Home Blog Page 62

হরমুজ প্রণালী বন্ধের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে বাড়ল তেলের দাম

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার জের ধরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। হরমুজ বন্ধের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। আজ বৃহস্পতিবার বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

বিশ্ববাজারে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে এক ডলারেরও বেশি বেড়েছে। ব্রেন্ট তেলের ভবিষ্যৎ মূল্য ১ দশমিক ৪৮ ডলার বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৪ দশমিক ৫৮ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৭১ ডলার বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯১ দশমিক ৭৪ ডলারে ওঠে। দিনের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ মূল্য ৩ ডলারেরও বেশি বৃদ্ধি পায়।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। এ আশঙ্কায় বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং কোনো শান্তি চুক্তি না হলে আরও হামলা চালানো হবে। এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুশিয়ারি দেয়, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

৯০ দিনের জ্বালানি মজুদের উদ্যোগ

দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে এবার ন্যূনতম ৯০ দিনের কৌশলগত জ্বালানি তেল মজুদ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, যুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ এ উদ্যোগ নিয়েছে।

এর আওতায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন স্টোরেজ নির্মাণ, ভূগর্ভস্থ মজুতের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং রেলওয়ে ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আলাদা জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক সংকটেও দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল ও নিরাপদ রাখা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টদের আশা। জ¦ালানি বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ নিজস্ব চাহিদার অধিকাংশ পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের জ্বালানি সরবরাহে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৮০ লাখ টন জ¦ালানি তেলের চাহিদা, যার অধিকাংশই আমদানিনির্ভর।

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। একই সময়ে ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের ওপরও চাপ তৈরি হয়। তখন জ্বালানি খাতে ব্যয় মেটানো এবং পর্যাপ্ত মজুত ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো কয়েক মাসের চাহিদা পূরণের সক্ষমতা রেখে তেল সংরক্ষণ করে। এর উদ্দেশ্য হলোÑ জরুরি পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা। বাংলাদেশে এতদিন এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত মজুত নীতিমালা ছিল না।

বর্তমান মজুত সক্ষমতা কত

বাংলাদেশে জ্বালানি তেল সংরক্ষণের প্রধান দায়িত্বে রয়েছে বিপিসি এবং এর অধীনস্থ তিন তেল বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন ডিপো, অয়েল ইনস্টলেশন ও বিপণন কোম্পানির ট্যাঙ্কে জ্বালানি তেল সংরক্ষণ করা হয়। তবে দেশের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা এখনও আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় সীমিত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। বর্তমানে গড়ে ১৫ থেকে ২৫ দিনের জ¦ালানি তেল মজুত সক্ষমতা রয়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখন বিদ্যমান ট্যাঙ্কের পাশাপাশি অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত বা অতিরিক্ত সংরক্ষণ সুবিধাও ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বিপিসি, বাংলাদেশ রেলওয়ে, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিটিকে ৯০ দিনের রোডম্যাপ প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ আমদানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল। অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী, নিয়মিত আমদানি করে সরবরাহ বজায় রাখা হতো। কিন্তু কয়েকটি কারণে এ পদ্ধতির ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে; যার মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের বাজারের অস্থিরতা, বৈশ্বিক তেলের মূল্যবৃদ্ধি; ডলার সংকট; জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন; ভূরাজনৈতিক সংঘাত; অভ্যন্তরীণ আর্থিক সংকট। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরবরাহ ব্যবস্থায়ও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে আসে। তখনই দেশে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়।

সরকারের নতুন পরিকল্পনা

জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের নির্দেশনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। দেশে ন্যূনতম তিন মাসের জ্বালানি তেল মজুত নিশ্চিত করতে একটি পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে নতুন স্টোরেজ নির্মাণের জন্য উপযুক্ত জায়গা চিহ্নিত করতে বলা হয়। আন্ডারগ্রাউন্ড স্টোরেজ ট্যাঙ্ক নির্মাণের সম্ভাবনা যাচাইয়ে বিস্তারিত ফিজিবিলিটি স্টাডি করার উদ্যোগ নিতে বলা হয়। প্রসঙ্গত, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৌশলগত মজুতের জন্য ভূগর্ভস্থ গুহা বা ট্যাঙ্ক ব্যবহৃত হয়; যা যুদ্ধ বা দুর্যোগের সময় তুলনামূলক নিরাপদ থাকে। মোংলা অয়েল ইনস্টলেশনের ট্যাঙ্ক সংস্কার করে সেখানে অধিক পরিমাণ জ্বালানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। নির্মাণাধীন ও সংস্কারাধীন ট্যাংকগুলো দ্রুত ব্যবহার উপযোগী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিপণন কোম্পানিগুলোকে নিজস্ব সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিতে বলা হয়।

রেলওয়ে ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভূমিকা

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ রেলওয়েকে তাদের নিজস্ব চাহিদার কমপক্ষে এক মাসের জ্বালানি মজুত রাখতে হবে। অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী, ন্যূনতম দুই মাসের জ্বালানি সংরক্ষণ করতে হবে। এতে জাতীয় পর্যায়ের মোট মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছে, তিন মাসের কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়। অতিরিক্ত তেল কিনে সংরক্ষণ করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে এ ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া বৃহৎ আকারের ট্যাঙ্ক, পাইপলাইন, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তুলতে সময় লাগবে। নতুন স্টোরেজ নির্মাণের জন্য উপযুক্ত জায়গা নির্বাচনও বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত জ্বালানির মান বজায় রাখা এবং কার্যকর রোটেশন ব্যবস্থা চালু করাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দরকার দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাত জ্বালানি তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে যে কোনো অস্থিরতা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে তিন মাসের কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার উদ্যোগকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জ্বালানি বিভাগ ইতোমধ্যে বিপিসিকে কৌশলগত মজুত নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সংকট, যুদ্ধ, সরবরাহ বিঘ্ন কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মধ্যেও বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখতে সক্ষম হবে।

নতুন করদাতা খোঁজার বড় মিশনে নামছে সরকার

অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সরকার আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন নিশ্চিত করার মাধ্যমে নতুন করদাতা শনাক্ত ও করের আওতায় আনার একটি বড় মিশন হাতে নিচ্ছে সংস্থাটি। তবে অনেক ক্ষেত্রে করছাড় ও বিশেষ সুবিধাও থাকছে।

আজ বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট প্রস্তাব করতে যাচ্ছেন, তাতে কর ও ভ্যাটের আওতা বাড়ানোর নানা প্রস্তাব থাকবে। এর অংশ হিসেবে ব্যবসায়-সংক্রান্ত ব্যাংক হিসাব খোলা, ব্যাংক ঋণ গ্রহণ এবং ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন বা বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হতে পারে।

জানা গেছে, সাধারণ ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন দাখিল বাধ্যতামূলক করা এবং খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম কর সংগ্রহের মাধ্যমে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেন্ট্রাল ডেটা ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে এনবিআরের তথ্যভান্ডারকে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ইউটিলিটি সেবা, ভূমি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় এসব বিষয়ে ঘোষণা থাকছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ক্ষুদ্র করভিত্তি ও কর ফাঁকির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং পদ্ধতিগত সংস্কারের কোনো বিকল্প

নেই। এ লক্ষ্যে এনবিআর সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নেবে। এসব বহুমুখী পদক্ষেপ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের করদাতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও টেকসই ভিত্তি পাবে বলে আশা করছে এনবিআর।

আগামী ৫ বছরের জন্য একটি পূর্বানুমানযোগ্য প্রগতিশীল কর কাঠামো ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী, যাতে করদাতারা ভবিষ্যতে তাদের করের বোঝা সম্পর্কে নিশ্চিত থাকতে পারেন। ব্যক্তি এবং কোম্পানি উভয় ক্ষেত্রে ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত করহারের প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী।

ব্যবসায়িক লেনদেনে বাধ্যতামূলক হবে ‘বিন’
ভ্যাটের জাল বিস্তার করতে সরকার নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসায় শনাক্তকরণ সংখ্যা বা বিন উপস্থাপন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব বাজেটে থাকছে। এর মধ্যে রয়েছে–যেকোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব বা এসটিডি হিসাব খোলা ও পরিচালনা, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন এবং আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক হিসেবে নিবন্ধন, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা, বাণিজ্যিক সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ বা নবায়ন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ গ্রহণ এবং বিআরটিএ থেকে বাণিজ্যিক যানবাহনের নিবন্ধন গ্রহণ।

ব্যাংক হিসাব খোলা ও সরকারি সেবায় টিআইএন
নতুন করদাতা শনাক্তে টিআইএন ব্যবহারের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে এনবিআর। এক্ষেত্রে স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট ও নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট ছাড়া অন্য যেকোনো ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন সনদ দাখিল বাধ্যতামূলক হবে। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া, জমি কেনাবেচা এবং নির্দিষ্ট কিছু পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রেও টিআইএন ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকছে।

খুচরা পর্যায়ে কর আদায়ের নতুন কৌশল
সরকার করভিত্তি সম্প্রসারণের জন্য নতুন বাজেটে অর্থমন্ত্রী উৎপাদক, আমদানিকারক বা পরিবেশকদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতারা যখন পণ্য কিনবেন, তখন সরবরাহ মূল্যের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম আয়কর সংগ্রহের প্রস্তাব করতে পারেন। এর ফলে খুচরা বিক্রেতাদের লেনদেনের তথ্য এনবিআরের কাছে চলে আসবে, যা নতুন করদাতা শনাক্ত করতে সহায়তা করবে।

সেন্ট্রাল ডেটা ইন্টিগ্রেশন ও ডিজিটাল নজরদারি
এনবিআর তার তথ্যভান্ডারকে অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করারও একটি বড় ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নেবে। এর অংশ হিসেবে সেন্ট্রাল ডেটা ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক লেনদেন, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্য এনবিআরের সিস্টেমে চলে আসবে।

এনবিআর চাইলে যেকোনো কর্তৃপক্ষ বা ব্যক্তিকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্যের এক্সেস দিতে বাধ্য করতে পারবে–এমন ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও বাজেটে থাকবে বলে জানা গেছে। তামাক পণ্যের অবৈধ বাণিজ্য রোধে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ পদ্ধতি চালুরও প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্টক ডিভিডেন্ড ও সংরক্ষিত আয়ের কর
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি স্টক ডিভিডেন্ড ও সংরক্ষিত আয়ের (রিটেইন্ড আর্নিংস) ওপর কর ওপর করারোপ আরও বাড়াতে চায় সরকার। এক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য যেকোনো কোম্পানি যদি নগদ লভ্যাংশের পরিবর্তে স্টক ডিভিডেন্ড বা বোনাস শেয়ার ঘোষণা করে, তবে সেই স্টক ডিভিডেন্ডের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর প্রদানের প্রস্তাব করা হচ্ছে।

এ ছাড়া কোনো কোম্পানি যদি তার কর-পরবর্তী নিট মুনাফার অন্তত ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ হিসেবে না দেয়, তবে অর্জিত নিট মুনাফার বিপরীতে রাখা সংরক্ষিত আয়, তহবিল বা উদ্বৃত্তের ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আরোপের বিধান রাখা হচ্ছে।

স্বর্ণ ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক খাতে আনার উদ্যোগ 
উৎসে করের উচ্চ হারের কারণে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের বাজার অনানুষ্ঠানিক থাকায় সরকার এই খাত থেকে তেমন রাজস্ব পায় না। এবার স্বর্ণ সরবরাহে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হতে পারে, যাতে ব্যবসায়ীরা আনুষ্ঠানিক খাতে আসতে আগ্রহী হন। জুয়েলারি খাতে ভ্যাট নির্ধারণে বড় পরিবর্তন এনে ৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে প্রতি ভরিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হতে পারে।

তরুণ ও নতুন উদ্যোক্তাদের করজালে আনতে ছাড়
নতুন উদ্যোক্তাদের করের আওতায় আনতে কর ছাড়ের প্রণোদনাকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে এনবিআর। এক্ষেত্রে স্টার্টআপ, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত।

আয়করের ক্ষেত্রে স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবসায় টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হতে পারে। আইটি ফ্রিল্যান্সিং থেকে সম্প্রসারিত করে সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয়ে কর অব্যাহতি দেওয়া এবং সব ধরনের কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে আয়কে করমুক্ত করার প্রস্তাব করা হতে পারে।

সীমিত সম্পদের মধ্যে মানুষকে স্বস্তি দিতেই এবারের বাজেট: অর্থমন্ত্রী

সীমিত সম্পদের মধ্যে দেশের সব মানুষকে স্বস্তি দিতেই সরকার এবারের বাজেট করেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের রূপরেখা তুলে ধরতে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনে পৌঁছে অর্থমন্ত্রী এ কথা জানান।

এর আগে বাজেট অধিবেশনে যোগ দিতে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমানের উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে বাজেটের সব বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে।

এবারের বাজেটের প্রেক্ষাপটও কিছুটা ভিন্ন উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন পর একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে জাতীয় বাজেট উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে। ফলে জাতির প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষাও অনেক বেশি। সেই প্রত্যাশা, চিন্তা-ভাবনা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যতটুকু সামর্থ্য রয়েছে, তার মধ্যেই বাজেট করতে হয়েছে। একটি বিধ্বস্ত ও ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে দেশকে স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে গিয়ে আগামী দিনে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি প্রচেষ্টা এই বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে।

এ বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশের সব নাগরিককে এর অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, যোগ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, জাতীয় ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সবাই যাতে অংশ নিতে পারে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল যেন সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের লক্ষ্য নিয়েই এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। সীমিত সম্পদের মধ্যেও সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এই বাজেট বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।

বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে

অবশেষে কোনো প্রশ্ন করা ছাড়াই সুনির্দিষ্ট খাতে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার সুযোগ দিতে যাচ্ছে সরকার। বিশেষ করে আবাসন খাতে জমি, বিল্ডিং বা ফ্ল্যাট কেনাবেচার ক্ষেত্রে দলিল মূল্যের চেয়ে প্রকৃত মূল্য বেশি হলে স্বপ্রণোদিত হয়ে ঘোষণা দিলে অপ্রদর্শিত অতিরিক্ত অর্থ নিয়মিত কর দিয়ে বৈধ করা যাবে।

ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের ক্ষেত্রেই এই সুবিধা থাকবে।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এমন সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রাখতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। এ জন্য অর্থবিলে আলাদা একটি ধারা সংযুক্ত হতে যাচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ধারাটি যুক্ত করার প্রস্তাব পাস হলে কোনো করদাতার জমি, ভবন বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনাবেচার প্রকৃত মূল্য দলিল মূল্যের চেয়ে বেশি হলে তিনি ওই অপ্রদর্শিত অর্থের ওপর ব্যক্তি শ্রেণির জন্য প্রযোজ্য নিয়মিত করহারে আয়কর পরিশোধ করতে পারবেন। অর্থ আইন বা বাংলাদেশে প্রচলিত অন্য কোনো আইনে যাই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তি স্বপ্রণোদিত হয়ে এই কর পরিশোধ করলে সে বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন বা কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না।

জানা গেছে, যদি অর্থ আইনের অধীনে কোনো ব্যক্তির এ ধরনের বিষয়ে কোনো কার্যক্রম ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়ে থাকে তাহলে অতিরিক্ত ক্রয় বা বিক্রয়মূল্যের ওপর প্রযোজ্য করের সঙ্গে অতিরিক্ত ২০ শতাংশ কর পরিশোধ করতে হবে। এ ছাড়া এ ধরনের কার্যক্রমের জন্য আদালতে আগে থেকেই দোষী প্রমাণিত হওয়া কোনো ব্যক্তি এই ধরনের সুবিধা পাবেন না।

আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করার সুযোগ দিলে টাকা পাচার কমে আসবে। অচল মূলধন অর্থনীতির মূলধারায় ফিরবে। ফলে স্থবিরতা কাটবে বেসরকারি বিনিয়োগে।

এ বিষয়ে আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাবের সভাপতি ড. আলী আফজাল সমকালকে বলেন, রিহ্যাবের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সময়োপযোগী। অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন খাতে যে বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত বা অলস অর্থ জমে আছে, সেগুলোকে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করার বাস্তব সুযোগ তৈরি করা জরুরি। আবাসন শিল্প এমন একটি খাত, যেখানে বিনিয়োগ দ্রুত অর্থনৈতিক চক্রে ফিরে এসে নির্মাণ শিল্প, ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক, পরিবহনসহ অসংখ্য লিংকেজ শিল্পকে সক্রিয় করে তোলে।

তিনি বলেন, সরকার যদি স্বচ্ছ নীতিমালার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে অপ্রদর্শিত অর্থ আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়, তাহলে তা একদিকে যেমন রিয়েল এস্টেট বাজার গতিশীল হবে, অন্যদিকে সামগ্রিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে আবাসন সংকট মোকাবিলা, নগর উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয় বলে মনে করেন আলী আফজাল। তাঁর মতে, দীর্ঘ মেয়াদে এমন করব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে করহার যৌক্তিক হবে, কর প্রদান সহজ হবে এবং মানুষ স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত হবে। করের বোঝা অতিরিক্ত হলে মানুষ কর ফাঁকির পথ খোঁজে, কিন্তু করহার যৌক্তিক হলে রাজস্ব আদায়ও বাড়ে এবং অপ্রদর্শিত অর্থ সৃষ্টির প্রবণতাও কমে।

তবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়াকে অসাংবিধানিক, দুর্নীতি সহায়ক ও বৈষম্যমূলক বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। জানতে চাইলে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, এমন সুযোগ দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতিকে আইনগত সুরক্ষা দেওয়া ও বিচারহীনতার শামিল। তিনি বলেন, আবাসন খাতে ব্যবসায় স্থবিরতা দূর, শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার অজুহাতে এ জাতীয় দুর্নীতি সহায়ক সুযোগ দেওয়া সরকারের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। এমন সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি ও অনিয়মকে স্বাভাবিকতায় পরিণত করার সমান মন্তব্য তিনি এই সুযোগ চিরতরে বন্ধ করার আহ্বান জানান।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ সমকালকে বলেন, যদি এই সুযোগ দিতেই হয়, তবে দুর্নীতি বা অন্যায়ের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থকে কোনোভাবেই সাদা করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু যারা নানা কারণে রিটার্নে তার অর্থ দেখাতে পারেননি, তাদের এই সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ, বৈধ পথে উপার্জিত কিন্তু কর ফাঁকি দেওয়া অর্থকে নিয়মিত করের চেয়ে কিছুটা বেশি হারে কর ও জরিমানা দিয়ে সাদা করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

তিনি বলেন, আবাসন বা স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে কালো টাকা রোধ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মৌজা রেট বা সরকারি নির্ধারিত মূল্যকে বাজারমূল্যের কাছাকাছি নিয়ে আসা। এর জন্য বাজারভিত্তিক একটি নির্দিষ্ট ফর্মুলা তৈরি করে সময় সময় তা হালনাগাদ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ঝড়ে উপড়ে পড়ল অর্ধশত গাছ যান চলাচল বন্ধ সাড়ে ৩ ঘণ্টা

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ঝড়ে অর্ধশতাধিক গাছ উপড়ে পড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা পর গাছগুলো সরিয়ে নিলে সন্ধ্যায় যান চলাচল শুরু হয়। তবে দীর্ঘ যানজটের কারণে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে যায়। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঝড় শুরু হলে গাছগুলো উপড়ে পড়ে।
গজারিয়া উপজেলার দড়ি বাউশিয়া এলাকা থেকে বাউশিয়া পাখির মোড় পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি ও গাছ উপড়ে পড়ে। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে মহাসড়কের উভয়পাশে প্রায় ২০ কিলোমিটারজুড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকে চরম ভোগান্তিতে পড়েন নারী, শিশুসহ দূরপাল্লার যাত্রী ও পরিবহন কর্মীরা।

হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বিকেলে হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি এবং গাছ উপড়ে মহাসড়কে পড়ে। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সড়কের উভয়পাশে শত শত যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ছোট-বড় যানবাহন আটকা পড়ে। এতে মেঘনা থেকে দাউদকান্দি পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, গজারিয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উভয় পাশে শত শত যানবাহন স্থির দাঁড়িয়ে আছে। একটু পর পর বড় গাছ সড়কে উপড়ে পড়ে আছে। সেগুলো সরিয়ে নিতে কাজ করছেন পুলিশ সদস্য, পল্লী বিদ্যুৎ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। মেঘনা থেকে দাউদকান্দিগামী একটি বাসের যাত্রী নুসরাত জাহান বলেন, মেঘনা থেকে দাউদকান্দি যেতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে। সেখানে দেড় ঘণ্টা বাসে বসে আছি। তিশা পরিবহনের বাসচালক সুমন মিয়া বলেন, বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঝড় শুরু হলে চোখের সামনেই একটি বিশাল গাছ রাস্তার ওপর পড়ে যায়। কোনো রকমে ব্রেক করে গাড়ি থামিয়েছি। আল্লাহর রহমতে বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছি। কিন্তু তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে একই জায়গায় আটকে আছি।

চট্টগ্রামগামী সেন্টমার্টিন পরিবহনের যাত্রী বেসরকারি চাকরিজীবী আনিসুর রহমান বলেন, জরুরি কাজে ঢাকা থেকে রওনা হয়েছিলাম। কিন্তু গজারিয়ায় এসে পুরো রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। বাসের ভেতরে গরমে শিশুরা কষ্ট পাচ্ছে। আশপাশে প্রয়োজনীয় কিছু পাওয়ারও সুযোগ নেই।
মুন্সীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ সফিকুল ইসলাম জানান, বিকেল ৪টা ১২ মিনিটে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে ফায়ার কর্মীরা বাউশিয়া ও মানাবেরসহ বিভিন্ন পয়েন্টে উদ্ধার কাজ শুরু করেন। তিনি আরও জানান, করাত ও আধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে রাস্তার ওপর পড়ে থাকা গাছগুলো কেটে দুই-আড়াই ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে ফেলা হয়। সন্ধ্যার পরপরই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। ভবেরচর হাইওয়ে থানার ওসি কামাল আখন্দ বলেন, ঝড়-বৃষ্টির কারণে বিদ্যুতের খুঁটি ও অর্ধশতাধিক গাছ উপড়ে মহাসড়কের ওপর পড়ে যায়। পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মী ও গজারিয়া ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের সহযোগিতায় গাছ ও খুঁটি অপসারণ করা হয়।

সকালে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ দুপুরেই রাস্তার কাজ শুরু

নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রধান রাস্তা বঙ্গবন্ধু সড়ক। প্রতিদিন এতে যানজট লেগে থাকে। দীর্ঘদিন ধরেই নগরবাসীর দাবি ছিল বিকল্প সড়ক নির্মাণের। সিটি করপোরেশন আগে কিছুটা কাজও করে রেখেছিল। কিন্তু নগরীর চাষাঢ়া মোড়ে গিয়ে রাস্তাটি আটকে ছিল। এবার সেই বিকল্প রাস্তা নিয়ে জোরেশোরে নেমেছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক। গতকাল মঙ্গলবার সকালে চাষাঢ়ার মহিলা কলেজ প্রান্তে এই রাস্তার মুখ দখল করে রাখা স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়। দুপুরেই শুরু হয় রাস্তার নির্মাণ কাজ।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এক সপ্তাহের মধ্যেই ২নং রেলগেট থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত রিকশা চলাচলের উপযোগী রাস্তা নির্মাণ সম্ভব হবে। পরে পর্যায়ক্রমে এই সড়ক ভারী যানবাহন চলাচলের উপযোগী করা হবে।

বঙ্গবন্ধু সড়কের বিকল্প হিসেবে ২নং রেলগেট থেকে চাষাঢ়া রেলস্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের পূর্ব পাশ দিয়ে বিকল্প সড়কের দাবি জানিয়ে আসছিল নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটি। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালীন ২০০৭ সালে এ সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হয়। কিছু অংশ আরসিসি ঢালাই দেওয়াও হয়েছিল। কিন্তু পরে রেলওয়ের বাধায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াৎ হোসেন খান নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে যোগ দিয়েই এই বিকল্প সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেন। এরই অংশ হিসেবে গতকাল সকাল ১০টায় চাষাঢ়ায় নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ সংলগ্ন স্থানে উচ্ছেদ অভিযান চালায় সিটি করপোরেশন। সব কটি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। পরে দুপুরে শুরু হয়ে যায় রাস্তার নির্মাণকাজ।
সেখানে কাজের তদারকি করছিলেন সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আজগর হোসেন। তিনি বলেন, সিমেন্টের ব্লক বসিয়ে বিকল্প পদ্ধতিতে আমরা রাস্তাটি আপাতত নির্মাণ করে দিচ্ছি। গত শনিবারের মধ্যে এ রাস্তা দিয়ে ইনশাআল্লাহ রিকশা চলতে পারবে। এর মুখটি হবে ২০ ফুটের মতো। পরে পর্যায়ক্রমে রাস্তাটির উন্নতি করা হবে। তিনি জানান, এটি চালু হলে বঙ্গবন্ধু সড়কের যানজট অনেক কমে যাবে। রিকশাগুলো বিকল্প পথ ধরে বিভিন্ন মহল্লায় যেতে পারবে।

তবে রাস্তা নির্মাণে ব্যক্তিগত ২ শতাংশ জমিও চলে গেছে বলে দাবি করেন নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন। সিটি করপোরেশনের চিফ অফিসার নূর কুতুবুল আলম বলেন, তাকে দাবির সপক্ষে কাগজপত্র সিটি করপোরেশনে দিতে বলা হয়েছে। এটি আমাদের আইন কর্মকর্তা দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
বিকল্প রাস্তা নির্মাণের জন্য সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াৎ হোসেনকে ধন্যবান জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জাহিদুল হক দীপু বলেন, এ রাস্তাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারায়ণগঞ্জের জমি অনেক মূল্যবান। এ জমি দখলে নিতে নানা মহল তৎপর থাকে। কিন্তু সেসব বাধা ডিঙ্গিয়ে তিনি নগরবাসীর স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করছেন।
গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন বলেন, সাবেক মেয়র আইভী রাস্তার কাজটি শুরু করেছিলেন। সাখাওয়াৎ হোসেন কাজটির পূর্ণতা দিচ্ছেন। এটি অত্যন্ত পজিটিভ উদাহরণ। সাখাওয়াৎ হোসেন নিঃসন্দেহে অন্য কোনো বিষয়ের দিকে না তাকিয়ে জনগণের স্বার্থে কাজ করছেন।
২ নম্বর রেলগেট থেকে চাষাঢ়া প্রায় ১ দশমিক ২ কিলোমিটার। এই অল্প সড়কে বিপুল পরিমাণ যানবাহন চলাচল করে। ঢাকায় না গিয়ে পদ্মা সেতুতে যেতে চট্টগ্রামের দিক থেকে আসা যানবাহন নারায়ণগঞ্জ শহর ব্যবহার করে। ২ নম্বর রেলগেট থেকে চাষাঢ়া ও চাষাঢ়া থেকে পঞ্চবটী নারায়ণগঞ্জের এই অংশটি আঞ্চলিক মহাসড়কের অংশ হয়ে গেছে। যার প্রভাব পড়ছে শহরে।

জরিপ ট্রাম্পের জনসমর্থন আরও কমেছে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা আরও কমেছে। যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সর্বনিম্ন স্তরের কাছাকাছি অবস্থায় রয়েছে।

ইরান যুদ্ধের কারণে আগামীতে জ্বালানি তেলের (গ্যাসোলিন) দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন দেশটির অধিকাংশ নাগরিক। গত সোমবার রয়টার্স ও জরিপ সংস্থা ইপসোসের এক যৌথ জনমত জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

জরিপে অংশ নেওয়া ৩৫ শতাংশ নাগরিক হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন, যা মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে করা আগের জরিপের সমান। এই হার তাঁর চলতি মেয়াদের সর্বনিম্ন রেটিং ৩৪ শতাংশের (এপ্রিলের জরিপ) চেয়ে ১ পয়েন্ট বেশি এবং প্রথম মেয়াদের সর্বনিম্ন রেটিং ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের ৩৩ শতাংশের খুব কাছাকাছি।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মার্কিন নাগরিকদের বড় একটি অংশ এই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের ওপর অসন্তুষ্ট। এই যুদ্ধের জেরেই দেশটিতে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।

সম্প্রতি ইরান যুদ্ধ শেষ হওয়ার গুঞ্জনে জ্বালানির দাম কিছুটা কমলেও ৫৯ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করছেন, আগামী এক বছরে তেলের দাম আরও বাড়বে। বিপরীতে মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ পরিস্থিতি ভালোর দিকে যাওয়ার আশা করছেন।

আইনপ্রণেতাদের বিদ্রোহ তৃণমূল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিপাকে মমতা

দলের আইনপ্রণেতাদের বিদ্রোহ কাটিয়ে উঠবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক দলগুলো পরাজয় কাটিয়ে উঠতে পারে, কিন্তু অনেক সময়ই হঠাৎ করে ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়া সহ্য করতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস একই ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে।

ক্ষমতা হারানোর এক মাস পার হতে না হতেই দলটির বেশির ভাগ আইনপ্রণেতা বিদ্রোহ করে বসেছেন। তাদের এ বিদ্রোহে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, আদৌ দলের ক্ষমতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে থাকবে কিনা। মমতা কোনো সাধারণ আঞ্চলিক নেত্রী নন। ২০১১ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটান, যা অনেকেই ‘অসম্ভব’ বলে মনে করতেন। টাইম ম্যাগাজিন একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিশ্বের একশ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল।

মমতার দলের বিদ্রোহ এরই মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে যে, বিজেপির জোট ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) আবারও সীমানা নির্ধারণ বিল উত্থাপন করবে। জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সীমানা নির্ধারণ বিল ২০১১ সালের জরিপের ভিত্তিতে নির্বাচনী সীমানা ঠিক করতে চায়। গত এপ্রিলে এটি পার্লামেন্টে উত্থাপন করা হলেও প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়। এনডিএর বর্তমানে লোকসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহীরা যেভাবে বিজেপির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, তাতে অনেকেই মনে করছেন আগামীতে এ ইস্যু ফিরে আসবে।

এরই মধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থীদের একহাত নিতে শুরু করেছেন মমতা অনুগত সাংসদরা। গতকাল তৃণমূলের কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘ওদের (বিদ্রোহী আইনপ্রণেতা) নেতা পাল্টে গিয়েছে। ওদের নেতার নাম নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু ডাইরেক্টলি বলতে পারছে না যে বিজেপি করি। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এ মন্তব্যের জবাবে বিদ্রোহী শিবিরের অন্যতম আইনপ্রণেতা কাকলি ঘোষ দস্তিদার বলেন, ‘আমি শুরু থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিলাম। ২০০১ সালে আমি বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে কাউন্সিলর হিসেবে লড়েছিলাম। আমি একটি রাজনৈতিক পরিবার থেকে এসেছি। …আমার মাথা কাটা যেতে পারে, কিন্তু আমি মাথা নত করব না। আমি অনেক সহ্য করেছি। এ ধরনের লোকদের কথায় আমার কিছুই যায়-আসে না।’

এদিকে, মঙ্গলবার মমতা অনুগত আরেক সাংসদ কীর্তি আজাদ দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে বলেন, যদি রাজনৈতিক নৈতিকতা থাকে, যদি সৎ হন, তবে (নিজেদের) তৃণমূলের সাংসদ বলবেন না। রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে পদত্যাগ করা বিদ্রোহী সুখেন্দু শেখর রায়ের উদাহরণ টেনে আজাদ জানান, তাঁর মতো অন্যদেরও তৃণমূল ও সাংসদ পদ ছেড়ে দেওয়া উচিত।
মমতার বাড়িতে তল্লাশি

এদিকে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবর বলছে, স্বাক্ষর জালিয়াতি মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা জানতে তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে গতকাল তল্লাশি চালানোর জন্য সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল ভারতের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মমতার বাড়ি ও তৃণমূল কার্যালয় দুটোই কলকাতার ৩০বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে অবস্থিত। সেখানে সিআইডি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী সঙ্গে নিয়ে পৌঁছানোর পরপরই তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বাধা সৃষ্টি করেন। তৃণমূলের সাবেক সাংসদ তথা দলের কোষাধ্যক্ষ শুভাশিস চক্রবর্তী জানান, মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে রয়েছেন। তিনি তাদের অনুপস্থিতিতে সিআইডিকে প্রবেশ করতে দিতে পারেন না। পরে স্থানীয় সময় বিকেল ৪টার দিকে সিআইডি সেখানে প্রবেশ করে।

সিআইডি মূলত বিধানসভায় জমা পড়া এক চিঠির স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ খতিয়ে দেখছে। ওই চিঠিতে বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। এতে ৭০ জন আইনপ্রণেতার স্বাক্ষর ছিল।

ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন লাগবে, আমানত কমার শঙ্কা

রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়াতে এবং কর ফাঁকি রোধে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত সংস্কারের প্রস্তাব থাকছে। খসড়া প্রস্তাবনা অনুসারে, দেশের যে কোনো ব্যাংকে নতুন ব্যাংক হিসাব খুলতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন প্রদর্শন করতে হবে। বিদ্যমান ব্যাংক হিসাব সচল রাখতেও এই শর্ত মানতে হবে। একই সঙ্গে উৎসে কর বিবরণী জমা না দিলে জরিমানা, বিদ্যুৎ খাতে উৎসে কর হ্রাস এবং স্বর্ণ আমদানিতে খরচ কমানোসহ কয়েকটি রূপরেখা থাকছে আগামী বাজেটে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা সমকালকে বলেন, নতুন এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএনধারীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং সিস্টেমে গ্রাহকের তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া সহজ হবে, যা ব্যাংকিং চ্যানেলে অবৈধ অর্থপ্রবাহ, অর্থ পাচার এবং সন্দেহজনক লেনদেন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে। মূলত বেনামি হিসাব খোলার সুযোগ বন্ধ করতে এবং একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর জালে নিয়ে আসতেই এই আইনি কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। এতে মানুষের প্রকৃত সম্পদ ও আয়ের তথ্য গোপন করা বা কর ফাঁকি দেওয়া কঠিন হবে।
তবে শিক্ষার্থী, সরকারি ভাতাভোগী এবং গেজেটের মাধ্যমে কর অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং নো ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট অর্থাৎ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য বিশেষ সঞ্চয়ী হিসাবের ক্ষেত্রে এ বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় দেওয়া হতে পারে বলে জানান এনবিআর কর্মকর্তারা।

সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিলে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এর ফলে ক্ষুদ্র আমানতকারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশ আইনি ঝামেলা ও করের হয়রানি এড়াতে ব্যাংকে টাকা রাখা কমিয়ে দিতে পারে। এতে ব্যাংকগুলোতে আমানতের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
তাছাড়া, সাধারণ মানুষ ব্যাংকিং চ্যানেলের ওপর আস্থা হারিয়ে টাকা ব্যাংকে না রেখে নিজেদের কাছে রেখে দেবে। ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন না করে নগদে কেনাবেচা করার প্রবণতা বাড়বে। এতে হুন্ডির মাধ্যমে অবৈধ লেনদেন আরও বেশি উৎসাহিত হবে। একই সঙ্গে যারা কেবল ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য বাধ্য হয়ে টিআইএন নেবেন, তাদের বড় অংশই বছর শেষে রাষ্ট্রকে কোনো কর না দিয়ে ‘শূন্য রিটার্ন’ দাখিল করবেন, যা এনবিআরের প্রশাসনিক ফাইলপত্রের চাপ বাড়াবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতি ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার সমকালকে বলেন, সাধারণ মানুষ কিছু অর্থ সঞ্চয় করলে তা সাধারণত ব্যাংকে আমানত হিসেবে রাখে। কিন্তু সরকার এমন চিন্তা-ভাবনা করলে তারা ব্যাংকের ধারেকাছেও আসবে না। এতে আমানত কমে যাবে ব্যাংকে। তিনি বলেন, দেশে দেড় থেকে দুই লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে যাদের কোনো টিআইএন নেই। সরকার সেসব প্রতিষ্ঠানকে টিআইএনের আওতায় আনার পদক্ষেপ নিতে পারে। কারণ তাদের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান করযোগ্য।
এদিকে খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৫০ সিসি বা তার বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল নতুন করে নিবন্ধন করতে হলেও বাধ্যতামূলকভাবে টিআইএন প্রদর্শন করতে হবে। তবে সাধারণ মোটরসাইকেল মালিকদের জন্য স্বস্তির বিষয় হলো, প্রতি বছর নিবন্ধন নবায়নের সময় তাদের অতিরিক্ত কোনো অগ্রিম কর দিতে হবে না। রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে পণ্য সরবরাহের চেইনে নতুন করে কর বসানোর পরিকল্পনা করছে এনবিআর। উৎপাদক বা আমদানিকারকদের কাছ থেকে যখন খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা হবে, তখন সরবরাহের মোট মূল্যের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ হারে অগ্রিম কর সংগ্রহ করা হবে। অর্থাৎ প্রতি এক হাজার টাকার পণ্য কেনাবেচায় দুই টাকা কর দিতে হবে। এছাড়া আবাসন খাতে স্বচ্ছতা আনতে জমি বা ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এলাকাভিত্তিক করের হার পুনর্বিন্যাস করার পাশাপাশি উৎসে কর সংগ্রহের নতুন কাঠামো প্রস্তাব করা হবে।

পাশাপাশি কোনো প্রতিষ্ঠান বা উইথহোল্ডিং অথরিটি যদি সময়মতো উৎসে করের বিবরণী বা ‘উইথহোল্ডিং রিটার্ন’ দাখিল করতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য উইথহোল্ডার্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি একটি স্বতন্ত্র ডেটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের বিপরীতে বিদ্যমান উৎসে করের হার ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হতে পারে। এর ফলে বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক উৎপাদন খরচ কমবে এবং বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর পুঁজি সংকট দূর হবে।