Home Blog Page 38

একা ফিরলেন মেসি, মার্তিনেজদের বরণ

বিশ্বকাপ এখন ভাঙা হাট। খেলা শেষ করে যে যার ঘরে ফিরে গেছে। রোববারের ফাইনাল জিতে চ্যাম্পিয়ন স্পেন মাদ্রিদে পৌঁছায় সোমবার। লামিনে ইয়ামালদের রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়া হয় দেশে। রানার্সআপ আর্জেন্টিনা লিওনেল মেসিকে ছাড়াই দেশে ফিরেছে বিশেষ বিমানে। এমিলিয়ানো মার্তিনেজরাও পেয়েছেন জমকালো সংবর্ধনা। এজেইজা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লালগালিচা পাতা হয়েছিল খেলোয়াড়দের বরণ করে নিতে। বিমানবন্দর থেকে ছাদখোলা বাসে শহর প্রদক্ষিণ শেষে নেওয়া হয় দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান কার্যালয়ে। রাজপথের দুপাশে দাঁড়িয়ে স্লোগান আর করতালিতে লাউতারো মার্তিনেজদের স্বাগত জানায় লাখ লাখ মানুষ। জাতীয় দলের দেশে ফেরা ও সমর্থকদের উদযাপনের সুযোগ করে দিতে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা করেছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই।
লিওনেল মেসির বীরের সম্মান পাওয়ারই কথা। ফুটবলপাগল আর্জেন্টাইনরা ভালো করেই জানেন, ২০২২ সালে শিরোপা জয়ের পরের বিশ্বকাপে (২০২৬) রানার্সআপ হওয়া কম পাওয়া নয়। দিয়েগো ম্যারাডোনার পর লিওনেল মেসির হাতে লেখা হলো টানা দুই বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার বীরত্বগাথা। যদিও স্পেনের কাছে ফাইনাল ম্যাচটি ১-০ গোলে হেরে যাওয়া আর্জেন্টাইনদের কাছে স্বপ্নভঙ্গ। খেলা শেষে হতাশায় বিমর্ষ ছিলেন মেসি। বিবাদ এড়িয়ে মাঠের এক কোণে ঠায় বসেছিলেন কিংবদন্তি। লামিনে ইয়ামাল কাছে গেলে উঠে দাঁড়িয়ে টেনে নিয়েছিলেন বুকে। সৌজন্যটুকু শেষ করে আবার বসে পড়েন মাটিতে। কতটা হতাশ হলে একজন মানুষ এভাবে বসে থাকতে পারেন! জাতিকে চতুর্থ বিশ্বকাপ উপহার দিতে না পারার কষ্ট লুকাতে ১০ জন খেলোয়াড় দলের সঙ্গে দেশে ফেরেননি। তাদেরই একজন হলেন মেসি। দেশটির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়কে ছাড়াই দেওয়া হয় সংবর্ধনা। মেসির শূন্যতায় অপূর্ণই থেকে গেছে অনুষ্ঠান।

মেসি দেশে ফিরেছেন এক দিন দেরিতে। তিনি গেছেন জন্মস্থান রোজারিওতে অসুস্থ বাবার কাছে। আর্জেন্টাইন স্পোর্টস পোর্টাল টিওয়াইসি জানায়, কয়েকটা দিন পরিবারের সঙ্গে থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরবেন মেসি। নিজের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেবেন। মেসির জীবনে তাঁর বাবাই সব। যিনি যুক্তরাষ্ট্রে ছেলের খেলা দেখতে আসতে পারেননি অসুস্থতার কারণে। বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ জয়ের পর বাবার জন্য কেঁদেছিলেন মেসি। আর্জেন্টিনা দল বিশ্বকাপ ভেন্যুতে এসেছিল ১ জুন। ১ মাস ২০ দিন পর দেশে ফেরার ফুরসত মিলেছে ফুটবলারদের। বাবাকে না দেখার কষ্টে কত দিন যে কেঁদেছেন আর্জেন্টিনার মহাতারকা, তা জানেন তিনি আর তাঁর ঈশ্বর। লিও চেয়েছিলেন, সোনালি ট্রফি জিতে বাবাকে উপহার দেবেন। বুয়েন্স আয়ার্স থেকে রোজারিওর রাস্তায় কোটি মানুষকে বিজয়ের আনন্দে ভাসাতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিধাতা যে চিত্রনাট্য লিখে রেখেছেন অন্যভাবে! শিরোপা জিততে না পারার হতাশা থেকেই হয়তো দলের সঙ্গে দেশে না ফেরার সিদ্ধান্ত লিওর। বিশ্বকাপ শেষে এক্সে আবেগঘন পোস্ট দেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। রানার্সআপ পদকের ছবি জুড়ে দেন সঙ্গে। মেসির পোস্টে লেখা ছিল, ‘ব্যথাটা অনেক তীব্র। এই ক্ষত সারতে অনেক সময় লাগবে। তবে আমি সব ভালো জিনিসও সঙ্গে নিচ্ছি। যে ম্যাচগুলোতে আমরা নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছি, তা স্মৃতিতে চিরকাল থেকে যাবে। পুরো দেশের সমর্থন আর প্রচেষ্টা আরও একবার বিশ্বের সেরাদের কাতারে নিয়ে এসেছে আমাদের।’ তাঁর পোস্টের পরের লাইনগুলো বেশি আবেগঘন, ‘আজ আমরা যা করেছি, তার কদর করা কঠিন; কিন্তু এই দলটি টানা দুটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছে।’ মেসি যেন আর্জেন্টাইন ভক্তদের মনে করিয়ে দিতে চাইলেন চার বছর আগের উদযাপনের কথা।

মেসির মতো দুঃখের দহনে কাতর গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। তিনিও সামাজিক মাধ্যমে কষ্টের কথা লিখেছেন, ‘আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম যে আমরা আবার জিতব। আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম এটাকে (সোনালি ট্রফি) আর্জেন্টিনায় নিয়ে এসে আরও একবার ইতিহাস গড়ব। সত্যি বলতে, এই কষ্টটা বোঝানো কঠিন।’ পরের লাইনেই দুঃখ প্রকাশ করেন সমর্থকদের কাছে, ‘অনেক কিছু নিয়ে ভাবার আছে এবং দেখতে হবে কীভাবে সামনে এগোনো যায় আর সরে দাঁড়ানোর সময় হয়েছে কিনা। আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি আমার দেশ এবং সতীর্থদের সাহায্য করার জন্য আমার সেরাটা দিয়েছি।’ তিনি আরও লিখেছেন, আমি কী করতে চাই, সে সম্পর্কে আমার একটা ধারণা আছে। আমি আমার চুক্তি পূরণ করব, তারপর দেখা যাবে। সত্যি বলতে, আমি ভাবার প্রয়োজন বোধ করছি। কারণ জানি না, আমি এত বড় (বিশ্বকাপ জয়) কিছু করতে পারব কিনা। হয়তো আমাদের কথা বলতে হবে।’ সিলভার মেডেলের একটি ছবি পোস্ট করেছেন তিনিও।

মেসি, এমিলিয়ানোদের চার বছর আগের অর্জনকে ভুলে যায়নি আর্জেন্টিনার মানুষ। সে প্রমাণ মিলেছে জাতীয় দলের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। তীব্র শীত আর বৃষ্টি উপেক্ষা করে লাখো মানুষ যেভাবে রাস্তায় নেমে এসেছিল, এই ভালোবাসা অকৃত্রিম।

বনের বুক চিরে সড়ক, ঝুঁকিতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত বনে ৩০টি সড়ক নির্মাণ চেয়ে এমপির ডিও লেটার

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া মধুশিয়া বন। বনে উঁচু গর্জন গাছ, নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে খুঁটাখালী খাল। বনের ভেতরে রাতে হেঁটে বেড়ায় হাতির পাল। এখানেই আছে মহাবিপন্ন এশীয় হাতির গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের পথ (করিডোর)।

অন্যদিকে, মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের জেএম ঘাট থেকে কালারমারছড়া পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সরু পথ চলে গেছে পাহাড়ি বনের বুক চিরে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বনেই রয়েছে মায়া হরিণ, চিত্রা হরিণ, বানর, মুখপোড়া হনুমান, বিপন্নপ্রায় পাহাড়ি কচ্ছপ ও অজগরের আবাসস্থল।

এ দুই সংরক্ষিত পাহাড়ি বনের ভেতর দিয়েই দুটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চকরিয়ার মধুশিয়া গর্জন বনের ভেতরে সড়কটির দৈর্ঘ্য হবে পাঁচ কিলোমিটার, আর মহেশখালীর বনের সড়কটি হবে প্রায় ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার। দুটি প্রকল্পেই অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত বনের ভেতরে সড়ক নির্মাণ ঘিরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও বন বিভাগের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সড়ক নির্মাণে সহযোগিতার জন্য বন বিভাগকে ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। তাতেও দমে যায়নি বন বিভাগ। দিয়েছে পাল্টা জবাব। বন বিভাগের দাবি, সংরক্ষিত বনে পাকা সড়ক নির্মাণ আইনবিরোধী এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের কাজের সুযোগ নেই। বন বিভাগের তীব্র আপত্তি, পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদ এবং আইনি জটিলতার মধ্যেও প্রকল্প দুটির কাজ এগিয়ে চলেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সড়কের কারণে বনের ভেতরে মানুষের অবাধ প্রবেশ, দখল, অবৈধ বসতি, বন্যপ্রাণী শিকার এবং বনভূমি ধ্বংসের নতুন পথও তৈরি করবে। জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রায়হান কাউছার বলেন, বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের জন্য অনাপত্তি চেয়ে আবেদন এসেছে। এখনও অনুমতি দেওয়া হয়নি।

সংরক্ষিত বনের ভেতর সড়ক
কক্সবাজার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চকরিয়ার খুঁটাখালী থেকে রামুর ঈদগড় পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ১৯ কোটি টাকার বেশি। কাজ শুরু হয় গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি। আগামী বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পের আওতায় খুঁটাখালী বাজার থেকে মধুশিয়া এবং ঈদগড় থেকে কালাপাড়া পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার সড়কের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন বাকি রয়েছে মধুশিয়া গর্জন বনের ভেতর দিয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার অংশ।

বন বিভাগের অভিযোগ, প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক কাজ শেষ করার পর তাদের কাছে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) চাওয়া হয়েছে। অথচ বনভূমির ভেতরে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বন বিভাগের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।

কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মারুফ হোসেন বলেন, মধুশিয়া গর্জন বন হাতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের পথ। এখানে রাস্তা নির্মাণ করা হলে হাতির স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হবে। একই সঙ্গে মানুষ ও হাতিতে সংঘাত বাড়বে এবং প্রাচীন এই গর্জন বন ঝুঁকিতে পড়বে।

চকরিয়া উপজেলা এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী ফরিদুল আলম বলেন, প্রকল্পের দুটি প্যাকেজে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে উভয় প্রান্তে কাজ চলছে। বন বিভাগ যে অংশ নিয়ে আপত্তি তুলেছে, সেখানে এখনও নির্মাণকাজ শুরুই হয়নি। তিনি বলেন, যেসব অংশে নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে, সেখানে বন বিভাগের জমি বা বনাঞ্চল নেই। রয়েছে বাজার, বসতি ও কৃষিজমি। তাই ওই অংশে বন বিভাগের অনাপত্তিপত্র প্রয়োজন হয়নি। এখন যে অংশ বন রয়েছে, সেই অংশের জন্য অনাপত্তিপত্র চাওয়া হয়েছে।

প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে হাতির করিডোর চিহ্নিত করতে একটি সমীক্ষা চালায়। ‘অ্যাটলাস: এলিফ্যান্ট রুটস অ্যান্ড করিডোরস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই সমীক্ষায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ১২টি হাতির করিডোর চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে আটটি করিডোর রয়েছে কক্সবাজার অঞ্চলে। সেগুলোর অন্যতম হলো খুঁটাখালী-মেধাকচ্ছপিয়া করিডোর, যার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মধুশিয়া গর্জন বন।

এমপির ডিও লেটার
কক্সবাজারের মহেশখালীতে সংরক্ষিত বনের বুক চিরে পাহাড়ের ওপর দিয়ে চলে গেছে পথটি। মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের জেএম ঘাট থেকে শুরু হয়ে রাস্তাটি গেছে কালারমারছড়ায়। ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বনের এই রাস্তাটি পাকা করতে চায় এলজিইডি। জাইকার অর্থায়নে প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে জেএম ঘাট থেকে কালারমারছড়া পর্যন্ত সড়ক পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছু অংশে ঢালাইয়ের পাশাপাশি কালভার্ট নির্মাণের কাজও চলছে।

তবে বন বিভাগ বলেছে, যে বনভূমির ভেতর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি ১৯৫৭ সালে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সরকারের আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনের ভেতর পাকা রাস্তা করার সুযোগ নেই। এতে বন এবং বন্যপ্রাণী উভয়ই হুমকির মুখে পড়বে। তাদের দাবি, এটি নানা প্রজাতির গাছপালার পাশাপাশি হরিণ, বানর, অজগরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। এখানে বন বিভাগের বনায়ন কর্মসূচিও চলমান।

এদিকে মহেশখালীর সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণে অনাপত্তিপত্র চেয়ে বন অধিদপ্তরে ডিও লেটার দিয়েছেন কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ। তিনি সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে ৩০টি সড়ক নির্মাণ করতে চান। গত ২০ মে দেওয়া ওই চিঠিতে এসব সড়ক বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তিনি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানান। এ ব্যাপারে আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ বলেন, মানুষের যোগাযোগ ও কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য রাস্তা প্রয়োজন। সড়ক না করলে মানুষ চলাচল করবে কীভাবে? দরপত্র হয়ে গেছে, কিন্তু বন বিভাগের কারণে কাজ আটকে আছে।

তবে বন বিভাগ তাঁর এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়ে দিয়েছে, সংরক্ষিত বনের মধ্যে পাকা রাস্তা নির্মাণ আইনবিরোধী এবং সরকারপ্রধানের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের কাজের সুযোগ নেই।
মহেশখালী উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিন জনি বলেন, জনগণের প্রয়োজনেই সড়কটি পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের আপত্তির কারণে কাজ এগোতে পারছে না।

কক্সবাজার উপকূলীয় বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক শেখ আবুল কালাম আজাদ বলেন, হাঁটার পথ থাকলেও সংরক্ষিত বনের ভেতর পাকা রাস্তা করার সুযোগ নেই। পাকা রাস্তা হলে পাচারকারীরা বন উজাড় করে ফেলবে; দখল হয়ে যাবে বনভূমি। তিনি দাবি করেন, এলজিইডি রাস্তার কাজ বন্ধ না করলে তারা আইনি পদক্ষেপ নেবেন।

প্রকৃতি সংরক্ষণকর্মী রাসেল মাহফুজ বলেন, মধুশিয়া গর্জন বনটি জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। আইন অনুযায়ী, বনভূমিকে বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার করা যায় না। দেশের সংবিধানেও বলা আছে, বর্তমান ও পরবর্তী সময়ে প্রজন্মের জন্য বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করবে সরকার। দেশের সংবিধান ও আইনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে এ ধরনের প্রকল্প থেকে সরে আসা উচিত।

আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক
বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন ২০২৬-এর ৭ ধারায় বলা হয়েছে, বনবহির্ভূত কাজে কোনো প্রাকৃতিক বন ব্যবহার করা যাবে না। অন্য কোনো বিকল্প না থাকলে মন্ত্রিসভার সম্মতি ও সরকারের অনুমোদনের ভিত্তিতে তা করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিরূপণ, ক্ষতিপূরণমূলক বনায়ন এবং জীববৈচিত্র্যের ঝুঁকি বিবেচনা করা বাধ্যতামূলক। জাতীয় বননীতি ২০২৫-এ বনভূমিকে বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ২০০১ সালের জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিতেও বনভূমি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদ
গত ১ জুলাই বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতিসহ (বেলা) কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে চিঠি দিয়ে খুঁটাখালী-ঈদগড় সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাতিলের দাবি জানায়। তাদের মতে, মধুশিয়া গর্জন বন শুধু হাতির করিডোর নয়; এটি বনশূকর, শিয়াল, বানর, বনমোরগ, নানা প্রজাতির পাখি, সরীসৃপেরও গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। পরিবেশবাদীর শঙ্কা, নতুন সড়ক চালু হলে বনাঞ্চলে মানুষের অবাধ যাতায়াত বাড়বে। ফলে বন উজাড়, অবৈধ দখল, বন্যপ্রাণী শিকার এবং কাঠ পাচারের ঝুঁকি বেড়ে যাবে।

বেলার প্রধান নির্বাহী ও সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, প্রচলিত আইনে ওই দুটি বনে সড়ক করার সুযোগ নেই। সড়ক প্রকল্প দুটির না আছে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি, না আছে বন বিভাগের অনুমতি। বন বিভাগ সুস্পষ্টভাবে আপত্তি তোলার পরও অন্য মন্ত্রণালয়গুলো বন বিভাগের কর্তৃত্ব মানছে না। তারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটাচ্ছে।

ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনতে তিন চিন্তা পাইপলাইন বরিশাল হয়ে ঢাকা অথবা খুলনা

ঢাকার শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকটের স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে ভোলার গ্যাস এলএনজি করে সরবরাহ করার কথা ভাবছে সরকার। দীর্ঘ মেয়াদে পাইপলাইন করে বরিশাল হয়ে ঢাকা বা খুলনা অঞ্চলে সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে। এলএনজি ও পাইপলাইন পদ্ধতিতে সরবরাহের বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করবে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি (জিটিসিএল)। মঙ্গলবার এক বৈঠকে জিটিসএলকে দায়িত্ব দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।

দ্বীপজেলা ভোলায় রয়েছে তিনটি গ্যাসক্ষেত্র। এর মধ্যে ৯টি কূপ খনন করা হয়েছে। দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ১৯ কোটি ঘনফুট থাকলেও চাহিদা না থাকায় উত্তোলন করা হয় ৭ থেকে ৮ কোটি ঘনফুট। এখানে আরও ১৫টি কূপ খননের লক্ষ্যে কাজ করছে পেট্রোবাংলা। প্রস্তাবিত কূপগুলোর খনন শেষ হলে দৈনিক উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ কোটি ঘনফুট বাড়তে পারে। বর্তমানে ভোলায় গ্যাসের মজুত রয়েছে প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এই মজুত আরও বাড়তে পারে। ফলে দেশের চলমান গ্যাস সংকটের সমাধান হিসেবে ভোলার গ্যাস কয়েক বছর ধরে আলোচনায় রয়েছে। এই গ্যাস কীভাবে দেশের মূল গ্রিডে আনা হবে, তা নিয়েই চলছে টানাপোড়েন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীমিত আকারে সিএনজিতে রূপান্তর করে ঢাকায় সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই প্রচেষ্টা খুব বেশি এগোয়নি।

একদিকে এলএনজি আকারে গ্যাস পরিবহন, অন্যদিকে পাইপলাইনের দুটি রুট এখন আলোচনার টেবিলে। স্বল্প মেয়াদে এলএনজি আকারে গ্যাস আনার বিষয় সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। তবে দাম বেশি হওয়ায় এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কম।

পাইপলাইন নিয়ে দুটি মত রয়েছে। একটি বরিশাল হয়ে সরাসরি ঢাকার আমিন বাজারে আসবে। অন্যটি বরিশাল হয়ে খুলনা যাবে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই ভোলা থেকে বরিশাল পর্যন্ত পাইপলাইনের সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়। সে সময় বরিশাল থেকে খুলনার চেয়ে ঢাকার গ্যাস নেওয়ার বিষয়ে বেশি জোর ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এলএনজির পাশাপাশি ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইনে আনার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর খুলনার রুটটি ফের আলোচনায়। এখন খুলনা হয়ে যশোর পর্যন্ত পাইপলাইন নেওয়ার কথাও ভাবা হয়েছে। তবে শিল্প মালিকদের দাবি, সবচেয়ে তীব্র গ্যাস সংকট যেহেতু ঢাকা-গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে, তাই ভোলার গ্যাসের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শিল্পাঞ্চলের জন্য।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেনের মতে, ভোলার গ্যাস এখন শুধু একটি জেলার সম্পদ নয়। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভরসা। তবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। স্বল্প মেয়াদে এলএনজি পরিবহন কিছুটা স্বস্তি দিতে পারলেও দীর্ঘ মেয়াদে পাইপলাইন, স্থানীয় শিল্পায়ন এবং নতুন অনুসন্ধান– এই তিনটি উদ্যোগকে সমন্বয় করেই এগোনো উচিত।
এ ব্যাপারে পেট্রোবাংলার পরিচালক (পরিকল্পনা) আব্দুল মান্নান পাটওয়ারী সমকালকে বলেন, ভোলার গ্যাস কীভাবে কাজে লাগানো যায় তার নানা উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে মঙ্গলবারের বৈঠকে।

এলএনজি ও পাইপলাইনে গ্যাস আনার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প-কারখানার মাধ্যমে বাড়তি গ্যাসকে কাজে লাগানো যায় কিনা, পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। কোনো আলোচনাই এখনও চূড়ান্ত নয়। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

ভোলার গুরুত্ব
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, কিন্তু সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২৬০-২৬৫ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে। যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিল্প উৎপাদনে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনও দিন দিন কমছে।

এক সময় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে। দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদনও দ্রুত কমছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে প্রতিদিন ১৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত, এখন তা ৮০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে।

খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের গ্যাস সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ, বিনিয়োগ ও অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। একদিকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে, অন্যদিকে এলএনজি আমদানিও চাহিদা অনুযায়ী বাড়ানো যাচ্ছে না। নতুন টার্মিনাল ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা থাকায় গ্যাসের ঘাটতি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভোলার গ্যাস একটি বড় সমাধান হতে পারে।

১৯৯৫ সালে বাপেক্স ভোলার শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে এবং ২০০৯ সালে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। পরবর্তীকালে ভোলা নর্থ ও ইলিশা নামে আরও গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়।

সাম্প্রতিক থ্রিডি সিসমিক জরিপে শাহবাজপুর থেকে ইলিশা পর্যন্ত প্রায় ৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২ দশমিক ৪২৩ টিসিএফ উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া চরফ্যাসন এলাকায় টুডি জরিপে আরও ২ দশমিক ৬৮৬ টিসিএফ গ্যাসের সম্ভাবনার তথ্য মিলেছে। বিভিন্ন মূল্যায়নে ভোলার সম্ভাব্য মজুত পাঁচ থেকে আট টিসিএফ পর্যন্ত হতে পারে।

ব্যর্থ সিএনজি, ব্যয়বহুল এলএনজি
আওয়ামী লীগ সরকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইন্ট্রাকোকে সিএনজি আকারে ভোলার গ্যাস ঢাকায় আনার অনুমতি দেয়। প্রথমে দৈনিক ৫০ লাখ ঘনফুট এবং পরে আড়াই কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। বাস্তবে দিনে সর্বোচ্চ ৮ থেকে ৯ লাখ ঘনফুট গ্যাস পরিবহন সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে সরবরাহ আরও কমেছে। অতিরিক্ত ব্যয়, পরিবহন জটিলতা ও সীমিত সক্ষমতার কারণে প্রকল্পটি কার্যত ব্যর্থ হয়েছে।

এই অবস্থায় সরকার নতুন পথ খোঁজে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বেসরকারি বিনিয়োগে ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাসকে এলএনজিতে রূপান্তর করে জাহাজে মূল ভূখণ্ডে আনা হবে। পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গত বছর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক হয়েছে। এফবিসিসিআই, বিজেএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। বৈঠকের পর মতামতের জন্য ১৬০টি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেয় পেট্রোবাংলা। তবে আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। অল্প কয়েক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে।  তারা প্রতি ঘনমিটার ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত দাম বলেছে। তবে গত ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক গণশুনানিতে বিতরণ কোম্পানিগুলো এলএনজি করে ভোলার গ্যাস সরবরাহ করতে প্রতি ঘনমিটারের দাম ৪৭ টাকা ৫০ পয়সা প্রস্তাব করে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, এত বেশি দামে গ্যাস কিনে প্রতিযোগিতামূলক শিল্প চালানো কঠিন হবে।

সূত্র জানিয়েছে, ভোলা থেকে এলএনজি আকারে গ্যাস আনার বিষয়ে ৯টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহপত্র জমা দেয়। এখান থেকে গ্যাজপ্রম, সিসিডিসি, সিএমসিসহ ৪টি প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়েছে।
গতকালের বৈঠকে অংশ নেওয়া একটি গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সমকালকে বলেন, ঢাকা-গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের তীব্র গ্যাস সংকটের স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে এলএনজির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে পাইপলাইনের বিষয়ে কথা হয়েছে।

বিইআরসির সর্বশেষ নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, বিদ্যমান শিল্পের জন্য পাইপলাইনের গ্যাস প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা। তবে নতুন শিল্প ও অতিরিক্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই দাম ৪০ টাকা। আর ভোলা থেকে সিএনজি করে আনা গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৪৭ টাকা ৬০ পয়সা।

পাইপলাইনের রুট 
দীর্ঘদিন ধরে ভোলা-বরিশাল-খুলনা বা ভোলা-বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ঢাকা-বরিশাল অংশের পাইপলাইনের সম্ভাব্যতা যাচাই আওয়ামী লীগের আমলেই সম্পন্ন হয় এবং পরবর্তী সময়ে বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারও ভোলা-বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইন বিষয়ে আগ্রহী ছিল। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্প্রতি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে নতুন সিদ্ধান্ত হয়। প্রথম ধাপে ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। এই গ্যাস যাবে খুলনার রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রে। যশোর, খুলনা ও বরিশালে আবাসিকে গ্যাস দেওয়া হবে। রূপসা কেন্দ্রের বিদ্যুৎ যাবে সিরাজগঞ্জে। তখন সিরাজগঞ্জের বিদ্যুৎকেন্দ্রর গ্যাস এলেঙ্গা হয়ে চন্দ্রা, আশুলিয়ায় দেওয়া হবে। এরপর গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন পর্যাপ্ত থাকলে বরিশাল থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইন সম্প্রসারণ করা হবে।

ভোলা থেকে বরিশাল পর্যন্ত গ্যাস আনতে ২০২৩ সালে আনুমানিক এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৫ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের প্রস্তাব করেছিল জিটিসিএল। ঢাকার আমিনবাজার পর্যন্ত এই পাইপলাইনের মোট দৈর্ঘ্য হতে পারে প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার । বরিশাল-ঢাকা অংশের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘গ্যাজপ্রম’ এ প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছে। অন্যদিকে, ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত গ্যাস নিতে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে।
শিল্প মালিকদের মতে ঢাকা ও গাজীপুর অঞ্চলে গ্যাসের সংকট বেশি। তাই ভোলার গ্যাস এ অঞ্চলের জন্য বেশি প্রয়োজন। তার বলেন, খুলনায় শুধু ৮০০ মেগাওয়াটের রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া বড় কোনো শিল্প এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। তাই ঢাকার অগ্রাধিকার বেশি হওয়া উচিত।

স্থানীয় উন্নয়ন 
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ভোলার গ্যাস আগে স্থানীয় উন্নয়নেই ব্যবহার করা উচিত। সরকারি অর্থায়নে সার কারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং বিসিক শিল্পনগরী, শিল্পাঞ্চল ও ইপিজেড গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে শেলটেক সিরামিক কারখানা চালু করেছে এবং প্রাণ-আরএফএল বড় বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের মতে, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গ্যাস পরিবহনের বদলে ভোলাতেই সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিরামিক, কাচ, রাসায়নিক ও গ্যাসভিত্তিক ভারী শিল্প গড়ে তোলা হলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন শিল্পবিপ্লব ঘটতে পারে। এতে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে ।

ঋণ পুনঃতপশিলে ঘুরেফিরে চিহ্নিত কয়েকটি কোম্পানি

টাকা ফেরত না দিয়েও দীর্ঘ সময় ধরে ঋণ নিয়মিত দেখানোর সুযোগ পেয়ে আসছেন শীর্ষ খেলাপিরা। বিশেষ সুবিধা পাওয়া ব্যবসায়ীরাই ঘুরেফিরে পুনঃতপশিলের জন্য হাজির হচ্ছেন। একের পর এক সুবিধা নেওয়ার কিছুদিন পর তারা আবার খেলাপি হচ্ছেন। প্রকৃত আদায় ছাড়া ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়মিত দেখিয়ে আসা ব্যাংক খাত এভাবে পুনঃতপশিলের ফাঁদে পড়েছে। এতে খেলাপি ঋণ না কমে উল্টো বাড়ছে। এর ফলে বাংলাদেশ এখন খেলাপি ঋণের হারে বিশ্বের শীর্ষস্থান পেয়েছে।

কখনও বৈশ্বিক খারাপ অবস্থা, কখনও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণ দেখিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকই খেলাপিদের জন্য উপায় বের করে দিচ্ছে। সুবিধা দিয়ে খেলপি ঋণ কমানোর নীতির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ব্যাংক খাতের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। তাদের বেশির ভাগের মতে, খেলাপি ঋণের সমস্যার সমাধানে নীতি শিথিলতার সিদ্ধান্ত কাজ দিচ্ছে না। এ ধরনের নীতির বারবার অপব্যবহার হয়েছে।

অধিকাংশ কর্মকর্তা মনে করেন, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোরতার কোনো বিকল্প নেই। খেলাপি অনেকেই ব্যাংকের টাকায় বিলাসী জীবন, বিদেশে পাচারসহ নানা অনিয়ম করছেন। এর বিপরীতে দেশে এমন অনেক বড় ব্যবসায়ী আছেন, যারা খেলাপি হননি। তাই ঋণখেলাপিদের বারবার সুবিধা দিতে থাকলে ভালো ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হবেন।

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণে বিশ্বে এখন শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। গত মার্চ পর্যন্ত পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ খেলাপি দেখানো হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ২০২৩ সালভিত্তিক খেলাপি ঋণের দেশওয়ারি তথ্য রয়েছে। ওই সময় ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে ১৪ নম্বরে ছিল বাংলাদেশের নাম। তখন খেলাপি ঋণে শীর্ষে থাকা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইউক্রেনের খেলাপি ঋণ ছিল ৩৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ন্যাশনাল ব্যাংক অব ইউক্রেনের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী ধারাবাহিক কমে ২০২৫ সালের জুন শেষে দেশটির খেলাপি নেমেছে ২৭ শতাংশে।

২০২৩ সালে ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল শাদ। আর আফ্রিকান দেশ গিনি ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে ছিল তৃতীয় অবস্থানে। আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গ্রুপের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে গিনির খেলাপি ঋণ নেমেছে ৩০ শতাংশে।

কারা সুবিধা পায়
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এ পর্যন্ত বিশেষ পুনঃতপশিলসহ বিভিন্ন সুবিধা চেয়ে ১২ শতাধিক আবেদন এসেছে। এর বিপরীতে আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণের পুনঃতপশিল চাওয়া হয়েছে। বিশেষ সুবিধার জন্য গত বছর ঋণ জালিয়াতিতে অভিযুক্ত এস আলম গ্রুপের ১২ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা পুনঃতপশিল চেয়ে আবেদন করে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাতে সাড়া দেয়নি। ২৬ ব্যাংক ও দুই আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বসুন্ধরা গ্রুপের প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিল হয়েছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি ও শিল্প উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। বেক্সিমকোর ছয় হাজার ৯১৯ কোটি টাকার পুনঃতপশিল চেয়ে আবেদন এসেছে। বেক্সিমকোর ঋণ পুনঃতপশিল না হলেও তাদের মালিকানাধীন খেলাপি প্রতিষ্ঠান শাইনপুকুর সিরামিকের এলসি খোলার সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বারবার বিশেষ সুবিধা নেওয়া আব্দুল মোনেম গ্রুপ এ দফায় দুই হাজার ৫১১ কোটি টাকা পুনঃতপশিল চেয়ে আবেদন করে। এই গ্রুপের মালিকানার আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি মিলের খেলাপি ঋণ থাকা অবস্থায় একইভাবে এলসি খোলার সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংক খাতে বিভিন্ন অনিয়মে অভিযুক্ত নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা গ্রুপের ৯ হাজার ৭২৪ কোটি টাকার ঋণ বিশেষ সুবিধায় পুনঃতপশিল চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। নাবিল গ্রুপ ৪ হাজার ১৬১ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিল করতে চেয়েছে। ১২ ব্যাংকে এসএ অয়েল রিফাইনারির এক হাজার ৬০৮ কোটি টাকা পুনঃতপশিলের আবেদন এসেছে। আব্দুল কাদির মোল্লার মালিকানাধীন থার্মেক্স গ্রুপ চেয়েছে এক হাজার ৪৫৭ কোটি টাকার পুনঃতপশিল সুবিধা। সাদ মুসা গ্রুপ চেয়েছে ৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার পুনঃতপশিল সুবিধা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে এই গ্রুপের বিরুদ্ধে এক খাতের ঋণ নিয়ে আরেক খাতে ব্যবহারের প্রমাণ রয়েছে। মাগুরা গ্রুপ ১৪ হাজার ৭৭১ কোটি টাকার বিশেষ সুবিধার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়েছে। ওরিয়ন গ্রুপের জন্য ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা পুনঃতপশিল চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।

আনন্দ শিপইয়ার্ড চেয়েছে এক হাজার ৫৬ কোটি টাকার পুনঃতপশিল। এক হাসপাতালের নামে ২ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আলোচিত আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালও চেয়েছে বিশেষ সুবিধা। দেশবন্ধু সুগার মিল, জেএমআই গ্রুপ, সানম্যান গ্রুপ, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড, সাইফ পাওয়ারটেক, রাইসিং স্টিল, অটোবি গ্রুপ, রানকা টেক্সটাইলের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে এ তালিকায়। দেশের অন্যতম ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের ৩৬টি ব্যাংকে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি না করতে বলা হয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বিশেষ পুনঃতপশিল সুবিধা দেওয়া হয়। ওই নির্বাচনের পর আবার বড় ঋণগ্রহীতাদের অভিনব সুবিধা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক খাতে ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে– এ রকম গ্রাহকের সুদহার কমানো, এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণে ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট, এক বছরের গ্রেস পিরিয়ড ও ১২ বছরের জন্য পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়। নতুন করে আর কখনও পুনঃতপশিল বা পুনর্গঠনের জন্য আসবে না– এই শর্তে ১১ গ্রুপের ১৫ হাজার ২১৮ কোটি টাকা নিয়মিত করে ব্যাংকগুলো।

পরে বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই শেষে বেক্সিমকো, আব্দুল মোনেম, সিকদার, অ্যাননটেক্স, কেয়া গ্রুপ, থার্মেক্স, যমুনা গ্রুপ, রাইজিং স্টিল মিলস, এসএ অয়েল রিফাইনারি, রতনপুর ও এমআর গ্রুপের বিআর স্পিনিং মিলস বিশেষ পুনঃতপশিল সুবিধা নেয়। এ গ্রুপগুলোর মধ্যে যমুনা ছাড়া অন্য সবাই এখন খেলাপি।

এরপর ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে নতুন সুবিধা চেয়ে আবেদন করে তিন গ্রুপ। এর মধ্যে ৯২৮ কোটি টাকা পুনর্গঠন করে চট্টগ্রামের এসএ গ্রুপ, ৮১২ কোটি টাকা রতনপুর গ্রুপ এবং ৫৭২ কোটি টাকা পুনর্গঠন করে বিআর স্পিনিং মিল। বেক্সিমকো গ্রুপ ওই সময়ে পাঁচ হাজার ৬৪৩ কোটি পুনর্গঠন করে। সুদসহ বছর শেষে তাদের স্থিতি দাঁড়ায় ছয় হাজার ১৫১ কোটি টাকায়।

২০১৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক আবার ‘এককালীন এক্সিট ও বিশেষ পুনঃতপশিল’ নীতিমালা জারি হয়। সেখানে বলা হয়, ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা, এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য পুনঃতপশিল করা যাবে। আগের সুবিধা নেওয়া গ্রুপগুলো এ দফায়ও ঋণ পুনর্গঠন করে। ফলে আগের সব রেকর্ড ভেঙে এ সুবিধার আওতায় পুনঃতপশিল হয় ৫২ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা।
২০১৯ সালেই আবার খেলাপি ঋণ কম দেখানোর সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনো মেয়াদি ঋণ অনাদায়ী থাকার ছয় মাস পর থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ হিসাব করতে বলা হয়। এভাবে চলার পর ২০২০ সালে এক টাকাও পরিশোধ না করে খেলাপিমুক্ত দেখাতে সার্কুলার করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর ২০২১ সালে যে পরিমাণ ঋণ পরিশোধের কথা, তার ১৫ শতাংশ দিলেই আর খেলাপি হয়নি।

২০২৩ সালে বিশেষ সুবিধায় সর্বোচ্চ ৯১ হাজার ২২১ কোটি টাকা পুনঃতপশিল হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দেওয়া বিশেষ সুবিধা পুনঃতপশিল করা এসব ঋণে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন ঋণগ্রহীতাদের কিস্তি দিতে হচ্ছে না। প্রতিবার সুবিধা পাওয়াদের তালিকায় ঘুরেফিরে একই প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম দেখা যায়।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের সময়ে একের পর এক বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারও খেলাপি ঋণ কমাতে বিশেষ নীতি-সহায়তা দেয়। গত বছরের জানুয়ারিতে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতপশিলের সুযোগ দেওয়া হয়। এ ব্যবস্থায় এক লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিল হয়।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ সুবিধার মেয়াদ বাড়িয়েছে। নতুন করে গত ২৯ জুনের এক নির্দেশনার মাধ্যমে এক্সিট নীতিমালার আওতায় কোনো ঋণখেলাপি এককালীন সমুদয় পাওনা পরিশোধ করলে আয় খাতে নেওয়া সুদ কিংবা তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের বেশি মওকুফের সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার জারি করেছে।

জানতে চাইলে ব্যাংক এশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী সমকালকে বলেন, বারবার পুনঃতপশিল করা এক ধরনের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। প্রকৃত ব্যবসার চেয়ে পুনঃতপশিল ব্যবসা অনেক লাভজনক। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ঋণ নিয়ে তারা দেশে বা বিদেশে কোনো না কোনো সম্পদ কিনেছে। নিয়মিতভাবে ওই সম্পদের দর বেড়েছে। অথচ বছরের পর বছর সুদ মওকুফসহ নানা সুবিধা নিয়ে আসছে। অনেক চাপে পড়লে এক পর্যায়ে হয়তো দেখা যাবে, এক্সিটের নামে আসল পরিশোধ করে বেরিয়ে যাবে। এরপরও ব্যবসা করে যে আয় করা যায়, তার চেয়ে সম্পদ বিক্রি করলে বেশি মুনাফা থাকবে।

আরফান আলী বলেন, খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান করতে হলে খেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কট করা, সরকারি কোনো সুবিধা না দেওয়া এবং বিচারের আওতায় আনতে হবে। তাতে ভালো ব্যবসায়ীরা উৎসাহিত হবেন।

যত টাকা পুনঃতপশিল 
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত ১৩ বছরে বিশেষ সুবিধায় মোট ছয় লাখ ১১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিল হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ এক লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার পুনঃতপশিল করা হয় ২০২৫ সালে। এর আগে কোনো এক বছরে সর্বোচ্চ ৯১ হাজার ২২১ কোটি টাকা পুনঃতপশিল হয় নির্বাচনের আগে ২০২৩ সালে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দেওয়া বিশেষ সুবিধা পুনঃতপশিল করা এসব ঋণে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন ঋণ গ্রহীতাদের কিস্তি দিতে হচ্ছে না।

আইএমএফের পদ্ধতির আলোকে এসব ঋণ ডিসট্রেস অ্যাসেট বা দুর্দশাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৫ সাল শেষে ব্যাংক খাতের দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকায়। উচ্চ খেলাপির কারণে গত বছর ২২টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায়। ২০২৫ সালে দেশীয় মালিকানার ৫২টি ব্যাংকের মধ্যে ৩৫টি ব্যাংক লোকসান করেছে।
বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সমকালকে বলেন, ব্যাংক আমানতকারীর অর্থ নিয়ে ব্যবসা করে। ঋণের টাকা আদায় করতে না পারলেও আমানতকারীকে নিয়মিত সুদসহ টাকা ফেরত দিতে হয়। আবার আয় খাতে নেওয়া সুদের ওপর সরকারকে সাড়ে ৩৭ শতাংশ কর পরিশোধ করা হয়েছে। এখন সেই সুদ মওকুফ করা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। অথচ ইতোমধ্যে সুদ পরিশোধ করেছেন, এ রকম গ্রাহকও এখন রাজনৈতিক পরিচয়ে এ সুবিধার জন্য আসছেন। এভাবে চললে ব্যাংক খাত টিকবে কীভাবে– প্রশ্ন রাখেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন নীতিমালা করে থাকে। এখন সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক দেখবে, ব্যবসা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছে, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করছে না। সে আলোকে ব্যাংক ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন, ব্যাংক যখন দেখবে ঋণ পরিশোধ না করে প্রাডো নিয়ে চলেন; ঠান্ডা লাগলেও চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড-ব্যাংকক যান– এ রকম খেলাপির জন্য কোনো সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।

মেসির সারা

ফিরিয়ে দেওয়া সোনালি ট্রফিটার পাশ দিয়ে যখন তিনি হেঁটে যাচ্ছেন, অবয়বে অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা; যেন বিশ্বজয়ের ওই প্রগাঢ় আলোকবৃত্তও তাঁকে আর স্পর্শ করতে পারছে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত থেকে যখন মেডেলটা গলায় পরছেন, তখনও ঠোঁটের কোণে ধরে রেখেছেন এক যান্ত্রিক, অতিমানবিক স্বাভাবিকতা। কিন্তু নিয়তি বোধহয় তাঁর জন্য অন্য এক নাটকের চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল। যখনই গ্যালারির ওই অতলান্ত নীল-সাদার মহাসমুদ্র থেকে হাজারো কণ্ঠের ‘মেসি, মেসি’ গর্জন আছড়ে পড়ল, ঠিক তখনই অলক্ষ্যে কোনো এক অদৃশ্য বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ভেতরে এতক্ষণ ধরে জমিয়ে রাখা আবেগের অতলান্ত পুকুরটা যেন নিমেষেই উথলে উঠল চোখের কোণে। বেয়ে নামল এক নিস্তব্ধ ভাঙনের শ্রাবণ। এ কোনো সাধারণ কান্না নয়, এ যেন এক জমে থাকা অভিমানের একলা মেঘমল্লার। নিথর, স্তব্ধ হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন প্রায় ১০টি মিনিট।

অপলক চেয়ে রইলেন সেই গ্যালারির দিকে, যেখানে তাঁর জীবনের শেষ বিশ্বকাপের শেষ ধুলোবালি উড়ছে। কোনো হুংকার নেই, কোনো নাটকীয়তা নেই; শুধু নির্বাক, অপলক চোখে তাকিয়ে রইলেন ওই গ্যালারির দিকে। তখনও মাঠের এক পাশে ট্রফি বিতরণ চলছিল, লাউড স্পিকারে বারবার স্প্যানিশ ফুটবলারদের নাম শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু কোনো কিছুতেই যেন বোধ ছিল না তাঁর। তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন স্থির হয়ে সেই আর্জেন্টিনার গ্যালারির সামনে। তাঁর পাশে এরপর এসে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর দলের সবাই। কোনো কথা নেই, হাত নাড়ানো নেই, শুধু মাথা তুলে গ্যালারির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকা। ওই ১০টি মিনিট আসলে নিছক কোনো সময় ছিল না, ওটা ছিল নিজের জীবনের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচের বালুচরে দাঁড়িয়ে ফেলে আসা দুই দশকের অবিস্মরণীয় মহাকাব্যের পাতা ওল্টানো। ফুটবল দুনিয়ার অলিখিত ব্যাকরণ বলে, মহাতারকাদের নাকি কাঁদতে নেই, তাদের আবেগের প্রকাশ হতে হয় ইস্পাতকঠিন। নিয়মের নিগড় ভেঙে আজ মনে হলো, ঈশ্বরের বরপুত্রও দিন শেষে রক্ত-মাংসের এক নশ্বর মানুষ।

ম্যাচের পর দর্শকদের সঙ্গে হৃদয় ভাঙার ব্যথাটা শেয়ার করে আর মিডিয়ার সামনে আসেননি মেসি। তাঁর দলেরও কেউ না। নিয়ম থাকায় শুধু এসেছিলেন তাদের কোচ লিওনেল স্কালোনি। তিনিও শেষ করতে পারেননি সংবাদ সম্মেলন। এটাই মেসির শেষ ম্যাচ ছিল কিনা? প্রশ্নটি করেছিলেন বুয়েন্স আয়ার্সের এক সাংবাদিক। উত্তর দিতে গিয়ে স্কালোনি শুধু বলেছেন, ‘তিনি এই ব্যাপারে কথা বলেননি মেসির সঙ্গে। ওর এখন ৩৯ বছর বয়স, এটা সত্যিই ভাবা যায় না, অকল্পনীয়। এই বিশ্বকাপে ও যা করেছে, তা অবিশ্বাস্য। আশা করি, সবাই তাঁর অর্জনের জন্য তাঁকে নিয়ে গর্বিত হবে, কারণ সে ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়। এটা নিয়ে আমার মনে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই।’ আগামী বিশ্বকাপে মেসির বয়স হবে ৪৩। অঙ্কটা মেলানো সত্যিই কঠিন। রোনালদো ফিটনেস ধরে রেখে এবার একচল্লিশে খেলেছেন।

অফিসিয়াল ঘোষণা না দিলেও নিজের একটি ইচ্ছার কথা তিনি বিশ্বকাপের আগে এক সাক্ষাৎকারেই বলেছিলেন। তাহলো আর্জেন্টিনার কোনো ঘরের মাঠ থেকে তিনি বিদায় নিতে চান প্রিয় গ্যালারির কাছ থেকে। তবে স্কালোনি জানুক আর না জানুক এটা অন্তত সবাই জেনে গেছে যে আর্জেন্টিনার একটা ‘সোনালি অধ্যায়’ এবং সোনালি প্রজন্মের বিদায় হয়ে গেল স্পেনের কাছে এই ফাইনাল হেরে। নিউ জার্সির মিডিয়া সেন্টারে বসা অনেক আর্জেন্টাইন সাংবাদিক বলাবলি করছিলেন স্কালোনি-মেসি জুটির সমাপ্তি দেখে নিয়েছে সবাই। আর যাই হোক স্কালোনিকে কোচ হিসেবে আর রাখা হচ্ছে না। ২০১৮ সালে স্কালোনি আর্জেন্টিনার কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই মানিকজোড় আলবিসেলেস্তেদের দীর্ঘ ট্রফিখরা কাটিয়ে মোট চারটি প্রধান আন্তর্জাতিক শিরোপা উপহার দিয়েছেন; যার মধ্যে রয়েছে ২০২১ ও ২০২৪ সালের ব্যাক-টু-ব্যাক কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালের ইউরোপ-আমেরিকা শ্রেষ্ঠত্বের ফিনালিসিমা এবং ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর কাতার ২০২২-এর ফিফা বিশ্বকাপ।

এর আগেও মারাকানার ঐতিহাসিক মাঠে যখন বিষাদের সুর বেজেছিল, তখন অঝোরে কেঁদেছিলেন মেসি; নিউ জার্সির এই স্টেডিয়ামেও এর আগে ঝরেছে তাঁর চোখের জল–তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের এই কান্নাটি ছিল একেবারেই নিস্তব্ধ, এক অদ্ভুত পাথরচাপা নীরবতায় ঘেরা। ৩৯ বছর বয়সে এসেও টুর্নামেন্টজুড়ে তিনি যেভাবে একাই ৮টি গোল করলেন ও ৪টি অ্যাসিস্ট সাজালেন, খাদের কিনারা থেকে দলকে মহাবীরের মতো কামব্যাক করালেন এবং এক অতন্দ্রপ্রহরীর মতো নেতৃত্ব দিলেন; তাতে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের ‘গোল্ডেন বল’ পুরস্কারটি নিঃসন্দেহে তাঁরই প্রাপ্য ছিল। চিরকাল একদল সমালোচক মুখিয়ে থাকে এটা বলার জন্য যে ফিফা নাকি সবসময় মেসিকে বাড়তি সুবিধা দেয় বা নিজেদের দিকে টানে। কিন্তু ট্র্যাজিক ফাইনালের পর পুরস্কার মঞ্চে সবাই দেখল, বিশ্বমঞ্চে বীরোচিত লড়াইয়ের পরও সেই মেসিই কীভাবে সবচেয়ে বড় উপেক্ষার শিকার হলেন, যখন তাঁর হাত ফসকে স্পেনের রদ্রির কাছে চলে গেল শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান। এই অবিচার দেখে ক্ষুব্ধ ফুটবল আইকন জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ স্পষ্ট ভাষায় ফিফার দ্বিমুখী নীতিকে কাঠগড়ায় তুলে বলেছেন, ‘গোল্ডেন বল জিততে মেসিকে আর ঠিক কী করতে হতো? আমি তো এদের বিচারবুদ্ধির কোনো ব্যবচ্ছেদই খুঁজে পাই না! ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ না জিতেও লুকা মড্রিচ যদি টুর্নামেন্টসেরা হতে পারে, তবে এবার কোন নিয়মে মেসির মাপকাঠি বদলে গেল?’ ইব্রার এই বিস্ফোরক মন্তব্যই প্রমাণ করে, নিয়তির নিষ্ঠুর খেলায় ট্রফি ভাঙলেও এই জাদুকরের শ্রেষ্ঠত্ব আর ফুটবলীয় আত্মত্যাগ খোদ ফুটবল-বিধাতার চেয়েও অনেক বেশি মহিমান্বিত।

হাঁটু- কনুইয়ের কালচে ,খসখসে ভাব দূর করুন ঘরোয়া পদ্ধতিতে

খাবারে স্বাদ বাড়াতে পাতে লেবু খাওয়া হয় প্রায় প্রতিদিনই। এছাড়া চা, শরবত ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের খাবারের স্বাদ বাড়াতে লেবুর জুড়ি নেই। বেশিরভাগ সময়ই রস বের করে লেবু খোসা ফেলে দেওয়া হয়। অনেকের হয়তো জানা নেই, ত্বক চর্চার এক দুর্দান্ত প্রাকৃতিক উপাদান লেবুর খোসা। যারা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেও হাঁটু, কনুই কিংবা পায়ের  কালচে দাগ উঠাতে পারছেন না তারা ভরসা করতে পারেন এই উপাদানের উপর।

লেবুর খোসায় প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে যা ত্বকের জন্য খুবই উপকারী। এসব উপাদান ত্বকের মৃত কোষ দূর করতে এবং ম্লান হয়ে যাওয়া উজ্জ্বলতা ফেরাতে অত্যন্ত সাহায্য করে। হাত-পায়ের খসখসে ভাব কাটাতে নিয়মিত রূপচর্চার অংশ করতে পারেন লেবুর খোসা। তবে মুখে ব্যবহারের আগে অবশ্যই ‘প্যাচ টেস্ট’করে নেওয়া জরুরি।

কীভাবে বানাবেন ঘরোয়া স্ক্রাব?

রস বের করে নেওয়া লেবুর খোসা ১টি, চিনি ১ চা চামচ, বেকিং সোডা ১ চিমটে

তৈরির নিয়ম:

লেবুর উল্টানো খোসার ভেতরের অংশে চিনি ও সামান্য বেকিং সোডা ছড়িয়ে দিন। তৈরি হয়ে যাবে প্রাকৃতিক স্ক্রাব।

ব্যবহারের পদ্ধতি

কনুই, হাঁটু বা পায়ের যে যে অংশে কালচে দাগ বা ময়লা জমে রয়েছে, সেখানে লেবুর খোসাটি দিয়ে হালকা হাতে ১ থেকে ২ মিনিট ম্যাসাজ করুন। মিশ্রণটি ত্বকে অন্তত ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা রেখে দিন। নির্দিষ্ট সময় পর পানি দিয়ে ভাল করে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে ২ থেকে ৩ বার এই পদ্ধতি মেনে চললেই ধীরে ধীরে পার্থক্য চোখে পড়বে।

নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতে রাখার দাবি

নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)-এর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের উদ্যোগের প্রতিবাদে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করেছেন রাজশাহীবাসী। এ সময় বক্তারা দাবি করেন, প্রধান কার্যালয় সরিয়ে নেওয়া হলে রাজশাহীর প্রশাসনিক গুরুত্ব, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দাবি বাস্তবায়ন না হলে কঠোর আন্দোলনেরও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় নগরীর হেতেম খাঁ এলাকায় নেসকোর প্রধান কার্যালয়ের সামনে ‘রাজশাহীবাসী’ ব্যানারে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।

বোয়ালিয়া থানা (পশ্চিম) বিএনপির সভাপতি শামসুল ইসলাম মিলুর সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য দেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশিদ ও মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি নজরুল হুদা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বোয়ালিয়া থানা (পূর্ব) বিএনপির সভাপতি আশরাফুল ইসলাম নিপু, সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন, বোয়ালিয়া থানা (পশ্চিম) বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বজলুজ্জামান মহন, চন্দ্রিমা থানা বিএনপির আহ্বায়ক ফাইজুল ইসলাম ফাহি, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি জাকির হোসেন রিমন, মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম রবি, মহানগর ছাত্রদলের সদস্য সচিব এমদাদুল হক লিমনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, রাজশাহী একটি বিভাগীয় শহর। এখান থেকে নেসকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় অন্যত্র স্থানান্তরের উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে রাজশাহীর প্রশাসনিক গুরুত্ব কমে যাবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তারা আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলে রাজশাহীবাসী কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে। প্রয়োজনে হরতালসহ আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

নেসকোর নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) আফাজ উদ্দিনের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। স্মারকলিপিতে বলা হয়, নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের উদ্যোগের খবরে রাজশাহীবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে রাজশাহীর প্রশাসনিক গুরুত্ব কমার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতেই বহাল রাখার দাবি জানানো হয়।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-১ শাখা থেকে গত ১৬ জুলাই নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরে সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করে মতামত দিতে বলা হয়। ওই চিঠি প্রকাশের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে রাজশাহীতে উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

রদ্রি যেন দুর্ভেদ্য দেয়াল

বিরল এক কীর্তি গড়েছেন রদ্রি। ইতিহাসের মাত্র চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ব্যালন ডি’অর ও বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জিতেছেন স্পেনের এই মিডফিল্ডার। যে তালিকার বাকি তিনজন হলেন পাওলো রসি, জিনেদিন জিদান ও লিওনেল মেসি। চোটে পড়ে প্রায় নিঃশেষ হতে বসা একজন খেলোয়াড়ের এমন দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন আগামী প্রজন্মকে উৎসাহিত করবে বলে মনে করছেন রদ্রি।

রদ্রির বিশ্বকাপসেরা হওয়া নিয়ে একটা বিতর্কও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ৮টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট করা লিওনেল মেসিকে বাদ দিয়ে তাঁকে গোল্ডেন বল দেওয়ায় অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। গত রোববার বিকেলে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে গোল্ডেন বলের জন্য রদ্রির নাম ঘোষণা হতেই গ্যালারিতে থাকা আর্জেন্টাইন সমর্থকরা মেসির নামে জয়ধ্বনি শুরু করেন। তা দেখে মেসিও কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। এই জয়ধ্বনি যে ফিফার এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ, তা বুঝতে পারা যাচ্ছিল। এই প্রশ্ন তোলাদের তালিকায় রয়েছেন দুই সাবেক তারকা ফুটবলার ইব্রাহিমোভিচ ও আনহেল ডি মারিয়া। সুইডিশ কিংবদন্তি ইব্রা একটি টিভি অনুষ্ঠানে বলেন, ‘গোল্ডেন বলের জন্য মেসিকে আর কী করতে হতো? ২০১৮ সালের ফাইনালে ক্রোয়েশিয়া হারার পরও লুকা মডরিচকে গোল্ডেন বল দেওয়া হয়েছিল। তা হলে মেসি কেন পাবে না?’ সাবেক আর্জেন্টাইন তারকা ডি মারিয়া তো ফিফার দিকে আঙুল তুলেছেন।

তবে রদ্রির পারফরম্যান্সের দিকে নজর দিলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে, কেন তাঁর হাতে উঠল এই পুরস্কার। স্পেনের বিশ্বজয়ের কারিগর এই ৩০ বছর বয়সী মিডফিল্ডার। আটটি ম্যাচেই শুরু থেকে দলের নিয়ন্ত্রণ ছিল তাঁর হাতে। বল দখলে রাখা, নিখুঁত পাস, অসাধারণ পজিশনিং ও ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণে রদ্রি ছিলেন অনন্য। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পাস খেলেছেন এবার রদ্রি, সে সঙ্গে সবচেয়ে বেশি দূরত্ব দৌড়ানো এবং সবচেয়ে বেশি খেলায় সম্পৃক্ত থাকার কৃতিত্ব তাঁর দখলে। যেমন রক্ষণে সহায়তা করেছেন, তেমনই তাঁর পায়ে গড়ে উঠেছে আক্রমণ। হতে পারে তিনি কোনো গোল করেননি, কোনো অ্যাসিস্টও করেননি। এমনকি ফাইনালে যে জয়সূচক গোলটি হয়েছে, সেটিও তিনি মাঠ থেকে উঠে যাওয়ার পর। তাতেও রদ্রির অবদান কমে যায় না। বিশ্বকাপে যে শুধু বেশি গোল ও অ্যাসিস্ট করলেই গোল্ডেন বল জেতা যায়, তা নয়। ফিফার টেকনিক্যাল কমিটি দেখে পুরো টুর্নামেন্টে কে সবচেয়ে ভালো খেলেছে। সেই কারণেই ২০০২ বিশ্বকাপে জার্মানি রানার্সআপ হওয়ার পরও গোলরক্ষক অলিভার কান সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন। ২০০৬ বিশ্বকাপে জিতেছিলেন ইতালির ডিফেন্ডার ফ্যাবিও ক্যানাভারো। রদ্রিও যেভাবে পুরো টুর্নামেন্টে সফলভাবে একটি দলকে চালনা করে চ্যাম্পিয়ন করেছেন, তাতে যোগ্য হিসেবেই তাঁকে গোল্ডেন বলের জন্য বেছে নিয়েছে ফিফা।

রদ্রির এই সেরা হওয়া অন্য একটি কারণে বিশেষ মাহাত্ম্যপূর্ণ। ২২ মাস আগে অসাধারণ ফর্মে থাকার সময় ভয়াবহ চোটে পড়েছিলেন তিনি। ম্যানচেস্টার সিটির ঐতিহাসিক ট্রেবল জয়ের পর ২০২৪ সালে স্পেনের ইউরো জয়েও বড় অবদান ছিল তাঁর। ম্যানসিটির ৭৪ ম্যাচের অপরাজেয় যাত্রার নায়ক ছিলেন তিনি। কিন্তু ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আর্সেনালের বিপক্ষে একটি ম্যাচে থমাস পার্টির সঙ্গে সংঘর্ষে পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায় তাঁর। ওই মৌসুমে আর মাঠে নামতে পারেননি তিনি। পরের মৌসুমে ফিরলেও আগের সেই ধার ছিল না তাঁর খেলায়। বিশ্বকাপেও এসেছিলেন সেই সংশয়কে সঙ্গী করেই। কিন্তু বিশ্বকাপের জন্য যেন নিজের সেরাটা তুলে রেখেছিলেন এ তারকা। ম্যাচের পর ম্যাচ দুর্ভেদ্য এক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রতিপক্ষের সামনে। এবারের বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে মাত্র একটি গোল হয়েছে, সেটির বড় কৃতিত্ব তাঁর।

এই পুরস্কার পেয়ে ভীষণ আপ্লুত রদ্রি। ভয়ানক চোট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ের সেই কঠিন দিনগুলোর কথা স্মরণ করেছেন তিনি। তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে তরুণ প্রজন্মের জন্য উদাহরণও মনে করছেন রদ্রি, ‘মনে হচ্ছে যেন নিখুঁত এক চিত্রনাট্য। আমি এটা একেবারেই আশা করিনি। আমি চাই নতুন প্রজন্ম দেখুক, একজন ফুটবলার সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও যিনি নরকে পতিত হন, তিনি আবার উঠে দাঁড়াতে পারেন। এটি প্রতিকূলতা জয় করার একটি উদাহরণ এবং সবার জন্য শিক্ষা, সবসময় বিশ্বাস রাখতে হবে।’ সেরা হওয়ার পেছনে তাঁর ভালো করার তীব্র তাড়নার কথাও বলেছেন রদ্রি, ‘এটাই এই দলের (সাফল্যের) রহস্য। আমরা সবসময় জয়ের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ি। শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরই তাঁর পুরস্কার দেন।’

সিএনএনের বিশ্লেষণ ইরানে মার্কিন অভিযান আসলে দীর্ঘ সংঘাতের দিকে যাত্রা

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে তৈরি হওয়া উত্তেজনা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির বড় ফাঁকফোকরগুলো সামনে নিয়ে এসেছে। যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান তীব্রতা এবং একের পর এক মার্কিন সেনার মৃত্যু সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। কিন্তু এই সামরিক পদক্ষেপের পেছনে ট্রাম্পের রাজনৈতিক বা কৌশলগত লক্ষ্য আসলে কী, তা এখনও ধোঁয়াশায় ঢাকা।

সোমবার সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্যের অস্পষ্টতা ট্রাম্পের নীতিকে এক বিপজ্জনক ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের চক্রে ঠেলে দিচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাম্পের জেদ
এই দফায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামরিক তৎপরতার কারণ মূলত হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের আধিপত্য হজম করতে না পারা। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতে থাকা ট্রাম্পের জন্য ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে পরাজয়। কিন্তু এবারের হামলা কেন আগেরবারের চেয়ে সফল হবে, সে বিষয়ে মার্কিন জনগণকে কোনো স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেননি তিনি।

সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নাকি অনন্ত যুদ্ধ?
ট্রাম্প বরাবরই মধ্যপ্রাচ্যের ‘অনন্ত যুদ্ধ’ থেকে মার্কিন সেনাদের দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতি হয়তো সেই স্তরে পৌঁছায়নি, তবে এটি কোনোভাবেই সীমিত বা সুনির্দিষ্ট মেয়াদের অভিযান নয়। ইরানের শাসন ব্যবস্থায় বড় কোনো পরিবর্তন না এলে শুধু বিমান হামলা চালিয়ে তাদের দুর্বল করা অসম্ভব। এ অবস্থায় ট্রাম্প সংঘাত অব্যাহত রেখে আসলে কোন লক্ষ্য অর্জন করতে চাচ্ছেন, তাও স্পষ্ট নয়।

কৌশলগত অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক উদাসীনতা
এই দফায় মার্কিন হামলাকে অনেকেই ট্রাম্পের নীতিগত ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। যুদ্ধের আগে যে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত ছিল, তা এখন অবরুদ্ধ। ট্রাম্প যদি হরমুজকে আগের অবস্থায় আনতে না পারেন, তবে এটি তাঁর মেয়াদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল হিসেবে গণ্য হবে।

ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক
জর্ডান ও উত্তর ইরাকে সাম্প্রতিক হামলায় মার্কিন সেনাদের মৃত্যু ওয়াশিংটনে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যদিও এই প্রাণহানির সংখ্যা আফগান বা ইরাক যুদ্ধের তুলনায় কম, তবুও প্রতিটি মৃত্যু এই যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উসকে দেয়।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, ইরান যেভাবে বিশ্ব বাণিজ্যকে জিম্মি করছে, তাদের এই ক্ষমতাকে দুর্বল করা এবং দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য। কিন্তু রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের কাছ থেকে কোনো আসন্ন হুমকি না থাকা সত্ত্বেও এই যুদ্ধ শুরু করে ট্রাম্প নিজেই একটি দুষ্টচক্রে জড়িয়ে পড়েছেন।

বের হওয়ার উপায় আছে কি?
এই জটিল পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ রাস্তা মার্কিন প্রশাসনের সামনে নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। স্টিভেন কলিনসনের মতে, হামলার তীব্রতা বাড়িয়ে হয়তো সাময়িকভাবে ইরানকে চাপে ফেলা যাবে, কিন্তু ড্রোনের এই যুগে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ অবস্থায় রাজনৈতিক চাপে ট্রাম্প যদি পিছু হটেন, তাহলে তেহরান তাদের অস্তিত্ব রক্ষার অজুহাতে আরও স্বৈরাচারী পদক্ষেপ নিতে পারে। আর কূটনৈতিকভাবেও ইরান কোনো ছাড় দেবে বলে মনে হচ্ছে না।

অর্থাৎ, স্পষ্ট ও দূরদর্শী কোনো লক্ষ্য ছাড়া শুধু তাৎক্ষণিক উত্তেজনা বৃদ্ধির এই মার্কিন কৌশল প্রমাণ করে, ট্রাম্পের হাতে পরাজয় বরণ করা অথবা অনন্ত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কোনো বিকল্প নেই। সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের খুব ভালো সামরিক সক্ষমতা না থাকলেও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধটি তারা বেশ ভালোভাবেই লড়ছে। এই পরিস্থিতি অতীতের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতগুলোর কথাই মনে করিয়ে দেয়।

কানাডার ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডা থেকে আমদানি হওয়া প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, কানাডা মার্কিন তৈরি গাড়ি, অ্যালকোহল ও দুগ্ধজাত পণ্যের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি অনুসরণ করছে। নতুন এই শুল্ক আগামী ১৯ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ১৯৩০ সালের ট্যারিফ অ্যাক্টের সেকশন ৩৩৮ ব্যবহার করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রায় এক শতাব্দী আগে প্রণীত এই ধারার মাধ্যমে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবারই প্রথম শুল্ক আরোপ করলেন।

নতুন শুল্কের আওতায় পড়ছে কানাডার বিভিন্ন পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে ওয়াইন, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, হকি স্টিক, সুইমিং পুল, আসবাব, মাছ ধরার সরঞ্জাম, বীজ, পোশাক ও উইগসহ নানা ভোগ্যপণ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই শুল্ক প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কানাডীয় আমদানির ওপর প্রযোজ্য হবে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র কানাডা থেকে মোট ৩৮২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল। নতুন শুল্ক সেই আমদানির প্রায় ৫ দশমিক ২ শতাংশের ওপর কার্যকর হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, অন্যান্য অংশীদার দেশের তুলনায় কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প সুরক্ষা ও বাণিজ্য ভারসাম্য আনার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছে। তাই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধ নিরসনে তার সরকার ইতিমধ্যে বিস্তৃত প্রস্তাব দিয়েছে। তার দাবি, অতীতে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা শুল্ক উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ইউএসএমসিএ) লঙ্ঘন করেছে।

এক বিবৃতিতে কার্নি বলেন, ‘এই বাণিজ্য বিরোধের কারণে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর ব্যয় বেড়েছে। বাকি থাকা সমস্যাগুলোর সমাধানে পারস্পরিক স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে কানাডা প্রস্তুত।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৩০ সালের ট্যারিফ অ্যাক্টের সেকশন ৩৩৮ এমনভাবে তৈরি হয়েছিল, যাতে কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের প্রতি বৈষম্যমূলক শুল্কনীতি অনুসরণ করলে তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করা যায়। তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর এতদিন কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এটি ব্যবহার করেননি।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা জন ভেরোনো বলেন, অতীতে কয়েকজন প্রেসিডেন্ট এ ধারা ব্যবহারের কথা বিবেচনা করলেও বাস্তবে কখনো তা প্রয়োগ করা হয়নি। তাঁর মতে, প্রতিশোধমূলক শুল্কের জবাবে আবার এই আইন ব্যবহার করা আইনের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, নতুন শুল্ক ইউএসএমসিএর আওতায় থাকা ছাড়প্রাপ্ত পণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। তবে জ্বালানি, পটাশ, মাছ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং আগে থেকেই সেকশন ২৩২-এর আওতায় থাকা কিছু পণ্য এ সিদ্ধান্তের বাইরে রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া কানাডার দুগ্ধ খাতের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, মার্কিন গাড়ির ওপর শুল্ক ও কোটা এবং বিভিন্ন প্রদেশে মার্কিন অ্যালকোহল বিক্রি বন্ধ রাখার বিষয়গুলোও নতুন শুল্ক আরোপের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে হোয়াইট হাউস।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, গত এক বছরে কানাডায় মার্কিন মোটরযান আমদানি ২২ শতাংশ এবং মার্কিন অ্যালকোহলজাত পণ্যের আমদানি ৮১ শতাংশ কমেছে।

তবে সাবেক কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর উপদেষ্টা ডায়মন্ড ইসিঙ্গার বলেন, বিভিন্ন প্রদেশে মার্কিন অ্যালকোহল বিক্রি পুনরায় চালুর বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত। কারণ, এ সিদ্ধান্ত মূলত সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক সরকারের হাতে।