের বাসিন্দা তৌফিকুর রহমান প্রতিদিন তাঁর ছেলেকে মোটরসাইকেলে করে স্কুলে পৌঁছে দেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে ছেলেকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে আমি অফিসের বদলে তেলের পাম্পে সিরিয়াল দিই।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে জরুরি স্বাস্থ্যসেবায়। ঢাকার বাইরে অনেক এলাকায় ডিজেল সংকটে জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না, ফলে অস্ত্রোপচারের মতো জরুরি কাজগুলোতেও বিঘ্ন ঘটছে। রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স চালক কালাম বলেন, হুটহাট কোনো রোগীকে জরুরিভিত্তিতে অন্য হাসপাতালে নেওয়া মুশকিল হয়ে গেছে। পাম্পে তেল পেতে ৭-৮ ঘণ্টা লাগছে।

তেলের সংকটের সুযোগ নিয়ে সিএনজি অটোরিকশা ও রিকশাচালকরা দ্বিগুণ ভাড়া হাঁকছেন। মতিঝিলে অফিস করা শরিফুল ইসলাম বলেন, নিজের মোটরসাইকেল তেলের অভাবে গ্যারেজে ফেলে রেখেছি। এখন অফিসে সময় খরচ দুটাই বেড়েছে। বাসে উঠতে পারি না অতিরিক্ত ভিড়ের জন্য, আর সিএনজিওয়ালারা ৩০০ টাকার ভাড়া চাচ্ছে ৬০০ টাকা। তেলের সংকটে মাসের বাজেটের চিত্রে চাপ বেড়েছে।

ঢাকার বাইরের সংকট আরও বেশি কষ্টকর। রংপুর বিভাগের পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, তেলের অভাবে বিভাগের অর্ধেকের বেশি পাম্প ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। রংপুর নগরীর শাপলা এলাকার স্কুলশিক্ষক ওবায়েদ ইসলাম বিরক্তির সুরে বলেন, দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তেল দেওয়ার সময়টা একেবারেই অবাস্তব। আমরা যারা চাকরি করি, তারা ওই সময়ে লাইনে দাঁড়াব কীভাবে?

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় করতোয়া নদীর খেয়াঘাটে দেখা গেছে এক বিস্ময়কর চিত্র। তেলের অভাবে ইঞ্জিনচালিত নৌকা এখন দড়ি টেনে চালানো হচ্ছে। মাঝিরা নদীর দুই পারে বাঁশের খুঁটি গেঁড়ে দড়ি বেঁধে টেনে নৌকা পার করছেন। ঘাট মাঝি আব্দুল লতিফ বলেন, ‘প্রতিদিন তিন লিটার তেল দরকার, পাচ্ছি এক লিটার। বাধ্য হয়ে হাত দিয়ে দড়ি টেনে নৌকা বাইতেছি। ২০ হাজার মানুষের যাতায়াত এই ঘাটে, সময় লাগছে আগের চেয়ে দ্বিগুণ।’

ভারত থেকে ডিজেল আমদানি
ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোতে শুক্রবার  মধ্যরাতে আট হাজার টন ডিজেল এসে পৌঁছেছে। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপক কাজী মো. রবিউল আলম জানিয়েছেন, আগামী ১৭ এপ্রিল আরও পাঁচ হাজার টনের একটি চালান আসার কথা রয়েছে। চলতি এপ্রিলে এই পাইপলাইনের মাধ্যমে মোট ৪০ হাজার  টন জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়া চলছে।

ফুয়েল পাস অ্যাপে বিড়ম্বনা
তেল বিতরণে স্বচ্ছতা আনতে সরকার পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ চালু করেছে। রাজধানীর আসাদগেট ও তেজগাঁওয়ের দুটি পাম্পে এই পদ্ধতি চালু হলেও নিবন্ধন জটিলতায় সাধারণ মানুষ নাজেহাল হচ্ছে। চালকরা বলছেন, ফুয়েল পাসেও লাইন ধরতে হচ্ছে।

(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা)

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযান শেষ হয়নি: নেতানিয়াহু

ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান ‘এখনও শেষ হয়নি’ বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আজ রোববার এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, আমরা এখনও তাদের বিরুদ্ধে লড়ছি। এখন আরও অনেক কিছু করার আছে।

লেবাননের সঙ্গে শান্তি আলোচনার জন্য ‘অনুমোদন’ দেওয়ার কথা জানান তিনি।

ইসরায়েল এমন এক সময়ে এ বিবৃতি দিয়েছে; যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা পাকিস্তানে একটি শান্তি আলোচনার বৈঠকে ছিলেন।

নেতানিয়াহু এই বিবৃতিতে সামরিক অভিযানে ইসরায়েলের কিছু ‘সাফল্যের’ তালিকাও দেন। এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান পাল্টাপাল্টি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলার ফলে অস্থির হয়ে পড়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্য।

যুদ্ধ শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে রাখে, যা পুরো বৈশ্বিক বাণিজ্যকে অস্থির করে তোলে। তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ হওয়ায় এর প্রভাব পড়ে তেল ও জ্বালানির বাজারে।

অবশেষে, গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যস্ততায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়।

অতিরিক্ত ঝাল খাবার খেলে কী হয় জেনে নিন

অনেকেই ঝাল খাবার খেতে খুব পছন্দ করেন। বিশেষ করে রান্নায় ঝাল না হলে মুখে রুচি আসে না। অনেকেরই হয়তো জানা নেই,দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ঝাল খাবার খেলে শরীরে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত ঝাল খাবার খেলে পেটের সমস্যা বিশেষ করে পেটে জ্বালা, গ্যাস, অ্যাসিডিটি ও বদহজম দেখা দেয়। অনেক সময় বুকজ্বালা বা পেট ব্যথাও হতে পারে। যাদের আগে থেকে গ্যাস্ট্রিক বা আলসারের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য ঝাল খাবার আরও বেশি ক্ষতিকর।

অতিরিক্ত ঝাল খেলে আরও যেসব সমস্যা দেখা দেয়

খুব বেশি ঝাল খেলে জিভে জ্বালা করে, মুখে ঘা হতে পারে, এমনকি খাওয়ার সময় অস্বস্তি লাগে। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে স্বাদ বোঝার ক্ষমতাও কিছুটা কমে যেতে পারে।

ঝাল খাবার খেলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে বেশি ঘাম হয় এবং অস্বস্তি লাগে। গরমের দিনে এটি আরও বেশি সমস্যা তৈরি করতে পারে। যেমন মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।

ত্বকের ওপরও ঝাল খাবারের প্রভাব দেখা যায়। অনেকের ক্ষেত্রে বেশি ঝাল খেলে ব্রণ, ফুসকুড়ি বা স্কিন র‍্যাশ বেড়ে যায়। কারণ ঝাল খাবার শরীরে অতিরিক্ত উত্তাপ তৈরি করে, যা ত্বকের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।

ঘুমের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি করে ঝাল খাবার । রাতে বেশি ঝাল খেলে বুকজ্বালা বা অস্বস্তির কারণে ঠিকমতো ঘুম আসে না। এর ফলে পরের দিন ক্লান্তি, বিরক্তি ও কাজের প্রতি মনোযোগ কমে যায়।

তবে সব ঝালই যে খারাপ তা নয়। অল্প পরিমাণে ঝাল খেলে হজমে সাহায্য করে। সেই সঙ্গে খাবারের স্বাদ বাড়ায়। কিন্তু অতিরিক্ত খেলেই সমস্যা তৈরি হয়।

বিতর্কের মধ্যে শুরু হচ্ছে অনলাইন ও অফলাইন ক্লাস

জ্বালানি সংকটের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ও সশরীরে– এই দুই পদ্ধতির সমন্বয়ে ক্লাস চালুর সরকারি সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্ক। অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের বড় অংশ এ উদ্যোগকে অবাস্তব, বৈষম্যমূলক এবং শিক্ষার জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করছেন।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস হবে। এর মধ্যে শনি, সোম ও বুধবার সশরীরে এবং রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার অনলাইনে পাঠদান করা হবে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, প্রাথমিকভাবে রাজধানীর কিছু নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানে এই পদ্ধতি চালু করা হবে।

তবে এই ঘোষণার পর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। অনেকেই বলছেন, সন্তানের জন্য আলাদা ডিভাইস ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বেশি বিপাকে পড়েছে। অনেকে সকালে সন্তানকে স্কুলে দিয়ে কর্মস্থলে যান, আবার ক্লাস শেষে নিয়ে আসেন। কিন্তু অনলাইন ক্লাস চালু হলে শিশুদের বাসায় রেখে মোবাইল বা ল্যাপটপ দিয়ে রেখে যেতে হবে। এটি নিরাপত্তা ও মানসিক বিকাশের বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এতে শিশুদের ডিভাইস আসক্তি বাড়বে এবং পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাবে।

নজরুল ইসলাম চৌধুরীর দুই সন্তান রাজধানীর রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র। একজন ষষ্ঠ শ্রেণিতে, অন্যজন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে, এমন খবর শোনার পর থেকেই উদ্বিগ্ন তিনি।

নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘আমার ও আমার স্ত্রীর দুটি মোবাইল ফোন আছে। আমারটা নিয়ে অফিসে যাই। বাসায় স্ত্রী যে ফোনসেট ব্যবহার করেন, তা দিয়ে ইন্টারনেট চালানো যায় না। আমার ফোন বাড়িতে রেখে গেলেও দুই সন্তান একসঙ্গে অনলাইনে ক্লাস করতে পারবে না। ওদের কি জনে জনে ফোনসেট কিনতে হবে? এটা কি হুট করে বললেই সম্ভব?’

আরিফুল ইসলাম জোয়ারদার নামের এক অভিভাবক সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আর ক্ষতি করবেন না। করোনার মধ্যে অনলাইন ক্লাস, অটোপাস দিয়ে তিন-চারটা বছর পার হয়েছে। ওই সময় কিছুই শিখতে পারেনি। আমার ছেলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত করোনাকালে কিছু শেখেনি। আবার অনলাইনে ক্লাসের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার পক্ষে নই আমরা।’

গত তিন সপ্তাহ ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালু নিয়ে আলোচনা চললেও, এটা চালু হলে কতদিন চলবে, তা নিয়ে এখনও কিছুই স্পষ্ট করেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন অফলাইন বা সশরীরে ক্লাস চালুর বিষয়ে ঘোষণা দিলেও কতদিনের জন্য এই সিদ্ধান্ত তা নিয়ে কিছু বলেননি। সবশেষ ৯ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষামন্ত্রী জানান, শুধু ঢাকার নির্বাচিত কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন দিন অনলাইন ক্লাস চালু করা হবে। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামও উল্লেখ করেন তিনি, যেগুলোতে প্রাথমিকভাবে অনলাইনে ক্লাস চালু করা হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বনশ্রী শাখার পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী সাবিনা ইয়াসমিন। তার বাবা আফজাল হোসেন বলেন, ‘অনলাইন ক্লাসটা আমরা চাই না বলার পরও সরকার চাপিয়ে দিচ্ছে। আমার তিন সন্তান। এক ছেলে ও দুই মেয়ে। সবাই স্কুলপর্যায়ে পড়ালেখা করে। তিনজনের জন্য তিনটি মোবাইল দরকার। কিন্তু বাসায় আছে একটা। আমারটা তো আমাকে ব্যবসায়িক কাজে সঙ্গে রাখতে হয়। আমি বাসায় থাকি না। ওদের আম্মুও বেসরকারি চাকরিজীবী। তাহলে বাসায় ওদের জন্য পৃথক তিনটি নতুন মোবাইল এখন কে কিনে দেবে?’

রাজউক উত্তরা মডেল কলেজেও অনলাইন ক্লাস চালু করতে চায় সরকার। অথচ এ প্রতিষ্ঠানের তিনজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এটা চালুর পক্ষে নন। আফরিন নাহার নামে একজন বলেন, ‘বাসায় ওয়াইফাই নেই। মোবাইল ইন্টারনেট চালানো হয়। এখন দুই ছেলের জন্য দুটি ফোন এবং মাসে অন্তত ২০ জিবি নেট কিনতে হবে। মোবাইল ও ইন্টারনেটের এ প্যাকেজ কেনার খরচ কে দেবে?’

ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর অভিভাবক আমেনা খাতুন। তিনি পেশায় চিকিৎসক। তাঁর স্বামী শুভ আহমেদও চিকিৎসক। তারা দুটি সরকারি হাসপাতালে চাকরি করেন। হাসপাতালে কাজ শেষে প্রাইভেট ক্লিনিকে বসেন। তারা জানান, সন্তানদের মোবাইল ফোন দেওয়া হয় না। এখন এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।

উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সাব্বির আহমেদ সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, শিক্ষার্থীদের আর ক্ষতি করবেন না। করোনার মধ্যে অনলাইন ক্লাস, অটোপাস দিয়ে তিন-চারটা বছর পার হয়েছে। ওই সময় কিছুই শিখতে পারেনি। আমার ছেলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত করোনাকালে কিছু শেখেনি। আবার অনলাইনে ক্লাসের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার পক্ষে নই আমি।

ডিভাইস আসক্তির আশঙ্কা
মনোবিদ, শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সব দিক রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুরা এমনিতেই মোবাইল, কম্পিউটার ও টেলিভিশন দেখে বিনোদনের চাহিদা মেটাচ্ছে। ধীরে ধীরে তারা এসব ডিভাইসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। এভাবে ডিজিটাল আসক্তি নিয়ে শিশুদের বেড়ে ওঠা অস্বাভাবিক। চোখে সমস্যা দেখা দেওয়া, স্থূল হয়ে যাওয়াসহ নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যা শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনলাইনে ক্লাস চালুতে তাদের এই আসক্তি আরও বাড়বে।

বিশিষ্ট লেখক, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নেই, কোনো খেলাধুলার ব্যবস্থা নেই। সব কিছুতেই শিশুদের ওপর একটা চাপ। লেখাপড়ার পাশাপাশি তারা যে বিনোদন পাবে, সেটা পায় না। এমন শিক্ষাজীবন শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠাকে বাধাগ্রস্ত করে। শিশুরা এখন ট্যাব, মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকে। মানুষের সঙ্গে মিশতে পারে না। অনেকভাবে আমরা এর কুফল এখনই ভোগ করছি।’

টেলিফোনে পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যম সরকারের স্বাস্থ্য বাতায়নে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসক ডা. নিশাত জাহান অরিন বলেন, ‘শিশুরা মোবাইল, ট্যাব, কম্পিউটারে আসক্ত হয়ে পড়লে তাদের মানসিক বিকাশে সমস্যা হতে পারে। শিশুর চোখ ব্রেইন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’

সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক নেহাল করিম বলেন, ‘আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শীর্ষে অবস্থান করছি, এ জন্য এর প্রভাব আমাদের মধ্যে থাকবে। আমরা ডিভাইস নিয়ে এত ব্যস্ত যে, সময় বের করতে পারছি না। শিশুরাও এর মধ্যে ঢুকে পড়েছে।’

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী অনলাইন ক্লাসের এ সিদ্ধান্তকে সরকারের ‘বাজে কাজ’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘সংকট আছে, সেটা ঠিক। কিন্তু শিক্ষাকে কেন সংকুচিত করার পথে হাঁটতে হবে। সরকারের উচিত এ থেকে সরে আসা।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার উন্নয়নে সম্প্রতি গঠিত পরামর্শক কমিটির প্রধান হিসেবে কাজ করেন অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ। তিনি বলেন, শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক দেশই আপৎকালীন পরিস্থিতিতে অনলাইন ক্লাস চালু করে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে অনলাইন ক্লাস চালুর পর সেই অভিজ্ঞতা ভালো নয়। করণীয় সম্পর্কে অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময় কিছুটা পরিবর্তন করা যেতে পারে। সকালে ক্লাস হলে আবহাওয়া ঠান্ডা থাকবে। এতে বৈদ্যুতিক পাখা, এসি কম চালানোর প্রয়োজন পড়বে। ছুটির দিন পরিবর্তন করেও ক্লাস নেওয়া যেতে পারে।

সরকারের ভাষ্য
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক সমকালকে বলেন, কারও ওপর এটা চাপিয়ে দেওয়া হবে না। তবে আমাদের আপৎকালীন সময়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। সেজন্য আমরা ঢাকা শহরের সবচেয়ে নামি কয়েকটি নির্বাচিত স্কুলে এটা চালুর চেষ্টা করছি। স্কুলগুলো তাদের সমস্যা ও সংকট জানিয়েছে। সেগুলো আমরা সমাধান করে তারপর অনলাইন ক্লাস চালু করব। কেউ এখানে বঞ্চিত বা চাপের মুখে পড়বে বলে আমরা মনে করি না।