Home Blog Page 137

দৌলতদিয়ায় দুর্ঘটনা: ২৬ মরদেহ উদ্ধার, জানা গেল পরিচয়

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় পদ্মায় পড়ে যাওয়া সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি উদ্ধার করা হয়েছে। এ পর্যন্ত নারী শিশুসহ ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

নিহতরা হলেন- রাজবাড়ী পৌরসভার ভবানীপুর লালমিয়া সড়কের মৃত ইসমাঈল হোসেন খানের স্ত্রী রেহেনা আক্তার (৬১), ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান (২৫), সোহেল মোল্লার মেয়ে সোহা আক্তার (১১), সজ্জনকান্দার মৃত ডা. আবদুল আলীমের মেয়ে জহুরা অন্তি (২৭), কাজী মুকুলের মেয়ে কাজী সাইফ (৩০), কেবিএম মুসাব্বিরের ছেলে তাজবিদ (৭), দাদশী রামচন্দ্রপুরের সোবাহান মণ্ডলের মেয়ে লিমা আক্তার (২৬), আগমারাই গ্রামের শরিফুল ইসলামের ছেলে সাবিত হাসান (৮), মিজানপুর বড়চর বেনি নগরের মান্নান মন্ডলের স্ত্রী জোস্ন্যা (৩৫), গোয়ালন্দ ছোট ভাকলার চর বারকিপাড়ার রেজাউল করিমের স্ত্রী মর্জিনা আক্তার (৩২), মেয়ে সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২), কালুখালী বোয়ালিয়ার ভবানীপুরের বিল্লাল হোসেনের মেয়ে ফাইজ শাহানূর (১১), রতনদিয়া মহেন্দ্রপুর বেলগাছির আব্দুল আজিজের স্ত্রী নাজমিরা জেসমিন (৩০), ছেলে আব্দুর রহমান (৬), বালিয়াকান্দি পশ্চিম খালখোলার আরব খানের ছেলে (গাড়ি চালক) আরমান খান (৩১), কুষ্টিয়া মজমপুরের মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬), খাগড়বাড়ীয়ার হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮), খোকসা সমাজপুর ধুশুন্দুর দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইস্রাফিল (৩), সমসপুরের গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১৩), ঝিনাইদহ শৈলকূপা থানার কাচেরকোল খন্দকবাড়িয়ার নুরুজ্জামানের মেয়ে আরমান (৭ মাস), গোপালগঞ্জ কোটালীপাড়া আমতলী নোয়াধার মৃত জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী মুক্তা খানম (৩৮), দিনাজপুর পার্বতীপুর থানার পলাশবাড়ী মথুয়ারাই মৃত নূর ইসলামের স্ত্রী নাছিমা (৪০), ঢাকা আশুলিয়ার বাগধুনিয়া পালপাড়ার মো. নুরুজ্জামানের স্ত্রী আয়েশা আক্তার সুমা (৩০), রাজবাড়ীর কালুখালীর মজনু শেখের ছেলে উজ্জ্বল শেখ (৫০), একই উপজেলার মদাপুর গ্রামের আফসার শেখের ছেলে আশরাফুল (২৪) এবং বোয়ালিয়া এলাকার মৃত সানাউল্লাহর ছেলে জাহাঙ্গীর (৫৫)।

রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন থেকে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। মরদেহ গুলো রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল মর্গ থেকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় আহত আরও তিনজনকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

এর আগে গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুপুর ২টা ১০ মিনিটে যাত্রী নিয়ে কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে থেকে ছেড়ে আসে বাসটি। তাদের বেশিরভাগই ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরছিলেন।

দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা সাকিব হোসেন, আব্দুল আজিজ, দেলোয়ার হোসেন জানান, বাসটিতে নারী-শিশুসহ সমস্ত আসনে যাত্রী ছিলেন। এ ছাড়া ইঞ্জিন কভারে ৩ জন, চালক, হেলপার ও বেশ কয়েকজনের কোলে শিশু ছিল। পন্টুনে ওঠার আগে ৪-৫ জন যাত্রী নেমে গেলেও বাসটি নদীতে পড়ে গেলে স্থানীয়রা ৬-৭ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। এখনও অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

ইরানের সক্ষমতা বাড়াতে ড্রোন পাঠাচ্ছে রাশিয়া: গোয়েন্দা তথ্য

ধাপে ধাপে ইরানে ড্রোন, ওষুধ ও খাদ্য সামগ্রী পাঠানোর প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করতে যাচ্ছে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরানের সক্ষমতা বাড়াতে এগুলো পাঠানো হচ্ছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এমন তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুজন কর্মকর্তা ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফায় হামলার কয়েকদিন পর থেকে ড্রোন সরবরাহের বিষয়ে ইরান ও রাশিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে গোপনে আলোচনা শুরু হয়। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, চলতি মাসের শুরুর দিকে মস্কো সরবরাহ শুরু করে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে তা সম্পন্ন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

টাইমসের ওই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আরেক ব্রিটিশ গণমাধ্যম ইনডিপেনডেন্ট বৃহস্পতিবার লিখেছে, ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আগ্রাসন শুরুর পর কয়েক বছর ধরে ইরানের কাছে থেকে সমর্থন পেয়েছে রাশিয়া। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মস্কো এখন তেহরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বারবার দাবি করেছেন, রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে। বুধবার তিনি বলেন, মস্কো যুক্তরাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করেছে। তারা প্রস্তাব দিয়েছে, যদি ওয়াশিংটন কিয়েভকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করে, বিনিময়ে মস্কোও ইরানের সঙ্গে সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ করবে।

জেলেনস্কি গত সোমবার দাবি করেছিলেন, ইরানকে রাশিয়ার গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখার অকাট্য প্রমাণ তাঁর কাছে আছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছিলেন, তিনি নিজে ওই তথ্য-উপাত্ত দেখেছেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি।

ড্রোন সরবরাহের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, বর্তমানে অনেক ভুয়া খবর ছড়ানো হচ্ছে। তবে একটি বিষয় সত্য- ইরানি নেতৃত্বের সঙ্গে সংলাপ অব্যাহত আছে।

ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো ইরানের তৈরি ‘শাহেদ’ ড্রোন। ইউক্রেনে হামলার সময় মস্কো প্রতি রাতে শত শত শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করেছে। রাশিয়ার ড্রোন সরবরাহের বিষয়ে ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে ইরানি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি।

স্বপ্নযাত্রা নাকি মহাবিপর্যয়, এবার কি কাটবে ইতালির আক্ষেপ?

বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি ইতালি আজ এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। টানা দুই বিশ্বকাপে না খেলতে পারার বেদনা কি এবার ঘুচবে, নাকি ১২ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা আরও দীর্ঘায়িত হবে? সেই উত্তর খুঁজতেই আজ রাতে বার্গামোতে প্লে-অফের সেমিফাইনালে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের মুখোমুখি হচ্ছে আজ্জুরিরা। টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপ মিস করার লজ্জা এড়াতে জেনারো গাত্তুসোর শিষ্যদের সামনে জয়ের কোনো বিকল্প নেই।

লুচিয়ানো স্পালেত্তির বিদায়ের পর দলের হাল ধরেছিলেন গাত্তুসো। তার অধীনে ইতালি ‘গ্রুপ আই’-এ রানার্সআপ হয়ে প্লে-অফে জায়গা করে নিলেও পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। বিশেষ করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন নরওয়ের কাছে বড় ব্যবধানে হার দলের ভঙ্গুর চিত্রটাই ফুটিয়ে তুলেছে। ২০০৬ সালে বিশ্বজয়ী দলের সদস্য গাত্তুসোর সামনে এখন কোচ হিসেবে সেই হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ।

তবে মাঠের লড়াইয়ের আগে ইনজুরিই ইতালির বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঝমাঠের কাণ্ডারি সান্দ্রো টোনালি ও আক্রমণভাগের প্রধান অস্ত্র ফেদেরিকো কিয়েসাকে ছাড়াই নামতে হচ্ছে গাত্তুসোকে। চোট কাটিয়ে ফেরার লড়াইয়ে আছেন স্কামাক্কা, বাস্তোনি ও মানচিনিরা। রক্ষণের কালাফিওরিকে নিয়েও রয়েছে অস্বস্তি।

গাত্তুসো অবশ্য আশাবাদী। তিনি জানান, ‘পুরো মন থেকে চাই আমরা লক্ষ্য অর্জন করি। এই দলটি সেটা প্রাপ্য।’ আজ নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডকে হারাতে পারলে বিশ্বকাপের মূল পর্বের টিকিট পেতে ইতালির সামনে শেষ বাধা হবে ওয়েলস অথবা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। পরাজয় মানেই ইতালিয়ান ফুটবলের জন্য আরও এক অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা।

তিন মাসে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ১৩০ কোটি ডলার

বাংলাদেশের পুঞ্জীভূত বিদেশি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে সরকারি ও বেসরকারি খাতে নেওয়া মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ১১২ বিলিয়ন দশমিক ২২ ডলার। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে বিদেশি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন বা ১৩০ কোটি ডলার।
বিদেশি ঋণের হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল বুধবার এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গত বছরের জুনের তুলনায় সেপ্টেম্বরে পুঞ্জীভূত বিদেশি ঋণের পরিমাণ কমেছিল। গত জুন পর্যন্ত বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ১১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিদেশি ঋণের পরিমাণ কমে যাওয়ার পর ডিসেম্বরে এসে তা ফের বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তাদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি দুই খাতেই বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ বেড়েছে। এ কারণে পুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ১ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণই বেশি বেড়েছে। বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ২ শতাংশের বেশি। আর সরকারি খাতে বেড়েছে ১ শতাংশের কিছু কম। ডিসেম্বর শেষে সরকারি খাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। আর বেসরকারি খাতে ২০ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এনামুল হক সমকালকে বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণ প্রয়োজন। তবে বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া ঋণের সঠিক এবং মানসম্পন্ন ব্যবহারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঋণের অর্থ এমন প্রকল্পে ব্যবহার করা উচিত, যাতে মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয় এবং মুনাফা নিশ্চিত করে।
তিনি মনে করেন, জ্বালানি আমদানিতে হয়তো নতুন করে আরও ঋণ সরকারকে নিতে হবে। গত প্রান্তিকে বেসরকারি খাতে ঋণ গ্রহণের হার বেশি থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঠিক কী কারণে ওই সময়ে এ ধরনের ঋণের পরিমাণ এতটা বাড়ল, তা স্পষ্ট করে বোঝা যাচ্ছে না।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশি উৎসের মোট ঋণের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ৮৭ দশমিক ৬২ শতাংশ। বাকি ১২ দশমিক ৩৮ শতাংশ স্বল্পমেয়াদি ঋণ। দীর্ঘমেয়াদি ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে এসেছে। এ ধরনের ঋণ ৪১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
দ্বিপক্ষীয় বিদেশি ঋণ ২৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট আছে শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ আছে ৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বাণিজ্যিক ঋণ আছে মোট ঋণের ৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য ঋণ ২ দশমিক ১৩ শতাংশ।

রাজস্ব আদায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা কম

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন থেকে পিছিয়ে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেই ধারা থেকে এখনও বের হতে পারছে না সংস্থাটি। এতে ঘাটতির
পরিমাণ বেড়েই চলছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এনবিআরের রাজস্ব আদায় কম হয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। তবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। গতকাল বুধবার প্রকাশিত এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

রাজস্ব কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধসহ নানা কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে ছিল ধীরগতি, যার প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আহরণে। তাদের মতে, এমনিতেই ব্যয়ের চাপ সামলাতে হিমশিম অবস্থায় সরকার। এর মধ্যে এই বিশাল ঘাটতি অর্থবছরের শেষ সময়ে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে ঋণের দায় পরিশোধ, সরকারের পরিচালন ব্যয় নির্বাহ, বাজেট বাস্তবায়ন করতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিকল্প নেই।

এমন বাস্তবতায় করজাল বৃদ্ধি করা, কর পরিপালন নিশ্চিতকরণ ও কর ফাঁকি প্রতিরোধ করার পাশাপাশি ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধারে এনবিআর কাজ করছে বলে জানান কর্মকর্তারা। এর অংশ হিসেবে চলতি করবর্ষে আয়কর রিটার্ন জমার সময় চার দফায় বাড়ানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ও আয়কর– এই তিন খাতের কোনো খাতেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি এনবিআর। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব আহরণে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। বিপরীতে প্রকৃত আহরণ হয়েছে দুই লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে।

শুধু গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুল্ক-কর বাবদ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ৫১ কোটি টাকা। তবে সংগ্রহ হয়েছে ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসের একক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ১১ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। তবে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় এই মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় এনবিআরকে চার লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়। পরে তা সংশোধন করে পাঁচ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। এই হিসাবে নতুন সরকারকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনে শেষ চার মাসে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা আদায় করতে হবে। অর্থাৎ প্রতি মাসে আদায় করতে হবে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা, যা অনেকটা অসম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় হয়েছে গত জানুয়ারিতে। ওই মাসে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। আর সর্বনিম্ন আদায় হয়েছে গত আগস্টে ২৭ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। এ খাতে গত আট মাসে রাজস্ব আদায় কম হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। আদায়ের লক্ষ্য ছিল এক লাখ ১৮ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। এ সময়ে আদায় হয়েছে ৮৫ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা। এ খাতে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৭১ শতাংশ।
ভ্যাট বা মূসক খাতে এসেছে ৯৭ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় এক লাখ ১৮ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ভ্যাট আদায় কম হয়েছে ২০ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
তুলনামূলক ভালো আদায় হয়েছে পণ্য আমদানি খাত থেকে। আট মাসে এ খাত থেকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৯ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৭১ হাজার ৯১২ কোটি টাকা। তবে শুল্ক খাতে তুলনামূলক প্রবৃদ্ধি কম হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ।

নদীতে বাস কীভাবে– তদন্ত চায় জামায়াত

যাত্রীবাহী বাস নদীতে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনায় কার গাফলতি রয়েছে, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে হতাহতের ঘটনায় শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের সবাইকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর আহাজারি ও অসহায়তা ভাষায় প্রকাশের মতো নয়। এ ধরনের ভয়াবহ দুর্ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

বিবৃতিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নিহতদের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি। দুর্ঘটনার পেছনে গাফিলতি, অব্যবস্থাপনা কিংবা দায়িত্বহীনতা রয়েছে কিনা– খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।

গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাব নিয়ে টানাপোড়েন

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের ওপর গণভোট হয়েছে যে অধ্যাদেশে, সেই ‘গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫’ নিয়ে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। জামায়াতের ভাষ্য, ক্ষমতাসীন দল বিএনপি অধ্যাদেশটি বাতিলের প্রস্তাব করেছে। এতে তারা আপত্তি জানিয়েছে। তবে সরকারি দলের ভাষ্য, তারা অধ্যাদেশটি বাতিল বা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়নি। আলোচনা চলছে।

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটির সভা শেষে পরস্পরবিরোধী এই ভাষ্য জানিয়েছে সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী।

১৪ সদস্যের এ কমিটি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করছে। এ কমিটির ১১ সদস্য বিএনপির। তিনজন জামায়াতের। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১৩টি জাতীয় সংসদে পাস করাতে একমত হয়েছে সরকারি ও বিরোধী দল।

বিশেষ কমিটির বৈঠক সূত্র জানায়, গণভোট ছাড়াও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশেও বিএনপি পরিবর্তন আনতে চাইছে। বিরোধী দলের দাবি, পরিবর্তন বা আলোচনার জন্য সংসদে উত্থাপনের মাধ্যমে এসব অধ্যাদেশ বাতিল করতে চাইছে সরকারি দল। এর মাধ্যমে আগের মতো প্রধানমন্ত্রীর হাতে একচ্ছত্র ক্ষমতা রাখতে চায়, যা জুলাই সনদের লঙ্ঘন।

সূত্রটি জানায়, ২০টি অধ্যাদেশের বিষয়ে এখনও একমত হতে পারেনি বিশেষ কমিটি। আগামী ২৯ মার্চ কমিটির তৃতীয় বৈঠক হবে।
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশ জারির পর তা পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন এবং ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। ইউনূস সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ গত ১৩ মার্চ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো পাস হতে হবে।

গতকাল বিশেষ কমিটির বৈঠকের পর জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বলেন, গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলে আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে বিরোধী দল আপত্তি জানিয়েছে।

রফিকুল ইসলাম খান জানান, ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশেও সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এসব অধ্যাদেশ নিয়ে এখনও আলোচনা হয়নি।

জামায়াতের আরেক এমপি জিএম নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বিএনপির আচরণে মনে হচ্ছে, তারা গণভোট বাতিল করতে চায়। তারা বলছে, গণভোটের বিধান সংবিধানে নেই। তাই গণভোট আয়োজন করা বৈধ কিনা– এই আলোচনা সংসদে হওয়া উচিত।

বিশেষ কমিটির বৈঠকে বিরোধী দলের কী অবস্থান ছিল– এমন প্রশ্নে নজরুল ইসলাম বলেছেন, গণভোট অধ্যাদেশ সংশোধনের নামে সংসদে উত্থাপন মানেই সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তা বাতিল হতে দেওয়া। এর মানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বাতিল করা। বিরোধী দল তা হতে দেবে না।
তিনি আরও বলেন, গণভোট হয়ে গেছে। এখন অধ্যাদেশ সংশোধনের প্রয়োজন নেই। ভবিষ্যতে এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে আর গণভোট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই সংশোধন প্রস্তাবই আদতে অধ্যাদেশটি বাতিল করার পাঁয়তারা।

তবে কমিটির সভাপতি ও সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন দাবি করেছেন, গণভোট বাতিল বা রাখার পক্ষে-বিপক্ষে তারা কোনো অবস্থান নেননি।
এ ছাড়া আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গতকাল রাতে সমকালকে বলেন, বিষয়টি এখনও আলোচনার টেবিলে। এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।

গণভোট অধ্যাদেশ ঝুলে আছে
রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের ৪৮টিতে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে রাজনৈতিক দলগুলোর তৃতীয় দফার সংলাপে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ছয়টি পদ্ধতির প্রস্তাব করা হয়েছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের মতামতে, সনদ বাস্তবায়নে আদেশ জারি এবং আদেশের ওপর গণভোট আয়োজনের সুপারিশ করে সাবেক ঐকমত্য কমিশন। বর্তমান আইনমন্ত্রী তখন ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনিও একই অভিমত দিয়েছিলেন। বিএনপি ওই সময় গণভোটে একমত হলেও সংবিধানে নেই– যুক্তিতে আদেশ জারির বিপক্ষে ছিল।

গত ১৩ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদনে রাষ্ট্রপতি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন। ২৫ নভেম্বর জারি করা হয় গণভোট অধ্যাদেশ। ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিনে আদেশের ওপর গণভোট হয়। ৬৮ শতাংশের বেশি ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়লাভ করে।

আদেশে বলা হয়েছিল, হ্যাঁ জয়ী হলে ত্রয়োদশ সংসদ দ্বৈত ভূমিকা পালন করবে। নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে ১৮০ কার্যদিবস মেয়াদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। এ পরিষদ গণভোটের ফল অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, ন্যায়পাল এবং দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের বিধান সংবিধানে যুক্ত করবে। ভোটের অনুপাতে (পিআর) সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দিয়ে ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ গঠন করবে। এসব ছাড়াও জুলাই সনদের যে ৩০ সংস্কার প্রস্তাবে সব দলের ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করবে।

নির্বাচনে বিজয়ী হবার পর বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি। দলটি জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন পদ্ধতি, পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন, দুদক এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ পদ্ধতিতে নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) দিয়েছিল। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায়। অন্যদিকে বিরোধী জোট গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চায়।

সরকারি দল সরাসরি বলছে না
বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, গণভোট নিয়ে বৈঠকে তেমন আলোচনা হয়নি। কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, গণভোট বিষয়ে বৈঠকে তেমন আলোচনা হয়নি। এটা নিয়ে ২৯ মার্চ পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা হবে অথবা সংসদের বৈঠকে আলোচনা হবে।

সরকারি দল থেকে গণভোট অধ্যাদেশ রহিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে জয়নুল আবেদীন বলেন, তাদের পক্ষ থেকে রহিত করার প্রস্তাব করা হয়নি, আবার রাখার প্রস্তাবও করা হয়নি। তারা বলেছেন, এটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সংবিধানের আলোকে এগুলো আলোচনা করতে হবে। কারণ সংবিধান সবার ঊর্ধ্বে। সংসদ সংবিধান অনুযায়ী চলবে। সে জন্য গণভোটসহ সবকিছু আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শেষ করতে চান তারা।

গণভোট অধ্যাদেশ নিয়ে বিএনপির দলীয় অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে জয়নুল আবেদীন বলেন, এটা সংসদের বিষয়। বিশেষ কমিটি এ বিষয়ে ঐকমত্য হতে না পারলে সংসদের বৈঠকে আলোচনা হবে।

বৈঠকে উপস্থিত চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিও গতকাল সন্ধ্যায় সমকালকে বলেন, আলোচনা চলমান। গণভোট বাতিলের প্রস্তাব কার পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে– এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, ‘একটা গ্লাসের অর্ধেক পানি দেখে কেউ একজন বলতে পারে অর্ধেক খালি; আবার আরেকজন বলতে পারে অর্ধেক ভরা।’

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গণভোট অধ্যাদেশের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, যে আদেশের ওপর গণভোট হয়েছে, তা ছিল এখতিয়ারবহির্ভূত। সুতরাং অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা যাবে না। রফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়েছেন। তাই এটা পাস না করা জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং মানবাধিকার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশেও সংশোধনের সুপারিশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে বৈঠকে করা হয় বলে জানা গেছে। নজরুল ইসলাম বলেছেন, বিরোধী দলের বিরোধিতায় এসব অধ্যাদেশ নিয়ে পরে আলোচনার সিদ্ধান্ত জানায় সরকারি দল।

১৩৩ অধ্যাদেশকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এক ভাগ হচ্ছে অধ্যাদেশগুলো যেভাবে জারি হয়েছিল, সেভাবে পাস করা হবে। আর কিছু অধ্যাদেশে সংশোধনী আনা হবে, সেভাবে পাস হবে। আর কিছু অধ্যাদেশ এই অধিবেশনে বাতিল হয়ে যাবে; পরে যদি প্রয়োজন হয়, তা বিল আকারে পরবর্তী অধিবেশনে উত্থাপন করা যাবে। অধ্যাদেশ পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ‘জুলাই সনদ’ এবং ‘সাংবিধানিকতা’– এ দুই বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ক্ষমতা কুক্ষিগতের অভিযোগ বিরোধীদের 
ইউনূস সরকারের জারি করা ‘সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ’-এর মাধ্যমে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করা হয়। এই অধ্যাদেশ সংশোধনের মাধ্যমে সরকারি দল আবারও প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা নিতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম খান।

দুর্নীতি দমন কমিশনের অধ্যাদেশ সংশোধনের মাধ্যমে চেয়ারম্যান নিয়োগে সার্চ কমিটির ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছে অভিযোগ করে বিরোধীদলীয় এই হুইপ বলেন, সরকার যাকে ইচ্ছা তাকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা নিতে চাইছে। একইভাবে পুলিশ কমিশনার এবং আইজিপি নিয়োগেও পেশাদারিত্বের চেয়ে সরকারের পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা চলছে। জামায়াত বলেছে, এসব সংশোধনী প্রস্তাব জুলাই চেতনার পরিপন্থি।

সংসদে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অতীতের সরকার অনেক কিছু করেছে। কিন্তু সেই অহংকার জাতির জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না। সংস্কার ও বিচারের ম্যান্ডেট নিয়ে এই সরকার এসেছিল। গুম কমিশন বা মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের মাধ্যমে যে অর্জনগুলো হয়েছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত করা জনগণ মেনে নেবে না।

জুলাই সনদ মানার কথা বলছে সরকার
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান দাবি করেন, সরকার এখন পর্যন্ত জুলাই সনদের বাইরে পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি বলেন, জুলাই সনদ সবার কাছে স্পর্শকাতর এবং সম্মানের। জুলাই সনদের শর্তই হলো ১ থেকে ৪৮ পর্যন্ত প্রস্তাব বাস্তবায়ন সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে।

গণভোটে বলা আছে; হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে– এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ওইটা জুলাই সনদের পরিপন্থি।

তাহলে আপনারা কোনটাকে প্রাধান্য দেবেন– এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংবিধান ও জুলাই সনদকে প্রাধান্য দিচ্ছি। সংবিধান এবং জুলাই সনদকে এড়িয়ে কোনো কিছু করতে গেলে সেটা নিয়ে পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা হবে।

গতকালের বৈঠকে কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে আরও অংশ নেন সালাহউদ্দিন আহমেদ, নূরুল ইসলাম মনি, আসাদুজ্জামান, ড. মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, এ এম মাহবুব উদ্দিন, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, মুহাম্মদ নওশাদ জমির, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মুজিবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম খান এবং জিএম নজরুল ইসলাম। বিশেষ আমন্ত্রণে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের দলীয় এমপি মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান।

চর্চায় শাকিব-সিয়াম-নিশো

সারা বছর প্রেক্ষাগৃহে দর্শক-খরা থাকলেও ঈদ এলেই বদলে যায় চিত্র। সিনেমা হলে তখন উপচে পড়া ভিড়, উৎসবের আমেজ আর দর্শকের উচ্ছ্বাসে মুখর পরিবেশ। এবার ঈদের দিন থেকেই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে পাঁচটি সিনেমা–‘প্রিন্স’, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’, ‘দম’, ‘রাক্ষস’ ও ‘প্রেশার কুকার’। এর মধ্যে ‘প্রিন্স’, ‘রাক্ষস’ ও ‘দম’ মূলত নায়কনির্ভর সিনেমা।

এই তিন সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন ঢাকাই ছবির জনপ্রিয় তিন নায়ক–শাকিব খান, সিয়াম আহমেদ ও আফরান নিশো। ফলে এবারের ঈদজুড়ে এই তিন নায়ককে ঘিরেই চলছে চর্চা, তর্ক-বিতর্ক এবং ভক্তদের উন্মাদনা।

শাকিব খান
ঈদের সিনেমার পরীক্ষিত নাম শাকিব খান। প্রতি ঈদেই তাঁর সিনেমা থাকে আলোচনার কেন্দ্রে, আর দর্শকও ভিড় করেন তাঁর সিনেমা দেখতে। বছরের দুই ঈদকে কেন্দ্র করে তাঁর সিনেমা মুক্তির বিষয়টি এখন প্রায় প্রতিষ্ঠিত। এবারের ঈদে মুক্তি পেয়েছে গ্যাংস্টার কালচারের গল্প নিয়ে সিনেমা ‘প্রিন্স: ওয়ানস আপন আ টাইম ইন ঢাকা’। মুক্তির পর থেকেই হলসংখ্যার দিক থেকে এগিয়ে ছিল এবং দেশের প্রায় সব সিঙ্গেল স্ক্রিনে দাপট দেখিয়েছে। তবে মুক্তির আগে প্রচারণার ঘাটতি নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ ছিল ভক্তদের মধ্যে। দুটি গান, পোস্টার ও একটি টিজার ছাড়া তেমন কোনো প্রচারণায় দেখা যায়নি সিনেমাটির বেলায়। তবে এগুলো প্রকাশেই তৈরি হয় আগ্রহ, ট্রেন্ডিংয়েও আসে সিনেমাটির ট্রেলার।

সার্ভার জটিলতায় ঈদের দিন দুপুর পর্যন্ত অনেক প্রেক্ষাগৃহে শো চালু না হওয়ায় দর্শক হতাশ হন, কোথাও ক্ষোভও দেখা যায়। এমনকি স্টার সিনেপ্লেক্স এর মতো মাল্টিপ্লেক্সের সবচেয়ে বৃহৎ চেইনটিতেও ঈদের প্রথম তিন দিন সিনেমাটি প্রদর্শিত হয়নি। পরে ঈদের চতুর্থ দিন থেকে সেখানে শো শুরু হলে দ্রুতই হাউসফুল হয়ে ওঠে। এরপর থেকে প্রতিটি শোয়ের টিকিট সোল্ড আউটের খবর আসছে। হাউসফুল শোয়ের খবর আসছে। তবে শো দেরিতে শুরু হওয়া সার্ভার জটিলতার থাকলেও ঈদের নায়কদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন শাকিব খানই।

সিয়াম আহমেদ
শাকিব খানের পর এবারের ঈদের সবচেয়ে আলোচিত নায়ক সিয়াম আহমেদ। ‘বরবাদ’ নির্মাতা মেহেদি হাসান হৃদয় এবার নিয়ে এসেছেন ‘রাক্ষস’। মূলত বরবাদ ইউনিভার্সেরই নতুন সংযোজন এই সিনেমা; যেখানে এবার যুক্ত হয়েছেন সিয়াম। ফলে মুক্তির আগেই ছিল দর্শক-হৃদয়ে জেগেছিল আশা-আকাঙ্ক্ষা ও কৌতূহল। বরবাদে ছিল দেশসেরা নায়ক শাকিব খান। তাঁর ইউনিভার্সে সিয়াম কতটা বাজিমাত করতে পারবেন। সিনেমা মুক্তির পর সেই সংশয় পুরোপুরি কেটে গেছে। এই সিনেমায় সিয়াম শুধু অভিনয় করেননি, বরং স্ক্রিন ডমিনেট করেছেন।

গান, রোমান্স, ডায়ালগ ও অ্যাকশন–সবখানেই তিনি ছিলেন পিওর ম্যাসি অ্যাভাটারে। ‘ওয়ান ম্যান শো’ ধরনের একটি সিনেমা কাঁধে নেওয়ার আত্মবিশ্বাসই তাঁকে নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে। ‘রাক্ষস’ সিঙ্গেল স্ক্রিনে মুক্তি না পেলেও মাল্টিপ্লেক্সে প্রায় ২৩টি শো চলছে–যেগুলোর বেশিরভাগই হাউসফুল। আগাম টিকিটও দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। তবে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও শো না বাড়ানো নিয়ে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ রয়েছে। তাদের মতে, শো বাড়ানো হলে সিনেমাটি বড় বাণিজ্যিক সাফল্য পাবে।

আফরান নিশো
‘সুড়ঙ্গ’ ও ‘দাগী’র পর এবারের ঈদে মুক্তি পেয়েছে আফরান নিশোর ‘দম’। রেদোয়ান রনি পরিচালিত কাজাখস্তানের বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশে ধারণ করা এই সারভাইভাল ঘরানার সিনেমাটি ভিজ্যুয়াল ও আবেগ–দুই দিক থেকেই নতুন অভিজ্ঞতা দিয়েছে দর্শকদের। বরাবরের মতোই অভিনয়ের জন্য প্রশংসা পাচ্ছেন নিশো। সিনেমাটি সিঙ্গেল স্ক্রিনে মুক্তি না পেলেও মাল্টিপ্লেক্সে সর্বোচ্চ সংখ্যক শো পেয়েছে এবং সেই শোগুলোতেই দর্শকের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নিশো এখন মাল্টিপ্লেক্স দর্শকদের কাছে আস্থার নাম হয়ে উঠেছেন।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এবারের ঈদের সিনেমা বাজারে তিন নায়কের লড়াইই সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। তিনজনই নিজ নিজ জায়গা থেকে দর্শকের মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। সেই কারণেই এবারের ঈদে সিনেমার গল্প মানেই ‘তিন তারকার’ জমজমাট প্রতিযোগিতা যেন।

কানে লাল ফুল গোঁজা মেয়েটি বেঁচে আছে, হারিয়েছে মা-ভাইকে

স্বজনদের সৌজন্যে যে ছবিটি পাওয়া গেল তাতে চার বছর বয়সী মেয়ে নওয়ারা আক্তারকে কোলে নিয়ে আছেন নুরুজ্জামান। নওয়ারার কানে গোঁজা লাল রঙের ফুল। পাশে দাঁড়ানো স্ত্রী আয়েশা আক্তারের কোলে ৭ মাসের ছেলে আরশান। ঈদে তোলা এই ছবিটি এখন নুরুজ্জামানের কাছে পারিবারিক সুখস্মৃতির সবশেষ স্মারক।

বুধবার পদ্মা নদীতে স্ত্রী ও পুত্র সন্তানকে হারিয়েছেন নুরুজ্জামান। তলিয়ে যাওয়া সৌহার্দ পরিবহনের বাসটিতে ছিলেন তারা। মেয়েকে নিয়ে নুরুজ্জামান গিয়েছিলেন চিপস কিনতে। ঘাটে ফিরে জানতে পারেন তাঁর স্ত্রী-সন্তানসহ অন্য যাত্রীদের নিয়ে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পানিতে পড়ে তলিয়ে গেছে। ঈদ উদযাপন শেষে ঝিনাইদহের শৈলকুপা থেকে ঢাকায় ফিরতে চাওয়া নুরুজ্জামানের মাথায় যেন ওই মুহূর্তে আকাশ ভেঙে পড়ে।

শৈলকুপায় নুরুজ্জামানদের বাড়ি কাঁচেরকোল ইউনিয়নের খন্দকবাড়িয়া গ্রামে। বৃহস্পতিবার সকালে সেখানে ছিল শুনশান নীরবতা। নুরুজ্জামানের বাবা কামরুজ্জামান প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ঢাকার সাভারের নয়ারহাটে যাওয়ার। আয়েশার বাবার বাড়ি সাভারে। সেখানে ছেলেসহ তাঁকে দাফন করা হবে।

কামরুজ্জামান জানান, সাভার ও মিরপুর সিআরপি হাসপাতালে চাকরি করতেন আয়েশা-নুরুজ্জামান দম্পতি। সন্তানদের নিয়ে ঈদের কয়েকদিন আগে বাড়ি ফেরেন। বুধবার দুপুরে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে।

নাতি-নাতনিকে বিদায় দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর বিকেলে মোবাইল ফোনে নুরুজ্জামানের কল পান কামরুজ্জামান। ওপর পাশ থেকে কাঁদতে কাঁদতে ছেলে জানান, ‘আব্বা আমার সব শেষ। আপনার বৌমা, আরশান পদ্মায় তলিয়ে গেছে।’

কামরুজ্জামানের সঙ্গে ওই ফোনালাপের সময়ই চিপস কিনতে গিয়ে নিজে বেঁচে যাওয়ার কথা জানান নুরুজ্জামান। ঘাটে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর রাত তিনটার দিকে বাসের ভেতর থেকে তাঁর স্ত্রী ও পুত্র সন্তানের লাশ উদ্ধার হয়।

প্রতি বছর ঈদের ছুটিতে নুরুজ্জামানের গ্রামের বাড়িতে বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প বসতো। তাঁর ভাতিজা মোবাস্বির আহেমদ বলেন, তাঁর চাচা-চাচি মিলে এ কাজ করতেন। কিন্তু এবার নিজেরা অসুস্থ থাকায় ক্যাম্প করতে পারেননি।

ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে গত মঙ্গলবার রাতে আত্মীয় বুলবুল আহমেদের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল নুরুজ্জামানের। বলেছিলেন, ‘ভাগনে আগামীকাল (বুধবার) চলে যাচ্ছি। দেখা হবে না।’ বুলবুল বলেন, সেটি ছিল বিদায়ের আগে সৌজন্যতার আলাপ। কয়েক ঘণ্টা পর পরিবারটির হৃদয় বিদারক কোনো ঘটনার কথা শুনতে হবে তা ভাবনাতেও ছিল না। এমন কিছু কেউ আসলে ভাবেও না।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে তলিয়ে যাওয়া বাসটি বৃহস্পতিবার উদ্ধার হয়েছে। আয়েশা-আরশানসহ শনাক্ত হয়েছে ২৬ জনের মরদেহ।

মেয়েকে নিয়ে সাঁতরে পল্টুনের কাছে আসেন শাকিলা, আনতে পারেননি ছেলেকে

ঈদের ছুটিতে ননদ নিশি এসেছিলেন বাবার বাড়ি বেড়াতে। ঢাকায় ঘুরতে যাওয়ার শখ ছিল ভাবী শাকিলার। তাই ঈদের ছুটি শেষে শাকিলা, তার ছেলে সাবিত, মেয়ে সাবিহা, ননদ নিশি ও নিশির একমাত্র মেয়ে সোহানা এই পাঁচজন সৌহার্দ্য পরিবহনে রাজবাড়ী থেকে ঢাকা যাচ্ছিলেন ঘুরতে। কিন্তু কে জানত এই যাত্রাই হবে তার সন্তান আর ভাতিজির শেষ যাত্রা।

শাকিলা বেগমের প্রতিবেশী মরিয়ম আক্তার কান্না জড়িত কন্ঠে জানান, পদ্মায় বাসডুবির পর পরই শাকিলা এক হাতে মেয়েকে কোলে নিয়ে আর অন্য হাতে সাঁতরে বাস থেকে বেরিয়ে পল্টুনের কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের বলেন, ভাই আপনারা মেয়েটাকে কিছুক্ষণ ধরে থাকেন, আমি বাস থেকে আমার ছেলেটাকে নিয়ে আসি। তখন পল্টুনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন মেয়েরা সঙ্গে মাকেও টেনে উপরে নিয়ে আসেন। কারণ তারা বুঝেছিলেন শাকিলা এবার ছেলে উদ্ধার করতে গেলে আর কখনোই ফেরত আসতে পারবেন না। এরপর শাকিলা পল্টুনে আসার পরই অজ্ঞান হয়ে যান।

দৌলতদিয়ায় বাসডুবির ঘটনায় শাকিলার ছেলে সাবিতের (৮) সঙ্গে ননদের মেয়ে সোহানাও (১০) প্রাণ হারিয়েছে। শুধু বেঁচে ফিরেছেন শাকিলা, তার মেয়ে সাবিহা ও ননদ নিশি।

এলাকাবাসী জানায়, শাকিলা বেগম দাদশী ইউনিয়নের আগমাড়াই গ্রামের শরিফুল ইসলামের স্ত্রী। শরিফুল ইসলাম পেশায় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী। সাবিত স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্র ছিল।

প্রতিবেশীরা জানান, শরিফুলের বোন নিশি আক্তার ঢাকায় গার্মেন্টে চাকরি করেন। স্বামী ও একমাত্র সন্তান সোহানাকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন তিনি। ঈদের ছুটিতে নিশি এসেছিলেন বাবার বাড়ি বেড়াতে। ছুটি শেষে ভাবী, ভাতিজা আর ভাতিজিকে নিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে এ দুর্ঘটনার কবলে পড়েন তারা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে আগমারাই গ্রামে শরিফুলদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুই শিশুর মরদেহ পাশাপাশি রাখা হয়েছে। সেখানে লোকে লোকারণ্য। শরীফুল তার প্রিয় সন্তানের কাছে বসে কান্না করছেন। শরিফুলের স্ত্রী শাকিলা শোকে নির্বাক হয়ে গেছেন। মাঝে মধ্যে বিলাপ করছেন ছেলের শোকে। তার স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। মেয়ে হারানো নিশি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। যেন কাঁদতে কাঁদতে তার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। মাঝে মধ্যে তিনি মূর্ছা যাচ্ছিলেন।

শরিফুল ইসলামের স্বজন সিরাজুল ইসলাম ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলেন, এ দৃশ্য দেখা যায়না। একটা সুখী পরিবারে এমন কালো ছায়া নেমে আসবে তা কল্পনাও করেনি কেউ।