Home Blog Page 33

ডিসেম্বরে কাউন্সিলের পরিকল্পনা বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক

চলতি বছরে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে এখনও কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারণ হয়নি। প্রাথমিকভাবে আগামী ডিসেম্বরে কাউন্সিল করার বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। কেন্দ্র থেকে নেতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে কাউন্সিলে নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।

গতকাল শনিবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয় বলে সূত্রে জানা গেছে। রাত ৮টার দিকে বৈঠক শুরু হয়ে শেষ হয় রাত পৌনে ১০টায়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তৃতীয় দফায় অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৈঠক সূত্র জানায়, কাউন্সিলের চূড়ান্ত তারিখ এখনও নির্ধারণ না হলেও সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ডিসেম্বরের মধ্যে কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে দলের। প্রস্তাবিত নতুন পদ্ধতি অনুযায়ী, বিএনপি তৃণমূল পর্যায় থেকে একটি উন্মুক্ত কাউন্সিল প্রক্রিয়া চালুর পরিকল্পনা করছে। এটি ওয়ার্ড থেকে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন ও থানা ইউনিট হয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি পর্যন্ত পৌঁছাবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, কেন্দ্র থেকে সরাসরি নেতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে নেতৃত্ব গড়ে তুলতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নতুন এই সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী, জেলা নেতারা থানা কমিটি গঠনের বিষয়টি তদারকি করবেন। আবার থানা ইউনিট ইউনিয়ন কমিটি এবং ইউনিয়ন কমিটি ওয়ার্ড কমিটি গঠনের দায়িত্বে থাকবে। তৃণমূলের এ স্তরগুলোর সাংগঠনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই কেবল কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হবে।

সূত্র আরও জানায়, পুনর্গঠন প্রক্রিয়া তদারকি করতে একটি ‘মনিটরিং অ্যান্ড ডিজাইন কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় দুই-চারজনের একটি ছোট কোর টিম কাজ শুরু করবে, পরে এর পরিধি বাড়ানো হবে। সাংগঠনিক কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে এবং কাউন্সিলের প্রস্তুতি তদারকি করতে স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যানসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা বিভিন্ন অঞ্চল সফর করবেন।
জানা গেছে, কাউন্সিলের তারিখ চূড়ান্ত হওয়ার পর গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্য একটি উপকমিটি এবং প্রচার, যোগাযোগ ও অভ্যর্থনা তদারকির জন্য আরও কয়েকটি উপকমিটি গঠন করা হবে। এ ছাড়া বিএনপির সহযোগী এবং অঙ্গ সংগঠনগুলোকেও একই পদ্ধতিতে (বটম-আপ অ্যাপ্রোচ) পুনর্গঠন করা হবে। বৈঠকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও আলোচনা হয়। সূত্র জানায়, প্রার্থীরা দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন, তবে বিষয়টি এখনও আলোচনাধীন।
বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু উপস্থিত ছিলেন। মালয়েশিয়া থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস।

ভারী বৃষ্টি ও ঢল চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে বন্যার অবনতি, রান্নায় সংকট

কোলে ১১ মাসের শিশু। ডান হাতে ছাতা ধরেছেন। হাঁটুপানি ভেঙে আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছেন রকিবুল ইসলাম। পেছনে পেছনে যাচ্ছেন স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা। গতকাল শনিবার চট্টগ্রামের বাঁশখালীর মনকিচর এলাকায় হাঁটুপানিতে ডুবে থাকা সড়কে দেখা যায় এই দৃশ্য। রকিবুল জানান, তাদের বসতঘরে ঢুকেছে বন্যার পানি। রান্নাঘর তলিয়ে গেছে। খাওয়া-দাওয়া নেই। বাড়িতে থাকার আর সুযোগ নেই। তাই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছেন।

একই সড়কে আরেকটু সামনে যেতেই দুই যুবক ও এক কিশোরের দেখা মেলে। তাদের মাথায় ও হাতে পানির কলসি। যুবক রাজ্জাক আলী বলেন, তিন দিন ধরে পানিতে ডুবে আছে ঘরবাড়ি।

খাবারের সংকট। তেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছে। খাবার পানির সংকট। এ কারণে এক কিলোমিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করেছেন। কলসিতে পানি নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছেন। সেখানে মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান রয়েছেন।

কিশোর আক্কাস বলে,  সে তার বাবা-মায়ের জন্য এই খাবার পানি সংগ্রহ করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রে দুই দিন ধরে সবাই শুকনা খাবার খাচ্ছে। কোনো খাদ্য সহযোগিতা পায়নি তারা।

তাদের মতো খাদ্য ও পানির সংকটে ভুগছেন সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলার বানভাসিরা।  এখানে অন্তত আট লাখ মানুষ পানিবন্দি। তারা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। কক্সবাজারের দুটি উপজেলায়ও বন্যার অবনতি হয়েছে। সেখানেও দুর্গতরা শুকনা খাবার খেয়ে দিন পার করছেন। পানির সংকট তীব্র। বান্দরবান সারাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাঙামাটির দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছায়নি বলে দাবি করছেন বানভাসিদের অনেকে।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর অধিকাংশ এলাকা গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন। মোবাইল টাওয়ারগুলো অচল হয়ে পড়ায় দুর্গত এলাকার মানুষরা যোগাযোগ করতে পারছেন না।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা স্পিডবোট ও লাইফ জ্যাকেট নিয়ে দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করছেন। উদ্ধারকাজ সুশৃঙ্খল করতে সেনাবাহিনী তিনটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে। ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন। বাঁশখালীর চেচুরিয়া এলাকায় ঘরের ভেতর আটকে পড়া এক অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশুসহ ১৩ জনের একটি পরিবারকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার করেছেন।

গতকাল সরেজমিন চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার জলদী সদর, শীলকুপ, গন্ডামারা বাহারছড়া ও শেখেরখিল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, চলাচলের প্রধান সড়কের কোথাও কোমর, কোথাও হাঁটুপানি। এলাকার পর এলাকা পানিতে ডুবে আছে। যেসব এলাকায় গত শুক্রবার পানি ওঠেনি, সেসব ঘরবাড়িতে ঢুকতে শুরু করেছে পানি। তাই মানুষ নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন।

হাঁটুপানির নিচে থাকা গন্ডামারা সড়কে কথা হয় রাশেদ আলী নামে এক ব্যক্তি সঙ্গে। তিনি বলেন, সময় যত বাড়ছে, বন্যার পানি ততই বাড়ছে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে আত্মীয়ের বাড়ি যাচ্ছেন। শুক্রবার শুকনা খাবার খেয়ে রাত কাটিয়েছেন। বিশুদ্ধ পানি শেষ হয়ে গেছে।

বাহারছড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে এক শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। তাকে কবর দেওয়ার জন্য শুকনা জায়গা খুঁজে পেতে অনেক কষ্ট হয়েছে। আমাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে পুকুরপাড়ে একটি উঁচু এলাকায় তাকে দাফনের ব্যবস্থা করতে হয়েছে।’

বাঁশখালীর পূর্ব ইলশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে ১২টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। তারা গত বৃহস্পতিবার রাতে এসেছে। এখনও প্রশাসনের কেউ তাদের খবর নেয়নি। খাদ্য সহযোগিতা পাননি। সবচেয়ে বড় সংকট বিশুদ্ধ পানির। পাঁচ কিলোমিটার দূরের দোকান থেকে পানি কিনে খেতে হচ্ছে।

সেখানে আশ্রয় নেওয়া সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাড়ি থেকে চাল-আলু নিয়ে এসেছিলাম। খাওয়া শেষ। এখন মুড়ি খেয়ে আছি। এক গ্লাস করে পানি খাচ্ছি। আমার মতো অন্যরাও খাবার কষ্টে আছেন।’

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকার মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি ত্রাণের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪৪ টন চাল ও আড়াই হাজার পরিবারে শুকনা খাবার বিতরণ করেছি। আজ থেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়েছে।’

সাতকানিয়ায়ও বন্যার পানি কমছে না। দুই উপজেলায় প্রায় আট লাখ মানুষ পানিবন্দি। মূলত বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকার পানি নেমে আসায় বন্যার পানি কমছে না। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বন্যা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।

শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ২১ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগকবলিত এলাকায় ১ হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ১২ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

সাতকানিয়া উপজেলা প্রতিনিধি জানান, সাতকানিয়া পৌরসভাসহ উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের কোনোটির পুরো অংশ, আবার কোথাও আংশিক পানিতে ডুবে রয়েছে। উপজেলার প্রায় চার লাখ মানুষ পানিবন্দি। সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কেরানীহাট-বান্দরবান মহাসড়কেও যান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। লোহাগাড়া সদর, আধুনগর, বড়হাতিয়া ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের কিছু এলাকায় এখনও পানি রয়েছে।

পাহাড়ি ঢলের পানির তীব্র স্রোতে একটি সেতু ধসে পড়ে রাঙ্গুনিয়া হয়ে বান্দরবানের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। সেতুর দুই পাশে আটকা পড়েছে হাজারো যাত্রী ও বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

গতকাল শনিবার ভোরে উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের দুধপুকুরিয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এছাড়া একটি রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পানির চাপ আরও বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে পানির তোড়ে সেতুটির একটি অংশ ভেঙে পড়ে। কর্ণফুলী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় উপজেলার লিচুবাগান এলাকা থেকে নদীর অপর পারে চলাচলকারী ফেরি সার্ভিসও বন্ধ রয়েছে। ফলে বিকল্প পথেও বান্দরবানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশে বন্যার পানি কিছুটা কমলেও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনও বাড়িঘর, উঠান ও গ্রামীণ সড়কে হাঁটুপানি জমে আছে। কৃষিজমি ও পুকুর তলিয়ে রয়েছে। ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

ফটিকছড়িতে দুর্গত মানুষের পাশে সেনাবাহিনী
বন্যায় ফটিকছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক স্থানে সড়কযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় শত শত পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। এমন পরিস্থিতিতে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

গতকাল গুইমারা রিজিয়নের অধীন লক্ষ্মীছড়ি জোনের উদ্যোগে উপজেলার সুন্দরপুর, হারুয়ালছড়ি ও আশপাশের বন্যাকবলিত এলাকায় জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সেনাসদস্যরা নৌযান ও অন্যান্য উপায়ে দুর্গম এলাকায় পৌঁছে ক্ষতিগ্রস্ত ১০০টি পরিবারের হাতে খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় ত্রাণ তুলে দেন।

দুই মন্ত্রীর দিনভর তৎপরতা
বন্যাকবলিত মানুষের পাশে সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন। গতকাল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রয়েছে। সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য রোগব্যাধি প্রতিরোধে আগাম প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।

সার্কিট হাউসে পৃথক এক সভায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, খাল-নালা দখল ও জলপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতার কারণে দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। বাঁশখালীর সব স্লুইসগেট খুলে দেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুত পানি নেমে যাচ্ছে।

কক্সবাজার
গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্যায় চকরিয়া উপজেলার অধিকাংশ এলাকার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ উপজেলার লক্ষ্যারচর ইউনিয়নে বাড়িঘরের পাশাপাশি ডুবে গেছে স্কুল, কলেজ, ইউনিয়ন পরিষদ। এ দৃশ্য শুধু লক্ষ্যারচরের নয়। উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা ও খুটাখালী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে।

এভাবে পানিবন্দি কক্সবাজার জেলার ৪০টি ইউনিয়নের প্রায় ৪ লাখ বাসিন্দা। তবে, বৃষ্টি কিছুটা কমায় কোথাও কোথাও নামতে শুরু করেছে পানি। তবে, অধিকাংশ এলাকার মানুষ এখনও পানিবন্দি।

লাক্ষ্যারচর ইউনিয়নের বন্যাদুর্গতের দাবি, প্রায় এক সপ্তাহ পানিবন্দি হয়ে থাকলেও এখনও পৌঁছায়নি খাদ্য সহায়তা। বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকটে ভুগছেন তারা।

ভোক্তভোগীরা জানান, বহু নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানির উৎস অচল হয়ে পড়েছে। ঘরে বুকসমান থেকে কোমরপানি। তাই রান্নাবান্না করা যাচ্ছে না। প্রকট হয়ে উঠছে শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য ও ওষুধের সংকটও।

চকরিয়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মঈন উদ্দিন বলেন, তিন দিন ধরে পানিবন্দি। শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবারও পাওয়া যাচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে যা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তা অতি সামান্য।

মাতামুহুরী উপজেলার বিএমচর ইউনিয়নের বাসিন্দা মকবুল আহমদ বলেন, বন্যার পানিতে বসতঘর ডুবে গেছে। চুলা ধরানোর সুযোগ নেই। অসংখ্য মানুষ না খেয়ে আছে। বিশুদ্ধ পানির জন্য মানুষ হাহাকার করছে।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেছেন, বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় সরকার ইতোমধ্যে কক্সবাজার জেলায় ৩০ লাখ টাকা এবং সাড়ে ৪০০ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষের কাছে ত্রাণসহ বিভিন্ন ধরনের জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। গতকাল দুপুরে বন্যাদুর্গত পেকুয়া ও চকরিয়া উপজেলা পরিদর্শন এবং ত্রাণ বিতরণকালে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এসব কথা বলেন।

রাঙামাটি
রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় ফারুয়া ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সেখানে অন্তত ২০টি গ্রামের ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের শিলক সেতু ধসে পড়ায় দুই জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

গতকাল বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নে পানি বেড়েছে। এতে ১১ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। রাইখ্যং নদীর প্রবল স্রোতের কারণে এই ইউনিয়নের কয়েক হাজার দুর্গত মানুষের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।

রাজাস্থলী-বিলাইছড়ি সীমান্ত সড়ক উদয়চর এলাকায় ধসে পড়ায় বড় যানবাহন চলাচল করছে না। উপজেলায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন জানান, নদীতে প্রচণ্ড স্রোতের কারণে উপজেলা সদর থেকে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয় বাজার থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করে ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়া হয়েছে।

বান্দরবান 
বান্দরবানে বন্যার পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় পাহাড়ধস ও সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সারাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গতকাল সকাল থেকে জেলা শহরের সঙ্গে রাঙামাটি, বাঙ্গাল হালিয়া-চন্দ্রঘোনা এবং রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বান্দরবান সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন।

শহরের বন্যার পানিতে সাতকানিয়ার বাজালিয়া এলাকার কোথাও কোথাও সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় এবং গাছ পড়ে থাকায় বান্দরবান থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারগামী দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

খাগড়াছড়ি
দীঘিনালা উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষজন বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেছে। এদিকে প্রায় চার দিন বন্ধ থাকার পর দীঘিনালা-লংগদু সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। গতকাল সকাল থেকে মাইনী নদীর পানি কমে যাওয়ায় দীঘিনালার নিচু এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করে। উপজেলার মেরুং বাজারের পানি অনেকটাই নিচে নেমে গেছে। ধীরে ধীরে বাজারের সবকিছু স্বাভাবিক হচ্ছে।

১৬ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
বৈরী আবহাওয়া ও বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন সব জেলার উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।

গতকাল সন্ধ্যায় সমকালকে এ তথ্য জানান আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি এবং এ বিভাগের অধীনে আলিম এবং এইচএসসি ভোকেশনাল, বিএমপি, ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বন্যা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৭ নির্দেশনা
দেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখতে সাত দফা জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে বন্যাকবলিত এলাকায় মেডিকেল টিম গঠন, জরুরি ওষুধ ও স্যালাইনের পর্যাপ্ত মজুত, অ্যান্টি-ভেনম সরবরাহ, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ছুটি বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মৃত্যু বেড়ে ৪৪
বন্যা ও পাহাড়ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সাতটি জেলা বন্যার কবলে পড়েছে। এসব জেলায় ৪৪ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে সৃষ্ট এ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাত জেলার ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ।

হবিগঞ্জে বিশুদ্ধ পানির সংকট
হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় নদীভাঙনে প্লাবিত হয়েছে অন্তত ৩০টি গ্রাম। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। বানভাসিরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকটে।

মৌলভীবাজারে দুর্ভোগ বেড়েছে
মৌলভীবাজারে নদনদীর পানি কমতে শুরু করায় পরবর্তী দুর্ভোগ বেড়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার অনেক স্থানে বিশুদ্ধ পানির সঙ্গে গোখাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। উপদ্রুত এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মার্কেটে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। অনেক এলাকার মানুষকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়েছে।

গ্যাসের মজুত কমছে, বিকল্প সীমিত

দেশে গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন কমছে। এর প্রভাব পড়ছে শিল্প খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এতে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বেড়েই চলেছে। সংকট মোকাবিলায় স্থল ও সমুদ্রে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের গতি ধীর।

১৯৯৮ সালে বিবিয়ানায় গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার পর দেশে আর কোনো বড় গ্যাসক্ষেত্রের খোঁজ মেলেনি। কিছু ছোট ক্ষেত্র আবিষ্কার হলেও সেগুলোর মজুত দেশের চাহিদার তুলনায় কম। ইরান যুদ্ধের কারণে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে মোট গ্যাসের মজুত ছিল ১২ দশমিক ২৬ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট)। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ১৫ টিসিএফে। দেশে বর্তমানে গ্যাসক্ষেত্র ২৯টি। এর মধ্যে ২০টি থেকে নিয়মিত গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। চারটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও সেগুলোকে এখনও উৎপাদনে আনা যায়নি। বাকি পাঁচটি ক্ষেত্র দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদনে থাকা ২০টি গ্যাসক্ষেত্রে গত জানুয়ারিতে মজুত ছিল ছয় দশমিক ৩২১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। ছয় মাসের ব্যবধানে জুনে তা কমে প্রায় ছয় টিসিএফে নেমে এসেছে। বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫৮ বিসিএফ গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে।

পরিত্যক্ত পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র– ছাতক, সাঙ্গু, ফেনী, কামতা ও রূপগঞ্জে এখনও প্রায় ৬৬১ বিসিএফ গ্যাস রয়েছে। জকিগঞ্জ ও কুতুবদিয়ায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া গেছে। প্রয়োজনীয় পাইপলাইন ও অবকাঠামোর অভাবে উৎপাদন শুরু করা যায়নি। আর ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে আনা সম্ভব হচ্ছে না। সেখানে প্রায় দুই টিসিএফ গ্যাস আছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানের কার্যকর মজুত দিয়ে সর্বোচ্চ আট বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। গ্যাসক্ষেত্রে শেষ পর্যায়ে চাপ কমে যাওয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস মাটির নিচে রেখেই খনি বন্ধ করতে হয়। বাণিজ্যিক বিবেচনায় তা উত্তোলনযোগ্য নয়।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গত ২২ জুন সংসদে বলেন, সংকট মোকাবিলায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় থ্রিডি সিসমিক জরিপ চলছে ও নতুন জরিপের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে দুটি নতুন ড্রিলিং রিগ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বড় দুই ক্ষেত্রে উৎপাদন কমায় উদ্বেগ বাড়ছে
গ্যাসের সামগ্রিক মজুত হ্রাসের পাশাপাশি উদ্বেগ বাড়ছে দেশের সবচেয়ে বড় দুই গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা ও তিতাসে উৎপাদন কমে যাওয়ায়। মার্কিন কোম্পানি শেভরন পরিচালিত বিবিয়ানা থেকে দেশের মোট গ্যাসের প্রায় অর্ধেক সরবরাহ হয়। কয়েক বছর আগে এখানে দৈনিক ১২০ থেকে ১৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হতো। বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৮৫ কোটি ঘনফুটে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ বিবিয়ানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসতে পারে।

একই রকম অবস্থা দেশের অন্যতম প্রাচীন গ্যাসক্ষেত্র তিতাসেও। পাঁচ বছর আগে যেখানে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত, এখন তা ৩০ কোটি ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে তিতাসের উত্তোলনযোগ্য মজুতের প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়ে গেছে।

ভরসা এলএনজি, বেড়েছে খরচ
দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি মেটাতে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা শুরু হয়। বর্তমানে দেশে গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। আমদানির কারণে দেশের ওপর আর্থিক চাপ দ্রুত বাড়ছে। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

২০২৫ সালে ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছর ১১৫টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এর বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার এবং ওমান থেকে আসার কথা। কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে চাহিদা সামাল দিতে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনতে হয়। এতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকি ছয় হাজার কোটি থেকে বেড়ে সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়।

ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমামের মতে, স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা এবং এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়ে এসেছেন। কিন্তু সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে গুরুত্ব না দিয়ে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়েছে। ফলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হলেও দেশের জ্বালানি সরবরাহে কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা আসেনি।

উদ্যোগ আছে, অনুসন্ধানে গতি কম
গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে সরকার নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। পেট্রোবাংলার কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ৫০টি এবং ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে আরও ১০০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও সংস্কার মিলিয়ে ৫০টি কূপের কাজ চলছে, যার মধ্যে ৩১টি পুরোনো কূপ সংস্কারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

তবে বাস্তব অগ্রগতি এখনও ধীর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্থলভাগে কিছু কাজ এগোলেও দীর্ঘদিন সমুদ্রে কার্যকর কোনো অনুসন্ধান হয়নি। ২০১২ ও ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো বিদেশি কোম্পানি চূড়ান্ত প্রস্তাব জমা দেয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় কোনো আন্তর্জাতিক কোম্পানি অনুসন্ধান চালাচ্ছে না।

এ অবস্থায় সম্প্রতি সংশোধিত উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তির (পিএসসি) আওতায় মোট ২৬টি ব্লকের জন্য আবারও আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে স্থল ও সমুদ্রে দ্রুত এবং ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম তামিম সমকালকে বলেন, দেশের অধিকাংশ গ্যাসক্ষেত্রের আয়ু শেষের দিকে।  পেট্রোবাংলার উচিত আগ্রাসী পরিকল্পনা নেওয়া।  তারা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা করছে। কিন্তু সেগুলো সেভাবে কার্যকর হচ্ছে না। কারণ খনন পদ্ধতি অনেক এগিয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও মান্ধাতার আমলের পদ্ধতিতে এগোচ্ছে।

ম তামিম বলেন, স্থলভাগের যেসব গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে গেছে সেগুলোতে বিদেশি অভিজ্ঞ কোম্পানিকে কাজে লাগানো উচিত। দেশি আর বিদেশি কোম্পানির মধ্যে পার্থক্য দেশেই আছে। প্রায় সমান মজুত নিয়ে শেভরন বিবিয়ানা থেকে এক সময় ১২০-১৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করত। অন্যদিকে তিতাস গ্যাসক্ষেত্র থেকে মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ কোটি ঘনফুট মিলেছে। তিনি বলেন, আর্থিক সক্ষমতা থাকলেও চাইলে এলএনজির সরবরাহ বাড়ানো যাবে না। কারণ অবকাঠামো নেই। নতুন টার্মিনাল স্থাপনে চার থেকে আট বছর লাগবে। তাই স্বল্প মেয়াদে গ্যাস সংকটের সমাধানের জন্য স্থলভাগে আগ্রাসী অনুসন্ধান চালাতে হবে।

আমদানির ক্ষেত্রেও অবকাঠামো সংকট
সরকার গ্যাস আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়ন কঠিন হবে। কারণ এ জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। মহেশখালীতে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ঝুলে আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ আইনে করা সামিট গ্রুপের চুক্তিটি ২০২৪ সালের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করে। পরে এটি আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র বা জিটুজি মডেলে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়বদ্ধতা না চাপানোর নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে শেষ মুহূর্তে চূড়ান্ত চুক্তি সই প্রক্রিয়াটি স্থগিত করা হয়।

একই সঙ্গে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে দেশের প্রথম স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলে বাস্তবায়নের জন্য পেট্রোবাংলা গত ২৮ জুন আন্তর্জাতিক আগ্রহপত্র প্রকাশ করেছে। দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষমতাসম্পন্ন এই টার্মিনালের জন্য ফিন্যান্সিয়াল ও টেকনিক্যাল কনসাল্ট্যান্ট নিয়োগের কাজ বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন।

এই খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, এখনই যদি এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয় তা শেষ করতে কয়েক বছর লাগবে। চুক্তির পর এফএসআরইউ স্থাপনে দুই বছর সময় লাগে। স্থলভাগের টার্মিনাল নির্মাণে ৭-৮ বছর সময় প্রয়োজন।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (পরিকল্পনা) আব্দুল মান্নান পাটোয়ারী বলেন, দেশে গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাপেক্সকে শক্তিশালী করা হচ্ছে। সমুদ্রের ব্লক ইজারা দিতে দরপত্র ডাকা হয়েছে। এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে কাজ চলছে। সংস্থাটির পরিচালক (পিএসসি) জানান, সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ডাকা দরপত্রে সময়সীমা আগামী নভেম্বর পর্যন্ত। এখন পর্যন্ত ৫টি কোম্পানি তথ্যউপাত্ত কিনেছে।

ধুঁকছে পোশাক শিল্পও
পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় তৈরি পোশাক, টেক্সটাইলের মতো শিল্পকারখানায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে। অনেক কারখানায় দিনের দীর্ঘ সময় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সময়মতো ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, যা রপ্তানি বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উৎপাদন সচল রাখতে অনেক উদ্যোক্তাকে ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি (ডিজেল, এলপিজি) ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সমকালকে বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে উৎপাদন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে অনেক প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি আদেশ বাতিল হচ্ছে, ব্যাংকঋণ পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয়েছে। কিছু কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে।

গ্যাস সংযোগের অভাবে স্থবির বিনিয়োগ
দেশে গ্যাসের ঘাটতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতে। নতুন শিল্পকারখানা নির্মাণ শেষ হলেও গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে আছে। গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বর্তমানে প্রায় এক হাজার ৮০০টি শিল্পে গ্যাস সংযোগের আবেদন জমা রয়েছে। এর মধ্যে ডিমান্ড নোটের অর্থ পরিশোধ করেও চার-পাঁচ বছর ধরে অপেক্ষায় আছে অন্তত ৫৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ফলে স্টিল, তৈরি পোশাক, সিমেন্টসহ বিভিন্ন খাতের অনেক কারখানা উৎপাদনে যেতে পারছে না। বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলে অন্তত ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ অলস পড়ে আছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

গ্যাস সংযোগের অভাবে বেশি বিপাকে পড়েছে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী। সিটি গ্রুপের প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা, মেঘনা গ্রুপের ১৬ হাজার কোটি টাকা, আব্দুল মোনেম গ্রুপের পাঁচ হাজার কোটি টাকা এবং বসুন্ধরা, নিটল-নিলয়, টিকে ও আমান গ্রুপের কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প রয়েছে উৎপাদনের অপেক্ষায়। কারখানা চালু না হলেও ব্যাংকঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। ফলে বাড়ছে আর্থিক চাপ। মিরসরাই, জামালপুর, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও গ্যাস সংযোগের অভাবে বিনিয়োগের গতি থমকে আছে।

জিতেও খুশি নন টুখেল, মন ভরেনি পারফরম্যান্সে

নরওয়েকে হারিয়ে ২০১৮ সালের পর ফের বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে ইংল্যান্ড। তবুও খুশি নন ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেল। জয়ের আনন্দ ছাপিয়ে তার কণ্ঠে অসন্তোষের প্রতিধ্বনিই বেশি শোনা গেল। ম্যাচ জয়ের পেছনে নিজেদের পারফরম্যান্সের চেয়ে ভাগ্যের অবদানকেই বড় করে দেখছেন ইংল্যান্ডের এই জার্মান কোচ।

রোববার রাতে মায়ামিতে অনুষ্ঠিত ম্যাচের শুরুতে পিছিয়ে পড়েছিল ইংল্যান্ড। তবে জুড বেলিংহামের জোড়া গোলে শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে জয় পায় ইংলিশরা। সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।

ম্যাচ শেষে টুখেলকে তেমন কোনো উদযাপন করতে দেখা যায়নি। নিজের অসন্তোষও লুকাননি। ম্যাচের পর মাঠেই দেওয়া ছোট প্রতিক্রিয়ায় এই জার্মান কোচ বলেন, ‘আমরা নিজেদের জন্য পরিস্থিতি খুব কঠিন করে তুলেছিলাম। ফলাফল অবশ্য দারুণ হয়েছে। শেষ চারে যেতে পারার অনুভূতি দুর্দান্ত। কিন্তু আমি এমন পারফরম্যান্সে খুশি নই।’

সন্তোষজনক পারফরম্যান্স ছাড়াই ম্যাচ জেতায় ভাগ্যকে কৃতিত্ব দিয়েছেন টুখেল। শিষ্যদের লড়াইয়ের মানসিকতার প্রশংসা করলেও তাদের খেলার ধরন নিয়ে হতাশাই প্রকাশ করেছেন ইংল্যান্ড কোচ।

তিনি বলেন, ‘মাঠে খেলোয়াড়দের নিবেদনে কোনো কমতি নেই। কিন্তু আমরা আজ যেভাবে খেলেছি, তাতে নিজেদের জন্য পরিস্থিতি কেবল কঠিনই করেছি। আমরা নিরাপদ ফুটবল খেলার চেষ্টা করেছি, যথেষ্ট আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখাইনি। আমরা আজ ভাগ্যবান ছিলাম।’

সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার আগে নিজেদের পারফরম্যান্সে আরও উন্নতির জায়গা দেখছেন টুখেল। তার ভাষ্য, ‘আমাদের আরও উন্নতি করতে হবে। এখন উদযাপনের সময়। এজন্য আমাদের হাতে তিন দিন সময় আছে।’

সুইসদের রূপকথা থামিয়ে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা

১২০ মিনিটের শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই শেষে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ে হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজের জোড়া আঘাতে সুইসদের প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার করে দেয় আলবিসেলেস্তেরা। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে লিওনেল মেসির দলের প্রতিপক্ষ জুড বেলিংহামের ইংল্যান্ড।

ম্যাচের ১০ মিনিটের মাথায় লিড নেয় আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির মাপা কর্নার কিক থেকে হেডে বল জালে জড়ান আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার। ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও দমে যায়নি সুইজারল্যান্ড। প্রথমার্ধে বেশ কিছু সুযোগ হাতছাড়া করলেও দ্বিতীয়ার্ধের ৬৭ মিনিটে ঠিকই সমতায় ফেরে তারা। মাঝমাঠ থেকে গড়া এক গোছানো আক্রমণ থেকে আর্জেন্টিনার রক্ষণ ভেঙে এমি মার্তিনেজকে পরাস্ত করেন ড্যান এনদোয়ে।

সমতায় ফেরার আনন্দ বেশি সময় স্থায়ী হয়নি সুইজারল্যান্ডের। ম্যাচের ৭২ মিনিটে ডাইভ দিয়ে ফাউল আদায়ের অভিনয় করতে গিয়ে ভিএআর প্রযুক্তির ফাঁদে পড়েন সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলো। রেফারিকে প্রতারিত করার দায়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের সাথে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন তিনি। ১ জন কম নিয়ে খেলার পরও নির্ধারিত ৯০ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনার একের পর এক আক্রমণ রুখে দিয়ে ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যায় লড়াকু সুইজারল্যান্ড।

টাইব্রেকারের শঙ্কা যখন ড্রেসিংরুম জুড়ে ভর করছিল, ঠিক তখনই জাদুকরী মুহূর্তের জন্ম দেন হুলিয়ান আলভারেজ। অতিরিক্ত সময়ের ১১২ মিনিটে বক্সের বাঁ দিকের কোণা থেকে ডান পায়ের অবিশ্বাস্য রকেট শটে বল জালে পাঠান এই ফরোয়ার্ড। সুইস কিপার গ্রেগর কোবেলের কেবল চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। এই গোলের উদযাপনের সময় মাঠে দুই দলের খেলোয়াড়দের তর্কের জেরে আর্জেন্টিনার বদলি খেলোয়াড় হোসে ম্যানুয়েল লোপেজকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি।

শেষ ৪ মিনিটের ইনজুরি টাইমে সমতা ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে ১০ জনের সুইজারল্যান্ড। ঠিক তখনই অতিরিক্ত সময়ের যোগ করা সময়ে আর্জেন্টিনার হয়ে তৃতীয় গোলটি করেন লাউতারো মার্তিনেজ। আর তাতেই ৩-১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা।

ভারী বৃষ্টি ও ঢল চট্টগ্রামসহ ৫ জেলায় দুর্যোগ, সুপেয় পানির সংকট

কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চুলা ধরানোর জায়গা নেই। তাই দুর্গত এলাকার কয়েক লাখ মানুষ খাবার ও সুপেয় পানির সংকট পোহাচ্ছে। নারী ও শিশুসহ ৩০ হাজার ৫৮৫ জন উঠেছে আশ্রয়কেন্দ্রে। চট্টগ্রাম বোর্ডের আজ শনিবারের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

এদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছানো এবং তাদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

গতকাল শুক্রবার পানিতে ডুবে চার শিশুসহ পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে গত ছয় দিনে ৩৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাহাড়ধসে মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের।
চট্টগ্রামের সাতটি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার অবস্থা করুণ। হাজার হাজার ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট বুকসমান পানিতে ডুবে গেছে। পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা মৎস্য প্রকল্প ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। রান্নার চুলায় হাঁড়ি উঠছে না। নলকূপ পানিতে ডুবে যাওয়ায় সুপেয় পানির হাহাকার দেখা দিয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও।

বন্যার মধ্যেই বঙ্গোপসাগরের কোথাও কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে পড়ছে– এই খবরে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়ছে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, গতকাল পর্যন্ত জেলার প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ধস ও পানিতে ভেসে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্গতদের জন্য ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ২৩ হাজার ৮০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া মানুষের খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।

আশ্রয় নেওয়াদের জন্য চিড়া, মুড়ি, গুড় এবং শিশুদের জন্য বিশেষ খাবার হিসেবে মাফিন, কেক ও বিস্কুটসহ ওরস্যালাইন এবং পাঁচ লিটার করে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে এবং প্রবীণ ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় মেডিকেল সাপোর্ট নিশ্চিত করা হয়েছে।
গত ৫ জুলাই থেকে গতকাল ১০ জুলাই পর্যন্ত ছয় দিনে চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাত হয়েছে এক হাজার ১১৭৫ মিলিমিটার! গত চার দশকে চট্টগ্রামে এটি সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড।

পানিতে ডুবে মৃত্যু তিন শিশুর
ঢলের পানিতে ডুবে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ও সরল ইউনিয়নে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ওই তিন শিশু হলো বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা গ্রামের মেহের আলী বাড়ির প্রবাসী কামাল উদ্দিনের ছেলে মোহাম্মদ আশিক (৭), একই ইউনিয়নের রত্নপুর এলাকার মোহাম্মদ মিরাজ (৩) এবং সরল ইউনিয়নের জালিয়াখালী এলাকার এক শিশু।

এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
বৈরী আবহাওয়া ও বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন পাঁচ জেলায় আজ শনিবার অনুষ্ঠেয় এইচএসসির তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। স্থগিত হওয়া পরীক্ষার নতুন সময়সূচি পরে জানানো হবে।

গতকাল চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগের ওই পাঁচ জেলায় শনিবারের আলিম, এইচএসসি বিএমটি, ভোকেশনাল ও ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে।

ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক
গত বুধবার থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের চন্দনাইশসহ বিভিন্ন উপজেলায় রেললাইনে বন্যার পানি জমে থাকায় ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে গতকাল থেকে এ রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।

 

সেনাবাহিনী মোতায়েন
চট্টগ্রাম জেলায় ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের জরুরি অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন ও ২৪ পদাতিক ডিভিশন বন্যাদুর্গত বিভিন্ন উপজেলায় অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

কক্সবাজার
বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে ১০ উপজেলার ৪০টি ইউনিয়নের পাঁচ লাখের বেশি মানুষ। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান সমকালকে জানান, গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৪ হাজার ৬১ জন রয়েছেন। সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।

নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে মৃত্যু হয়েছে এক শিশুর। তার নাম হাসনাতু জান্নাত (১২)। আরও দুই শিশুকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। শিশু জান্নাত উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ গ্রামের আবদুল মালেকের মেয়ে।

কাকরা ইউনিয়নের বাসিন্দা আহমেদুল হক বলেন, ঘরে চাল আছে, তরকারি আছে। কিন্তু রান্না করার জায়গা নেই। মাটির চুলা বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। এখন শুকনা বা রান্না করা খাবার দরকার। গত বৃহস্পতিবার ভোরে ঘরে পানি ঢোকার পর থেকে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারেননি।

উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা ও খুটাখালী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। যেসব স্থানে গতকাল হাঁটুপানি ছিল, গতকাল সেখানে কোমরপানি দেখা গেছে।

পানি ওঠার কারণে গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। বরইতলী ইউনিয়নের ডেইঙ্গাকাটা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, পাঁচটি গরুই তাঁর একমাত্র সম্বল। পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় নৌকায় করে গরুগুলো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা আশ্রয় নিয়েছেন পাশের একটি বাড়ির ছাদে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শাহিদুল আলম সমকালকে বলেন, দুর্গতদের টাকা, চালসহ প্রয়োজনীয় অনুদান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

রাঙামাটি
বাঘাইছড়ি, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি উপজেলাসহ ১০ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে উদ্ভূত বন্যার পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। হাজারও মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন ৩ হাজার ৫২৪ জন। বিভিন্ন নদনদীতে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বাঘাইছড়ি উপজেলা ও পৌরসভা, জুরাছড়ি উপজেলার মৈদং ইউনিয়ন, জুরাছড়ি সদর, বনযোগীছড়া ইউনিয়ন, বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি এলাকা ও বরকল উপজেলার কয়েকটি এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১০ উপজেলার ২০৪টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ৪০টিতে ৩ হাজার ৫২৪ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যে রাঙামাটি সদরে ৫০৮ জন, কাউখালী ১১৫ জন, কাপ্তাইয়ে ১৯৮ জন, বাঘাইছড়ি উপজেলায় ২৩৬৬ জন, রাজস্থলীতে ৪৮ জন, নানিয়ারচরে ৩৩ জন, বিলাইছড়িতে ১২২ জন, বরকলে ১১৮ জন ও জুরাছড়িতে ১৬ জন রয়েছেন। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, পানিবন্দি লোকজনকে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা লোকজনকে তিন বেলা খাবার দেওয়া হচ্ছে।

খাগড়াছড়ি
গতকাল দিনভর বৃষ্টি বিরতির ফলে খাগড়াছড়িতে পানি দ্রুত নামতে শুরু করেছে। জেলা ও আন্তঃউপজেলা সড়কের নিচু অংশ থেকে পানি সরে যাওয়ায় খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি, দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি, দীঘিনালা-সাজেক এবং দীঘিনালা লংগদু সড়কেও ছোট ছোট যানবাহন এবং মানুষের চলাচল বেড়েছে। তবে কোথাও কোথাও সড়কের অবকাঠামো (সেতু ও ধারক দেয়াল) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভারী যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

তবে এরই মধ্যে প্লাবিত হয়েছে ৩০টি গ্রাম। পানিবন্দি হয়েছে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ। ২৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে আছে ১৮০০ জন। জলাবদ্ধতা বিরাজ করছে জেলাশহর এবং দীঘিনালার মেরুং ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি এলাকা পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে দীঘিনালাতেই। জেলা শহর এবং দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ও কবাখালী এলাকায় প্রশাসন-জনপ্রতিনিধির পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে ত্রাণ তৎপরতায় অংশ নিতে দেখা গেছে।

সাজেক থেকে ফিরেছেন ৪২১ পর্যটক
দীঘিনালা-সাজেক-বাঘাইহাট সড়কের পানি কিছুটা কমেছে। এতে সাজেকে আটকে পড়া ৪২১ পর্যটককে নিরাপদে খাগড়াছড়ি পৌঁছে দিয়েছে সেনাবাহিনী ও ট্যুরিস্ট পুলিশ। এর পর পর্যটকরা নিজ নিজে গন্তব্যে চলে গেছেন। জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত জানান, খাগড়াছড়ি থেকে পর্যটকদের নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছাতে সহযোগিতা করার জন্য পরিবহন মালিক ও অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বান্দরবান
জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গতকাল পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও প্রধান সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সারাদেশের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ ছিল। গতকাল সকাল থেকে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। তবে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দূরপাল্লার যাত্রী, পর্যটক ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালক ও শ্রমিকরা দুর্ভোগে পড়েছেন। জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, ‘বন্যাদুর্গত এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া মানুষের মাঝে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং এবং সার্বক্ষণিক মনিটর করা হচ্ছে।’

হাতিয়ার দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নের দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। গত রোববার থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত টানা বৃষ্টি হয়েছে। পানিবন্দি নিম্ন আয়ের মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। ৩০০ হেক্টর জমির আমন ধানের বীজতলা তিন থেকে চার ফুট পানি নিচে তলিয়ে গেছে।

মৌলভীবাজারের ২৫ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি, মৃত্যু ১
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার উজিরপুর ও একামধু এলাকার দুটি স্থানে মনু নদের বাঁধ ভেঙে অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আকুয়া গ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে আশোরফ আলী আশই (৭০) নামে এক ব্যক্তি গতকাল শুক্রবার মারা গেছেন। ভাঙন এলাকায় বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। একামধু, ভাঙ্গারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্তত চারটি স্কুল জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। একামধু গ্রামের অনেকের ঘরবাড়ি পানিতে নিমজ্জিত থাকায় পরিবারের সদস্য, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে কেউ কেউ মনুর তীর রক্ষাবাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকে নিকটবর্তী আত্মীয়স্বজনের বাড়ি গেছেন।

সুনামগঞ্জে জনজীবন স্থবির
টানা বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। সুনামগঞ্জ শহর ও শহরতলির কোনো কোনো এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বিকেলে জানানো হয়েছে, সকালের চেয়ে বিকেলে সামান্য পরিমাণে কমেছে জেলা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমার পানি।

হবিগঞ্জের ১৫ গ্রাম প্লাবিত
কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে খোয়াই নদ। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জে নদের বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। এতে অন্তত ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। হঠাৎ পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। গবাদি পশু ও আসবাব নিয়ে নিরাপদ স্থানে ছুটছেন দুর্গতরা।

চুয়াডাঙ্গার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
টানা বৃষ্টিতে চুয়াডাঙ্গা জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বসতবাড়ি ও ফসলের মাঠ তলিয়ে গেছে। বিপাকে পড়েছেন মানুষ। দামুড়হুদা উপজেলার জয়রামপুরে রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় দুই গ্রামের মধ্যে চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টির কারণে গ্রীষ্মকালীন সবজি ও আমন বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সাতক্ষীরায় কোথাও কোথাও হাঁটুপানি
কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সাতক্ষীরা শহরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পৌর সদরের নিম্নাঞ্চলের গ্রামীণ সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। কোনো কোনো এলাকায় হাঁটুপানি জমে থাকায় সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। রাস্তার পাশের ড্রেন দিয়ে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় অনেকের বাড়ির উঠান, রান্নাঘরে এমনকি বসতঘরে পানি জমেছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা।

শেরপুরে ৩০ মিটার সড়ক বিলীন
টানা দুদিনের বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে শেরপুর-নালিতাবাড়ী-গাজীর খামার সড়কের গোল্লারপাড় এলাকায় প্রায় ৩০ মিটার পাকা সড়কের অর্ধেক নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। গত বুধবার বিকেল থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত দফায় দফায় ভারী বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে আর বৃষ্টিপাত হয়নি।

বেনাপোল বন্দরে কোটি কোটি টাকার পণ্য নষ্ট
টানা বৃষ্টিতে তলিয়েছে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোটি কোটি টাকার পণ্য। বন্দরের বিভিন্ন শেডে হাঁটুপানিতে ভাসছে জিনিসপত্র। সরু ড্রেনসহ পানি নিষ্কাশনে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা থাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতার।

‘আমরা ফ্রান্সকে ভয় পাই না, ভয়টা ওদেরই হওয়া উচিত’

লস অ্যাঞ্জেলসে বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে স্পেন। আর শেষ চারে পা রাখতেই ব্লকবাস্টার লড়াইয়ের পারদ চড়তে শুরু করেছে। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে স্পেনের প্রতিপক্ষ এমবাপ্পের ফ্রান্স। শিরোপার অন্যতম দুই প্রধান দাবিদারের এই হাই-ভোল্টেজ মহারণ নিয়ে এবার ফরাসি শিবিরকে হুঙ্কার দিয়ে রাখলেন স্পেনের আক্রমণভাগের কাণ্ডারি লামিন ইয়ামাল।

বেলজিয়াম বধের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ইয়ামাল জানিয়ে দেন, ফরাসি ব্রিগেডকে বিন্দুমাত্র সমীহ করছে না লা রোজা’রা। বরং সাম্প্রতিক ইতিহাস টেনে ইয়ামাল বলেন, ভয়টা ফরাসিদেরই হওয়া উচিত।

ইয়ামাল বলেন, ‘ফ্রান্সেরই আমাদের ভয় পাওয়া উচিত, কারণ আমরা ওদের দু-দুবার হারিয়েছি। আমরা ওদের মোটেও ভয় পাচ্ছি না। এই মুহূর্তে বুকভরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে যদি কেউ ফ্রান্সের বিপক্ষে মাঠে নামার যোগ্যতা রাখে, তবে সেটা আমরাই। আমার স্পষ্ট মনে হয়, আমরাই এই টুর্নামেন্টের সেরা দল।’

স্প্যানিশ সমর্থকদের আশ্বস্ত করে এই তরুণ জাদুকর আরও যোগ করেন, ‘দলের সবাই এখন দারুণ খুশি এবং উত্তেজিত। আমরা সেমিফাইনালে নিজেদের সবকিছু উজাড় করে দেব। সমর্থকেরা যেন আমাদের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখেন এবং আপাতত শেষ চারে ওঠার আনন্দ উদযাপন করেন।’

স্পেন ও ফ্রান্সের মধ্যকার সবচেয়ে স্মরণীয় লড়াইগুলোর একটি ছিল ২০২৪ ইউরোতে। সেবার স্পেনের হয়ে দুর্দান্ত এক গোলে সমতা ফিরিয়েছিলেন ইয়ামাল, যা শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জয় এনে দিয়েছিল তার দলকে। তিনি বলেন, ‘আশা করি সেটা আবার হবে, আমি সত্যিই চাই সেই দিনটা এখনই আসুক।’

ফ্রান্সের বিপক্ষে কৌশলগত এবং মানসম্পন্ন এক লড়াইয়ের অপেক্ষায় থাকা আছেন বার্সেলোনার এই খেলোয়াড়। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করছি তারা আমাদের বিপক্ষে আক্রমণাত্মক খেলবে, তবে পুরো ম্যাচ ধরে নয়। কোনো দলই পুরো মাঠজুড়ে এক-বনাম-এক লড়াই করবে না। আমরা সবাই জানি ফ্রান্সের উপরে ও নিচে মানসম্পন্ন খেলোয়াড় আছে এবং তারা অনেক শারীরিক শক্তির খেলা খেলে। আমরা নিজেদের মতো করেই খেলব এবং বল দখলে রাখার চেষ্টা করব। আমি অনেক আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলতে যাচ্ছি, জানি সবকিছু ভালো হবে, ম্যাচের জন্য প্রস্তুত আছি এবং সেই দিনটা আসার অপেক্ষায় আছি।’

ইরানের অনুরোধে আলোচনা চালাতে রাজি যুক্তরাষ্ট্র, তবে যুদ্ধবিরতি শেষ: ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তবে উত্তেজনা সত্ত্বেও দুই দেশ আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে।

শুক্রবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আমাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে চেয়েছে। আমরা তাতে সম্মত হয়েছি। তবে তাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, যুদ্ধবিরতি শেষ।’

তবে ট্রাম্পের এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয় তেহরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অনুরোধ তারা করেনি। তবে কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের স্বাগত জানাতে সম্মত হয়েছে।

সপ্তাহজুড়ে সংঘাতের পর শুক্রবার পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল। এর আগে কাতার ও সৌদি আরবের তিনটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কয়েকটি স্থাপনায় হামলা চালায়। জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায় ইরান।

এদিকে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা স্থায়ীভাবে সংঘাতের অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কাতারের প্রতিনিধিদল শুক্রবার ইরানে বৈঠক করেছে। একই সময়ে নিরাপদ নৌ চলাচল নিয়ে আলোচনার জন্য ওমান সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির।

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধের বিষয়ে ইরানের কাছে নতুন করে দাবি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, তেহরানকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে হবে যে প্রণালির সব নৌপথ উন্মুক্ত থাকবে এবং সেখানে চলাচলকারী জাহাজের ওপর আর কোনো হামলা বা অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে না।

এদিকে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি পোস্টে দাবি করেন, তাকে হত্যার কোনো চেষ্টা করা হলে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক হামলা চালাতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি লেখেন, ‘ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্টকে হত্যা বা হত্যার চেষ্টা করে, তাহলে এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রয়েছে। প্রয়োজন হলে এর সঙ্গে আরও হাজারো ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত হবে।’ ট্রাম্প আরও দাবি করেন, প্রয়োজনে এক বছরের মধ্যে ইরানের সব অঞ্চল সম্পূর্ণ ধ্বংস করার মতো প্রস্তুতি মার্কিন সেনাবাহিনীর রয়েছে।

সম্প্রতি মার্কিন কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানায়, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ওয়াশিংটনকে জানিয়েছে, ইরান ট্রাম্পকে হত্যার একটি নতুন পরিকল্পনা করেছে। যদিও এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। অন্যদিকে বৃহস্পতিবার নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়া কিছু মানুষের হাতে ‘আমরা ট্রাম্পকে হত্যা করব’ লেখা ব্যানার দেখা যায়।

গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতার লক্ষ্য ছিল কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটানো। তবে চলতি সপ্তাহে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় সেই সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় বুধবার ও বৃহস্পতিবার ইরানের ছয়টি শহরে অন্তত ১৭ জন নিহত এবং ১১৫ জন আহত হয়েছেন বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবারও বেড়েছে। এতে বিশ্ববাজারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারাও বাড়তি চাপের মুখে পড়ছেন।

ইরানের হাতে নিহত হলে করণীয় কী হবে, আগেই বলে রেখেছেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের হাতে তিনি নিহত হলে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া জানানো হবে, সে বিষয়ে আগেই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন। তার দাবি, এমন ঘটনা ঘটলে ইরানের ওপর নজিরবিহীন সামরিক হামলা চালানো হবে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্ট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘যদি আমার কিছু হয়, তাহলে তাদের ওপর এমন মাত্রায় বোমা ফেলা হবে, যা তারা আগে কখনো দেখেনি।’

ট্রাম্পের এ মন্তব্য এসেছে এমন এক সময়, যখন ইসরায়েলের গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, ইরান নাকি তাকে হত্যার নতুন পরিকল্পনা করেছে। যদিও এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের লক্ষ্যবস্তু হয়ে আছেন। তার ভাষায়, ‘আমি অনেক দিন ধরেই তাদের তালিকায় আছি। আমাদের এই বিষয়টি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।’

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির জানাজায় ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বানসংবলিত কিছু ব্যানার প্রদর্শনের ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি। প্রসঙ্গটি টেনে ট্রাম্প বলেন, তেহরান বহু বছর ধরেই তাকে হত্যার চেষ্টা করছে। সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আশা করি, আপনারা আমার শূন্যতা অনুভব করবেন।’

এদিকে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে এমন তথ্য রয়েছে যে, ইরান সম্প্রতি ট্রাম্পকে হত্যার সম্ভাব্য একটি নতুন পরিকল্পনা তৈরি করেছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছিল। তবে ইসরায়েলের কাছ থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যকে নতুন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই এমন গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশ দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

মুখ খুললেন পরীমনি, রাষ্ট্রের কাছে ফিরে চাইলেন সম্মান র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার

২০২১ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি মামলায় র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া নিয়ে মুখ খুললেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। ৪ আগস্ট রাজধানীর বনানীর বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তারের ওই ঘটনাটি নিয়ে তিনি শুক্রবার রাতে ফেসবুকে তাঁর ভেরিফায়েড় অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছেন। পোস্টে পরীমনি দাবি করেছেন,  তাঁকে ‘সম্পূর্ণ বেআইনি ও বিশেষ মহলের স্বার্থে’ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে টানা ২৮ দিন কারাগারে রাখা হয়েছিল। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাষ্ট্রের উদ্দেশে কয়েকটি প্রশ্ন তুলেছেন এ অভিনেত্রী। লিখেছেন, ‘আমার সেই দিনগুলো কি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব? যে জীবন, যে সম্মান, যে মানসিক শান্তি আমি হারিয়েছি, তা কি আর কখনো ফিরে পাব? মানুষের মনে আমাকে নিয়ে যে অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও বিতর্কিত ধারণা তৈরি করা হয়েছে, রাষ্ট্র কি তার দায় নেবে?’

পরীমনি ফেসবুক স্ট্যাটাসের শুরুতে র‍্যাবের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল খাইরুল ইসলামকে ধন্যবাদ জানিয়ে লিখেছেন, ‘সম্প্রতি একটি অনলাইন টক শোতে তিনি এমন কিছু তথ্য প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, যার মাধ্যমে দেশের মানুষ জানতে পেরেছেন, বনানীতে তাঁর বাসায় দীর্ঘ অভিযানের পর তৎকালীন র‍্যাব মহাপরিচালক ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনের নির্দেশে তাঁকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় আমাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ডে টানা ২০ দিন কারাগারে রাখা হয়েছিল। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা আমার জীবনকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত করেছে, তা আল্লাহ আর আমি ছাড়া পৃথিবীর আর কারও পক্ষে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। তবুও আমি বিশ্বাস করি, সত্য একদিন না একদিন প্রকাশিত হয়। সময় লাগতে পারে, কিন্তু সত্যকে চিরদিন চাপা রাখা যায় না।’

এ অভিনেত্রী লেখেন, ‘গ্রেপ্তারের দিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি সেই ঘটনার একজন ভুক্তভোগী হয়েই জীবন কাটাচ্ছি। যেভাবে আমাকে অপদস্থ করা হয়েছে, আমার সম্মান, নৈতিকতা এবং চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে থাকবে। রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীকে ব্যবহার করে একজন সাধারণ নারী শিল্পীর জীবনকে যেভাবে বিপর্যস্ত করা হয়েছে, আমি শুধু চাই ভবিষ্যতে আর কোনো নির্দোষ মানুষ যেন এমন অভিজ্ঞতার শিকার না হন। এতোগুলা দিন পর আমি কোনো ক্ষোভ বা প্রতিশোধের কথা বলতে চাই না। আমি শুধু সত্য, ন্যায়বিচার এবং মানবিকতার পক্ষে কথা বলতে চাই।’

পরীমনি লিখেছেন, ‘এবার হয়তো রাষ্ট্রীয় সেই সাজানো মামলা থেকে আদালত আমাকে অব্যাহতি দেবেন। কিন্তু আমার সেই দিনগুলো কি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব? যে জীবন, যে সম্মান, যে মানসিক শান্তি আমি হারিয়েছি, তা কি আর কখনো ফিরে পাব? মানুষের মনে আমাকে নিয়ে যে অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও বিতর্কিত ধারণা তৈরি করা হয়েছে, রাষ্ট্র কি তার দায় নেবে? রাষ্ট্রের কাছে আমি এই প্রশ্নগুলোর জবাব চাইলে কি দিতে পারবেন? আমি কখনো চাইনি আমার পরিচয় একজন বিতর্কিত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। আমি সব সময় একজন শিল্পী হিসেবে মানুষের ভালোবাসা নিয়েই বেঁচে থাকতে চেয়েছি। কিন্তু একটি ঘটনার অভিঘাত আমার জীবনকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যার দায়ভার আমাকে আজও বহন করতে হচ্ছে।’

তিনি লেখেন, আমি কাউকে ছোট বা অপমান করতেও চাই না। আমি শুধু চাই, ভবিষ্যতে আর কোনো নির্দোষ মানুষ যেন এ ধরনের অন্যায়ের শিকার না হন। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা টুকু অটুট থাকুক। সেই আস্থার ভিত্তি হোক ন্যায়বিচার, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতা মূলক। যারা সেই কঠিন সময়ে কোনো প্রশ্ন না করেই আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আমার পরিবার, সহকর্মী, বন্ধু, সাংবাদিক এবং আমার অসংখ্য ভক্ত আপনাদের প্রতি আমি আজীবন গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। আপনাদের বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং সমর্থনই আমাকে বারবার উঠে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছে।

সবশেষে এ অভিনেত্রী স্ট্যাটাসে বলেন, ‘আমি অতীতের ক্ষত বয়ে বেড়াতে চাই না। আমি মুক্ত আকাশে পরীর মতো করেই উড়তে চাই। আমি বাঁচতে ভালোবাসি আর আমার কাজ, আমার সন্তান, আমার পরিবার এবং আমার দর্শকদের ভালোবাসা নিয়েই আমি বাকি জীবন বাঁচতে চাই। আমি বিশ্বাস করি, সত্যকে কখনো চিরদিন চাপা রাখা যায় না। আর ন্যায়বিচারের পথে হাঁটা কখনো বৃথা যায় না। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি যেন আরও ভালো কাজের মাধ্যমে আপনাদের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে পারি।’

প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের ৪ আগস্ট বিকেলে বনানীর ১২ নম্বর সড়কে পরীমনির বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। গ্রেপ্তারের পর মাদক মামলায় পরীমনির ৫ আগস্ট চার দিন এবং ১০ আগস্ট দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। ১৩ আগস্ট রিমান্ড শেষে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর আবারও ১৯ আগস্ট এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ড শেষে ২১ আগস্ট আবার তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। ৩১ আগস্ট ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ চার্জশিট দাখিল হওয়া পর্যন্ত তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন। পরদিন তিনি কারামুক্ত হন। এরপর ৪ অক্টোবর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক কাজী গোলাম মোস্তফা পরীমনিসহ তিনজনের বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের সংশ্লিষ্ট থানার জিআর শাখায় চার্জশিট জমা দেন।