আওয়ামী লীগ আমলে মামলার চোটে আদালত আর কারাগার ছিল বিএনপি নেতাকর্মীর ‘ঠিকানা’। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কারামুক্তি পান অধিকাংশ নেতাকর্মী। তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলটির অনেক নেতাকর্মী নতুন করে মামলার চক্করে পড়ছেন। অভিযোগ রয়েছে, কৌশলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে তাদের।
মে মাসের শুরু থেকে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, দখলদারসহ অপরাধী ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সারাদেশে অভিযান চালাচ্ছে। সেখানে বিএনপির এমন কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার এবং সাজা দেওয়া হয়েছে; তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নেতাকর্মীর ভাষ্য, বিএনপি সরকারে আসার পর অনেক সুবিধাভোগী ব্যক্তি দলে ভিড়েছে। তারাই ষড়যন্ত্র করে বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীকে বিপদে ফেলছেন। আর এতে সহায়তা করছে প্রশাসনেরও একটি অংশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাল-জালিয়াতি করে বিএনপির নেতাকর্মীকে আওয়ামী লীগ বানিয়ে নাজেহাল করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে ছবি, ভিডিও কারসাজি করে বানানো হচ্ছে অপরাধী। ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকলেও মামলা দিয়ে করা হচ্ছে আসামি। পরে গ্রেপ্তার হয়ে জুটছে কারাবাস। আওয়ামী আমলে রাজনৈতিক মামলা হলেও তাতে সামাজিকভাবে হেয় হতে হয়নি। এখন দল ক্ষমতায় থাকায় ষড়যন্ত্রমূলক চাঁদাবাজ, দখলবাজের মামলায় তাদের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে।
এমনই এক ভুক্তভোগী নেতা ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর রহমান নির্ঝর। তিনি অভিযোগ করেন, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছাত্রলীগের কমিটিতে তিনি ছিলেন বলে সম্প্রতি প্রচার করা হয়। এ ঘটনায় গত ২৩ এপ্রিল উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন তিনি। পরে ২ মে পুলিশ তাঁকে ‘কথা বলার’ জন্য থানায় ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টি জানানো হয়।
তানভীর জানান, পরে থানার ওসি জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়ে পাঠান। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে পুলিশ অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬-এর ৭৫ ধারায় তিন দিনের সাজা দেন। তিনি বলেন, যেখানে আমি সাহায্য চেয়েছি, সেখানে উল্টো আমাকেই কারাগারে পাঠানো হলো।
তানভীর রহমান দাবি করেন, আমি ২০০৫ সাল থেকে ছাত্রদলের রাজনীতি করি। ২০১৬ সালে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম। ২০২০ সাল থেকে যুবদলের রাজনীতি করছি। এবার উত্তরা পশ্চিম থানা যুবদলের পদপ্রত্যাশী।
একই দিন (২ মে) উত্তরা পশ্চিম থানা বিএনপির সদস্য রেজাউল কবিরকে তাঁর বাসা থেকে পুলিশ ডেকে নিয়ে যায়। এর আগে দুদিন থানা থেকে ফোন করে ওসির সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়েছিল। তবে ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকায় তিনি যেতে পারেননি। রেজাউলকে বাসা থেকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পরই জানতে পারেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপরাধী তালিকায় নাকি তাঁর নাম উঠেছে। থানা থেকে ডিসি অফিসে নেওয়ার পর ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে ৯ দিনের সাজা দেন।
তবে তাঁর কী অপরাধ, কেন অপরাধের তালিকায় নাম উঠেছে, তা তিনি জানেনই না। কখনও চাঁদাবাজি, দখলবাজি বা সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয় এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই।
রেজাউল মনে করেন, তাঁর দল এখন ক্ষমতায়। সরকারের অপরাধীর তালিকায় তাঁর মতো নিরপরাধের নাম যদি থাকে, তাহলে একজন সাধারণ কর্মীর কীইবা করার থাকে।
জানতে চাইলে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি মোহাম্মদ খালিদ মনসুর সমকালকে বলেন, সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চাঁদাবাজদের একটি তালিকা তৈরি করে। সেখানে আমার এলাকার ছয়জন ছিল। তাদের দুজন তানভীর রহমান নির্ঝর ও রেজাউল কবির। এ কারণেই তাদের গ্রেপ্তার করে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়।
চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার হলে মাত্র তিন দিনের সাজা হয় কীভাবে– এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। আমরা গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করেছি। আদালত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
শুধু তানভীর বা রেজাউল নয়; এ রকম ১৭টি ঘটনা যাচাই করে সত্যতা পেয়েছে সমকাল। তবে বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, এমন ঘটনার সংখ্যা শতাধিক। নেতাকর্মীদের অন্যায়ভাবে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
উত্তরা পশ্চিম থানা বিএনপি নেতা আজহারুল ইসলাম সমকালকে বলেন, এখনকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গণহত্যায় জড়িত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী না ধরে উল্টো বিএনপির নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করছে। এর মধ্যে উত্তরা পশ্চিম থানার আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী একটি মহলের করা অভিযোগের ভিত্তিতে ১২ মে থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সোলায়মান, ৫১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মাসুদ, থানা ছাত্রদলের সভাপতি প্রার্থী রিয়াজ সরকার হীরা, ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি প্রার্থী মো. জুয়েলকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
আজহারুল ইসলাম অভিযোগ করেন, উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় আওয়ামী সংস্কৃতি ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইদুর রহমান সজলের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য বলা হলে থানা পুলিশ বলে, তাকে ধরলে চাকরি থাকবে না।
উত্তরা পশ্চিম থানা যুবদল নেতা ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, থানা পুলিশ জেনে বিএনপিকে টার্গেট করেই মাঠে নেমেছে। আগে দলের কাছে বলতে পারতাম। এখন কার কাছে বলব!
ঢাকা মহানগর বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে জানান, রাজধানীতে উত্তরা আর মোহাম্মদপুরেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চলছে বেশি। মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংকে নির্মূল করতে এই অভিযান যথার্থ হলেও কোনোভাবেই যেন নিরীহ ব্যক্তি বিপদে না পড়েন। শুধু দলের নেতাকর্মী নয়, সাধারণ মানুষও যেন অহেতুক শাস্তি না পায়।
মহানগর উত্তরা পূর্ব থানার বিএনপির নেতা আহসান হাবীবের অভিযোগ, দলের নাম ভাঙিয়ে অনেকে নানা রকম অপরাধ করছেন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর অনেকে এখন ভোল পাল্টে বিএনপি সাজার চেষ্টা করছেন। তাদের বেশির ভাগই বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। সুবিধাভোগী ওই সব কথিত বিএনপি নেতাকর্মীর সঙ্গে আবার প্রশাসনের আগে থেকেই ভালো সম্পর্ক। ফলে তারা যৌথভাবে একদিকে বিএনপিকে নানা অপরাধে কলঙ্কিত করছে, অন্যদিকে তাদের অপরাধের দায় বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীর কাঁধে চাপাচ্ছে।
ঢাকা মহানগর উত্তরের মতো দক্ষিণেও চলছে নেতাকর্মী হয়রানি। লালবাগ যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক দেলোয়ার হাকিম বিপ্লবকে ১ মে গভীর রাতে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। তিনি সমকালকে জানান, রাতভর থানা হাজতে রাখা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়, লালবাগ কেল্লার মোড় টেম্পোস্ট্যান্ড থেকে চাঁদাবাজি করেন তিনি। পরে এলাকার এমপি হামিদুর রহমান হামিদের হস্তক্ষেপে পরদিন বিকেলে তিনি ছাড়া পান।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক জহিরউদ্দিন তুহিন সমকালকে বলেন, যাত্রাবাড়ী থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আলাউদ্দিন মানিক একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসাবিষয়ক একটি ঝামেলার মধ্যস্থতা করেছিলেন ওই এলাকার এক পুলিশ কর্মকর্তা। তবে সেটা একপক্ষীয় হওয়ায় মানিক তা মানতে রাজি হননি। এর দুয়েক দিন পর ৮ মে মানিককে বাসা থেকে তুলে নিয়ে একটি চাঁদাবাজি মামলা দেওয়া হয়। সেটাকে আবার ফলাও করে গণমাধ্যমে দেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। যার পরিপ্রেক্ষিতে মানিকের দলীয় পদ স্থগিত করতে বাধ্য হন তারা। এ রকম অনেক ঘটনা ঘটছে তাদের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সমকালকে বলেন, এ বিষয়টি আমার পুরোপুরি জানা নেই। এ রকম কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে, তা দুঃখজনক। শুধু বিএনপি নেতাকর্মী কেন, কাউকেই অহেতুক হয়রানি করার আইনি সুযোগ নেই।




