খুলনার কয়রায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাদের বিরোধ ও সমন্বয়হীনতায় স্থবির হয়ে পড়েছে সরকারি নানা সেবামূলক কার্যক্রম। বিশেষ করে বিভিন্ন সরকারি ভাতা, সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুই দলের নেতাকর্মীদের পাল্টাপাল্টি চাপ ও প্রভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েছে স্থানীয় প্রশাসন। ফলে স্বাভাবিক সরকারি সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত সুবিধাভোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য জামায়াতে ইসলামীর হওয়ায় তাঁর অনুসারী ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দুই দলের এমন অনড় অবস্থানের কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রচণ্ড বিঘ্ন ঘটছে।
আটকে গেছে তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ
জানা গেছে, উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির জন্য তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের লক্ষ্যে গত ৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে গভীর রাত ২টা পর্যন্ত টানা মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। তবে দুই রাজনৈতিক দলের বিরোধের কারণে দীর্ঘ সময় পার হলেও ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
নির্বাচন কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, দ্রুত ফলাফল ঘোষণার লক্ষ্যে গভীর রাত পর্যন্ত কষ্ট করে পরীক্ষা নেওয়া হলেও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তারা ফলাফল প্রকাশে ব্যর্থ হয়েছেন।
একইভাবে সম্প্রতি বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম নির্বাচনেও দুই দল বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপি চেয়ারম্যান জানান, প্রতিটি ইউনিয়নের ১৫টি মসজিদ বাছাই করে নামের তালিকা জমা দেওয়ার কথা থাকলেও দুই দলের নেতারা তাঁদের পছন্দের লোক ঢোকাতে অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছেন। ফলে নিরপেক্ষ তালিকা প্রস্তুত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বন্ধ খাবার পানির ট্যাঙ্ক বিতরণ
কয়রা উপজেলায় লবণাক্ততার কারণে খাবার পানির তীব্র সংকট রয়েছে। ফলে স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তর থেকে ভূগর্ভস্থ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ৩ থেকে ১৫ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার প্লাস্টিকের ট্যাঙ্ক বিতরণ কার্যক্রম চালু ছিল। দুই দলের দ্বন্দ্বের কারণে সুফলভোগীদের তালিকা পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
কালনা গ্রামের ফরমান সরদার ও মমতাজ বেগম বলেন, ছয় মাস আগে ট্যাঙ্কির জন্য আবেদন করেছিলাম, পাইনি। অফিসে গেলে বলা হয় দুই দলের ঝামেলা মিটলে দেওয়া হবে। আমরা রাজনীতির হিসাব বুঝি না। অথচ নেতাদের টানাটানিতে আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ইশতিয়াক আহমেদ জানান, সংসদ সদস্যের কাছ থেকে নির্ধারিত তালিকা না পাওয়ায় বর্তমানে প্লাস্টিকের ট্যাঙ্ক বিতরণ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া মহিলা বিষয়ক দপ্তর ও সমাজসেবা অফিসের নানাবিধ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধাভোগী নির্বাচনেও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চলছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরিতে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা আমাদের মূল লক্ষ্য। স্থানীয় পর্যায় থেকে একাধিক তালিকা আসার কারণে চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়নে কিছুটা বিলম্ব ঘটছে।’
উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মিজানুর রহমান বলেন, ‘দুই দলের নেতাদের টানাপোড়েনে প্রশাসনের কর্মকর্তারা যেমন বিব্রত হচ্ছেন, তেমনি প্রচণ্ড দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এই সুযোগে রাজনীতি থেকে ঝরে পড়া অপশক্তি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। দ্রুত সমাধান না হলে সার্বিক উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমীন বাবুল বলেন, ‘এ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় তাঁদের দলীয় নেতাকর্মীরা প্রতিটি ক্ষেত্রে একচ্ছত্র প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন; যার ফলে সরকারি সুবিধাভোগী নির্বাচনে বাধা তৈরি হচ্ছে। আমরা বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করেছি।’
ইউএনও মো. আবদুল্লাহ আল বাকী বলেন, ‘প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সম্পূর্ণ সরকারি নিয়মনীতি ও বিধিবিধান অনুসরণ করে কাজ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সুপারিশ বা চাপ অনেক সময় আমাদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। এর ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়ে যাচ্ছে।’


