Home Blog Page 6

মন্ত্রিসভা ও বিএনপিতে পরিবর্তনের হাওয়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শেষের দিকে। ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিরতিহীন ভোট গ্রহণ করা হবে। জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোট হবে। সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী পরাজয় নিশ্চিত জেনেও জোটের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে।

ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এখনও প্রার্থীর নাম প্রকাশ না করলেও দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলামকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করা হচ্ছে বলে দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে। সংসদের অধিবেশন কক্ষে প্রকাশ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গ্রহণ করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন ডেকেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। আগামী ২৭ আগস্ট এ অধিবেশন বসবে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তাঁকে দলের মহাসচিবের পদ এবং মন্ত্রিসভা; উভয় স্থান থেকেই পদত্যাগ করতে হবে। ফলে বিএনপি এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী পদে দেখা যেতে পারে বড় ধরনের পরিবর্তন।

এমন অবস্থায় দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল করার পরিকল্পনার কথা আগেই জানিয়েছে বিএনপি। ফলে কাউন্সিলের আগ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন রিজভী। তিনি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগে থেকেই নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা নিয়ে আলোচনা চলছে ক্ষমতাসীন বিএনপিতে। শুরুতে অনেকের নাম শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই সবাই এগিয়ে রাখছেন। তবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকালে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে এ বিষয়ে কেউ কথা বলতে রাজি নন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য সমকালকে বলেন, দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে দক্ষতা এবং বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকবেন এমন একজনকেই রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করবে বিএনপি। সেই হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই যোগ্য ও আস্থাভাজন হিসেবে সবাই মনে করছেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও রাষ্ট্র সংস্কারে প্রবাসীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কার, সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের লক্ষ্যে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও গবেষণা উদ্যোগ ‘সেন্টার ফর সোসাইটি অ্যান্ড কালচার’ (সিএসসি) আত্মপ্রকাশ করেছে।

গত ৮ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার উডব্রিজে ‘৩৬ জুলাই: ইগনিটেড ইন রেসিলিয়েন্স, ইউনাইটেড ফর দ্য ফিউচার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সংগঠনটির প্রথম প্রকাশ্য কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও সাংস্কৃতিক জাগরণে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়।

সিএসসির উদ্যোগে জুলাই হাউস, BAND, SAVE Bangladesh, সোচ্চার ও দ্য বেঙ্গল কাউন্সিলের সহযোগিতায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশি নেটওয়ার্কের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানটি দুটি পর্বে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম পর্বে আলোচনা ও প্যানেল আলোচনা এবং দ্বিতীয় পর্বে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

আলোচনা পর্বে অংশ নেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, ‘জুলাই রেকর্ডস’-এর চেয়ারম্যান কাজী ওয়ালি উল্লাহ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ রাব্বির বোন মিম আক্তার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়ব এবং ‘ডেইলি ওয়াদা’র সম্পাদক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বাংলাদেশপন্থি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

কাজী ওয়ালি উল্লাহ আন্দোলনের মৌখিক ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। শহীদ রাব্বির বোন মিম আক্তার ভাইয়ের মরদেহ বহনের আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেন এবং তৎকালীন সরকারের আমলে সংঘটিত নৃশংসতার দ্রুত বিচার দাবি করেন।

শফিকুল আলম জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সাংবাদিকদের জীবনঝুঁকি এবং তৎকালীন মূলধারার গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা বাধার কথা তুলে ধরেন।

ফয়েজ আহমদ তৈয়ব প্রবাসী বাংলাদেশিদের মেধা ও দক্ষতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করে রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নে তাদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

অনুষ্ঠানে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের যাত্রায় তাঁর সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা জানান। ওয়াশিংটন ডিসি এলাকায় প্রবাসীদের আন্দোলন সংগঠনে নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে মেক্সিকোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারীকে শহীদদের নামসংবলিত বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। রাষ্ট্রদূতের পক্ষে তাঁর স্ত্রী তামান্না তাহসিন সম্মাননা গ্রহণ করেন।

এ ছাড়া ড. নুসরত রহমান, মুনিবা ফখরুল ও শাফকাত রাব্বির অংশগ্রহণে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, জনমত গঠন এবং দাবি আদায়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে বক্তব্য দেন সিএসসির বোর্ড ডিরেক্টর মুনা হাফসা এবং প্রধান সদস্য রেদওয়ান হোসেন তালুকদার। তারা বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক পরিসরে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ সাংস্কৃতিক উদ্যোগের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। দেশের রাজধানীর বাইরের প্রান্তিক অঞ্চল থেকে শুরু করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও সাংস্কৃতিক জাগরণ ছড়িয়ে দেওয়া এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধরে রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।

অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন গান, কবিতা ও নাটক পরিবেশন করা হয়। কনসার্টের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন রক সংগীতশিল্পী জন কবির। তাঁর পরিবেশনায় মিলনায়তনে উপস্থিত দর্শকেরা সম্মিলিতভাবে গানে অংশ নেন।

ওহাইওভিত্তিক ব্যান্ড ‘কম্পিউটেশনাল ফ্লুইড রক’ (সিএফআর) এর পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক পর্ব শুরু হয়। এতে সিএসসির সদস্য শেখ আহমেদ সাকিব কিবোর্ড ও ভোকালিস্ট হিসেবে অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে ‘মুক্তির মন্দির’, ‘৩৬ জুলাই’, জেমসের ‘বাংলাদেশ’ এবং ‘কাকতালের ওই মা তোর পোলা মরে নাই’সহ বিভিন্ন গান পরিবেশিত হয়। পাশাপাশি শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কবিতা আবৃত্তি ও একটি সংক্ষিপ্ত নাটক মঞ্চস্থ করা হয়।

অনুষ্ঠানস্থলে মূল আয়োজনের পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানভিত্তিক প্রদর্শনী ও মেলার আয়োজন করা হয়। সেখানে বাংলাদেশ থেকে আনা জুলাই আন্দোলনবিষয়ক বিভিন্ন বই প্রদর্শন ও বিক্রি করা হয়। শিল্পী দেবাশীষ চক্রবর্তীর অনুমতি নিয়ে তাঁর আঁকা জুলাই আন্দোলনের নির্বাচিত কিছু পোস্টার পুনর্মুদ্রণ করে বিক্রিরও ব্যবস্থা করা হয়।

আয়োজকদের ভাষ্য, প্রবাসীদের সম্পৃক্ত করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও বিস্তৃত করাই সিএসসির অন্যতম লক্ষ্য।

সারাদেশে লোডশেডিং পোলট্রি, মৎস্য ও কৃষি খাত ধুঁকছে মরছে মুরগি, চিংড়ি ঘেরে অক্সিজেন সংকট

গ্যাস সংকটের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলছে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং। শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষকে এর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বেশি। জেলা শহরে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং হলেও কোনো কোনো গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিদ্যুতের এই অনিয়মিত সরবরাহে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, পোলট্রি ও মৎস্য খাত। ব্যাহত হচ্ছে সেচ, বরফ উৎপাদন ও চিংড়ি ঘেরের এয়ারেটর চালানো। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় মারা যাচ্ছে মুরগি। বিদ্যুৎনির্ভর হিমাগারে আলু, বীজ ও পেঁয়াজ সংরক্ষণেও দেখা দিয়েছে নতুন ঝুঁকি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, নিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন কমার পাশাপাশি বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। ছোট খামারি ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের অনেকেই সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

ইলিশ মৌসুমে বরফের সংকট
বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে কক্সবাজার, চাঁদপুর, নোয়াখালী, বরিশাল ও পটুয়াখালীর মৎস্য খাত। এখন ইলিশ ধরার মৌসুম। সাগর থেকে ধরা মাছ সংরক্ষণে এ সময়ে বিপুল পরিমাণ বরফ প্রয়োজন হয়। একটি ব্লক বরফ তৈরি করতে টানা ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বরফ কলগুলো স্বাভাবিক উৎপাদনে যেতে পারছে না। ফলে বরফ তৈরি করতে প্রায় দ্বিগুণ সময় লাগছে। কোথাও কোথাও অর্ডারও বাতিল করতে হচ্ছে।

বরিশালের কেডিসি এলাকার একটি বরফকলের শ্রমিক মাহফুজুর রহমান বলেন, প্রতিদিন তিন থেকে চারবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে বরফকলগুলোতে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে।

মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, ১৫০ টাকার একটি বরফের ক্যান এখন ৩০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। বাড়তি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় বরফ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে জেলেরা মাছ ধরতে যেতে পারছেন না, আবার ট্রলার ও বরফকলের মালিকদেরও বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে।

পটুয়াখালীর মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য বন্দরে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ৩৬টি বরফকল রয়েছে। বিদ্যুৎ সংকটে এসব বরফকলের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমেছে। কোনো কোনো বরফকল দিনে মাত্র ২০ থেকে ২৫ ক্যান বরফ উৎপাদন করতে পারছে। কোনোটি সর্বোচ্চ ২০০ ক্যান পর্যন্ত উৎপাদন করছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতার তুলনায় বর্তমানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ উৎপাদন হচ্ছে।

পটুয়াখালীর মৎস্য ব্যবসায়ী রহিম খান বলেন, বিদ্যুৎ সংকটে বরফের পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। চাহিদামতো বরফ পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে খুলনা, বাগেরহাট ও বরিশাল থেকে ট্রাকে করে বরফ আনতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হচ্ছে।

নোয়াখালীর হাতিয়ার মৎস্য ব্যবসায়ী সেলিম হাওলাদার বলেন, ইলিশ মৌসুমে প্রতিদিন শত শত ট্রলার সাগরে যায়। মাছ সংরক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ বরফ প্রয়োজন। বরফের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এর প্রভাব পড়বে মাছ আহরণ ও বাজারজাতকরণে।

চিংড়ি ঘেরে অক্সিজেনের সংকট
দেশে মোট ১০৫টি হিমায়িত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা রয়েছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশ চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত হয় খুলনার বিভিন্ন কারখানায়। খুলনার উপকূলীয় এলাকায়ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে চিংড়ি চাষে। পাইকগাছা ও কয়রার চাষিরা বলছেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ঘেরের এয়ারেটর চালানো যাচ্ছে না। এতে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গিয়ে চিংড়ি মারা যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার হোগলবুনিয়া গ্রামের গৌতম মণ্ডল বাড়ির পাশে দেড় বিঘা জমিতে সেমি-ইনটেনসিভ পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করছেন। তাঁর ঘেরে প্রায় ৪০ হাজার রেণু পোনা রয়েছে। তিনি বলেন, তীব্র গরমে প্রতি ঘণ্টায় এয়ারেটর চালাতে হয়। তা না হলে মাছ মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে সন্ধ্যার পর প্রায় নিয়ম করে এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ যাচ্ছে। এক দিন ছয় ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ ছিল না। এখন ঋণ করে হলেও জেনারেটর কেনার কথা ভাবতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) পরিচালক এস. হুমায়ুন কবীর বলেন, চিংড়ি পচনশীল পণ্য। সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিটি ধাপেই বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।

তিনি বলেন, ঘেরের পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রাখতে সারাক্ষণ বিদ্যুৎচালিত এয়ারেটর ব্যবহার করতে হয়। লোডশেডিং হলে উৎপাদন কমে যায়, কখনও কখনও সব মাছও মারা যেতে পারে। এখন চিংড়ি চাষের ভরা মৌসুম হওয়ায় বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।

তাপে মরছে মুরগি
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতির মুখে পড়েছে পোলট্রি খাত। তীব্র গরমে মুরগির ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল ও শীতলীকরণ ব্যবস্থা চালু রাখা যাচ্ছে না। ফলে বাড়ছে মুরগির মৃত্যু ও কমছে ডিম উৎপাদন।

জয়পুরহাটে ৬৫০টির বেশি লেয়ার খামারে বছরে প্রায় ৩১ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়। খামারিরা বলছেন, দিনে দু-তিনবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তাপজনিত চাপ বাড়ছে। খামারি আহমেদ রানা বলেন, যেসব এলাকায় বেশি পোলট্রি খামার রয়েছে, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ দেওয়া উচিত। কারণ, অল্প সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাটেও বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।

যশোরের অভয়নগরেও বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র গরমে একটি পোলট্রি খামারের চার শতাধিক মুরগি মারা গেছে। ৮ আগস্ট সকালে উপজেলার নওয়াপাড়া পৌরসভার বুইকরা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। খামারের দুই তরুণ উদ্যোক্তা মো. হাসান ও মো. হোসেন যমজ ভাই। বেকারত্ব ঘোচাতে ২০২৩ সালে একটি এনজিও থেকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তারা খামারটি শুরু করেছিলেন। পরিবারের সবাই এই খামারে শ্রম দেন।

হাসান বলেন, গত শুক্রবার পর্যন্ত খামারে নানা বয়সী প্রায় আড়াই হাজার মুরগি ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৫০০টি বিক্রির উপযোগী হয়েছিল। রাত ১২টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত টানা আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। এ সময় বিক্রির উপযোগী চার শতাধিক মুরগি মারা যায়।

তিনি বলেন, আমার সব শেষ হয়ে গেল। আমরা ধারদেনা করে দুই ভাই খামারটি করেছি। ভেবেছিলাম মুরগি বিক্রি করে সব দেনা পরিশোধ করব। কিন্তু বিদ্যুতের কারণে সব শেষ হয়ে গেল। হাসান জানান, মুরগির খাবার ও ওষুধের দোকানে বাকিসহ তাদের প্রায় সোয়া লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতি হয়েছে তিন লাখ টাকার বেশি।

খামারিদের ওপর লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিলের বাড়তি চাপও তৈরি হয়েছে। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের খামারি আবদুল মালেকের তিনটি খামারে জুন ও জুলাই– এ দুই মাসে বিদ্যুৎ বিল এসেছে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা। বিদ্যুতের দাম বাড়ার আগে তাঁর মাসিক বিল ছিল গড়ে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। অর্থাৎ, একদিকে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় ঘাটতি পূরণে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে খামারিদের উৎপাদন ব্যয়ে দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়েও প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। উপজেলায় ৩১টি লেয়ার ও এক হাজারের বেশি ব্রয়লার খামার রয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন ধরে রাখতে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে খামারিদের। বাড়তি এই ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরও পড়ছে।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) দাবি, ফিড, বাচ্চা, ওষুধ, ভ্যাকসিন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহনসহ প্রায় প্রতিটি উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়েছে। এতে খামারিদের উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও মুরগি ও ডিমের খামার পর্যায়ের বাজার দামের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নেই। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের আগে দেশে প্রায় দুই লাখ পোলট্রি খামারি ছিলেন। ধারাবাহিক লোকসান, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারমূল্যের অস্থিতিশীলতা, সহজ শর্তে অর্থায়নের অভাবসহ নানা সমস্যায় বর্তমানে খামারির সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ৩৬ হাজারে। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রায় ৬৪ হাজার খামারি এ খাত থেকে ঝরে পড়েছেন।

বিপিআইএর যুগ্ম মহাসচিব আলমগীর হোসেন বলেন, ডিম উৎপাদনকারী খামারিরা টানা দুই বছর ধরে লোকসানে আছেন। লোডশেডিং তাদের ব্যয়ের তালিকা আরও বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, আগে কোনো খামারির মাসে জেনারেটরের পেছনে দুই হাজার টাকা খরচ হলে, এখন তা ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। গ্রামে একেবারেই বিদ্যুৎ থাকে না। এর ফলে খামারিরা শুধু আর্থিক নয়, সামাজিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

হিমাগারে আলু, বীজ, পেঁয়াজ নষ্ট 
অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে কৃষিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে সেচ নিয়ে। বৈদ্যুতিক মোটরের মাধ্যমে সেচ দেওয়া কৃষকদের বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকতে হচ্ছে। ফলে সময়মতো জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

রাজশাহীর বাঘার চকরাজাপুর ইউনিয়নের কৃষক মহাসিন আলী বলেন, বিদ্যুৎ কখন আসবে তার কোনো ঠিক নেই। মোটর চালানোর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। সময়মতো পানি দিতে না পারলে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের পথে বসতে হবে।

এদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে হিমাগারগুলোর পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। আবার জ্বালানি তেলের দামও বেশি। কুমিল্লা সদর উপজেলার আমতলী এলাকার হক অ্যান্ড সন্স কোল্ডস্টোরেজের কম্প্রেশার মেশিনের অপারেটর মো. বাবুল সরকার বলেন, জেলায় ২০টির বেশি হিমাগার রয়েছে। এসবের অধিকাংশই আলু ও বীজে পূর্ণ। গত এক সপ্তাহ ধরে দিনে গড়ে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে আলু ও বীজ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আলু নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে হয়। বীজ আলুর ক্ষেত্রে তাপমাত্রা নিয়ে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হয়। তাপমাত্রার সামান্য হেরফের হলেই বীজ নষ্ট হতে পারে।

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার আর বি কোল্ডস্টোরেজের ব্যবস্থাপক সেলিম হোসেন বলেন, দিনে গড়ে ছয় ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। এতে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ১৫ লাখ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে হিমাগারগুলো ইতিহাসের সর্বোচ্চ ক্ষতির মুখে পড়বে।

দেশের অন্যতম প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা পাবনায়ও বিদ্যুৎ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার সংকটের মধ্যে কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। এবার জেলায় পেঁয়াজের ফলন ভালো হলেও ভরা বর্ষার শুরুতেই সংরক্ষিত পেঁয়াজে ব্যাপক পচন দেখা দিয়েছে।

সনাতন পদ্ধতির চাতাল থেকে শুরু করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তৈরি আধুনিক সংরক্ষণাগারসহ কোথাও পচন পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। এরই মধ্যে সংরক্ষিত দেশি ও হাইব্রিড পেঁয়াজের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে পচন ধরেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

সুজানগরের মানিকহাট এলাকার পেঁয়াজ চাষি মাসুদ রানা ভালো দামের আশায় ৪০০ মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেছিলেন। এর মধ্যে ১০০ মণের বেশি পেঁয়াজে পচন ধরেছে। বাধ্য হয়ে নামমাত্র দামে বিক্রি করতে গিয়ে প্রতি মণে প্রায় এক হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে তাঁর।

চলমান সংকট প্রসঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদ বলেছেন, আমরা সাময়িক নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিচ্ছি। কৃষি খাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে কাজ করছি। কৃষকদের সেচ খরচ কমাতে ধাপে ধাপে সোলার সিস্টেমে রূপান্তর করা হবে। ইতোমধ্যে আমরা সৌরচালিত মিনি কোল্ডস্টোরেজ বিতরণ শুরু করে দিয়েছি। পেঁয়াজ সংরক্ষণের এয়ার ফ্লোতে পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ার খবর শুনে আমরা ওই মেশিনকে সোলারে রূপান্তরের কাজ করছি। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিনির্ভরতা কমবে এবং কৃষি উৎপাদন আরও লাভজনক হবে।

গ্যাস সরবরাহ আবার কমছে, বাড়ছে লোডশেডিং

একটু স্বস্তির পর আবারও অস্বস্তি। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত এক্সিলারেটের টার্মিনালটি চার দিন আগে আংশিক চালু হয়ে দৈনিক ৭৫ কোটি ঘনফুটে উঠেছিল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে ভেড়ানো সম্ভব হয়নি। এতে সরবরাহ আবার কমতে শুরু করেছে।

গত সোমবার বিকেল থেকে কক্সবাজারের মহেশখালীতে সামিটের টার্মিনালের সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুটে। সব মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ এখন প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট। এদিকে, পূর্ণ ক্ষমতায় চালু করতে আংশিক চালু থাকা এক্সিলারেটের টার্মিনালটি ৪৮ ঘণ্টার জন্য বন্ধ করা হবে। ফলে সরবরাহ আরও কমবে। এলএনজি সরবরাহ কমায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে আবারও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বাড়ছে লোডশেডিং।

এরই মধ্যে তীব্র গরমে বিদ্যুৎ সংকটে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ। কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের জন্য বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, কোথাও ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও নাগরিক সেবা। ক্ষোভ থেকে কোথাও বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করা হচ্ছে, কোথাও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে। গ্রাহকদের ক্ষোভ সামাল দিতে বিদ্যুৎ অফিস ও উপকেন্দ্রে পুলিশি নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাময়িক স্বস্তি এসেছিল
বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাময়িক স্বস্তি এসেছিল গত সোমবার। গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ার পাশাপাশি ভারতের আদানি থেকে তুলনামূলক বেশি বিদ্যুৎ পাওয়ায় লোডশেডিং কমে আসে। গত রোববার মধ্যরাতের পর জাতীয় পর্যায়ে লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। সোমবার মধ্যরাতের পর তা ২ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ছিল ১ হাজার থেকে ২ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। কিন্তু এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। গতকাল বেলা ৩টার দিকে লোডশেডিং বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪৬৫ মেগাওয়াটে।

আবহাওয়ায় আটকে এলএনজি
বর্তমানে দেশের গ্যাসের চাহিদা মেটাতে সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালনায় দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) চালু রয়েছে। দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত সর্বোচ্চ সরবরাহ ক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট।

সূত্র জানায়, সাগর উত্তাল থাকায় সামিটের এফএসআরইউতে নতুন এলএনজি কার্গো যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। বৈরী আবহাওয়া ও অতিরিক্ত বাতাসের কারণে আমদানি করা একটি এলএনজিবাহী জাহাজ সিঙ্গাপুর বন্দরে ফিরে গেছে। এতে সামিটের টার্মিনালে নতুন কার্গো যুক্ত হয়নি।
এর প্রভাবে সোমবার বিকেল থেকে সামিটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ কমে ২০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। ১৫ আগস্ট নতুন একটি এলএনজিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর মধ্যে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আরপিজিসিএলের একজন কর্মকর্তা বলেন, নতুন কার্গো যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না।

অন্য টার্মিনালও বন্ধ থাকবে
অন্যদিকে, গত ২১ জুলাই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুই সপ্তাহ পর গত ৬ আগস্ট আংশিক মেরামত শেষে আবার সরবরাহ শুরু হয়। বর্তমানে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হচ্ছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে টার্মিনালটির সক্ষমতা ৫৫ থেকে ৬০ কোটি ঘনফুট।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল জানিয়েছেন, মহেশখালীর এই টার্মিনালটি বর্তমানে দুটি বয়লারের একটি দিয়ে চলছে। পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে হলে অপর বয়লারটি সচল করতে হবে। এ জন্য টার্মিনালটি আবার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে। এতে প্রায় ৭২ ঘণ্টা পুরো টার্মিনালের উৎপাদন বন্ধ থাকতে পারে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোন সময়ে টার্মিনাল বন্ধ রাখলে শিল্প, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য গ্রাহকের ওপর প্রভাব কম পড়বে, এই সংকট কীভাবে মোকাবিলা করা যায় তা নিয়ে এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে আলোচনা চলছে।

গরমে নাকাল জনজীবন
গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব এরই মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব মিলিয়ে ১২ ঘণ্টারও কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কার্যক্রম।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে কয়েক দিন ধরে, বিশেষ করে রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন ও সুবিদখালী সদর এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার পর অল্প সময়ের জন্য আসছে, আবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তীব্র গরমে রাতে ঘুমাতে না পেরে অনেকেই বাইরে সময় কাটাচ্ছেন। এতে কর্মজীবী মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্মও ব্যাহত হচ্ছে।
সিলেট নগরেও দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে শুধু বাসাবাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়; নগরের পানি সরবরাহ, সড়কবাতি, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবাও ব্যাহত হয়।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, সিলেটে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম পাওয়ায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। প্রশাসকের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে নগরবাসীর দুর্ভোগ কমাতে লোডশেডিং কমানোর আশ্বাস দেন তারা।

ক্ষোভ থেকে বিক্ষোভ, নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন
দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে কোনো কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েছেন। গোপালগঞ্জে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে, বিদ্যুৎ অফিস ও উপকেন্দ্রে হামলার আশঙ্কায় পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো)।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গোপালগঞ্জ পৌর এলাকায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯ থেকে ১০ মেগাওয়াট, অর্থাৎ চাহিদার প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।

ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন জেলা পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ স্থাপনাগুলোতে নিয়মিত পুলিশি টহলের অনুরোধ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশের সহযোগিতা প্রয়োজন।
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জেও লোডশেডিং নিয়ে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। গত ১ আগস্ট রাতে তীব্র লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে স্থানীয় গ্রাহকরা আফতাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ এরিয়া অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। গত সোমবার সন্ধ্যার আগে ওই কার্যালয়ে আবার ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

বেসরকারি খাতকে তেল আমদানির সুযোগ 
জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে আরও সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে তেল আমদানির সুযোগ দিতে একটি সাধারণ নীতিমালা তৈরির কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দিতে নয়; বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো ও সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতেই এ উদ্যোগ। গতকাল রাজধানীতে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) আয়োজিত ‘জ্বালানি খাতের সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতকে কেন্দ্র করে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে অযথা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল। পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন হয়। কালোবাজারি ও অনলাইনভিত্তিক জ্বালানি বিক্রির ঘটনাও ঘটে। এই পরিস্থিতির পর বেসরকারি খাতকে তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাঁর মতে, সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলে প্রতিযোগিতা ও সরবরাহ বাড়বে।

শিল্পে গ্যাস সরবরাহের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, গ্যাসের চাপ কমলে উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ও নগদ অর্থপ্রবাহে বড় প্রভাব পড়ে। এতে ব্যাংক ঋণ খেলাপির ঝুঁকিও তৈরি হয়। কোনো ব্যবসায়ী যেন এ কারণে খেলাপির তালিকায় না ওঠেন, সরকার সেটি চায়।

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা-সরবরাহে বড় ঘাটতি রয়েছে। প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির অভাবে কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। দেশি কূপের গ্যাস উৎপাদন প্রতিবছর প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, নতুন এফএসআরইউ চালু করতে সাধারণত ৩০ থেকে ৩৬ মাস লাগে। তবে দুই বছরের কম সময়ে তৃতীয় এফএসআরইউ চালুর চেষ্টা চলছে। তৃতীয় ও চতুর্থ এফএসআরইউর পাশাপাশি মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জমি চিহ্নিত এবং লেনদেন পরামর্শক নিয়োগের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এলপিজির বাজার স্থিতিশীল করতে সরকার বাল্ক এলপিজি আমদানির কথাও জানিয়েছে।

সেমিনারে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বর্তমান সংকটের একক কোনো সমাধান নেই। গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি আমদানি ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। দ্রুত ২-৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে যুক্ত করে গ্যাস অনুসন্ধান এবং পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাবনাময় স্তরকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দেন।
ড. ইজাজ হোসেন বলেন, তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় এলএনজি আমদানি দরকার হলেও দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে হবে। ২০৩০ সালে গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি হতে পারে।

নতুন এলএনজি টার্মিনালে বিদেশি আগ্রহ
দেশে বড় পরিসরের নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে একটি বিদেশি বেসরকারি উদ্যোক্তা গোষ্ঠী আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম। তিনি বলেন, উদ্যোক্তারা সরকারের সঙ্গে বৈঠক করে আগ্রহের কথা জানিয়েছে। তাদের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাব পাওয়ার পর তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নতুন এফএসআরইউ প্রকল্প প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির প্রকল্প সরাসরি অনুমোদন করা হয়নি। সরকার জিটুজি পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে যোগ্যদের সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত প্রস্তাব পাওয়ার পর দরকষাকষি হবে। আলোচনা সন্তোষজনক হলে চুক্তি করা হবে। দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজনেই জিটুজি পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ভ্রমণে উচ্চমাত্রার সতর্কতা কানাডার

বাংলাদেশে ভ্রমণ নিয়ে দেশের নাগরিকদের সতর্কতা হালনাগাদ করেছে কানাডা সরকার। রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিচারিক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও জনঅস্থিরতার আশঙ্কায় দেশটি বাংলাদেশে ভ্রমণকারীদের উচ্চমাত্রার সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। সোমবার সর্বশেষ এই সতর্কতা হালনাগাদ করা হয়।

কানাডা সরকার এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বরে বাংলাদেশ নিয়ে দুই দফা ভ্রমণ সতর্কতা হালনাগাদ করেছিল। এবারের সতর্কতায়ও বাংলাদেশকে উচ্চমাত্রার সতর্কতা অবলম্বনের পর্যায়েই রাখা হয়েছে।

কানাডা সরকারের ভ্রমণ সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে যেকোনো সময় বিক্ষোভ ও সহিংস সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে। এসব পরিস্থিতিতে হঠাৎ যান চলাচল বন্ধ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং জনজীবনে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। এ কারণে বাংলাদেশে ভ্রমণরত কানাডীয় নাগরিকদের বড় ধরনের জমায়েত ও বিক্ষোভ এড়িয়ে চলতে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলে সতর্কতা আরও কঠোর
চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষেত্রে সতর্কতা আরও কঠোর করেছে কানাডা। দেশটির নাগরিকদের ওই এলাকায় সব ধরনের ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ অঞ্চলে রাজনৈতিক সহিংসতা, অপহরণ ও সংঘর্ষের ঝুঁকির কথাও সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে অবস্থানরত বা ভ্রমণরত কানাডীয় নাগরিকদের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম নিয়মিত অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত থাকা এবং ভ্রমণের আগে কানাডা সরকারের সর্বশেষ তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

‘গলায় দা ধরে এমপির বাড়ি জমি লিখে নেন সৎ ভাইয়েরা’ আদালতে মামলার আরজিতে এমপি নাছির চৌধুরীর স্ত্রী পারভিন আক্তার

সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী পারভিন আক্তার এবার এমপির তিন সৎ ভাইসহ আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার আবেদন করেছেন। মামলার আরজিতে বলা হয়েছে, অসুস্থ নাছির চৌধুরীকে গলায় দা লাগিয়ে বাড়িসহ সম্পত্তির দলিল রেজিস্ট্রি করেছেন সৎ ভাইরা।

পারভিন আক্তারের পক্ষে আদালতে মামলার আবেদন করেন আইনজীবী কাওছার আলম। আমল গ্রহণকারী দিরাই আদালতের বিচারক মো. জসিম এই মামলা গ্রহণ করে আদেশে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের পেশকার মুহিত লাল চন্দ মিঠু বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মামলার আরজিতে দিরাই উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক (স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত) মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুকসহ নাছির চৌধুরীর তিন সৎ ভাইকে বিবাদী করা হয়েছে। বিবাদীরা হলেন– নাছির উদ্দিন চৌধুরীর সৎ ভাই মঈন উদ্দিন চৌধুরী, মিজানুর রহমান চৌধুরী ও মোসলেহ উদ্দিন চৌধুরী। অন্য বিবাদীদের মধ্যে রয়েছেন দিরাই উপজেলার মাতারগাঁও গ্রামের মৃত নাজমুল ইসলামের ছেলে আমিরুল ইসলাম, পুরাতন কর্ণগাঁও গ্রামের আব্দুন নুর মিয়ার ছেলে ছয়ফুল চৌধুরী, তল বাউসী গ্রামের দলিল লেখক মুজিবুর রহমান, কলিয়ার কাপনের নাজমুল ইসলামের ছেলে তাজুল ইসলাম ও দিরাইয়ের নুরুল ইসলামের মেয়ে মোহরার মমতাজ বেগম।

মামলার আরজিতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে বাদী পারভিন আক্তার নাছির উদ্দিন চৌধুরীর দিরাইয়ের বাড়িতে গেলে মারপিট ও শ্লীলতাহানির শিকার হন। এতে আরও বলা হয়, বিবাদীরা নাছির উদ্দিন চৌধুরীর বাড়িসহ সম্পত্তি থেকে তাঁর দুই স্ত্রী ও সন্তানদের বঞ্চিত করে সম্পত্তি আত্মসাতের জন্য আগেই পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

আরজিতে আরও বলা হয়, নাছির উদ্দিন চৌধুরীর প্রথম স্ত্রী শেলী চৌধুরী অসুস্থ হয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন তখন। একই সময়ে নাছির উদ্দিন চৌধুরীও দিরাইয়ের বাড়িতে অসুস্থ ছিলেন। ওই সময় নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে দাতা সাজিয়ে বিবাদীরা গ্রহীতা হয়ে বাড়িসহ অন্য ভূমি থেকে বাদীর দুই কন্যা, অন্য স্ত্রী ও নাছির উদ্দিন চৌধুরীর বোনকে বঞ্চিত করে দলিল তৈরি করার পরিকল্পনা নেয়।

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২২ সালের ২৫ জানুয়ারি দিরাই এসআরও অফিসের দুই কর্মচারীকে অফিসার সাজিয়ে অসুস্থ, অক্ষম নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে দলিলে স্বাক্ষর করতে বললে তিনি অসম্মতি জানান। পরে তাঁরা গলায় রামদা ধরে স্বাক্ষর না করলে গলা কেটে খুন করবে বলে ভয় দেখায়। কথাবার্তা শুনে তাঁর অন্য স্ত্রী শেলী চৌধুরী এসে বাধা দিলে আসামি মিজানুর রহমান চৌধুরী তাঁকেও খুন করার হুমকি দেয়। এ সময় নাছির উদ্দিন চৌধুরীর টঙ্গর এলাকার সমর্থক ওয়াকিব হাসান তখন ওই বাড়িতে তাঁকে দেখতে আসেন এবং ঘটনাটি দেখেন। মঈন উদ্দিন চৌধুরীরা ভয়ভীতি দেখিয়ে ওয়াকিবকে তাড়িয়ে দেয়। এক পর্যায়ে নাছির উদ্দিনের মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য আসামিরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করতে থাকে। পরে নাছির উদ্দিন চৌধুরী সুস্থ হয়ে এসব বিষয় জানিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন।
মামলার আরজিতে আরও বলা হয়, বিবাদীদের এমন আচরণের কথা জেনে এলাকায় জনরোষ তৈরি হলে তাঁরা ক্ষমা প্রার্থনা করে দলিল বাতিল করার অঙ্গিকার করেন। এ কারণে তাদের আদালতের আশ্রয় নিতে বিলম্ব হয়েছে।

পারভিন আক্তার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা জোর করে কিছু করতে চাই না। আইন হাতেও তুলতে চাই না। এ জন্য আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি।’

বিবাদী মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক সমকালকে বলেন, ‘মামলা কী হয়েছে জানি না। জানার পর আইনিভাবেই জবাব দিব।’

কুমারখালী দোকানে সার সংকট, বাড়তি টাকা দিলে মেলে

৫ বিঘা জমিতে আমন ধানের আবাদ করেছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কৃষক সামছুল আলম। তাঁর বাড়ি উপজেলার পান্টি ইউনিয়নের বড় ভালুকা গ্রামে। এ ইউনিয়নে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ডিলারের কাছে কিছুদিন আগে যান সার কিনতে। কিন্তু ডিলারের থেকে সরকার নির্ধারিত দরে ১০ কেজির বেশি সার পাননি। বাধ্য হয়ে একই ইউনিয়নের বেলতলী এলাকার সাবডিলার আব্দুল কুদ্দুসের দোকান থেকে বাড়তি দামে সার কেনেন। সেখানে প্রতি কেজি ইউরিয়ার দাম ৩২ টাকা, ডিএপি সারের দাম ৩৭ টাকা ও টিএসপি সারের দাম ৩৮ টাকা রাখা হয়। অথচ সারগুলোর সরকারি দাম যথাক্রমে ২৭, ২১ ও ২৭ টাকা।

গত শনিবার সামছুলের সঙ্গে কথা হয় সমকালের। একই দিন বড় ভালুকা গ্রামের মাঠে দাঁড়িয়ে আক্ষেপের অপর কৃষক জনি মোল্লা বলছিলেন, ‘উপজেলা হয়ে যে সার আমাদের সোবাহান সাহেবের (ইউনিয়নের ডিলারের বাবা) কাছে আসে, সেই সার আমরা ঠিকমতো পাই না। ১৫-২০ কেজি করে সার দেয়। বস্তা ধরে নিতে হলে ৪-৫ জন করে ভাগে নিতে হয়। আমার ছয় বিঘা ভুই ধান। বলেন, আমার কি সম্ভব প্রত্যেক দিন যায়া যায়া ২০ কেজি করে সার নিয়ে আসা?’ সরকারি দামে সার না পেয়ে বাধ্য হয়ে তিনি কালোবাজার থেকে ইউরিয়া কিনেছেন ৩২ টাকা কেজিতে, টিএসপি ৪০ টাকায় আর ডিএপি ৩২ টাকায়।

সামছুল-জনির মতো কুমারখালীর হাজারো আমন চাষির কণ্ঠে একই হাহাকার। ডিলার সিন্ডিকেটের তৈরি কৃত্রিম সংকটে এসব কৃষকের পকেট থেকে কেজিপ্রতি পাঁচ থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গচ্চা যাচ্ছে। কৃষি বিভাগের তথ্য ও কৃষকদের অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) কুমারখালীতে প্রায় ১৬ কোটি টাকা লুটেছে সার সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১১ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত কুমারখালী উপজেলায় বিসিআইসির ডিলার ১৩ জন আর বিএডিসির ডিলার ১৭ জন। তাদের অধীরে আছেন ১০৮ জন সাবডিলার।

বছরে ১৬ কোটি টাকা লুট
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরে কুমারখালীতে ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের অর্থবছরে (২০২৫-২৬) সরকার কর্তৃক অনুমোদিত ইউরিয়ার সারের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৮৩৮ মেট্রিকটন। এ ছাড়া টিএসপি দুই হাজার ৭৩৮ মেট্রিকটন, ডিএপি চার হাজার ৯৮৫ মেট্রিকটন ও এমওপি তিন হাজার ১৫৪ মেট্রিকটন বরাদ্দ হয়।

কৃষি কার্যালয়ের তথ্য ও কৃষকের করা অভিযোগ অনুযায়ী বাড়তি টাকার হিসাব করলে চিত্রটি ভয়াবহ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিকেজিতে ১৩ টাকা বাড়তি হিসাবে টিএসপি সার থেকেই তিন কোটি ৫৫ লাখ টাকা বাড়তি নিয়েছে সিন্ডিকেট। প্রতি কেজি ১১ টাকা হিসাবে ডিএপি সার থেকে পাঁচ কোটি ৪৮ লাখ টাকা; প্রতি কেজিতে পাঁচ টাকা হিসাবে এমওপি সার থেকে এক কোটি ৫৭ লাখ টাকা এবং প্রতি কেজি পাঁচ টাকা হিসাবে ইউরিয়া সার বিক্রি করে পাঁচ কোটি ৪১ লাখ টাকা লুটেছে চক্র।

সারের জন্য হাহাকার
চলতি আমন মৌসুমে উপজেলার যদুবয়রা, পান্টি, বাগুলাট, চাঁদপুর, সদকী, শিলাইদহ ও চাপড়া ইউনিয়নের মাঠে মাঠে চলছে জমি চাষ ও চারা রোপণের কাজ। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সারের চাহিদা। চাষিরা বলছেন, এই সুযোগেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে ডিলার-সাব ডিলারদের সিন্ডিকেট।

গত এক সপ্তাহ সরেজমিন দেখা গেছে, ন্যায্যমূল্যের ডিলার পয়েন্টে গিয়ে চাহিদামতো সার মিলছে না। বাধ্য হয়ে কৃষক ছুটছেন সাবডিলারের কাছে। কেউ কালোবাজারেও ছুটছেন। সেখানে সরকার নির্ধারিত দামে কোনো সারই বিক্রি হচ্ছে না।

পান্টি ইউনিয়নের জোতভালুকা গ্রামের মোহাম্মদ শাহাদত শেখের ছেলে মজনু শেখ বলেন, ‘সরকারি দামে সার পাচ্ছি না। সাব ডিলারের কাছ থেকে ৩২ টাকা কেজি ইউরিয়া, ৪২ টাকা কেজি টিএসপি কিনেছি। চাষ করতি হলে সার কেনাই লাগবে। কোনো উপায় নেই।’

বাজারের চিত্রও একই। প্রতি কেজি টিএসপি ২৭ টাকার জায়গায় ৩৮-৪২ টাকা, ২৭ টাকার ইউরিয়া ৩০-৩২ টাকায়, ডিএপি ২১ টাকার বদলে ৩২-৩৫ টাকায় ও এমওপি ২০ টাকার পরিবর্তে ২৫-২৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কৃত্রিম সংকট তৈরির জন্য কৃষকেরা সরাসরি ডিলারদের দায়ী করছেন। তারা বলছেন, চাহিদামতো সার না দিয়ে অল্প অল্প করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে বারবার ডিলারের কাছে যেতে হচ্ছে। এতে সময় নষ্টের পাশাপাশি বাড়তি ভোগান্তি। কম সার দেওয়ার কথা স্বীকার করেন পান্টি ইউনিয়নের বিসিআইসির ডিলার মেসার্স পলাশ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জাবিউল্লাহ পলাশ। তাঁর ভাষ্য, কৃষকের সার ব্যবহার দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। সেজন্য কৃষকদের বুঝাতে ও সুষম সারের ব্যবহার নিশ্চিত করতে কম সার দেওয়া হচ্ছে।

একই ইউনিয়নের বেলতলার সাব ডিলার আবদুল কুদ্দুসের মেসার্স ওয়াকিল এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক তাঁর ছেলে ওয়াকিল আহমেদ। তিনি বেশি দাম নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। তবে বস্তাপ্রতি ১০০ টাকা বেশি নেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘চাহিদামতো সার কিনতে কৃষকদের অন্য এলাকার ডিলারের কাছে পাঠানো হচ্ছে। অন্য ডিলারের কৃষক আসলে বেশি টাকা নেওয়া হতেই পারে। কিন্তু তাঁর অভিযোগ আমলে নেওয়া যাবে না। কারণ, বাইরে থেকে সে কেন আসবে?’

কালোবাজারে বিক্রি
যদুবয়রা ইউনিয়নের দক্ষিণ ভবানীপুর গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম। দুই বিঘা জমির জন্য গত ২ আগস্ট সার কিনতে তিনি গিয়েছিলেন ভবানীপুরের বড় ভাই মোড়ের দোকানি আবিদ হাসানের কাছে। আবিদ তাঁর কাছে প্রতিকেজি ইউরিয়ার দাম ৩২ টাকা, এমওপি প্রতিকেজি ২৫ টাকা ও ডিএপি সারের দাম প্রতিকেজি ৪৫ টাকা রাখেন। রবিউল বলেন, সরকারি দামে সার মিলছে না। অতিরিক্ত টাকা দিলেই বেশি বেশি সার পাওয়া যায়।

আবিদ হাসানের সার বিক্রির লাইসেন্স নেই। তবু বাড়তি দামে বিক্রি করছেন। একইভাবে লাইসেন্স ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে সারের ব্যবসা করছেন পান্টি ইউনিয়নের পান্টির গোদের বাজারের ব্যবসায়ী জাকির হোসেনও। জাকির এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। আবিদ হাসান দাবি করেন, ‘আমার সার বিক্রির লাইসেন্স নেই। নিজের জমির জন্যে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন এলাকার ডিলারের কাছ থেকে ৪ থেকে ৫ বস্তা করে সার কিনে দোকানে রাখি। কিন্তু আমি কোনো কৃষকের কাছে বিক্রি করি না।’
চাপড়া ইউনিয়ন বোর্ড অফিস এলাকার কৃষি উদ্যোক্তা মনিরুল ইসলামের দাবি অসাধু ডিলারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার। তিনি বলেন, সাবডিলারদের ওপর নজরদারি চালাতে হবে। কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে।

আলাউদ্দিন নগর বাহার কৃষি কলেজের অধ্যক্ষ নুর-ই-আলম বলেন, আমন মৌসুমের শুরুতেই সারের সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায়।
কুমারখালী দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাবীব চৌহান বলেন, সার নিয়ে কারসাজি দীর্ঘদিনের। ডিলাররা কালোবাজারে সার বিক্রি করছেন বলেই কৃষক পাচ্ছেন না। কোটি কোটি টাকা লুটছে সিন্ডিকেট।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনির হোসেনের ভাষ্য, কৃষকদের অভিযোগের ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা কয়েকটি ডিলার পয়েন্টে অবস্থান করে সার দেবেন। সিন্ডিকেট ও অসাধু ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।

ইউএনও ফারজানা আখতার বলেন, সারের কৃত্রিম সংকট ও বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ মৌখিকভাবে পেয়েছেন, লিখিত পাননি। কৃষক যেন সরকারি দামে সার পায় সেটি নিশ্চিতে কাজ করছেন। দ্রুতই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার  আশ্বাস দেন।

মানসিক চাপেও বাড়তে পারে কোলেস্টেরল

কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়ার কথা শুনলেই অনেকে শুধু তেল-চর্বিযুক্ত খাবারকে দায়ী করেন। তবে শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপও শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী দুশ্চিন্তা, ঘুমের সমস্যা, অনিয়মিত খাওয়া ও শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস না থাকলে কোলেস্টেরলসহ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, মানসিক চাপ ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন মানসিক চাপে থাকলে শরীরে কিছু হরমোনের পরিবর্তন হয়। একই সঙ্গে অনেকের মিষ্টি, ভাজাপোড়া ও বেশি ক্যালরির খাবারের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। ফলে সরাসরি ও পরোক্ষ—দুইভাবেই কোলেস্টেরল বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

মানসিক চাপ কীভাবে কোলেস্টেরল বাড়ায়

মানসিক চাপের সময় শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এগুলো শরীরকে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করে। স্বল্প সময়ের জন্য এই প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হলেও দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ থাকলে শরীরের বিপাক প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফরিদাবাদের ফোর্টিস হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র ডিরেক্টর ডা. সঞ্জয় কুমারের মতে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তিনি আরও বলেন, মানসিক চাপের সময় শরীর কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন ছাড়ে। এগুলো শরীরে দ্রুত শক্তি সরবরাহের ব্যবস্থা করে। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে লিভারে গ্লুকোজ, কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড তৈরির পরিমাণ বাড়তে পারে।

মানসিক চাপ বদলে দেয় খাওয়ার অভ্যাসও

মানসিক চাপের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে খাবারের ওপর। দুশ্চিন্তায় অনেকেই না বুঝে বেশি খেয়ে ফেলেন। বিশেষ করে মিষ্টি, ফাস্টফুড, ভাজাপোড়া, চিপস, কোমল পানীয়সহ উচ্চ ক্যালরির খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে। এ ধরনের খাবারে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্স ফ্যাট ও অতিরিক্ত ক্যালরি থাকতে পারে। নিয়মিত এসব খাবার খেলে ওজন বাড়ার পাশাপাশি রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রাও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, মানসিক চাপের কারণে অনেকে খাবারের সময় ঠিক রাখেন না। দিনের বেশির ভাগ সময় না খেয়ে থেকে রাতে বেশি খাওয়া, বারবার স্ন্যাকস খাওয়া বা গভীর রাতে ভারী খাবার খাওয়ার অভ্যাসও শরীরের বিপাক প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি করতে পারে।

শুধু মানসিক চাপ নয়, খাবারও গুরুত্বপূর্ণ

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে মানসিক চাপ কমানোর পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসের দিকেও নজর দিতে হবে। নিয়মিত অতিরিক্ত তেল, চর্বিযুক্ত মাংস, ভাজাপোড়া, বেকারি খাবার, ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত মিষ্টি খেলে কোলেস্টেরল বাড়ার ঝুঁকি বেশি। তাই খাবারের তালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল, ওটস, বার্লি, বাদাম, বীজ এবং মাছের মতো পুষ্টিকর খাবার রাখা ভালো। বিশেষ করে আঁশযুক্ত খাবার কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। চর্বিযুক্ত মাছেও উপকারী ফ্যাট থাকে, যা হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। রান্নায় অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

কোন খাবার বেশি রাখবেন

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিনের খাবারে রাখতে পারেন—ওটস ও বার্লি, ডাল, ছোলা ও বিভিন্ন ধরনের শিম, শাকসবজি, পেয়ারা, আপেলসহ আঁশযুক্ত ফল, বাদাম ও বিভিন্ন বীজ, মাছ ও পরিমিত অলিভ অয়েল বা স্বাস্থ্যকর তেল। তবে কোনো একটি খাবার খেলেই কোলেস্টেরল কমে যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। পুরো খাদ্যাভ্যাসটাই স্বাস্থ্যকর করতে হবে।

ঘুম কম হলেও বাড়তে পারে ঝুঁকি

মানসিক চাপের সঙ্গে ঘুমের সমস্যারও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। নিয়মিত কম ঘুম বা অনিয়মিত ঘুম শরীরের হরমোন ও বিপাক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে ক্লান্তি বাড়ায় এবং ব্যায়াম বা শরীরচর্চার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমের চেষ্টা করা জরুরি। রাত জেগে কাজ বা মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস থাকলে তা ধীরে ধীরে কমিয়ে নিয়মিত ঘুমের সময় ঠিক করা ভালো।

ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ণ

নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী শরীরচর্চা করা যেতে পারে। ব্যায়াম শুধু কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণেই নয়, মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করে। ফলে এটি একই সঙ্গে দুই দিকেই উপকার করতে পারে।

ধূমপান ও মদ্যপান এড়িয়ে চলুন

ধূমপান হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির জন্য ক্ষতিকর। একইভাবে অতিরিক্ত অ্যালকোহল ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বাড়াতে পারে এবং হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তাই কোলেস্টেরল বা হৃদরোগের ঝুঁকি থাকলে এসব অভ্যাস এড়িয়ে চলা জরুরি।

কী লক্ষণে সতর্ক হবেন

কোলেস্টেরল বেড়ে গেলেও অনেক সময় কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। এ কারণেই একে অনেক সময় নীরব সমস্যা বলা হয়। তবে দীর্ঘদিন মানসিক চাপ, ওজন বেড়ে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে নিচের বিষয়গুলো থাকলে সতর্ক হওয়া দরকার—

  • নিয়মিত অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা
  • ঘুমের সমস্যা
  • মানসিক চাপের কারণে বেশি খাওয়া
  • ওজন বা কোমরের মেদ বেড়ে যাওয়া
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস
  • পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস
  • পরীক্ষায় বারবার বেশি কোলেস্টেরল পাওয়া

কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো জীবনযাপনে কয়েকটি পরিবর্তন আনা। নিয়মিত ব্যায়াম, পরিমিত ও স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ কমানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। দুশ্চিন্তা বেশি হলে ধ্যান, নামাজ বা প্রার্থনা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, হাঁটাহাঁটি, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং পছন্দের কাজে সময় দেওয়াও উপকারী হতে পারে। তবে শুধু মানসিক চাপ কমালেই কোলেস্টেরল স্বাভাবিক হবে—এমন নয়। আবার শুধু খাবার নিয়ন্ত্রণ করলেও সব ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান হবে না। বয়স, ওজন, বংশগত কারণ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা, শারীরিক পরিশ্রম এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ও কোলেস্টেরলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন

রক্ত পরীক্ষায় বারবার কোলেস্টেরল বেশি পাওয়া গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে এলডিএল বেশি থাকলে, পরিবারের কারও হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজের ইচ্ছায় কোলেস্টেরলের ওষুধ শুরু বা বন্ধ করা ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক রক্তের লিপিড প্রোফাইলসহ অন্যান্য পরীক্ষা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারেন।

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো একসঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়া— স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা।

পৌনে ২ লাখ ভিসা বাতিল করল যুক্তরাষ্ট্র, সুবিধা হারাচ্ছেন আরও হাজারো মানুষ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসননীতির অংশ হিসেবে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি বিদেশি নাগরিকের ভিসা বাতিল করেছে। একই সময়ে আরও হাজারো মানুষের ভ্রমণ ও অভিবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন সুবিধা বাতিল করা হয়েছে।

সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত এক তথ্যবিবরণীতে এসব তথ্য জানানো হয়।

তথ্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া, ভিসার শর্ত লঙ্ঘন, জালিয়াতি, সহিংসতায় উসকানি এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি-ভিসা বাতিলের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে।

গত বছর দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ঠেকাতে ব্যাপক অভিযান শুরু করে। এর অংশ হিসেবে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাদের অনেকের কাছেই বৈধ ভিসা ছিল। এবার বিপুলসংখ্যক ভিসা বাতিলের ঘটনায় প্রশাসনের কঠোর অভিবাসননীতির আরেকটি দিক সামনে এসেছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, নিয়মিত যাচাই-বাছাইয়ের অংশ হিসেবে এসব ভিসা বাতিল করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ভিসাধারীরা ভিসার শর্ত মেনে চলছেন কি না এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য কোনো হুমকি হয়ে উঠছেন কি না, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। হামলা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, চুরি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধও ভিসা বাতিলের অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছে দপ্তর।

পররাষ্ট্র দপ্তর কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনার কথাও উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আরেকজনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও মানব পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্য একজনের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নিপীড়নের উপকরণ রাখার এক ডজনের বেশি অভিযোগ রয়েছে।

দপ্তর আরও জানিয়েছে, উত্তর আফ্রিকার একটি মার্কিন দূতাবাস যুক্তরাষ্ট্রে ‘বার্থ ট্যুরিস্ট’ হিসেবে আসা ১০০টির বেশি বাবা-মায়ের ভিসা বাতিল করেছে। এসব ব্যক্তি সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। তাদের সন্তান যেন জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব পায়, সেটিই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

এ ছাড়া জনপ্রিয় রক্ষণশীল অধিকারকর্মী চার্লি কার্ককে হত্যার ঘটনায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা কয়েকজন বিদেশি নাগরিকের ভিসাও বাতিল করা হয়েছে। তাদের একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘ফ্যাসিস্টরা মারা গেলে গণতন্ত্রপন্থীরা অভিযোগ করে না।’ আরেকজন মন্তব্য করেছিলেন, ‘তিনি দেরিতে মারা গেছেন।’

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত বিদেশি নাগরিকদের শনাক্ত ও তাদের কর্মকাণ্ডের তদন্ত অব্যাহত থাকবে।

দপ্তর আরও বলেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা একটি সুযোগ, অধিকার নয়।’ ভিসার অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ভিসা বাতিলসহ বিদ্যমান সব ক্ষমতা ব্যবহার করা হবে।

এর আগে গত জানুয়ারিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছিল, তারা এক লাখের বেশি ভিসা বাতিল করেছে। তখন এটিকে রেকর্ডসংখ্যক ভিসা বাতিলের ঘটনা বলা হয়েছিল। নতুন হিসাব অনুযায়ী, সেই সংখ্যা এখন ১ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর নীতি নিয়েছে। আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম যাচাই আরও জোরদার করা হয়েছে এবং যাচাই-বাছাইয়ের আওতা বাড়ানো হয়েছে।

অধিকারকর্মী ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যাচাইয়ের এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি অভিবাসীদের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি ও তাঁদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

ইরানের হত্যার হুমকি, খাবার বহনের ট্রাকে লুকিয়ে তুরস্ক ছাড়েন ট্রাম্প ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন

ইরানের পক্ষ থেকে হত্যার হুমকির পর গত মাসে তুরস্ক থেকে গোপনে সামরিক বিমানে করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময় হোয়াইট হাউস জানিয়েছিল, ট্রাম্প পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানেই ফিরছেন। তবে বাস্তবে তাকে বিমানবন্দরের একটি ক্যাটারিং ট্রাকে করে অন্য একটি ছোট সামরিক বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সোমবার ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় গিয়েছিলেন ট্রাম্প। এ সফরে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক যাত্রায় ব্যবহার করা হয় কাতারের উপহার দেওয়া নতুন উড়োজাহাজটি। তবে আঙ্কারা ছাড়ার সময় আকস্মিকভাবে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। এতে নতুন উড়োজাহাজটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই ট্রাম্পের তুরস্ক সফর অনুষ্ঠিত হয়। তুরস্কের সঙ্গে ইরানের সীমান্ত রয়েছে।

আঙ্কারা ছাড়ার আগে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে জানিয়েছিলেন, তিনি ‘পুরোনো দিনের কথা মনে করে’ পুরোনো নীল রঙের এয়ারফোর্স ওয়ানে করে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স মাইল্ডেনহলে যাবেন। একই সময়ে কাতারের দেওয়া নতুন উড়োজাহাজটিও সেখানে যাবে, যাতে ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন সেনারা সেটি ঘুরে দেখতে পারেন। তবে পরে জানা যায়, এটি ছিল নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ।

আঙ্কারায় ক্যামেরার সামনে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে ওঠেন ট্রাম্প। এরপর তাকে গোপনে বিমানবন্দরের একটি ক্যাটারিং ট্রাকে করে অপেক্ষমাণ ছোট একটি সামরিক বিমানে নিয়ে যাওয়া হয়। বিমানটি ছিল মার্কিন বিমানবাহিনীর সি৩২-এ। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে একজন মার্কিন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পকে হত্যার একটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকি পাওয়ার পর এই গোপন অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানকে কার্যত ট্রাম্পের ‘ডিকয়’ বা বিভ্রান্তিমূলক বিমান হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

ট্রাম্পের সঙ্গে ভ্রমণ করছেন বলে ধারণা করা সাংবাদিকেরা পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানেই ছিলেন। হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মীও মনে করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ওই বিমানেই রয়েছেন। সাংবাদিকদের বিমানের প্রেস কেবিনের জানালার পর্দা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল।

পরে সাংবাদিকেরা জানতে চান, কেন তাদের জানালার পর্দা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘সম্ভবত আমরা একটি বিপজ্জনক ফ্লাইটে ছিলাম।’ এরপর তিনি বলেন, ‘তবে আমি গেলে আপনারাও যাবেন, তাই না?’

ট্রাম্পকে বহনকারী সি৩২-এ যুক্তরাজ্যে গিয়ে রাত প্রায় ১০টা ২০ মিনিটে অবতরণ করে। কয়েক মিনিট পর পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানও সেখানে পৌঁছায়। তবে ট্রাম্প কখন এবং কীভাবে সি৩২-এ থেকে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে ফিরে যান, তা স্পষ্ট নয়।

ট্রাম্পের সফরসঙ্গী সাংবাদিকেরা জানান, যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে তিনি পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামেন। সাংবাদিকদের দিকে তিনি শান্তির প্রতীক হিসেবে দুই আঙুল তুলে ইশারা করেন, তবে তাদের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে যাননি। পরে কিছু সময় মার্কিন সেনাসদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করে তিনি কাতারের দেওয়া নতুন উড়োজাহাজটির দিকে যান।

ট্রাম্পের গোপন তৃতীয় বিমানে যাত্রার বিষয়ে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভ চেউং বলেন, কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজটিতে প্রেসিডেন্ট ও তার কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি যেমন বলেছেন, আমেরিকার অনেক শত্রু তাকে লক্ষ্য করছে। এসব হুমকি মোকাবিলায় আমাদের হাতে থাকা সব ধরনের ব্যবস্থা আমরা ব্যবহার করি।’

ওয়াশিংটন পোস্টকেও একই বক্তব্য দিয়েছে হোয়াইট হাউস। এ বিষয়ে পেন্টাগন তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

কাতারের দেওয়া নতুন উড়োজাহাজটি একটি বোয়িং ৭৪৭। ট্রাম্পের পছন্দ অনুযায়ী এতে লাল, সাদা, গাঢ় নীল ও সোনালি রঙের নকশা করা হয়েছে। গত বছর কাতার যুক্তরাষ্ট্রকে বিমানটি উপহার দেয়। পরে প্রতিরক্ষা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এলথ্রি হ্যারিস টেকনোলজিস বিমানটি সংস্কার করে।

বোয়িংয়ের নতুন প্রজন্মের এয়ারফোর্স ওয়ান সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা চলায় অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ব্যবহারের জন্য এই বিমানটি নেওয়া হয়েছিল। তবে বিমানটির দ্রুত সংস্কারের খরচ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল।

এর আগে ২০০০ সালেও একই ধরনের নিরাপত্তা কৌশল নেওয়া হয়েছিল। সে সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন পাকিস্তানে যাওয়ার সময় পরিচয়বিহীন একটি নির্বাহী উড়োজাহাজ ব্যবহার করেছিলেন। একই সময়ে তার আনুষ্ঠানিক এয়ারফোর্স ওয়ানকে ডিকয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।