Home Blog Page 32

ব্যাংককের বারে ভয়াবহ আগুন, নিহত অন্তত ২৭

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের একটি জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ-বারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও আটজন গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রোববার গভীর রাতে শহরের চাতুচাক জেলার ‘রং বিয়ার না লাত ফ্রাও’ নামের বারে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, মঞ্চের কাছ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো বারজুড়ে আগুন ও ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় আতঙ্কিত লোকজন প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, অনেকেই আগুনের মধ্য দিয়েই বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। কারও কারও শরীরের পোশাকেও আগুন ধরে যায়।

খবর পেয়ে মধ্যরাতের কিছু পর ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় আধা ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন দমকলকর্মীরা। পরে বারের একটি শৌচাগার থেকে অধিকাংশ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ধোঁয়া ও আগুন থেকে বাঁচতে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা।

প্রাথমিক তদন্তে ব্যাংককের দুর্যোগ প্রশমন বিভাগ জানিয়েছে, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এয়ার কন্ডিশনার) বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চানভিরাকুল জানান, আগুন লাগার সময় মঞ্চে গান পরিবেশন করছিলেন এক সংগীতশিল্পী। তার বর্ণনা অনুযায়ী, বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনার পরই ধোঁয়া ও আগুনে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই বের হতে না পেরে ভবনের পেছনের দিকে গিয়ে শৌচাগারে আশ্রয় নেন।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে নয়জন পুরুষ ও ১৮ জন নারী। এ ছাড়া ৬০ জনের বেশি আহত ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, যাদের মধ্যে আটজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

ব্যাংককের দুর্যোগ প্রশমন বিভাগের পরিচালক সুরিয়াচাই রাভিওয়ান বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অধিকাংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছে ধোঁয়ায় শ্বাসরোধে। ব্যাংককের গভর্নর চাচার্ত সিত্তিপুন্ত বলেন, বারের ছাদে ব্যবহৃত দাহ্য সজ্জাসামগ্রী আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে ভূমিকা রাখতে পারে। জরুরি নির্গমনপথের কাছে কয়েকজনকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেছে, যা ওই পথে কোনো বাধা ছিল কি না-সে প্রশ্নও তুলেছে। তবে ফরেনসিক তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।

সোমবার সকাল পর্যন্ত বারটি ঘিরে রেখেছে পুলিশ। ভবনের ভেতরের দেয়াল, আসবাব ও ছাদ আগুনে সম্পূর্ণ কালো হয়ে গেছে। বাইরে সারিবদ্ধভাবে রাখা মরদেহের ব্যাগ এবং ধ্বংসস্তূপ অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতার সাক্ষ্য দিচ্ছে।

থাইল্যান্ডে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। ২০২২ সালে ব্যাংককের দক্ষিণে একটি বারে অগ্নিকাণ্ডে ২২ জন নিহত হন। এর আগে ২০০৯ সালের নববর্ষ উদ্‌যাপনের রাতে রাজধানীর একটি নাইটক্লাবে ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারান ৬৬ জন এবং আহত হন দুই শতাধিক মানুষ।

সংসদে অর্থমন্ত্রী ধনী ব্যক্তির কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ধনী ব্যক্তি ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করছে সরকার। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে ই-রিটার্ন ব্যবস্থা। গতকাল রোববার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন সদস্যের লিখিত প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান তিনি।

নওগাঁ-৩ আসনের সদস্য মো. ফজলে হুদার প্রশ্নে তিনি জানান, সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা না চাপিয়ে ধনী ব্যক্তি ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি বন্ধে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। করপোরেট করদাতার জন্য খুব শিগগিরই ই-রিটার্ন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে। করদাতার তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে এপিআই সংযোগের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ের কাজ চলছে। কোন খাত থেকে কত কর আসা উচিত, তা নির্ধারণে ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা ও অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। অনলাইনে উৎসে কর কাটার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত কর ফাঁকিদাতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

গাজীপুর-৫ আসনের সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলনের প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপে ২০২৫ সালের অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে এলেও আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারের প্রভাবে চলতি বছরের মে মাসে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে জোগান সংকট কাটিয়ে উৎপাদন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য থেকে, বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে বাজারভিত্তিক নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে।

নতুন উদ্যোক্তা পাবেন বিনা জামানতে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ

কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সদস্য মো. মাহবুবুল আলমের প্রশ্নে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, নতুন উদ্যোক্তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। এই তহবিল থেকে নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ১০ লাখ টাকা এবং জামানত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। স্টার্টআপ উদ্যোক্তার জন্য ৫০০ কোটি টাকার আলাদা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে, যেখান থেকে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি ৩৯টি তপশিলি ব্যাংকের অংশীদারিত্বে গঠিত বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির মাধ্যমে ইকুইটি সহায়তাও দেওয়া হবে।

সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১,৮৮,৭০১ কোটি টাকা

সাবিকুন্নাহারের প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ৩১ মে পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৮৮ হাজার ৭০১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ কমাতে নতুন রেজল্যুশন কৌশল, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ক্রেডিট রিস্ক ব্যবস্থাপনা, জামানত মূল্যায়নের নতুন ব্যবস্থা এবং ঋণ পুনরুদ্ধারে কর্মকর্তাদের জন্য প্রণোদনা চালুর উদ্যোগ রয়েছে।

মুজিববর্ষ উদযাপনে খরচ ৯৮৩ কোটি টাকা

মো. মাহবুবুর রহমানের প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী জানান, মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে জেলা-উপজেলায় বিভিন্ন কর্মসূচি, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ও বেদি নির্মাণ, সরকারি অফিসে ব্রোঞ্জ, তামা ও মার্বেল পাথরের ভাস্কর্য নির্মাণ, রাষ্ট্রীয় সময় গণনার ডিজিটাল বোর্ড স্থাপনসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের মোট খরচ হয়েছে ৯৮২ কোটি ৯১ লাখ ৭৪ টাকা। এ-সংক্রান্ত ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণও সংসদে উপস্থাপন করেন মন্ত্রী।

মন্ত্রী আরও বলেন, আগের প্রধানমন্ত্রীর এক বছরে খাওয়া-দাওয়ার খরচ হয়েছে ৩৫ কোটি টাকা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ব্যয়ের সঙ্গে আগের প্রধানমন্ত্রীর ব্যয়ের তুলনা টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি শুধু একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এ ধরনের আরও অনেক ব্যয় রয়েছে।

ব্যাংক খাতের লুটপাটের তদন্ত চলছে

গাজীপুর-৪ আসনের সদস্য সালাহউদ্দিন আইউবীর সম্পূরক প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, যারা দেশের টাকা লুটপাট করে বিদেশে পালিয়েছেন, তাদের বিষয়ে সরকার কোনো আপস করবে না। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তদন্ত চলছে এবং সম্পত্তি ক্রোকের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে।

টেলিটক বিক্রির পরিকল্পনা নেই

মোবাইল অপারেটর টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের নেটওয়ার্কের পরিধি বাড়াতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। গতকাল শেখ মো. আব্দুল্লাহর এক প্রশ্নে মন্ত্রী আরও বলেন, টেলিটক বিক্রির পরিকল্পনা সরকারের নেই।

নতুন বেতন কাঠামোর প্রভাব জানতে চেয়েছে আইএমএফ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে গতকাল রোববার সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে অর্থ বিভাগ। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি মাস থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের কথা রয়েছে। এ জন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে কত ধাপে এবং কী পরিমাণে বাস্তবায়ন হবে, তা মন্ত্রিপরিষদ নির্ধারণ করবে।

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, এ বিষয়ে আইএমএফ কোনো মতামত দেয়নি। বরং বাজেট বাস্তবায়নে এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। এদিকে গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু আইএমএফের সঙ্গে আগের সরকারের নেওয়া ঋণ কর্মসূচিকে ‘সম্পূর্ণ জনস্বার্থবিরোধী’ বলে মন্তব্য করেন।

গতকাল আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক শুরু করে। দিনব্যাপী আটটি বৈঠকের সূচি থাকলেও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ও সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের জানাজায় অংশ নিতে যাওয়ায় অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকটি বাতিল হয়।

দিনের শুরুতে প্রতিনিধি দল অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সঙ্গে বৈঠক করে। পরে অর্থ বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনীতি, বাজেট এবং সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।

অর্থমন্ত্রী সংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের মূল চিন্তা ঋণ পাওয়া নয়, দেশের স্বার্থ রক্ষা করা। দেশের মানুষের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে আইএমএফের সঙ্গে কোনো কর্মসূচিতে সরকার যাবে না।’ তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনগণ ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থ সুরক্ষাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাই নতুন কর্মসূচির প্রতিটি শর্তে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ শতভাগ সংরক্ষিত থাকবে।

সরকার তিন বছর মেয়াদি নতুন কর্মসূচির আওতায় ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার আশা করছে। এ অর্থ সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ মোকাবিলায় ব্যবহার করা হবে। এ লক্ষ্যে গত ৯ জুন অর্থমন্ত্রী আইএমএফকে চিঠি দিয়ে জানান, আগের কর্মসূচি গ্রহণের সময়কার অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। রাজনৈতিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও নতুন চ্যালেঞ্জের কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিন হলেও সরকার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে সংস্কার এগিয়ে নিতে চায়।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকার আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি করে, যা ২০২৫ সালের জুনে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। ওই কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার পেলেও ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষের সম্মতিতে কর্মসূচি বাতিল হয়।

গতকালের বৈঠকে মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, রাজস্ব আহরণ, ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের ব্যয় বিষয়েও আলোচনা হয়।

সোয়া ১০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, ৫১ মৃত্যু

কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা ঢল আর পাহাড়ধস মিলিয়ে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা বড় মানবিক সংকটে পড়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ– এই সাত জেলায় লাখো মানুষ এখনও পানিবন্দি। কোথাও ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে, কোথাও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, আবার কোথাও কৃষিজমি, মাছের ঘের ও গবাদি পশুর খামার একসঙ্গে ক্ষতির মুখে পড়েছে। সরকারি হিসাবে গতকাল রোববার পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন ৩৯ জন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ এবং পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা দুই লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮।

এই বন্যার মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস। সোমবারও দেশের বিভিন্ন বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। বিশেষ করে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে। এতে নিম্নাঞ্চলে নতুন করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি এবং পাহাড়ি এলাকায় আরও ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

আক্রান্ত ৫৮ উপজেলা 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সাত জেলার ৫৮টি উপজেলা, ৩৮৬টি ইউনিয়ন এবং ১১টি পৌর এলাকায় বন্যা হানা দিয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য এক হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু হলেও সেখানে উঠেছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনও নিজ নিজ এলাকায় বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছেন। যাদের বড় অংশই খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ আশ্রয়ের অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা চট্টগ্রাম। এখানকার ১৬ উপজেলার ১৫২টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় বন্যার প্রভাব পড়েছে। পানিবন্দি হয়েছে এক লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা পাঁচ লাখ ৯৫ হাজার। এখানে ১৩ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি আহত হয়েছেন ১২ জন। ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ২১ হাজার ৯০০ মানুষ অবস্থান করছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে চাল, টাকা, শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।

কক্সবাজারের ১০ উপজেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌর এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে ৩৯ হাজার ৫০৬ পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা এক লাখ ৫৮ হাজার ২৭। সেখানে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। আহত হয়েছেন ২৪ জন, এর মধ্যেও পাঁচজন রোহিঙ্গা। এ ছাড়া একজন নিখোঁজ রয়েছেন। জেলার ২৭টি কেন্দ্রে এক হাজার ৫৮০ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

বান্দরবানে সাত উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌর এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে পানিবন্দি রয়েছে ১২ হাজার ৫০০ পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৮৩ হাজার ৫০০। সেখানে ছয়জনের মৃত্যুর পাশাপাশি আহত হয়েছেন দুজন। ২২০টি কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ছয় হাজার ২৫০ জন।

রাঙামাটিতে ৯ উপজেলার ৪৩টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌর এলাকা বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে এক হাজার ৪৪টি পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা তিন হাজার ৫২৪। সেখানে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ৫০টি কেন্দ্রে তিন হাজার ৬৩৭ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

খাগড়াছড়ির ৯ উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌর এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে এক হাজার ৭৩টি পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৪১৭। ১৫০ কেন্দ্রে দুই হাজার ৮৮৩ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

মৌলভীবাজারের পাঁচ উপজেলার ৩১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌর এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে সাত হাজার ৩০৮ পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২৬ হাজার ৫৪৪। সেখানে একজনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার ২০টি কেন্দ্রে দুই হাজার ১৭২ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

হবিগঞ্জের তিন উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে ছয় হাজার ৪৪৪ পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২৮ হাজার ১৪০। দুটি কেন্দ্র খোলা হলেও সেখানে এখনও কেউ আশ্রয় নেননি।

অপ্রতুল বরাদ্দ

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গতকালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, সাত জেলার জন্য নগদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দুই কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এ হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ মানুষের জন্য মাথাপিছু বরাদ্দ পড়ে প্রায় ২৮ টাকা। অন্যদিকে, পানিবন্দি দুই লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবারের হিসাবে পরিবারপ্রতি বরাদ্দ দাঁড়ায় প্রায় ১০৬ টাকা। একই সময়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তিন হাজার ২৫০ টন চাল। সেই হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিপ্রতি চালের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩ দশমিক ২ কেজি।
যদিও সরকার বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় চাল, টাকা, শুকনা খাবার, ঢেউটিনসহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তায়ও ত্রাণ কার্যক্রম চলছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বড় ক্ষতি

বন্যার প্রভাব শুধু মানুষের বাসাবাড়িতে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষি খাতেও এর প্রভাব দ্রুত দৃশ্যমান হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, ১২ জেলায় ২৮ হাজার ৬১০ হেক্টরের বেশি ফসল আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার হেক্টর আমনের বীজতলা এবং প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর আউশ ধানের জমি রয়েছে।

পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন সবজি, পাট, মরিচ, আদা, হলুদ, পানের বরজ এবং বিভিন্ন ফলের বাগানও ক্ষতির মুখে পড়েছে। আরও প্রায় পাঁচ লাখ হেক্টর জমির ফসল এখনও ডুবে আছে। পানি দ্রুত না নামলে ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে।

একক জেলা হিসেবে চট্টগ্রামেই সবচেয়ে বেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার প্রায় সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর আউশ এবং ৫৫০ হেক্টর আমনের বীজতলা তলিয়ে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, আক্রান্ত হওয়া মানেই সব জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়া নয়। পানি দ্রুত নেমে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই ফসল পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। তবে ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জানতে আরও সময় লাগবে।

তিন পার্বত্য জেলার কৃষকের আরেক দুশ্চিন্তার নাম কাঁঠাল। পাহাড়ে এ বছর ফলন ভালো হলেও টানা বৃষ্টিতে গাছে থাকা ফল পচে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বাজারে নেওয়ার আগেই নষ্ট হচ্ছে ফল। সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় কৃষক লোকসান গুনছেন। একই সঙ্গে জুমচাষের আদা, হলুদ ও সবজিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বান্দরবানে প্রাথমিক হিসাবে তিন হাজার ৭০২ একর জমির ফসলের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমনের বীজতলার পানি দ্রুত নেমে গেলে কৃষকরা ফের বীজতলা তৈরি করে অনেকটা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন। তবে আউশ ধান প্রায় পরিপক্ব অবস্থায় থাকায় এ ক্ষতি পুনরুদ্ধারের সুযোগ কম। তিনি মনে করেন, চলতি বছর হাওর অঞ্চলের বোরো ক্ষতির পর এখন আউশ ও আমনেও চাপ তৈরি হওয়ায় ধান উৎপাদনে ঝুঁকি বাড়ছে। উত্তরাঞ্চলে যদি মৌসুমের শেষদিকে বন্যা হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এ এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অভিযোজন এখন সময়ের দাবি। তাঁর মতে, ভাসমান বীজতলা, উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং কৃষকের কাছে সময়মতো তথ্য পৌঁছে দেওয়া গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় পর্যাপ্ত আমনের চারা রয়েছে, যা বন্যাকবলিত এলাকায় সরবরাহ করা সম্ভব।

তিনি বলেন, আমার বিশ্বাস, যেসব এলাকায় বীজতলা নষ্ট হয়েছে সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত নয় এমন জেলা থেকে চারা পাঠানো দরকার। ব্যবস্থাপনা সঠিক হলে বড় ধরনের চারার সংকট হবে না। তবে বন্যার কারণে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি হবেই।

প্রাণিসম্পদ খাতেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উদ্বেগজনক। শুধু চট্টগ্রামেই প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২৭ কোটি ১৮ লাখ টাকার ক্ষতির তথ্য দিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। বন্যায় ২৩টি গরু, ৮৪টি ছাগল এবং প্রায় ৪৩ হাজার মুরগি মারা গেছে। প্রায় পাঁচ হাজার একর ঘাসের প্লট এবং বিপুল পরিমাণ শুকনো পশুখাদ্য নষ্ট হয়েছে। এতে অনেক খামারি গবাদি পশু নিয়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকের খামার পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর খামারি ফরহাদুল ইসলাম জানান, ঝড়ের সময় একটি গাছ তাঁর খামারের ওপর ভেঙে পড়ে তিনটি গরু মারা গেছে, আরও কয়েকটি আহত হয়েছে। এতে কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ডেইরি ও ফ্যাটেনিং খামারিদের সংগঠনের নেতারা বলছেন, বন্যার পানি নেমে গেলে ক্ষুরা রোগ, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

বন্যায় মৎস্য খাতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কার্যালয়ের হিসাবে, প্রায় ১২ হাজার ২৫১টি পুকুর, দিঘি ও মাছের খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে চার হাজার ১০৬ হেক্টর জলাশয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩২০টি চিংড়ি ঘের। এতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১০৯ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে। বহু মাছচাষি এক মৌসুমের পুরো বিনিয়োগ হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন।

এদিকে বান্দরবানে বন্যা ও পাহাড়ধসে প্রায় ২১ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে এসব সড়ক পুনর্নির্মাণে প্রায় ৪০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ কৃষি ও জীবিকার পাশাপাশি অবকাঠামো পুনরুদ্ধারেও বড় ব্যয়ের মুখে পড়বে সরকার।

জানতে চাইলে কৃষি ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াছিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। যেখানে বীজ বা চারা সংকট  তৈরি হবে, সেখানে সরকার চারা সরবরাহের প্রস্তুতি নিয়েছে।

রাজধানীতে বৃষ্টি কমতে পারে আজ, বাড়তে পারে উত্তরাঞ্চলে

রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। চলতি বর্ষা মৌসুমে ঢাকায় এক দিনে এটিই সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। একই সময়ে গতকাল রোববার দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে চট্টগ্রামে, সেখানে রেকর্ড করা হয়েছে ১৬০ মিলিমিটার।

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আজ সোমবার রাজধানীতে বৃষ্টির তীব্রতা কমতে পারে। তবে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, গত শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে গতকাল রোববার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ঢাকায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সাধারণত জুলাই মাসে ঢাকায় গড়ে প্রায় ৩৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। সে হিসাবে এক দিনেই মাসিক গড় বৃষ্টিপাতের প্রায় অর্ধেক নেমে এসেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর সঙ্গে পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় দেশের মধ্যাঞ্চলে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর প্রভাবে ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুরসহ আশপাশের এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হয়েছে। একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে চট্টগ্রামেও।

নাজমুল হক বলেন, এপ্রিল ও মে মাসে বজ্রসহ বৃষ্টি সাধারণত বিচ্ছিন্নভাবে হয়। কিন্তু জুন-জুলাইয়ে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় বৃষ্টিপাতের বিস্তৃতি অনেক বেশি হয় এবং একটি শহরের প্রায় সব এলাকা এর আওতায় আসে।

তবে চলতি মৌসুমে ঢাকায় এটি সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাত হলেও অতীতের কয়েকটি রেকর্ডের চেয়ে কম। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় এক দিনে সর্বোচ্চ ৩৪১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল ২০০৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল ২০০৯ সালের ২৮ জুলাই। এ ছাড়া ১৯৫৬ সালে এক দিনে ৩২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। ২০২২ সালে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে ২৪ ঘণ্টায় ২৫৫ মিলিমিটার এবং ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর ঘূর্ণিঝড় ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ২০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ স্থানে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গতকাল সকালে বান্দরবানের সাঙ্গু, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের কুশিয়ারা এবং নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীর পাঁচটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু ও মাতামুহুরীসহ কয়েকটি নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে পারে। এতে নদী-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া ও হালদা নদীর পানি কয়েকটি স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।

বাবার ‘নিষ্পাপ রক্তের’ প্রতিশোধ নেওয়া হবে: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ‘নিষ্পাপ রক্তের’ প্রতিশোধ নেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। বাবার দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর দেওয়া প্রথম বার্তায় মোজতবা খামেনি বলেন, এই প্রতিশোধ গ্রহণ শুধু পরিবারের তার সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি ইরানি জাতির ইচ্ছা।

আজ শনিবার ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা এই লিখিত বার্তা প্রকাশ করে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন সম্পন্ন হওয়ার কয়েক দিন পর এমন বিবৃতি দেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা।

মোজতবা খামেনি আরও বলেন, ‘আমরা অপরাধী ও কলঙ্কিত খুনিদের কাছ থেকে শহীদ নেতা এবং এই যুদ্ধের সব শহীদের পবিত্র রক্তের বদলা নেওয়ার অঙ্গীকার করছি।’ তিনি বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছে। তারা জবাবদিহিতা থেকে রেহাই পাবে না।’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘অপরাধী ও কলঙ্কিত ঘাতক’ হিসেবে অভিহিত করেন মোজতবা।

২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইলের যৌথ হামলায় নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ছয় দিনব্যাপী আনুষ্ঠানিকতা শেষে গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় ভোরে আয়াতুল্লাহ খামেনির জন্মস্থান মাশহাদ শহরে তার মরদেহ সমাহিত করা হয়।

শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দেওয়া লাখ লাখ শোকার্ত মানুষের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মোজতবা খামেনি। তাদের এই অংশগ্রহণকে ‘শত্রুর মনোবল চূর্ণকারী ও ঐতিহাসিক উপস্থিতি’ হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।

বর্ষায় রান্নাঘরের ৫ জিনিস ছত্রাকমুক্ত রাখবেন যেভাবে

বর্ষাকালে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় রান্নাঘরের কিছু জিনিস দ্রুত ছত্রাকের কবলে পড়ে ব্যবহারের অযোগ্য় হয়ে যায়। অনেক শুকনো খাবার বাতাসের আর্দ্রতা শোষণ করে দলা পাকিয়ে যায়, ছাতা পড়ে যায়। এতে খাবারের স্বাদও বদলে যায়। বর্ষাকালে যেসব জিনিস দ্রুত নষ্ট হয় তা সংরক্ষণের উপায় জেনে নিন। যেমন-

১. বৃষ্টির দিনে চিনির দানাগুলো একসাথে লেগে বড় বড় দলা পাকিয়ে যায়। চিনি বাতাসের সংস্পর্শে এলে এর ওপর আর্দ্রতা জমতে পারে। এছাড়া পাত্রটি খুললেও ভেজা ভাব, সোঁদা গন্ধ দেখা যায়। ভেজা চামচ ব্যবহার করলে চিনি আরও তাড়াতাড়ি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। চিনি আর্দ্রতা মুক্ত রাখতে এয়ারটাইট পাত্র ব্যবহার করুন। চিনি তুলতে চামচটাও যাতে শুকনো হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।

২.বর্ষাকালে বাতাস থেকে আর্দ্রতা শোষণ করে লবণ একেবারে গলে যায়। তাই লবণও এয়ারটাইট পাত্রে রেখে শুকনো চামচ ব্যবহার করুন।

৩. আর্দ্রতার সংস্পর্শে এলে হলুদ, মরিচ, ধনে গুঁড়োও বাতাসের সংস্পর্শে নষ্ট হয়ে যায়। কৌটার মধ্যেই দলা পাকাতে শুরু করে। অনেক সময় আবার ছাতাও পরে যায়। এসব রাখতে এয়ার টাইট পাত্র ব্যবহার করুন। ড্যাম্প ধরা স্থান এড়িয়ে চলুন। শুকনো চামচ ব্যবহার করুন।

৪. বৃষ্টির সময় বেসন ও সুজিও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এগুলোর গন্ধ বদলে যেতে পারে। প্যাকেট খোলার সঙ্গে সঙ্গে এসব জিনিস বায়ুরোধী পাত্রে রাখুন। ঠান্ডা ও শুষ্ক জায়গায় সংরক্ষণ করুন।

৫. বর্ষাকালে বিস্কুট ও স্ন্যাকসের মুচমুচে ভাব নষ্ট হয়ে নেতিয়ে যায়। খোলা প্যাকেটের মধ্যে বাতাসের আর্দ্রতা ঢুকে এমন অবস্থা হতে পারে। খোলার পর প্যাকেট ক্লিপ দিয়ে শক্ত করে সিল করুন। প্রয়োজনে বায়ুরোধী পাত্রে ভরে রাখুন।

দেশজুড়ে আরও ৫ দিনের বৃষ্টির পূর্বাভাস

মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় দেশজুড়ে আগামী পাঁচ দিন বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময়ে বিভিন্ন বিভাগে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির পাশাপাশি কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।

রোববার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ুর বর্ধিতাংশের অক্ষ পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় রয়েছে।

আজ রোববার রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।

আগামীকাল সোমবার রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের অনেক জায়গায় এবং ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। রংপুর ও রাজশাহীর কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে।

বুধবার (১৫ জুলাই) রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে। তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় বৃষ্টি হতে পারে। এদিন খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী পাঁচ দিনজুড়েই দেশে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

পাহাড়ধসে রান্নাঘরে প্রাণ গেল গৃহবধূর, অল্পের জন্য বাঁচলেন স্বামী

কক্সবাজারে পাহাড়ধসে স্বামীর সামনে মাটিচাপা পড়ে রোজিনা বেগম (৪০) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের এ ঘটনায় তার স্বামী আব্দুল মজিদ অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও স্ত্রীকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে কক্সবাজার শহরের পূর্ব কলাতলী ঝরঝরিপাড়ায় পাহাড়ধসের ঘটনাটি ঘটে। খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট প্রায় দেড় ঘণ্টা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে রোজিনা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে।

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, টানা বৃষ্টিতে জেলার পাহাড়গুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বারবার সতর্ক করা হলেও জীবিকার তাগিদে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে ফিরে আসছেন, যা পাহাড়ধস ও প্রাণহানির আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পরিবারের বরাতে জানা যায়, রাতের খাবার একসঙ্গে খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আব্দুল মজিদ ও তার স্ত্রী রোজিনা বেগম। এ সময় পাহাড়ের পাশের রান্নাঘরে রান্না করতে গেলে ভারী বৃষ্টির মধ্যে হঠাৎ পাহাড়ধস নামে। এতে আব্দুল মজিদ সামান্য আহত হয়ে প্রাণে বাঁচলেও রোজিনা বেগম মাটিচাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।

নিহত রোজিনা বেগমের স্বামী আব্দুল মজিদ বলেন, ‘আমি বারবার ওকে বলেছিলাম, পাহাড়ের পাশের রান্নাঘরে না যেতে। বলেছিলাম, বৃষ্টি বেশি, পাহাড়ধসে যেতে পারে। কিন্তু রান্না করতে রান্নাঘরে যেতেই মুহূর্তেই ধস নামে। আমি অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও আমার স্ত্রী মাটিচাপা পড়ে মারা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এর আগেও পাহাড়ের ওপরে থাকা বাড়ির লোকজনকে বলেছিলাম, যেন পানি না ফেলে এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশগুলো কেটে ফেলে। কিন্তু কেউ কথা শোনেননি। ঘটনার সময় আমি ও স্ত্রী পেছনের ঘরে, আর বাবা ও আমার ছোট মেয়ে সামনের ঘরে ছিলাম।’

স্বজনদের দাবি, টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়টি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাদের অভিযোগ, পাহাড়ের ওপরে থাকা বাড়ির জন্য মাটি ভরাট করায় ধসের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বারবার সতর্ক করলেও বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি। পাহাড়ধসের পর চিৎকার করেও সময়মতো সহযোগিতা মেলেনি। আর সেই ধসেই প্রাণ হারান রোজিনা বেগম।

আব্দুল মজিদের ভাই আব্দুল গফুর বলেন, ‘আমরা ১৯৯১ সাল থেকে এখানে বসবাস করছি। এতদিন কখনও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু সম্প্রতি পাহাড়ের ওপরে বাড়ি নির্মাণের জন্য মাটি ভরাট করায় ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। আমরা বারবার সতর্ক করলেও কেউ ব্যবস্থা নেয়নি। অন্তত পাহাড় ঢেকে রাখার ব্যবস্থা করা হলে হয়তো ধস নামত না, আর আমার বোনকেও প্রাণ হারাতে হতো না।’

ফায়ার সার্ভিস জানায়, রোজিনা বেগম রান্নাঘরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ পাহাড়ের ওপরের অংশ ধসে পড়ে। এতে তিনি মাটিচাপা পড়ে আটকা পড়েন। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট উদ্ধার অভিযান শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করেন।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসাইন বলেন, ‘রাত ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে কলাতলীর ঝরঝরিপাড়ায় পাহাড়ধসে একজন নারী মাটিচাপা পড়েছেন-এমন খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টার পর তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘টানা বৃষ্টির কারণে কক্সবাজারের পাহাড়গুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত পাহাড়ধসের আশঙ্কা থাকায় ফায়ার সার্ভিস নিয়মিত মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু সতর্কবার্তা সত্ত্বেও অনেকেই বিভিন্ন প্রয়োজনে আবারও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে ফিরে আসছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, ওই নারী রান্নাঘরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ পাহাড়ের ওপরের অংশ ধসে পড়ে। এতে তিনি মাটিচাপা পড়ে আটকা পড়েন। খবর পেয়ে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। টানা বৃষ্টির এ সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান না করার জন্য তিনি সবাইকে আবারও অনুরোধ জানান।

রয়টার্সের প্রতিবেদন ডিসেম্বরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন শেখ হাসিনা

দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ জন্য তিনি আগামী ডিসেম্বরে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরতে চান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নিজে এসব কথা বলেছেন। তবে সুনির্দিষ্ট তারিখ এবং কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন তা জানাননি।

টেলিফোনে সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয় বৃহস্পতিবার রাতে। রয়টার্স এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে শুক্রবার। শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দেশে ফেরার পর তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। তবু আমাকে যেতেই হবে। আমার দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। মৃত্যু যদি আসেই, তবে আমি চাই তা যেন নিজের মাটিতেই হয়।’

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত নভেম্বরে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনগুলোর সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ও তাঁর দলের সদস্যরা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। আদালতে নিজেদের সমর্পণ করার মাধ্যমে তাঁরা মূলত বর্তমান কর্তৃপক্ষের পরীক্ষা নিতে চান।

শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের জন্য বাংলাদেশ কয়েক দফায় ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। রয়টার্স লিখেছে, দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে বর্তমান সরকার যখন স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, তখন শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র হতে পারে।

ভারতে নির্বাসিত হওয়ার পর শেখ হাসিনা এই প্রথমবারের মতো দেশে ফেরার নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করলেন। এ সময়সূচির ব্যাপারে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেননি জানিয়ে বলেন, ‘তারা আমাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে বারবার ভারতের কাছে চিঠি পাঠাচ্ছে। আমি নিজেই চলে যাব।’

আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালেরও মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। দলটির অন্য নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি রয়টার্স। শেখ হাসিনার বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, তবে সাড়া পায়নি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। গত এপ্রিলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, তারা হাসিনাকে হস্তান্তরের জন্য বাংলাদেশের অনুরোধ খতিয়ে দেখছে। নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত হতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে চায় দিল্লি।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই বছর আগে গণআন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকারের চালানো সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা বলছেন, ‘আমাদের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকেই আত্মগোপনে আছেন। তাই বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি এবং একদিন আপনাদের সবারই ফিরে আসা উচিত। আমরা একসঙ্গে আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করব।’

সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে ফেরার কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ এবং কবে কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন তা জানাননি শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমি বিচারে বিশ্বাস করি। আমার মনে হয় একবার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলে আদালতের এই প্রহসন জনগণের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।’

শেখ হাসিনা জানান, দেশে ফেরার পরিকল্পনার বিষয়ে ঢাকার বর্তমান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ হয়নি। তিনি বলেন, ‘একটি সরকার যখন দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে, তখন কিছু ভুলত্রুটি হতেই পারে। কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। একটি সরকারের ভালো-মন্দ বিচার করার অধিকার কেবল জনগণের। আমি সেই বিচার জনগণের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি।’

সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী জানান, আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠিত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছেন। তিনি বলেন, ‘তারা হয়তো আমাকে দণ্ডিত করতে পারে, আমি হয়তো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারব না। কিন্তু তারা কেন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করবে? আমরা যদি খারাপ কিছু করে থাকি, তবে সেটি জনগণকেই নির্ধারণ করতে দেওয়া হোক।’