Home Blog Page 85

ইরানের ‘সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে’: ট্রাম্প

যুদ্ধবিরতি আলোচনা থমকে যাওয়ায় ইরানকে আবারও কড়া বার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের জন্য ‘সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে’।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘তাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে শেষ পর্যন্ত তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। এখন সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু-এর সঙ্গে ফোনালাপের ঠিক আগে ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন।

এদিকে ইরানের গণমাধ্যম দাবি করেছে, সংঘাত নিরসনে তেহরান যে প্রস্তাব দিয়েছে, তার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র কোনো বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি হয়নি। ওয়াশিংটনের অনড় অবস্থানের কারণেই আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

এর আগে এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার ঠিক আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইরান সমঝোতায় না এলে ‘পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে’। সাম্প্রতিক বক্তব্যেও সেই একই ধরনের কড়া অবস্থানের প্রতিফলন দেখা গেছে।

সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প ইরানের দাবিগুলোকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি কার্যত ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে।

তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দাবি করেছেন, তেহরানের প্রস্তাব ছিল ‘দায়িত্বশীল’ এবং ‘উদার’।

আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, ইরানের দাবির মধ্যে ছিল সব ফ্রন্টে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি, বিশেষ করে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করা। পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলো থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে আর হামলা না চালানোর নিশ্চয়তাও চাওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতিও দাবি করেছে তেহরান।

অন্যদিকে আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ফারসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা পাঁচটি শর্ত দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-ইরানকে শুধু একটি পারমাণবিক স্থাপনা চালু রাখার অনুমতি দেওয়া হবে এবং তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে হবে।

গত শুক্রবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরান যদি ২০ বছরের জন্য তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত রাখতে রাজি হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সেটি বিবেচনা করতে পারে। এতে বোঝা যাচ্ছে, ওয়াশিংটন হয়তো আগের ‘সম্পূর্ণ বন্ধ’ অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের ওপর ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। পরে আলোচনা এগিয়ে নিতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হলেও মাঝেমধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

বর্তমানে ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় এর প্রভাব বিশ্ববাজারে পড়েছে। ইরানের পদক্ষেপের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়ে গেছে।

তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাব হিসেবেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে বন্দর অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে দুই দেশের মধ্যস্থতায় কাজ করছে পাকিস্তান। তবে এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব রয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইবোলার নতুন প্রাদুর্ভাব কতটা উদ্বেগজনক?

ডিআর কঙ্গো-এ নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা ভাইরাস নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে অজান্তেই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে এমন এক অঞ্চলে, যেখানে চলমান সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এবার যে ধরনের ইবোলা শনাক্ত হয়েছে, সেটিও তুলনামূলক বিরল।

বিশ্বের জন্য কি বড় হুমকি?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইবোলা প্রাদুর্ভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেও, বিশেষজ্ঞরা আশ্বস্ত করছেন যে, এটি কোভিড-১৯-এর মতো বিশ্বব্যাপী মহামারির রূপ নেবে না। বিশ্বজুড়ে এই ভাইরাসের বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অত্যন্ত কম। এমনকি ২০১৪-১৬ সালের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের সময়েও যুক্তরাজ্যে মাত্র তিনজন আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তারা সবাই ছিলেন স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যকর্মী।

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যানডেমিক সাইন্সেস ইনস্টিটিউটের ড. আমান্ডা রোজেক বলেন, বিশ্বব্যাপী মহামারির ঝুঁকি না থাকলেও, এই ঘোষণা প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি যথেষ্ট জটিল এবং এর জন্য আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্রয়োজন।

তবে কঙ্গোর প্রতিবেশী দেশ উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান ও রুয়ান্ডার জন্য বড় ঝুঁকি রয়েছে। ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য ও যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে উগান্ডায় এরই মধ্যে দুজনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে একজন মারা গেছেন।

প্রাদুর্ভাব কতটা গুরুতর?

বর্তমানে প্রায় ২৫০টি সন্দেহভাজন সংক্রমণ এবং ৮০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

কোন ধরনের ইবোলা ছড়াচ্ছে?

এবারের প্রাদুর্ভাব ঘটিয়েছে ‘বুন্ডিবুগিও’ প্রজাতির ইবোলা ভাইরাস। এটি খুবই বিরল এবং আগে মাত্র দুইবার বড় প্রাদুর্ভাব ঘটিয়েছে-২০০৭ ও ২০১২ সালে।এই ধরনের ইবোলার জন্য এখনো অনুমোদিত কোনো ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

লক্ষণ কী কী?

সংক্রমণের দুই থেকে ২১ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রথমে সাধারণ ফ্লুর মতো লক্ষণ দেখা দেয়, যেমন-জ্বর, মাথাব্যথা, ক্লান্তি। পরে পরিস্থিতি গুরুতর হলে দেখা দিতে পারে- বমি, ডায়রিয়া, শরীরের অঙ্গ বিকল হওয়া, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ।

কীভাবে ছড়ায়?

ইবোলা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল-যেমন রক্ত, বমি বা অন্যান্য নিঃসরণের মাধ্যমে ছড়ায়। সাধারণত উপসর্গ প্রকাশের পর সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।

চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

নির্দিষ্ট ওষুধ না থাকায় আক্রান্তদের তরল খাবার, পুষ্টি ও ব্যথানাশক সেবার (সাপোর্টিভ কেয়ার) মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা শুরু করলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়।

দেরিতে শনাক্ত 

কঙ্গোয় গত ২৪ এপ্রিল প্রথম এক নার্সের শরীরে লক্ষণ দেখা দিলেও প্রাদুর্ভাব নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তিন সপ্তাহ সময় লেগেছে। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের ড. অ্যান কোরি বলেন, বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে অলক্ষ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর পর এটি শনাক্ত হয়েছে, যা বেশ উদ্বেগজনক। ডব্লিউএইচও আশঙ্কা করছে, বর্তমানে যে সংখ্যার কথা জানা যাচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে আক্রান্তের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।

বর্তমানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আক্রান্তদের দ্রুত আইসোলেশন, তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং হাসপাতাল ও দাফন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেন সংক্রমণ না ছড়ায়, সে চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে কঙ্গোর যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে, যেখানে আড়াই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত, সেখানে এই কাজ অত্যন্ত কঠিন। আক্রান্ত অঞ্চলের অনেকগুলোই খনি এলাকা, যেখানে মানুষের যাতায়াত অনেক বেশি। ফলে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত আক্রান্তদের শনাক্ত করা, তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ ঠেকানো। তবে ইতিবাচক দিক হলো, ডিআর কঙ্গোর আগেও ইবোলা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এখনকার পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে নাকি এটি বড় আকারের সংকটে পরিণত হবে।

মোটরসাইকেলে অগ্রিম আয়কর বসাবেন না এনবিআরের প্রতি বাইকারদের আবেদন

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মোটরসাইকেলে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আরোপের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশের পর সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা। পরে তারা এনবিআর চেয়ারম্যান বরাবর স্মারকলিপিও দেন।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত বাজেটে ১১১ থেকে ১২৫ সিসির মোটরসাইকেলের জন্য বছরে দুই হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসির জন্য পাঁচ হাজার টাকা ও ১৬৫ সিসির বেশি হলে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রাথমিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে দেশের লাখ লাখ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে বাজেটের নীতিগত রূপরেখা ও কর প্রস্তাব পেশ করেছে এনবিআর। তবে প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, মোটরসাইকেলের এই করহার অনেক বেশি। তাই তিনি তখন ১১১ থেকে ১২৫ সিসিতে এক হাজার, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত তিন হাজার টাকা। ১৬৫ সিসির বেশি হলে প্রতিবছর পাঁচ হাজার টাকা কর নির্ধারণের নির্দেশনা দেন।

গতকাল মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বাইকাররা বলেন, বাংলাদেশে মোটরসাইকেল এখন শুধু শখের বাহন নয়; বরং দৈনন্দিন যাতায়াত ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও রাইড শেয়ার চালকরা সময় বাঁচাতে ও যানজট এড়াতে মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল।

মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের পক্ষে এনবিআরে স্মারকলিপি জমা দেন ও মানববন্ধনে কথা বলেন এ কে এম ইমন নামের একজন বাইকার। তিনি বলেন, বাইক সাধারণ মানুষের একমাত্র বাহন। রাইড শেয়ার কিংবা পণ্য ডেলিভারি দিয়ে বাইকের মাধ্যমে দৈনিক ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা আয় করা যায়। এই টাকা দিয়েই চলে অনেকের সংসার। কিন্তু বাইকে কর আরোপ করা হলে এসব মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানববন্ধনে বেশ কয়েকজন নারী বাইকাররাও অংশ নেন। তাদের একজন শিউলি রহমান বলেন, ঢাকায় গণপরিবহন ব্যবস্থা ভালো নয়। নিরাপদ যাতায়াতের জন্য মাথায় ঝুঁকি নিয়ে বাইক নিতে হয়েছে। কর আরোপ করা হলে বাইকারদের ঘাড়ে অনেক চাপ পড়বে।

যশোরেও মানববন্ধন

একই দাবিতে গতকাল বাংলাদেশ বাইকার অ্যাসোসিয়েশন যশোর জেলা শাখার উদ্যোগে প্রেস ক্লাব যশোরের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলার শতাধিক বাইকার অংশ নেন। মানববন্ধনে নেতৃত্ব দেন যশোর বাইকিং কমিউনিটির অ্যাডমিন ও সংগঠনের সভাপতি এসকে সুজন। পরে অংশগ্রহণকারীরা জেলা প্রশাসক বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন।

ঋণের বন্ধকি সম্পত্তির বড় অংশই অস্তিত্বহীন

একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণের বন্ধকি সম্পত্তির আর্থিক মূল্যায়ন করিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে দেখা গেছে, পাঁচ ব্যাংকের এক লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তির বাজারমূল্য আছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। মোট ঋণের যা মাত্র ২৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ। আর ফোর্স সেল ভ্যালু বা তাৎক্ষণিক বিক্রয়মূল্য রয়েছে ৩১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। মোট ঋণের যা ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রস্তুত করা সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ১০০ টাকা বন্ধকি সম্পত্তির বিপরীতে ব্যাংকগুলো ৫০ থেকে ৮০ টাকা ঋণ দিতে পারে। ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার সময় এ রকম দেখিয়েছে। তবে সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠান যাচাই করে কয়েক গুণ বেশি দেখানোর তথ্য পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যে সম্পত্তি বন্ধক দেখানো হয়েছে, তার কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংকের। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব ব্যাংকের সম্পত্তির অস্তিত্ব নেই। আবার ঋণের বেশির ভাগ বেনামি এবং সুবিধাভোগী পলাতক থাকায় নতুন করে বন্ধক বা আদায় করা যাচ্ছে না। তবে এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। এ রকম অবস্থায় এসব ব্যাংকের অবস্থার উন্নতির জন্য অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন করে তাদের কাছে বিক্রির সুপারিশ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে দুই লাখ টাকা করে ফেরত দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়োগ দেওয়া প্রশাসকদের মাধ্যমে অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে আট লাখ ২২ হাজার গ্রাহককে তিন হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। আরও আট হাজার কোটি টাকার বেশি ফেরতের কার্যক্রম চলছে। একজন আমানতকারীর যত অর্থই জমা থাকুক, এ প্রক্রিয়ায় তিনি দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাচ্ছেন। ব্যাংকগুলোর নিজস্ব অর্থের বাইরে এ দেওয়া হচ্ছে। ফলে এসব ব্যাংকের সমপরিমাণ দায় কমে আসছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়ে গত এপ্রিল শেষে এক লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে। মোট ঋণের যা ৮৬ শতাংশ। মোট আমানত কমে এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে। এর বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে বিশেষ ধার হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৫৯ হাজার কোটি টাকা। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মূলধন হিসেবে সরকার এরই মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। অবশ্য ব্যাংকটির মোট মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থের মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের মধ্যে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ শেয়ার ইস্যু করা হবে। আর প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের দেওয়া হবে আরও সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার শেয়ার। এভাবে ব্যাংকটি সরকারি মালিকানায় চলার পর এক পর্যায়ে আবার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চার মাস আগে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণ ছিল এক লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে ছিল এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। এর মানে ঋণ কমলেও খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। ব্যাংক খাতের মোট মূলধন ঘাটতির অর্ধেকের বেশি এই পাঁচ ব্যাংকে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল দুই লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে পাঁচ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এক লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।

একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা এক্সিমের গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৩ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৬২ দশমিক ৪৫ শতাংশ ছিল খেলাপি। আর মূলধন ঘাটতি ২২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। একীভূত হওয়ার আগে এক্সিম ব্যাংকের কর্তৃত্ব ছিল নাসা গ্রুপের কর্ণধার নজরুল ইসলাম মজুমদারের হাতে। বাকি চার ব্যাংক পরিচালিত হতো এস আলম গ্রুপের কর্তৃত্বে।

এই চার ব্যাংকের মধ্যে খেলাপি ঋণের সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকা ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৮ হাজার ১৭ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৯৭ দশমিক ৬৪ শতাংশই খেলাপি। মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৬২ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা ঋণের ৯৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ খেলাপি। ব্যাংকটির ৬৫ হাজার ৯০ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি রয়েছে।

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৪ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা ঋণের ৯৬ দশমিক ২৭ শতাংশ খেলাপি। মূলধন ঘাটতি রয়েছে ১৩ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা। আর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩৮ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে ৭৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ খেলাপি। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ১১৪ কোটি টাকা।

জামায়াত ছাড়তে ধর্মভিত্তিক ৪ দলকে হেফাজতের চাপ

জামায়াতে ইসলামীর জোট ছাড়তে নির্বাচনের পরও ধর্মভিত্তিক চারটি দলকে চাপ দিচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। এ দলগুলোর শীর্ষ নেতারা হেফাজতের পদেও রয়েছেন। তাদের বার্তা দেওয়া হয়েছে, জামায়াত জোট বা হেফাজত– যে কোনো একটি বেছে নিতে হবে। তবে তারা জোট ও হেফাজত দুই জায়াগায় থাকতে চান। উদাহরণ দিচ্ছেন, বিএনপির সঙ্গে থাকা কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দলগুলোর নেতারা দুই জায়গায় থাকতে পারলে, তারা কেন পারবেন না?

দলগুলোর এবং হেফাজত নেতারা এসব তথ্য জানিয়েছেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর মতবাদকে ভ্রান্ত আখ্যা দেন কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এবং মহাসচিব সাজিদুর রহমান। জামায়াতকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে ভোট না দিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। হেফাজত আমির ফতোয়া দিয়েছিলেন, জামায়াত জোটকে ভোট দেওয়া হারাম।

যদিও হেফাজত ঘনিষ্ঠ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন এবং নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক। বাংলাদেশ খেলাফতের আমির মামুনুল হক হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব। দলটির শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাই হেফাজতের বিভিন্ন পদে রয়েছেন।

খেলাফতের অপরাংশের আমির আবদুল বাছিত আজাদ এবং মহাসচিব ড. আহমেদ আবদুল– দুজনেই হেফাজতের নায়েবে আমির। নেজামে ইসলামের মহাসচিব মুসা বিন ইজহার হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব। খেলাফত আন্দোলনের আমিরে শরিয়ত হাবিবুল্লাহ মিয়াজী হেফাজতের নায়েবে আমির।

হেফাজত-সংশ্লিষ্ট জমিয়ত উলামায়ে ইসলামের দুই অংশ বিএনপির সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। ইসলামী ঐক্যজোট নির্বাচনী সমঝোতা না করলেও, বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলছে। এই তিনটি দলের নেতাদের বিএনপি ছাড়তে চাপ দিচ্ছে না হেফাজত।

জামায়াত জোটে থাকা হেফাজত-সংশ্লিষ্ট চারটি দলগুলোর একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করে সমকালকে বলেছেন, হেফাজত ও জোট দুই জায়গাতেই থাকবেন তারা। দীর্ঘদিনের সম্পর্কসহ নানা কারণে হেফাজত সংগঠন হিসেবে বিএনপির দিকে বেশি ঝুঁকে গেছে। হেফাজত ছাড়বেন না, তবে এই অবস্থার পরিবর্তন আনার চেষ্টা করবেন।

এই চারটি দল ছাড়াও জামায়াত, এনসিপিসহ ১১টি দল মিলে নির্বাচনী ঐক্য গঠন করেছিল। নির্বাচনের পর দলগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে সম্মিলিতভাবে বিরোধী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে সংসদে। জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবিতে সংসদের বাইরে জোটবদ্ধ থাকবে। এই দাবিতে গত শনিবারও রাজশাহীতে সমাবেশ করেছে ১১ দল। আগামী জুলাই পর্যন্ত জোটের কর্মসূচি চলবে।

নির্বাচনের পরও চাপ

জামায়াতের জোটে ছিল চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনও। দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জামায়াতের কড়া সমালোচক ছিল। তবে গত বছরের সেপ্টেম্বরে দল দুটি প্রকাশ্য সম্পর্কে আসে। সংস্কারের দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন করে। তবে আসন বণ্টন নিয়ে টানাপোড়েন জোট ভাঙে জামায়াত ও চরমোনাই পীরের।

এরপর থেকে আবারও জামায়াতের সমালোচনায় মুখর হয়েছে ইসলামী আন্দোলন। এই দলটি হেফাজতের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট না হলেও, একই ভাষায় সমালোচনা করছে। নির্বাচনের আগে হেফাজতের শীর্ষ ‘মুরব্বিরা’ জামায়াতের বিরুদ্ধে যেমন প্রচার করেছেন, ভোটের পর কওমিভিত্তিক চার দলকে চাপ দিচ্ছেন জামায়াত ছাড়তে।

চারটি দলের সঙ্গে আলোচনা করতে গত ২৮ এপ্রিল কমিটি গঠন করে দেন হেফাজত আমির। এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরী নেতৃত্বাধীন এই কমিটি। কমিটি বৈঠকও করে দলগুলোর সঙ্গে। এতে গুঞ্জন ছড়ায় জামায়াত জোট না ছাড়া দলগুলোর নেতাদের হেফাজত থেকে বহিষ্কার করা হবে।

এসব আলোচনার মধ্যেই রোববার মামুনুল হক চট্টগ্রামের জামিয়া ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা করেছেন হেফাজত আমিরের সঙ্গে। বৈঠকের পর মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী দাবি করেন, হেফাজতের মধ্যে বিভেদ নেই।

মামুনুল হক বলেন, হেফাজতের আমির যে বিশ্বাস ও আকিদার কথা বলেন তা বাংলাদেশ খেলাফতসহ সংগঠনের যুক্ত সব দল তা ধারণ করে। বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে বিভিন্ন মত ও পথের দল নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্য গঠিত হয়।  জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের সঙ্গে আকিদা, বিশ্বাস ও আদর্শিক পার্থক্য আগের মতোই রয়েছে। ১১ দল আদর্শিক নয়, রাজনৈতিক ঐক্য।

বৈঠকে উপস্থিত থাকা হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন সমকালকে বলেন, হেফাজত অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে রয়েছে, থাকবে। সংগঠনে যুক্ত নেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে রয়েছেন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তারা রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী নিয়ে থাকেন। এই বক্তব্যই হেফাজত আমিরকে জানানো হয়েছে। তিনি সবার মুরব্বি হিসেবে নিশ্চয় বিষয়টি বুঝেছেন। জোট না ছাড়লে হেফাজত থেকে বহিষ্কারের গুঞ্জন সঠিক নয়।

যদিও এবারের ৫ মে হেফাজত এককভাবে কর্মসূচি করতে পারেনি। ঢাকায় ইসলামী ঐক্যজোটের নেতারা লালবাগে কর্মসূচি করেন। মাওলানা মামুনুল হক হেফাজতের পরিবর্তে ‘শাপলা স্মৃতি সংসদ’-এর ব্যানারে কর্মসূচি করেন। এতে জামায়াত জোটে থাকা হেফাজত নেতারা আসেন।

বৈঠকে যায়নি বাকি তিন দল 

খেলাফত মজলিসের অপরাংশ, নেজামে ইসলাম এবং খেলাফত আন্দোলনকেও ডাকা হয়েছিল রোববারের বৈঠকে। তবে তাদের সবার পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন মামুনুল হক। এই দলগুলোর একাধিক নেতা সমকালকে বলেন, হেফাজত যে জামায়াতকে ছাড়তে চাপ দিচ্ছে তাতে তারা নীতিগতভাবে একমত নন। তারা হেফাজত আমিরের কমিটিকে জানিয়েছেন, একসময় জামায়াতের সঙ্গেই বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে ছিলেন তারা। তখন যদি প্রশ্ন তোলা না হয়, তবে এখন কেন আপত্তি করা হচ্ছে?

নির্বাচনের আগে হেফাজতের শীর্ষ নেতারা দুই দফা গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করেন। বিএনপিকে নির্বাচনে সমর্থন করেছেন। হেফাজতের পদে থাকা জমিয়ত নেতাদের মধ্যে উবায়দুল্লাহ ফারুক, জুনায়েদ আল হাবিব, মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি, মনির হোসেইন কাসেমী নির্বাচন করেন বিএনপির সমর্থনে। ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন জমিয়তের অপরাংশের নেতা রশিদ ওয়াক্কাস। এই উদাহরণ দিয়ে জামায়াত জোটে থাকা হেফাজত নেতারা বলেছেন, জমিয়ত যদি বিএনপির জোটে থেকে হেফাজতে থাকতে পারে, তাহলে তারা কেনো পারবেন না?

জামায়াত জোটে থাকা খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ডা. আহমদ আবদুল কাদের সমকালকে বলেন, হেফাজত সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন। এই সংগঠনের নেতারা রাজনৈতিকভাবে কে কোন দলে জোটে থাকবে, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কোন দল কার সঙ্গে জোট করবে, তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যা সব দল ও নেতার জন্যই প্রযোজ্য।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং ১১ দলের সমন্বয়কারী হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, কোনো দলই জোট ছাড়ছে না। বরং জোট দৃঢ় হচ্ছে জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংস্কারের জন্য।

খামারিদের হিসাব মিলছে না

কোরবানির ঈদ ঘিরে দেশের বিভিন্ন এলাকার খামারে খামারে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র প্রস্তুত হচ্ছে পশুর হাট। তবে এবারের কোরবানির বাজারে স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তিই বেশি। পশুখাদ্য, শ্রমিক, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খরচ লাগামহীন থাকায় পশুর ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন খামারিরা।

সরকার বলছে, দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংকট নেই। বরং চাহিদার চেয়ে প্রায় ২২ লাখ বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ের খামারিরা বলছেন, ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, পশু আছে ঠিকই, কিন্তু উৎপাদন খরচ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন তারা। ফলে কোরবানির পশুর দাম গতবারের চেয়ে বেশ বাড়তে পারে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর দাম বাড়ার শঙ্কাই বেশি। খামারিরা যেমন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায়, তেমনি সাধারণ ক্রেতারাও অপেক্ষায় আছেন শেষ পর্যন্ত কোরবানির পশুর দাম কোথায় গিয়ে ঠেকে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে এক কোটি এক লাখ ছয় হাজার ৩৩৪টি। এর বিপরীতে প্রস্তুত রয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এর মধ্যে গরু-মহিষ ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতির পশু পাঁচ হাজার ৬৫৫টি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মাঠ পর্যায়ে কত পশু হাটে ওঠে, কত বিক্রি হয়, আর কত পশু অবিক্রীত থেকে খামারে ফেরত যায়– সেই বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। ফলে উৎপাদনের সরকারি হিসাব বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতাও খামারিদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, করোনার আগে দেশে বছরে এক কোটির বেশি পশু কোরবানি হতো। তবে করোনার পর থেকে সেই সংখ্যা কমে গেছে। ২০২১ সালে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল প্রায় এক কোটি ১৯ লাখ, অথচ কোরবানি হয়েছিল ৯০ লাখের কিছু বেশি পশু। প্রায় ২৮ লাখ পশু বিক্রি হয়নি। গত বছরও ৩৩ লাখের বেশি পশু অবিক্রীত ছিল। ফলে এবারও অনেক খামারি শঙ্কা করছেন, চাহিদা প্রত্যাশার চেয়ে কম হলে আবারও লোকসান গুনতে হতে পারে।

ঢাকায় ঘাটতি, উত্তরাঞ্চলে উদ্বৃত্ত

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে এবার কোরবানির পশুর ঘাটতি রয়েছে। ঢাকায় সম্ভাব্য চাহিদা ২১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৯টি হলেও প্রাপ্যতা ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৯৪২টি। অর্থাৎ, ঘাটতি প্রায় সাড়ে সাত লাখ। চট্টগ্রামেও প্রায় ৫০ হাজার পশুর ঘাটতির তথ্য রয়েছে। অন্যদিকে, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগে বড় ধরনের উদ্বৃত্ত রয়েছে। শুধু রাজশাহী বিভাগেই চাহিদার চেয়ে প্রায় ১৯ লাখ বেশি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো থেকেই মূলত রাজধানীর বাজারে গরু আসবে।

খাদ্যের দামেই বাড়ছে ব্যয়

খামারিদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ পশুখাদ্যের বাজার নিয়ে। তারা বলছেন, গত দুই বছরে দানাদার খাদ্যের দাম বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ভুসি, খইল, খুদ, খড়, ঘাসসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি ও বিদ্যুৎ খরচও বেড়েছে।

রাজধানীর মেরাদিয়া এলাকার আদিল ডেইরি ফার্মের মালিক আদিল হোসেন জানান, কুষ্টিয়া থেকে গরু এনে খামারে রাখা হচ্ছে। এবার তাঁর খামারে ১৫০ থেকে ২০০ গরু তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে মাঝারি আকারের গরুর দাম এবার বেশি থাকবে। তিনি বলেন, পশুখাদ্যের খরচ বাড়ার কারণে আগে যে গরু এক লাখ টাকার একটু বেশি দামে বিক্রি হতো, এবার সেই গরু দেড় লাখের কাছাকাছি যেতে পারে।

ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় সামারাই ক্যাটল ফার্ম লিমিটেডেও এখন কোরবানির প্রস্তুতি চলছে। খামারটির মালিক ও বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি নিলয় হোসেন বলেন, আমার এখানে ২০০ থেকে এক হাজার ১০০ কেজি ওজনের গরু রয়েছে। তবে বড় গরুর চাহিদা এবার কম থাকবে। তিনি বলেন, গরুর খাদ্যের দাম, পরিবহন খরচ, শ্রমিকের মজুরিসহ সবকিছু বেড়েছে। আগে যে মাঝারি গরু এক লাখ টাকায় পাওয়া যেত, এবার সেটি দেড় লাখে যেতে পারে। তিনি বলেন, অতীতে দেখা গেছে বড় গরু কিনলে ক্রেতাকে নানা ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। ফলে বড় গরুর ক্রেতারা খামারে আসছেন না। এতে বড় খামারিরা লোকসানে পড়বেন। অনেক খামারি খামার বন্ধ করে দিয়েছেন।

পাবনার বেড়া উপজেলার খামারি লালচাঁদ মোল্লা বলেন, গত বছরের চেয়ে গমের ভুসির বস্তা ৩০০ টাকা, মসুরের ভুসি ২০০ টাকা, ধানের গুঁড়া ৩০০ টাকা বেড়েছে। খড়ের দামও অনেক বেশি। তাঁর হিসাবে, প্রতি মণ গরু পালনে এখন খরচ পড়ছে প্রায় ২৮ হাজার টাকা। শ্রমিক রেখে পালন করলে সেই খরচ আরও বাড়ে। তিনি বলেন, ৩৩ থেকে ৩৪ হাজার টাকা মণ দর না পেলে লাভ করা সম্ভব নয়।

নওগাঁর খামারি একরামুল হাসান বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা দানাদার খাবারের বাজার নিয়ন্ত্রণ নেই। তিন মাসে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেড়েছে।

গাইবান্ধার খামারিরাও একই অভিযোগ তুলেছেন। তাদের ভাষ্য, আগে যে খাবার ৪০ টাকায় কেনা যেত, এখন সেটি ৬০ টাকা। চুয়াডাঙ্গার খামারিরা বলছেন, এবার তীব্র গরম ও লোডশেডিং নতুন করে ব্যয় বাড়িয়েছে। গরুকে সুস্থ রাখতে সারাক্ষণ বৈদ্যুতিক পাখা চালানো, পানি ছিটানো ও ঠান্ডা পরিবেশ নিশ্চিত করতে হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ বিল ও শ্রম খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ।

পরিবহন, হাটের হাসিল, মধ্যস্বত্বভোগীর কমিশনসহ সবকিছু যোগ হয়ে রাজধানীর বাজারে দাম আরও বাড়বে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গাবতলীর গরু ব্যবসায়ী তৈয়ব আলী বলেন, খামার থেকেই দাম বেশি। মাঝারি গরুতে অন্তত ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বাড়তি পড়ছে। ছোট আর বড়– দুই ধরনের গরুতেই এবার দাম বাড়বে।

বড় গরুতে ঝুঁকি, বাড়ছে ছোট গরুর চাহিদা

বাজার বিশ্লেষক ও খামারিরা বলছেন, বড় গরুর চেয়ে এবার ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি থাকবে। কারণ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

জয়পুরহাটের খামারি সাগর হোসেনের অভিজ্ঞতা এখন অনেকের জন্য সতর্কবার্তা। ২০২৪ সালে প্রায় এক হাজার কেজি ওজনের একটি গরু বিক্রি না হওয়ায় তিনি আরও এক বছর লালন-পালন করেন। পরে সেটি আগের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে দেড় লাখ টাকার বেশি অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয়েছে তাঁকে। তিনি বলেন, এত বড় গরু পালার সাহস এখন আর পাই না।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন জয়পুরহাটের আরেক খামারি সুমন হোসেন। তিনি বলেন, এবার বড় গরু কম রেখেছি। ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি।

খামারিদের বড় উদ্বেগ ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশ। তারা বলছেন, সীমান্ত দিয়ে গরু ঢুকলে দেশি খামারিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন না। পাবনার খামারি লালচাঁদ মোল্লা বলেন, ভারতের গরু এলে স্থানীয় খামারিরা বড় ক্ষতিতে পড়বেন।

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্তবর্তী হাট বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে বিদেশি গরু বাজারে প্রবেশ করতে না পারে। তিনি বলেন, খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার কাজ করছে। উৎপাদন খরচ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু অযৌক্তিকভাবে দাম যেন না বাড়ে সে বিষয়েও নজর রাখা হবে।

গতকাল রোববার বগুড়ায় প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প আয়োজিত এক সেমিনারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, খামারির স্বার্থ সুরক্ষা এবং স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে টেকসই করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। সরকারের লক্ষ্য এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে একদিকে খামারিরা তাদের উৎপাদিত পশুর ন্যায্যমূল্য পাবেন, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তারাও সহনীয় দামে কোরবানির পশু কেনার সুযোগ পাবেন।

জুলাইয়ের ৭৯৮ মামলায় ৫০৭৪ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ৪ আগস্ট বিকেলে রাজধানীর বাংলামটরে আন্দোলনে অংশ নিয়ে বেলাল হোসেন রাব্বি নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চার দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ ঘটনায় তাঁর মা জেসমিন আক্তার শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়।

পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মামলার তদন্তে নেমে এজাহারে উল্লেখ আসামিদের মধ্যে ১০ জনের বিরুদ্ধে রাব্বি হত্যাকাণ্ডে কোনো সংশ্লিষ্টতা পায়নি। তবে এজাহারভুক্ত ১২ জনের পাশাপাশি এবং তদন্তে নতুনভাবে শনাক্ত আরও ছয়জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় আদালতে ১৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে পিবিআই।

শুধু রাব্বি হত্যা মামলা নয়; জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে হয়রানিমূলক আসামি করা হয়েছিল বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। এ জন্য ৭৯৮টি মামলায় ৫ হাজার ৭৪ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য আদালতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ।

পাশাপাশি অন্তত ৪০টি মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কোনো মামলা তদন্ত করার পর সাক্ষ্য-প্রমাণ না পেলে বা মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হলে আদালতে যে প্রতিবেদন দাখিল করে সেটিকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন বলে। এ ছাড়া পুলিশ গত ১৬ মে পর্যন্ত জুলাইয়ের ১৭৫টি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। এতে মোট আসামি ১৩ হাজার ৮২৪ জন।

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা হয়। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৭৯৯টি, হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারায় ১ হাজার ৫৬টি।

অভিযোগপত্র দেওয়া মামলাগুলোর মধ্যে ৪৯টি হত্যা মামলা। এতে অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি সংখ্যা ৪ হাজার ৭২৩। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৭১ জন এজাহারনামীয়, বাকি ১ হাজার ৪৫২ জনের নাম পুলিশের তদন্তে উঠে আসে। এ ছাড়া হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারার ১২৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ৯ হাজার ১০১। এর মধ্যে ৬ হাজার ১৭৪ জন এজাহারনামীয়, বাকি ২ হাজার ৯২৭ জনের নাম পুলিশের তদন্তে উঠে আসে।

ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে জনবান্ধব ও হয়রানিমুক্ত করার লক্ষ্যে কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর-১৮৯৮ এ ধারা ১৭৩ (এ) সংযোজন করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। এই ধারা অনুযায়ী, হয়রানিমূলক কারও নাম কোনো মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে (এফআইআর) অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকলে তদন্ত কর্মকর্তা অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করবেন এবং আদালত প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে অভিযুক্তকে অব্যাহতি দিতে পারবেন। এই ধারার আওতায় ডিএমপির বিভিন্ন থানার ৩৫৪ মামলায় ৩ হাজার ৮৪৯ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য আদালতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দেয় পুলিশ।

এর বাইরে সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) বিভিন্ন থানার ৩৯টি মামলায় ১৪৪ জনকে, চট্টগ্রামে (সিএমপি) ১৯টি মামলায় ৫২ জন, গাজীপুরে (জিএমপি) ১২টি মামলায় ২১ জন, রাজশাহীতে (আরএমপি) ১০টি মামলায় ২৫ জন, বরিশালে (বিএমপি) ৩টি মামলায় ৬ জন, খুলনায় (কেএমপি) ১টি মামলায় ৫ জন ও রংপুরে (আরপিএমপি) ২টি মামলায় ৬ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

একইভাবে ঢাকা রেঞ্জের ৯টি জেলার ২১১টি মামলায় ৪৮৫ জন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ৬টি জেলার ৩৪টি মামলায় ৯৫ জন, খুলনা রেঞ্জের ৮টি জেলার ২৮টি মামলায় ৫৮ জন, রংপুর রেঞ্জের ৪ জেলার ৫টি মামলায় ৮ জন, রাজশাহী রেঞ্জের ৩ জেলার ১২ মামলায় ২৮ জন, ময়মনসিংহের ৪ জেলার ১৮টি মামলায় ৬০ জন, বরিশাল রেঞ্জের ২ জেলার ২ মামলায় ১৭ জন এবং সিলেট রেঞ্জের ৩ জেলার ২০টি মামলায় ১৪০ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে আদালতে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন সমকালকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্তে ধারাবাহিক অগ্রগতি হচ্ছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ (এ) ধারার কার্যকর প্রয়োগ বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে নিরপরাধ ব্যক্তির হয়রানি বন্ধ, তদন্তে স্বচ্ছতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার মান আরও উন্নত হয়।

৬১% আসামির বিরুদ্ধে প্রমাণ পায়নি পিবিআই

থানার মোট ১ হাজার ৮৫৫টি মামলার মধ্যে ৭৭টির তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। পাশাপাশি আদালতের নির্দেশে ১৯৫টি সিআর মামলার তদন্ত শুরু করে তদন্ত সংস্থাটি। সব মিলিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের ২৭২টি মামলার তদন্ত শুরু করে পিবিআই। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৮৪টি এবং অন্যান্য ধারার মামলা ১৮৮। গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এসব মামলার মধ্যে মোট ১৬৫টির তদন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে, যার ৪২টি হত্যা মামলা, বাকি ১২৩টি অন্যান্য ধারার। তদন্তাধীন আছে ১০৭টি মামলা।

সংস্থাটির তদন্ত শেষে নিষ্পত্তি হওয়া ১৬৫ মামলার মধ্যে ১১১টিতে ঘটনার প্রমাণ মিলেছে, যার শতকরা হার ৬৭ দশমিক ৩। এসব মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে; যার মধ্যে ১৯টি হত্যা মামলা ও ৯২টি অন্য ধারার। এর বাইরে ৩১টি মামলার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে; যার ১২টি সিআর ও দুটি জিআর মামলাকে মিথ্যা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। চুড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়ার পেছনে রয়েছে নানা কারণ। এর মধ্যে কোনো সিআর মামলায় বাদীর আদালতে হাজির না হওয়া, মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া ও একই ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের করা। এ ছাড়া অন্যান্যভাবে নিস্পত্তি হয়েছে ২৩টি (অধিকাংশ সিআর মামলা); যেসবের বাদী অনীহাসহ নানা কারণে আদালতের কাছে আবেদন করে মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া ১১১টি মামলায় এজাহারভুক্ত মোট ৯ হাজার ৬৯১ জন আসামির মধ্যে ৬১ দশমিক ১ শতাংশের বিরুদ্ধে অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। এর বাইরে এজাহারনামীয় ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে বেশির ভাগই সিআর মামলা।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন কারণে পূর্ব বিরোধ, প্রতিশোধপরায়ণতা কিংবা মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে অনেককে এসব এজাহারে আসামি করা হয়েছিল। এমন ব্যক্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যারা ঘটনার সময় দূরের কথা, কয়েক বছর ঢাকায় অবস্থানই করেননি।

জুলাই অভ্যুত্থানের আরেক মামলা

মুদি দোকানী মো. জামাল তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় ভাড়া থাকেন। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় তিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে আদালতে মামলা করেন তিনি। মামলায় বলা হয়, ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে আশপাশের অলিগলি থেকে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। হামলাকারীরা তাদের ওপর গুলি চালায়। এতে জামাল গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে তাকে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া পরে। পরদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।

মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ১৯৭ জনকে আসামি করা হয়। পিবিআইর তদন্তে ঘটনার সত্যতা উঠে আসে। তবে মামলায় অভিযুক্ত ১৯৭ জনের মধ্যে ঘটনার সঙ্গে ৩৮ জনের জড়িত থাকার সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে পুলিশ। বাকি ১৫৯ জনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তাই সম্প্রতি জড়িত ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া) আবু ইউসুফ সমকালকে বলেন, যে ১০৭টি মামলা তদন্তাধীন, তার প্রায় ৯০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। যে ১০ ভাগ কাজ বাকী আছে, তার মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমতি, মেডিকেল সনদ ও অন্য মামলার সঙ্গে একত্রে প্রতিবেদন দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কারণে বিলম্ব হচ্ছে। তবে অতি শিগগিরই প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

সংসার ভাঙার পর প্রেম-বিয়ে নিয়ে অভিনেত্রীর মন্তব্য ভাইরাল

দুই সপ্তাহ ধরে দাম্পত্য ভাঙনের গুঞ্জনের পর অবশেষে বিচ্ছেদের কথা স্বীকার করেছেন বলিউড অভিনেত্রী মৌনী রায় এবং তার স্বামী সুরজ নাম্বিয়ার। যৌথ বিবৃতিতে চার বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টানার কথা জানিয়েছেন তারা।

বিচ্ছেদ ঘোষণার মধ্যেই নতুন করে ভাইরাল হয়েছে মৌনী রায়ের একটি পুরনো সাক্ষাৎকার, যেখানে তিনি প্রেম-বিয়ে নিয়ে নিজের আবেগঘন ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন।

সহ-অভিনেতা নবীন কস্তুরিয়ার সঙ্গে আলাপকালে মৌনী বলেন, ‘আমি ১৯ বছর বয়সেই বিয়ের জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হতো, একজন সঠিক মানুষ পাশে থাকলে জীবনে নিরাপত্তা ও ভিন্ন অনুভূতি আসে।

তিনি জানান, বাস্তবে সেই সঠিক মানুষ খুঁজে পাওয়া মোটেও সহজ নয়। তার অনেক বন্ধু এখনও অবিবাহিত তাদের অভিজ্ঞতা দেখে তিনি বুঝেছিলেন, সম্পর্কের ক্ষেত্রে সময় ও ধৈর্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

অভিনেত্রীর কথায়, ‘সঠিক মানুষকে খুঁজে পেতে প্রায় আড়াই থেকে তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। যখন মানুষ খোঁজা বন্ধ করে দেয়, তখনই হয়তো জীবনের সঠিক মানুষ এসে যায়।’

সম্প্রতি বিচ্ছেদ নিয়ে যৌথ বিবৃতিতে মৌনী রায় ও সুরজ নাম্বিয়ার জানিয়েছেন, পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখেই তারা আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যম ও জনসাধারণের কাছে তাঁদের অনুরোধ, এই কঠিন সময়ে যেন তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সম্মান জানানো হয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে দুবাইয়ে প্রথম দেখা হয়েছিল মৌনি রায় এবং ব্যবসায়ী সুরজ নাম্বিয়ার। নিজেদের সংস্কৃতিকে সম্মান জানাতে ২০২২ সালের ২৭ জানুয়ারি গোয়ায় ঐতিহ্যবাহী মালায়ালি ও বাঙালি রীতিতে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। চলতি মাসে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়।

মৌনিকে শেষবার ‘দ্য ভূতনি’ ধারাবাহিকে দেখা গিয়েছিল এবং শিগগিরই তিনি ‘হ্যায় জাওয়ানি তো ইশক হোনা হ্যায়’ ও ‘দ্য ওয়াইভস’ ধারাবাহিকে অভিনয় করবেন।

তাসকিনের জোড়া শিকার, ২৩ রানে ২ উইকেট নেই পাকিস্তানের

প্রথম দিন শেষে বিনা উইকেটে ২১ রান তুলে কিছুটা স্বস্তিতেই ছিল পাকিস্তান। তবে দ্বিতীয় দিনের সকালে সফরকারীদের সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেননি তাসকিন আহমেদ। নিজের টানা দুই ওভারে পাকিস্তানের দুই ওপেনারকে ফিরিয়ে ম্যাচ বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছেন তাসকিন। ২৩ রানে ২ উইকেট হারিয়ে চাপে রয়েছে পাকিস্তান।

আজ দিনের দ্বিতীয় ওভারে বোলিংয়ে আসেন তাসকিন। তার ডেলিভারিতে আব্দুল্লাহ ফজলের ক্যাচ নেন লিটন। এতে ৮ রানেই থামে ফজলের ইনিংস। নিজের পরের ওভারেই আরেক ওপেনার আজান আওয়াইসকে ফাঁদে ফেলেন তাসকিন। মুমিনুল হকের ক্যাচ হয়ে বিদায়ের আগে ৩৪ বলে মাত্র ১৩ রান করেন আজান।

এর আগে টসে হেরে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ২৭৮ রান করে। লিটন দাস করেন সর্বোচ্চ ১২৬ রান।

বিএনপির অনেক নেতাকর্মী ভুয়া মামলার চক্করে

আওয়ামী লীগ আমলে মামলার চোটে আদালত আর কারাগার ছিল বিএনপি নেতাকর্মীর ‘ঠিকানা’। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কারামুক্তি পান অধিকাংশ নেতাকর্মী। তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলটির অনেক নেতাকর্মী নতুন করে মামলার চক্করে পড়ছেন। অভিযোগ রয়েছে, কৌশলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে তাদের।

মে মাসের শুরু থেকে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, দখলদারসহ অপরাধী ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সারাদেশে অভিযান চালাচ্ছে। সেখানে বিএনপির এমন কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার এবং সাজা দেওয়া হয়েছে; তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নেতাকর্মীর ভাষ্য, বিএনপি সরকারে আসার পর অনেক সুবিধাভোগী ব্যক্তি দলে ভিড়েছে। তারাই ষড়যন্ত্র করে বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীকে বিপদে ফেলছেন। আর এতে সহায়তা করছে প্রশাসনেরও একটি অংশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাল-জালিয়াতি করে বিএনপির নেতাকর্মীকে আওয়ামী লীগ বানিয়ে নাজেহাল করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে ছবি, ভিডিও কারসাজি করে বানানো হচ্ছে অপরাধী। ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকলেও মামলা দিয়ে করা হচ্ছে আসামি। পরে গ্রেপ্তার হয়ে জুটছে কারাবাস। আওয়ামী আমলে রাজনৈতিক মামলা হলেও তাতে সামাজিকভাবে হেয় হতে হয়নি। এখন দল ক্ষমতায় থাকায় ষড়যন্ত্রমূলক চাঁদাবাজ, দখলবাজের মামলায় তাদের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে।

এমনই এক ভুক্তভোগী নেতা ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর রহমান নির্ঝর। তিনি অভিযোগ করেন, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছাত্রলীগের কমিটিতে তিনি ছিলেন বলে সম্প্রতি প্রচার করা হয়। এ ঘটনায় গত ২৩ এপ্রিল উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন তিনি। পরে ২ মে পুলিশ তাঁকে ‘কথা বলার’ জন্য থানায় ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টি জানানো হয়।

তানভীর জানান, পরে থানার ওসি জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়ে পাঠান। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে পুলিশ অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬-এর ৭৫ ধারায় তিন দিনের সাজা দেন। তিনি বলেন, যেখানে আমি সাহায্য চেয়েছি, সেখানে উল্টো আমাকেই কারাগারে পাঠানো হলো।

তানভীর রহমান দাবি করেন, আমি ২০০৫ সাল থেকে ছাত্রদলের রাজনীতি করি। ২০১৬ সালে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম। ২০২০ সাল থেকে যুবদলের রাজনীতি করছি। এবার উত্তরা পশ্চিম থানা যুবদলের পদপ্রত্যাশী।

একই দিন (২ মে) উত্তরা পশ্চিম থানা বিএনপির সদস্য রেজাউল কবিরকে তাঁর বাসা থেকে পুলিশ ডেকে নিয়ে যায়। এর আগে দুদিন থানা থেকে ফোন করে ওসির সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়েছিল। তবে ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকায় তিনি যেতে পারেননি। রেজাউলকে বাসা থেকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পরই জানতে পারেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপরাধী তালিকায় নাকি তাঁর নাম উঠেছে। থানা থেকে ডিসি অফিসে নেওয়ার পর ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে ৯ দিনের সাজা দেন।

তবে তাঁর কী অপরাধ, কেন অপরাধের তালিকায় নাম উঠেছে, তা তিনি জানেনই না। কখনও চাঁদাবাজি, দখলবাজি বা সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয় এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই।

রেজাউল মনে করেন, তাঁর দল এখন ক্ষমতায়। সরকারের অপরাধীর তালিকায় তাঁর মতো নিরপরাধের নাম যদি থাকে, তাহলে একজন সাধারণ কর্মীর কীইবা করার থাকে।
জানতে চাইলে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি মোহাম্মদ খালিদ মনসুর সমকালকে বলেন, সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চাঁদাবাজদের একটি তালিকা তৈরি করে। সেখানে আমার এলাকার ছয়জন ছিল। তাদের দুজন তানভীর রহমান নির্ঝর ও রেজাউল কবির। এ কারণেই তাদের গ্রেপ্তার করে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়।
চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার হলে মাত্র তিন দিনের সাজা হয় কীভাবে– এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। আমরা গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করেছি। আদালত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

শুধু তানভীর বা রেজাউল নয়; এ রকম ১৭টি ঘটনা যাচাই করে সত্যতা পেয়েছে সমকাল। তবে বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, এমন ঘটনার সংখ্যা শতাধিক। নেতাকর্মীদের অন্যায়ভাবে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

উত্তরা পশ্চিম থানা বিএনপি নেতা আজহারুল ইসলাম সমকালকে বলেন, এখনকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গণহত্যায় জড়িত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী না ধরে উল্টো বিএনপির নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করছে। এর মধ্যে উত্তরা পশ্চিম থানার আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী একটি মহলের করা অভিযোগের ভিত্তিতে ১২ মে থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সোলায়মান, ৫১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মাসুদ, থানা ছাত্রদলের সভাপতি প্রার্থী রিয়াজ সরকার হীরা, ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি প্রার্থী মো. জুয়েলকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

আজহারুল ইসলাম অভিযোগ করেন, উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় আওয়ামী সংস্কৃতি ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইদুর রহমান সজলের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য বলা হলে থানা পুলিশ বলে, তাকে ধরলে চাকরি থাকবে না।

উত্তরা পশ্চিম থানা যুবদল নেতা ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, থানা পুলিশ জেনে বিএনপিকে টার্গেট করেই মাঠে নেমেছে। আগে দলের কাছে বলতে পারতাম। এখন কার কাছে বলব!

ঢাকা মহানগর বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে জানান, রাজধানীতে উত্তরা আর মোহাম্মদপুরেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চলছে বেশি। মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংকে নির্মূল করতে এই অভিযান যথার্থ হলেও কোনোভাবেই যেন নিরীহ ব্যক্তি বিপদে না পড়েন। শুধু দলের নেতাকর্মী নয়, সাধারণ মানুষও যেন অহেতুক শাস্তি না পায়।

মহানগর উত্তরা পূর্ব থানার বিএনপির নেতা আহসান হাবীবের অভিযোগ, দলের নাম ভাঙিয়ে অনেকে নানা রকম অপরাধ করছেন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর অনেকে এখন ভোল পাল্টে বিএনপি সাজার চেষ্টা করছেন। তাদের বেশির ভাগই বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। সুবিধাভোগী ওই সব কথিত বিএনপি নেতাকর্মীর সঙ্গে আবার প্রশাসনের আগে থেকেই ভালো সম্পর্ক। ফলে তারা যৌথভাবে একদিকে বিএনপিকে নানা অপরাধে কলঙ্কিত করছে, অন্যদিকে তাদের অপরাধের দায় বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীর কাঁধে চাপাচ্ছে।

ঢাকা মহানগর উত্তরের মতো দক্ষিণেও চলছে নেতাকর্মী হয়রানি। লালবাগ যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক দেলোয়ার হাকিম বিপ্লবকে ১ মে গভীর রাতে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। তিনি সমকালকে জানান, রাতভর থানা হাজতে রাখা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়, লালবাগ কেল্লার মোড় টেম্পোস্ট্যান্ড থেকে চাঁদাবাজি করেন তিনি। পরে এলাকার এমপি হামিদুর রহমান হামিদের হস্তক্ষেপে পরদিন বিকেলে তিনি ছাড়া পান।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক জহিরউদ্দিন তুহিন সমকালকে বলেন, যাত্রাবাড়ী থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আলাউদ্দিন মানিক একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসাবিষয়ক একটি ঝামেলার মধ্যস্থতা করেছিলেন ওই এলাকার এক পুলিশ কর্মকর্তা। তবে সেটা একপক্ষীয় হওয়ায় মানিক তা মানতে রাজি হননি। এর দুয়েক দিন পর ৮ মে মানিককে বাসা থেকে তুলে নিয়ে একটি চাঁদাবাজি মামলা দেওয়া হয়। সেটাকে আবার ফলাও করে গণমাধ্যমে দেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। যার পরিপ্রেক্ষিতে মানিকের দলীয় পদ স্থগিত করতে বাধ্য হন তারা। এ রকম অনেক ঘটনা ঘটছে তাদের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সমকালকে বলেন, এ বিষয়টি আমার পুরোপুরি জানা নেই। এ রকম কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে, তা দুঃখজনক। শুধু বিএনপি নেতাকর্মী কেন, কাউকেই অহেতুক হয়রানি করার আইনি সুযোগ নেই।