Home Blog Page 13

জনগণ নিরাপদ নয় এমন সরকারের দরকার নেই: বিরোধীদলীয় নেতা

শুধু স্বাস্থ্যখাত নয় দেশে সব প্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত অবস্থায় রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, যে সরকারের অধীনে জনগণ নিরাপদে ঘুমাতে পারে না, সে সরকারের দরকার নেই।

আজ রোববার রাজধানীর হাতিরঝিলের মধুবাগ মাঠে ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা সপ্তাহ কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতা। জামায়াত আমির বলেছেন, ব্যাংক, বিমা, পুঁজিবাজার মাটির সঙ্গে হামাগুড়ি খাচ্ছে। দিনে-দুপুরে খোদ রাজধানীতেই বিভিন্ন রকম অপকর্ম চলছে- যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য রয়েছেন। রাজধানীর অবস্থা থেকে বুঝা যায় সারা দেশের অবস্থা কী।

বিমানবন্দরে হট্টগোলের মামলায় জামায়াতের সহযোগী সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে তাঁর মুক্তি দাবি করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সেদিন বিমানবন্দরে জামায়াতের ৩৪ এমপি এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করা হয়েছে। আখতারুজ্জামানকে উত্ত্যক্ত করা হয়েছে।

মেজর আখতার অপরাধী নন, প্রতিবাদ করেছিলেন বলে দাবি করেছেন জামায়াত আমির। তিনি বলেছেন, আখতারুজ্জামান প্রতিবাদ করেন দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখা প্রবাসীদের জন্য। যাদের ব্যাগ কেটে মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করা হয়। তিনি এসবের প্রতিবাদ করায় তার বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি করে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। তাকে হাতকড়া পরানো হয়েছে। অপমান করার জন্য হেলমেট পড়ানো হয়েছে। তা দেশের ১৮ কোটি মানুষ জানুক।

সরকারকে সতর্ক করে শফিকুর রহমান বলেছেন, মেজর আখতারের গ্রেপ্তারকে প্রবাসীরাও হালকাভাবে নেবে না। সরকারকে সাবধান করে দিচ্ছি। একটি মেডিকেল কেন্দ্র রাতের অন্ধকারে ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হলো, সমস্ত সম্পদ লুণ্ঠন করা হলো, যেখানে জনপ্রতিনিধিরা আড়ালে আবডালে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জনগণের চোখে ধুলো দিতে একজন এমপিকে পদত্যাগ করিয়েছেন, দল থেকে বহিষ্কার করেননি। গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনেননি। জনগণকে বোকা ভাববেন না, আড়াল করতে পারবেন না।

৯ মাসে ডেঙ্গুতে ২৬২ জনের মৃত্যুর জন্য সরকারকে দায়ী করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর আগে হামে মৃত্যুর ঘটনায় সরকার অতীতের সরকারকে দায় দিয়েছে। কিন্তু এ সরকার গত সাত মাসে কি করল? এখনও হাম ও ডেঙ্গুতে মানুষ মরছে। ব্যর্থতা স্বীকার করে নেন। বিশ্বে ডেঙ্গুর টিকা আছে। কিন্তু সরকার এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সরকারিভাবে টিকা আনার যদি উদ্যোগ না থাকে, তাহলে বেসরকারিভাবে আনার রাস্তা খুলে দেন। দুর্যোগে জামায়াত বসে থাকার সংগঠন নয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধ সপ্তাহ ঘোষণা করেছি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জামায়াত সমর্থিত মেয়র প্রার্থী সেলিমউদ্দিন এবং দক্ষিণে আবু সাদিক কায়েম আছেন। গ্রাম পর্যন্ত জামায়াতের সহকর্মীরা জনগণের কাছে পৌঁছে যাবে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার চরম ব্যর্থ হয়েছে। হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর জায়গা হয় না। সরকার পারছে না, দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা দাঁড়াবার চেষ্টা করছি।

স্থানীয় এমপি সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, বিএনপি চাঁদাবাজ, দখলবাজ দলে পরিণত হয়েছে।

মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির সেলিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে উদ্বোধন কর্মসূচিতে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তৃতা করেন।

রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলার প্রতিবাদ এনসিপির

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে এনসিপি। গতকাল রোববার রাতে দলটির পক্ষ থেকে মিডিয়া সেলের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হামলাকারী ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইয়াসির আরাফাতের পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ফেসবুক পোস্টের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা রামদা, চাপাতি, হকিস্টিক, পাইপ ও বেসবল ব্যাটসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে অবস্থান নেন। এ সংবাদ সংগ্রহে গেলে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয়। হামলায় সমকালের মাঈনুল ইসলাম রাজু, ডেইলি স্টারের নূর আহসান মৃদুল, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের আরিফ উজ্জামান কোরবান, আগামীর সময়ের জাহিদুল ইসলাম আহত হয়েছেন। জাহিদুল ইসলাম মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছেন।’

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হামলাকারীরা এ সময় সাংবাদিকদের ‘পুঁতে ফেলার’ হুমকিও দেয়। এই হামলায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবীব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম এবং সহ-দপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলমসহ অন্তত ১০ জন নেতা-কর্মী সরাসরি অংশ নেন।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের এ ধরনের সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ প্রশাসনও এর দায় এড়াতে পারে না। ক্যাম্পাসগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থী এবং সংবাদকর্মীদের পূর্ণ নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে মতপ্রকাশের পরিবেশ অবিলম্বে ফিরিয়ে আনতে হবে। ক্যাম্পাসে সব ধরনের সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির রাজনীতি শক্ত হাতে প্রতিহত করবে।

আরও ১৯৪ কিশোর আটক সাদা কাগজে সই, নিয়ম না মেনে জিজ্ঞাসাবাদ

০

সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়েছিল ১৪ বছরের কিশোর সুমন। রাত ১১টা পেরিয়ে গেলেও বাড়ি না ফেরায় সন্তানের খোঁজে উদ্বিগ্ন মা তাহের বানু ছুটে যান থানায়। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, কয়েকজন বন্ধুসহ তাঁর ছেলেকে পুলিশ ধরে নিয়ে এসেছে।

কী অপরাধ করেছে, তখনও তা পরিষ্কার ছিল না লক্ষ্মীপুর পৌরসভার এই বাসিন্দার কাছে। সন্তানকে ছাড়িয়ে নিতে তাঁকে শেষ পর্যন্ত সাদা কাগজে সই করতে হয়। আবার অভিভাবকসহ এসব কিশোরকে জিজ্ঞাসাবাদের ছবি-ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় সমাজসেবা কর্মকর্তা বা প্রবেশন অফিসার না রাখা এবং ছাড়িয়ে আনতে অভিভাবকদের হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে।

সর্বশেষ গত শনিবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, চাঁদপুরে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে ১৯৪ জনকে আটক করা হয়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও চাঁদপুরে পাঁচ দফা পর্যন্ত এই অভিযানে তিন হাজার ২৩৪ জনকে আটক করা হয়।

এরই মধ্যে গত শুক্রবার রাতে কুমিল্লার দাউদকান্দি থানা পুলিশের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। থানার ওসি সাজেদুল ইসলাম পলাশের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রায় ৯ মিনিটের ওই ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, আটক কিশোরদের থানায় অভিভাবকদের পাশে দাঁড় করিয়ে নাম, পরিচয় এবং আটকের ঘটনাস্থল সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ সময় ওসিকে বলতে শোনা যায়, ‘কাউকে এক টাকাও দিবেন না, দিলে আল্লার কাছে ঠেকা থাকবেন।’ পাশাপাশি তিনি অভিভাবকদের সামনে দাঁড় করিয়ে নিজের ছেলেদের চুল ছোট করার নির্দেশও দেন।

এভাবে প্রকাশ্যে কিশোরদের ভিডিও ধারণ ও ফেসবুকে প্রকাশ করা কতটা আইনসংগত– এমন প্রশ্নে ওসি সাজেদুল ইসলাম পলাশ বলেন, ‘অভিভাবকদের ভালো উদ্দেশ্যে তাদের সন্তানদের সামনে কিছু ভালো পরামর্শ দিয়েছি।’

ওসির ফেসবুকে আটক কিশোরদের ভিডিও পোস্ট করা ঠিক হয়নি বলে জানিয়েছেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান। তিনি সমকালকে বলেন, ‘এ বিষয়ে ওসিকে সতর্ক করে দেওয়া হবে।’

অপরাধ প্রমাণের আগেই কিশোরদের ছবি ও ভিডিও এভাবে ছড়িয়ে দেওয়ায় জনমনে এই অভিযান নিয়ে স্বস্তির পরিবর্তে আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

নোয়াখালীর সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন অফিসার শ্যামল পাল বলেন, যে কোনো অপরাধে শিশু-কিশোর আটক হলে থানা পুলিশ জেলা প্রবেশন অফিসারকে অবহিত করবে এবং তাঁর সামনে জিজ্ঞাসাবাদ করার বিধান রয়েছে। জেলা পুলিশের গত এক সপ্তাহের অভিযানে আটক কিশোরদের সম্পর্কে সমাজসেবা অধিদপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে। তবে তাদের সামনে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি।

সাদা কাগজে মুচলেকা ও হয়রানির অভিযোগ 

অভিভাবকদের বড় একটি অভিযোগ হলো, আটক কিশোরদের ছাড়িয়ে আনতে গেলে তাদের কাছ থেকে কোনো নির্ধারিত ফরমে নয়, বরং সাদা কাগজে স্বাক্ষর বা মুচলেকা নিয়ে সন্তানদের পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্মীপুরের এক অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘সাদা কাগজে সই করতে দেওয়া হয়েছে। সেখানে কী লেখা ছিল, তা পড়ার সুযোগ বা পরে কাগজের কপি আমাদের দেওয়া হয়নি। সন্তানকে নিয়ে চিন্তায় থাকায় আমরা সই করে তাকে নিয়ে বাড়ি চলে আসি।’

কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানার সামনে গত শনিবার দুপুরে ২৩ বছর বয়সী স্বামী রাকিবুল ইসলাম রিফাতকে ছাড়িয়ে নিতে অপেক্ষা করছিলেন স্ত্রী আকলিমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী পেশায় রাজমিস্ত্রি। শুক্রবার রাত ১০টার দিকে শহরতলির বালুতোপা এলাকা থেকে পুলিশ রিফাতকে কিশোর গ্যাং সন্দেহে ধরে নিয়ে আসে। তাঁর নামে কোনো মামলা নেই। পুলিশ তাঁকে ছাড়ছে না, দেখা করে পানি ও পাউরুটিও দিতে পারছি না।’

নগরীর নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া আটক ছাত্রের মা বলেন, ‘পুলিশের এ অভিযান চালু থাকুক। তবে নিরপরাধ ছেলেদের আটক করে যেন হয়রানি করা না হয়।’

আটক আরেক কিশোরের বাবা ব্যবসায়ী চান মিয়া বলেন, ‘সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডিবি কার্যালয়ে চেষ্টা তদবির করে ছেলেকে মুক্ত করি। ছেলের কোনো অপরাধ ছিল না।’

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনআরডিএসের নির্বাহী পরিচালক ও সমাজবিজ্ঞানী আবদুল আউয়াল বলেন, আমাদের সমাজে কিশোরদের মাঝে অপরাধে জড়িয়ে পড়া উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। রাষ্ট্রের কিশোর অপরাধীদের সংশোধনের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, কিশোর-কিশোরীরা জন্মগতভাবে অপরাধী হয় না। তারা মূলত সমাজের পরিবেশ, পারিবারিক বিশৃঙ্খলা, দারিদ্র্য, সঙ্গদোষ বা সঠিক নির্দেশনার অভাবে অপরাধের পথ বেছে নেয়। এ জন্য তাদের শুধু অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে, অপরাধের মূল সামাজিক কারণগুলোও চিহ্নিত করতে হবে।

লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার আবু তারেক বলেন, কিশোর ও উঠতি বয়সী তরুণদের অপরাধ থেকে দূরে রাখা এবং সচেতন করার লক্ষ্যেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের অপ্রয়োজনীয় আড্ডা এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযান চালানো হয়েছে।

জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও চাঁদপুরে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে মোট তিন হাজার ২৩৪ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া অভিযানে দুই হাজার ৪২ জনকে আটক করা হয়; যাদের এক হাজার ২০৯ জন মুচলেকায় মুক্ত হলেও ৮৩৩ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

লক্ষ্মীপুরে তিন দিনের অভিযানে ২৬৬ জনকে আটক করা হয়। এর মধ্যে ২১৫ জন মুচলেকায় ছাড়া পান এবং ৫১ জনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। অন্যদিকে, নোয়াখালীতে গত শনিবার রাতে ১৭০ জনসহ ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া অভিযানে মোট ৮৫১ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া চাঁদপুরের মতলব উত্তরে শনিবার সন্ধ্যার পর পরিচালিত অভিযানে ২১ কিশোরকে আটক করা হয়, যাদের পরিচয় যাচাই-বাছাই শেষে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় একই অভিযানে ৫১ জনকে আটক করা হয়।

এদিকে, চট্টগ্রামের খুলশীর জালালাবাদে অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাং নেতা ওয়াকিল হোসেন ওরফে বিহারী বগাকে নারী ও তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত শনিবার রাতে গ্রেপ্তারের পর গতকাল তাদের কারাগারে পাঠান আদালত। অন্য আসামিরা হলেন– মো. আবদুল হান্নান, মো. মনির হোসেন ওরফে ইমন ও সাবিহা বেগম। এর মধ্যে হান্নান ও ইমনের বিরুদ্ধে পাঁচ থেকে ছয়টি করে মামলা রয়েছে।

বিশ্ব শিশু দিবস আজ একই বয়স, শৈশব দুই রকম

একই বয়সের দুটি শিশু, অথচ শৈশব দুই রকম। একজনের দিন শুরু হয় স্কুলের পোশাক পরে বই-খাতা গুছিয়ে। অন্যজনের দিন কাটে জীবিকার তাগিদে। একজন বেড়ে ওঠে বই, ইন্টারনেট ও পড়ার অনুকূল পরিবেশে। অন্যজন বেড়ে ওঠে অভাব, অপুষ্টি আর অনিরাপদ পরিবেশে। বৈষম্যের দেয়াল আলাদা করে দেয় তাদের বেড়ে ওঠার পথ।

বাংলাদেশে আজ ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিশু দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর অক্টোবরের প্রথম সোমবার দিবসটি পালন করা হয়। শিশু অধিকার ও সুরক্ষার নানা দিক সামনে রেখে এবারও দিবসটি উদযাপিত হবে। উদযাপনের পাশাপাশি দেশের সব শিশু কি সমান অধিকার ও সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠছে কিনা– সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।

এ বছর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে শিশুদের জীবনযাত্রার একটি বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। ৬২ হাজার ৯৮০টি পরিবারের নমুনার মধ্যে ৬১ হাজার ২০৭টি পরিবার থেকে সফলভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

জরিপে ১৭৩টি সূচক অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শিক্ষায় অগ্রগতি থাকলেও ঝরে পড়ার চিত্রটি উদ্বেগের। প্রাথমিক স্তরে বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার ৮৫ শতাংশ হলেও নিম্ন মাধ্যমিকে তা ৬০ দশমিক ১ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ।

উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বয়সসীমায় ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে। আবার ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৫০ দশমিক ২ শতাংশের ভিত্তিগত পাঠদক্ষতা এবং ৩৯ দশমিক ২ শতাংশের ভিত্তিগত সংখ্যাগত দক্ষতা রয়েছে।

একটি বেসরকারি স্কুলে কর্মরত চাকরিজীবী ও অভিভাবক শাহানা জামান নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, বাবা-মা চাকরি করলে সন্তানকে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। স্কুলের পড়া, অনলাইন ক্লাস, খাবার ও নিরাপত্তা– সব সামলাতে বাড়তি সহায়তা দরকার হয়। অনেক পরিবার সেই সুযোগ পায় না। ফলে একই শহরে থেকেও শিশুর সুযোগের মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়।
শিশুশ্রমও সেই বৈষম্যের বড় উদাহরণ। এমআইসিএস ২০২৫ অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯.২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৬.৮ শতাংশ।

কন্যাশিশুর সামনে এখনও বড় বাধা বাল্যবিবাহ। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছে। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৮.৯ শতাংশ বর্তমানে বিবাহিত। যদিও ২০১৯ সালের তুলনায় বাল্যবিবাহের হার কমেছে, পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক।

শিশুর নিরাপত্তার চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। এক থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু গত এক মাসে শারীরিক শাস্তি বা মানসিক আগ্রাসনসহ সহিংস শৃঙ্খলার অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্মনিবন্ধনের হার ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ।

পুষ্টির ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৪ শতাংশ খর্বাকৃতির, ১২ দশমিক ৯ শতাংশ দুর্বল ও অতিরিক্ত রোগা এবং ২৩ শতাংশ কম ওজনের। ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের মাত্র ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাদ্য পাচ্ছে।

অভিভাবক এবং জিম ট্রেইনার ফাহমিদা হক বলেন, ‘আমরা দুজনই চাকরি করি। সন্তানের জন্য ভালো খাবার ও ভালো স্কুল নিশ্চিত করার চেষ্টা করি। শিশুর নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ, সময় দেওয়া এবং সুস্থ পরিবেশও দরকার। কর্মজীবী বাবা-মায়ের জন্য এ জায়গাগুলোতে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা আরও প্রয়োজন।’

শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশের প্রশ্নেও উদ্বেগ আছে। উন্নত পানির উৎস ব্যবহার করলেও নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত পানির সুবিধা পাচ্ছে মাত্র ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। পানির উৎসের ৪৭ দশমিক ১ শতাংশে ই. কোলাই দূষণ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮.৪ শতাংশের রক্তে উচ্চমাত্রার সিসা পাওয়া গেছে।

সব মিলিয়ে এমআইসিএস ২০২৫-এর তথ্য বলছে, বাংলাদেশের শিশুদের জন্য অগ্রগতি যেমন হয়েছে, তেমনি বৈষম্য ও ঝুঁকিও রয়ে গেছে। কোনো শিশু স্কুলে যাচ্ছে, অন্য শিশু শ্রমে যুক্ত; কেউ পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে, কেউ অপুষ্টিতে আছে; কেউ নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠছে, কেউ সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, অগ্রগতির পাশাপাশি এখনও পিছিয়ে রয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু, যাদের জন্য প্রয়োজন লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা ও সেবার সুযোগ। শিশুতে শিশুতে পারিবারিক বাস্তবতায় পার্থক্য থাকলেও তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের বিশ্ব শিশু দিবসে শিশুদের অধিকার ও সুযোগের এই বৈষম্য কমানোর বিষয়টিই আলোচনায় রয়েছে।

ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ভবন ধ্বংস, নিহত ৫

ইসরায়েলি বিমান হামলায় আগুন লেগে গাজা সিটির একটি আবাসিক ভবন ধ্বংস হয়েছে। এতে অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। স্বাস্থ্য ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গতকাল শনিবার ভোরে নিহতদের মধ্যে এক খ্রিষ্টান মা, মেয়েসহ চারজন নারী রয়েছেন। হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

নিহত বেড়েছে ১১৪ শতাংশ
২০২৬ সালের শুরু থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে ইসরায়েলি দখলদারদের হামলায় ৩০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। শুক্রবার ফিলিস্তিনের কলোনাইজেশন অ্যান্ড রেজিস্ট্যান্স কমিশন জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা ২০২৫ সালের পুরো বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বা প্রায় ১১৪ শতাংশ বেড়েছে। নিহতের ৭৩ শতাংশই রামাল্লাহ ও আল-বিরেহ এবং নাবলুস প্রদেশের।

কমিশন জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি ও তাদের জমি-সম্পত্তির ওপর ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা মোট ২ হাজার ৫১টি হামলা চালিয়েছে। গত মাসে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের ধ্বংসযজ্ঞে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৩২০ ফিলিস্তিনি। তাদের মধ্যে ১৬৪ শিশু ও ৬৪ নারী রয়েছেন।

জুনে জাতিসংঘের ১৪ জন বিশেষ প্রতিবেদক সতর্ক করে বলেন, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের সমর্থন ও সহযোগিতায় বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাস উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক সরকারি প্রতিবেদনে ফলের দাম বাজারের চেয়ে অনেক কম

কয়েক দিনের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারে আমদানি করা কমলা ও মাল্টার দাম বেশ বেড়েছে। বর্তমানে কেজিপ্রতি ৫০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ফলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত ও বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে গতকাল শনিবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

বৈঠকে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এতে মাল্টার দাম কেজিপ্রতি ২৪০ থেকে ৩২০ টাকা এবং কমলার দাম ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু রাজধানীর বাজারের বাস্তব চিত্রের সঙ্গে ফলের দামে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। কোন তথ্যের ভিত্তিতে কমিশন এ দাম নির্ধারণ করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলের দাম কম দেখালেও দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বেশি।

সভায় মাল্টার বর্তমান বাজারদর নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনার পরও খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মাল্টার দাম কীভাবে ৫২০ টাকায় পৌঁছায়, ব্যবসায়ীদের কাছে তার ব্যাখ্যা চান তিনি।

বাজারদরের সঙ্গে বড় ফারাক

কারওয়ান বাজারের খুচরা ফল বিক্রেতা শরিফুল ইসলাম সমকালকে জানান, গতকাল তিনি কেজিপ্রতি মাল্টা বিক্রি করেছেন ৪০০ থেকে ৪২০ টাকায়। প্রতিকেজি কমলা বিক্রি করেছেন ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকায়। জিগাতলার ট্যানারি মোড়ের ফল বিক্রেতা আমিনুল হকও এ দুই ফলের দামের বিষয়ে প্রায় একই রকম তথ্য দেন।

ট্যারিফ কমিশন কেন ফলের দাম এত কম উল্লেখ করেছে জানতে চাইলে কমিশনের চেয়ারম্যান (সচিব) নাসির-উদ-দৌলা সমকালকে বলেন, বিষয়টি ভালোভাবে জানতে হবে, প্রয়োজন আছে। তিনি প্রতিবেদনটি যে তৈরি করেছেন, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। কিন্তু ওই কর্মকর্তাকে ফোন ও এসএমএস করলে তিনি সাড়া দেননি।

পাঁচ ফলের  বেশির ভাগই  আমদানি 
সভায় মাল্টা, কমলা, আপেল, আঙুর ও খেজুর– এই পাঁচটি তাজা ফল নিয়ে আলোচনা হয়। কমিশনের উপস্থাপনা অনুযায়ী, দেশে আমদানি করা তাজা ফলের বার্ষিক চাহিদা পাঁচ থেকে ছয় লাখ টন। এর মধ্যে আপেল ও মাল্টার চাহিদা প্রায় ৭৭ শতাংশ। রমজান ও ধর্মীয় উৎসবের কারণে খেজুরের বার্ষিক চাহিদা দাঁড়ায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টনে, যার ৬০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় রমজানে।

আপেল, সাধারণ মাল্টা, কমলা, আঙুর ও খেজুর জলবায়ু ও বাণিজ্যিক কারণে বাংলাদেশে অত্যন্ত সীমিত বা নগণ্য পরিমাণে উৎপাদিত হয়। তাই এসব ফলের চাহিদার ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশ আমদানি করে মেটাতে হয়। যদিও পেয়ারা, ড্রাগন ও আমের দেশীয় উৎপাদন পর্যাপ্ত।

মূলত চীন, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ব্রাজিল, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসব ফল আসে। আমদানির ওপর নির্ভর করায় আমদানি পর্যায়ের শুল্ক-করসহ যে কোনো খরচ ও জটিলতার প্রভাব সরাসরি খুচরা বাজারে পড়ে।

শুল্ক-করেই দাম দ্বিগুণ

কমিশনের উপস্থাপনা অনুযায়ী, ফল আমদানিতে বিভিন্ন শুল্ক ও কর মিলিয়ে মোট করভার দাঁড়ায় ৯৬ দশমিক ১০ থেকে ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ আমদানি মূল্যের প্রায় সমান বা এর চেয়ে বেশি কর দিতে হয়।

এই করভারের মধ্যে রয়েছে ২৫ আমদানি শুল্ক, ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর এবং ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক অতিরিক্ত শুল্ক। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শূন্য থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম কর।

উচ্চমূল্যের তিন কারণ
কমিশনের প্রতিবেদনে উচ্চমূল্য ও বাজার অস্থিতিশীলতার তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথম কারণ, বিলাসদ্রব্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধকরণ। জরুরি পুষ্টি উপাদান হওয়া সত্ত্বেও তাজা ফলকে বিলাসদ্রব্য গণ্য করে উচ্চ কর আরোপ করা হচ্ছে। দ্বিতীয় কারণ, শুল্কায়নযোগ্য মূল্য। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রকৃত বুকিং দরের চেয়ে বেশি মূল্য ধরে কাস্টমসে শুল্কায়ন করা হচ্ছে। এতে একই শুল্কহারেও আমদানিকারককে বেশি কর দিতে হয়।

তৃতীয় কারণ, সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধা। আমদানিকারকের সংখ্যা সীমিত, তার ওপর হিমাগার সংকট রয়েছে। এতে সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং দাম বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি দাম
কমিশনের উপস্থাপনায় দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশের সঙ্গে ফলের দামের তুলনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের তুলনায় বাংলাদেশে সব ফলের দাম অনেক বেশি।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি কেজি আপেলের দাম ২৮০ থেকে ৩৮০ টাকা। যেখানে ভারতে ১৫০ থেকে ২২০, পাকিস্তানে ১১০ থেকে ১৭০ এবং নেপালে ১৬০ থেকে ২৪০ টাকা। শ্রীলঙ্কায় এর দাম ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা।

আঙুরের দাম বাংলাদেশে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা, ভারতে ১৩০ থেকে ২০০, পাকিস্তানে ১০০ থেকে ১৬০, নেপালে ১৫০ থেকে ২৩০ এবং শ্রীলঙ্কায় ৩৮০ থেকে ৫০০ টাকা।

সাধারণ খেজুর বাংলাদেশে ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, ভারতে ১৬০ থেকে ২৬০, পাকিস্তানে ১২০ থেকে ২০০, নেপালে ১৮০ থেকে ২৮০ এবং শ্রীলঙ্কায় ৩২০ থেকে ৪৫০ টাকা। উপস্থাপনায় শুধু শ্রীলঙ্কাতেই দাম বাংলাদেশের চেয়ে বেশি বা কাছাকাছি দেখানো হয়েছে।

সমাধানে তিন প্রস্তাব
পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্যারিফ কমিশন সম্ভাব্য কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা হিসেবে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে। প্রথমত, শুল্ক কাঠামো যৌক্তিকীকরণ। এর আওতায় তাজা ফল ও খেজুরকে জরুরি নিত্যপণ্যে রূপান্তর এবং নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি) ও সম্পূরক শুল্ক (এসডি) প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় ইনভয়েস মূল্যে শুল্কায়ন। আন্তর্জাতিক দর অনুযায়ী শুল্কায়ন এবং তাজা ফলকে পচনশীল পণ্য বিবেচনায় ‘গ্রিন চ্যানেল’-এর মাধ্যমে খালাসের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তৃতীয়ত, এলসি সহজীকরণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের এলসি সুবিধা দেওয়া এবং কোল্ড স্টোরেজ সুবিধার আওতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

শুল্ক পর্যালোচনার আশ্বাস বাণিজ্যমন্ত্রীর
সভায় ব্যবসায়ীরা জানান, মাল্টার বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ সরবরাহের ঘাটতি। তাদের হিসাবে, কোনো কোনো সপ্তাহে দেশে মাত্র ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার মাল্টা এসেছে। অথচ স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কনটেইনার মাল্টা প্রয়োজন হয়।

উচ্চ শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ও বন্দরের জটিলতা এবং আগের চালানে লোকসানের কারণে অনেক ব্যবসায়ী মাল্টা আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন বলেও জানান। পচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন ও সংরক্ষণ পর্যায়ে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য শুনে মাল্টার শুল্কসংক্রান্ত বিষয়টি পর্যালোচনার আশ্বাস দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত এলসি খুলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর তাগিদ দেন।

বাজারে মাল্টা, খেজুরসহ আমদানিনির্ভর ফলের সরবরাহ বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানিকারকদের দ্রুত ঋণপত্র খুলে আমদানি বাড়ানোর আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, খেজুর আমদানিতে শুল্ক-কর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চলতি সপ্তাহেই জানানো হবে।

বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকটের শুরু মিয়ানমারে সমাপ্তিও হতে হবে সেখানে বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা দেওয়া হবে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ এখনও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রধান লক্ষ্য মিয়ানমারে তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত রাজনৈতিক সমর্থন ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংকটের মূল কারণগুলোরও সমাধান করতে হবে। যে সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, এর সমাপ্তিও হতে হবে মিয়ানমারে।

গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স অ্যান্ড ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন আ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’। আগামীকাল সোমবার পর্যন্ত চলবে এই সম্মেলন। এতে শতাধিক দেশের দুইশ বক্তা, তিনশর বেশি প্রতিনিধি এবং সহস্রাধিক অংশগ্রহণকারী যোগ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আমাদের অগ্রাধিকার। আমরা এখন প্রতিশ্রুতি থেকে সরাসরি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করার পাশাপাশি দেশকে শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন, সেবা, রপ্তানিসহ সব খাতে আমরা ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই।

বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত নিশ্চয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতায়ই বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ অগ্রাধিকার পান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। যা সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু হবে। কৃষক কার্ড কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, কৃষিসেবা ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করবে। হেলথ কার্ড সবার জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করবে এবং চূড়ান্তভাবে ইউনিভার্সাল কার্ডের মাধ্যমে নাগরিকরা এক ছাতার নিচে সমন্বিত সরকারি সেবা নিতে পারবেন।

স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগে কাজ করছে, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই নারী হবেন। তারা তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা দেবেন।

মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের জন্য নয়, শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করারও মাধ্যম হতে হবে। আমরা আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছি। সরকার প্রথম শ্রেণি থেকে বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে জাতীয় অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে দক্ষতা, উন্নয়ন ও উপযুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। সরকার ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও স্টার্টআপগুলোকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আমরা চাই আমাদের তরুণরা বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করুক এবং ব্রেইন ড্রেনকে ব্রেইন সার্কুলেশনে রূপান্তর করুক।

কৃষিকে অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারসংযোগ আরও সহজলভ্য করা হচ্ছে। তিনি বলেন, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তার পরিপূরক হিসেবে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্য রপ্তানি শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। একটি শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতিই গড়ে তুলতে পারে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ।

পানি নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ কৃষি খাতকে সহায়তা করার পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।

পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ করা হবে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের পাশাপাশি বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড সার্টিফায়েড ফ্যাক্টরির মধ্যে ৫৩টিই এখন বাংলাদেশে।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। আমরা প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে সুদৃঢ় করছি। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে।

আইনের শাসন প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা হবে, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবে।

বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রেখে চলেছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সরবরাহ চেইনে অপার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, আঞ্চলিকভাবে অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে আরও গভীর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব। নতুন বাজার উন্মুক্ত করার পাশাপাশি তরুণদের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। সমতা, ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে আমরা আরও শক্তিশালী সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি।

বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ তার সব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করে যাবে। কারণ শান্তি ও সম্প্রীতিই হলো যৌথ সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি।

প্রধানমন্ত্রী বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে এমন একটি এলাকায় পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র একসঙ্গে বিকশিত হবে, পারস্পরিক সমান সুবিধা গ্রহণ করবে এবং নাগরিকরা অর্থবহ সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে তার যথাযথ ভূমিকা পালনে  প্রস্তুত।

সিজিএস আয়োজিত এবারের বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের পাঁচটি মূল আলোচ্য বিষয়– ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবারস্পেস ও তথ্যক্ষমতা, বাণিজ্য, সংযোগ ও কৌশলগত প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু, সহনশীলতা ও মানব নিরাপত্তা। সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর পারভেজ করিম আব্বাসী।

সম্মেলনে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ, মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারাসহ বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ স্থিতিশীলতা চায়: তথ্যমন্ত্রী
সংলাপে অংশ নিয়ে তথ্যমন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, বাংলাদেশ কোনো যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক সংঘাতে জড়াতে চায় না। বাংলাদেশ বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা চায়। কারণ, উন্নতির জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরানসহ বিভিন্ন দেশের সংঘাতের প্রভাব বিশ্বজুড়ে পড়ছে। এসব সংঘাতের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও জ্বালানি কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। ফলে এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই দেশের দ্বন্দ্ব সহজে শেষ হওয়ার নয়। একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতাই এর অন্যতম কারণ। তবে পরাশক্তিগুলো ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সামলাতে পারলেও বাংলাদেশের মতো ভোক্তানির্ভর দেশের জন্য এর প্রভাব সামলানো কঠিন। চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতা করবে এটাই প্রত্যাশা।

জনগণের স্বার্থই গুরুত্বপূর্ণ : শামা ওবায়েদ
সংলাপে অংশ নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের খেলার দাবার বোর্ড হতে চায় না। মাথা উঁচু রেখে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনা, সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বে প্রস্তুত রয়েছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে জনগণের স্বার্থই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের স্বার্থকে সামনে রেখেই আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, সংসদের প্রধান হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সাতজনকে দাফন, শোকে মুহ্যমান চার গ্রাম

ময়মনসিংহ থেকে গত শুক্রবার গভীর রাতে সাতটি মরদেহ পৌঁছায় জামালপুরে গ্রামের বাড়িতে। ভোর থেকে শোকাহত মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করেন। গতকাল শনিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর পর্যন্ত দুটি ইউনিয়নের চার গ্রামে জানাজা শেষে মরদেহগুলো দাফন করা হয়। মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় সাতজনকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান গ্রামগুলোর বাসিন্দারা।

গত শুক্রবার দুপুরে ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া বাইপাস মোড়ে রাজীব পরিবহনের বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে সাতজন নিহত হন। বাসের চালককে আসামি করে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা হয়েছে।

নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন। তারা হলেন– জামালপুর সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নের দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের রাশিদা বেগম (৭০), তাঁর ছেলে মোফাজ্জল হোসেন (৫০), মোফাজ্জল হোসেনের মেয়ে মর্জিনা আক্তার (২৫) এবং মর্জিনার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মিনান। নিহত অন্য তিনজন হলেন– ওই ইউনিয়নের বীর গোবিন্দ গ্রামের অটোরিকশাচালক মো. সুজন আলী এবং শরিফপুর ইউনিয়নের বাদেচাঁন্দি গ্রামের আকরাম আলী ও তাঁর স্ত্রী মমতা বেগম। মরদেহগুলো গ্রামে পৌঁছালে স্বজনের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ। এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
সকালে মোফাজ্জল হোসেন ও রশিদা বেগমের জানাজা দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়ায় অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। মর্জিনা বেগম ও তাঁর ছেলে মিনানের জানাজা ও দাফন হয় মর্জিনার শ্বশুরবাড়ি রানাগাছা ইউনিয়নের ঘোড়ার কান্দা গ্রামে। একই ইউনিয়নের বীর গোবিন্দ গ্রামে দাফন করা হয় অটোরিকশাচালক সুজন মিয়াকে। এ ছাড়া শরিফপুর ইউনিয়নের বাদেচাঁন্দি গ্রামে দাফন করা হয় আকরাম হোসেন ও তাঁর স্ত্রী মমতা বেগমকে। এসব জানাজা ও দাফনে স্থানীয় এমপি শাহ ওয়ারেছ আলী মামুনসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন।
স্থানীয়রা জানান, আকরাম হোসেন গাজীপুরে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর স্ত্রী মমতা বেগম গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। প্রায় এক মাস আগে তারা বাড়িতে এসেছিলেন। শুক্রবার তারা ওই অটোরিকশায় কর্মস্থলে ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন। তাদের দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে।

পেশায় রাজমিস্ত্রি মোফাজ্জল হোসেন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গাজীপুরের হোতাপাড়ায় থাকতেন। মা রাশিদা বেগম, অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে মর্জিনা ও নাতিকে গাজীপুর নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি বাড়ি এসেছিলেন। শুক্রবার  নান্দিনা থেকে অটোরিকশায় করে ময়মনসিংহ বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

জানাজায় অংশ নেওয়া স্থানীয়রা জামালপুর-ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়কে বাসের বেপরোয়া চলাচল বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন। বিশেষ করে, রাজীব পরিবহনের বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
রানাগাছা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান কেরামতউল্লাহ উজ্জলসহ স্থানীয়দের অভিযোগ, জামালপুর-ময়মনসিংহ সড়কে রাজীব পরিবহনের বাসের অদক্ষ চালক ও বেপোরোয়া গতির কারণে  দুর্ঘটনা ঘটছে। গত এক মাসে শুধু রাজীব পরিবহনের বাসের চাপায় প্রাণ গেছে ১১ জনের। কিন্তু কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

গভীর রাতে মামলা, গ্রেপ্তার নেই
প্রাণহানির ঘটনায় গত শুক্রবার বাসচালককে আসামি করে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা হয়েছে। তবে গতকাল শনিবার পর্যন্ত পুলিশ বাসচালককে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
জামালপুর সদর উপজেলার দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের মো. মোবারক আলী মামলাটি করেন। ওইদিন রাত ১২টার পর পুলিশ লিখিত অভিযোগটি মামলা হিসেবে রুজু করে। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় পরিবারের চার সদস্য– মা, ভাই, ভাতিজি ও নাতিকে হারিয়েছেন মোবারক আলী।

জামালপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) ইয়াহিয়া আল মামুন বলেন, ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহ সদরে। তাই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা ময়মনসিংহ পুলিশ নেবে।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার পর রাজীব পরিবহনের বাসটি আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, দুর্ঘটনার পরপরই বাস ও ক্ষতিগ্রস্ত অটোরিকশাটি জব্দ করে থানায় নেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার পর চালক ও হেলপার পালিয়ে যায়। মামলা করা হয়েছে। চালককে দ্রুত গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে।
রাজীব পরিবহনের গায়েবানা জানাজা
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঢাকা-জামালপুর রুটে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য রাজীব পরিবহনের কুখ্যাতি রয়েছে। মর্মান্তিক ওই দুর্ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার রাত ১০টার দিকে জামালপুর শহরের ফৌজদারি এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা রাজীব পরিবহনের গায়েবানা জানাজা ও প্রতীকী লাশ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন।