প্রধানমন্ত্রিত্ব বা সরকারপ্রধানের চেয়ার দূর থেকে দেখতে খুব আরামদায়ক মনে হলেও এটি আরামের নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নিজের আসনের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, দেখলে মনে হয় এই চেয়ারে বসতে আরাম। কিন্তু এই চেয়ারটাতে বসলে মনে হয়, প্রতি মুহূর্তে আগুনের তাপ আসছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এই চেয়ার আমাকে বলে, আমি সব সময় পপুলার (জনপ্রিয়) কথা বলতে পারি না। এই চেয়ার বলে, জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নয়, আমাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় সরকারি দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। বিরোধী দলের অনেক সদস্যও টেবিল চাপড়ান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে সংসদ বা জনসভায় অনেক জনপ্রিয় কথা বলে হাততালি কুড়ানোর সুযোগ থাকলেও দায়িত্বের চেয়ার তাঁকে সেই অনুমতি দেয় না। জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের পেছনে ছুটলে সাময়িক বাহবা মিললেও দীর্ঘ মেয়াদে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে সংসদ নেতা বলেন, ডেপুটি স্পিকার পদটি আপনাদের জন্য দেওয়ার প্রস্তাব এখনও উন্মুক্ত রয়েছে। রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে মানুষের ক্ষুধার অন্ন ও অসুস্থ শিশুর চিকিৎসার মতো বাস্তব সমস্যার সমাধানে সরকারি ও বিরোধী দলকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।
অতীতের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও ১৭৩ দিনের হরতালের স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই ক্ষতির মাশুল আজও আমাদের টানতে হচ্ছে। স্থিতিশীল সরকার ও সংসদ ছাড়া সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
সংসদ নেতা বলেন, এই সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক। জনগণের প্রতিটি সমস্যা লাঘব করা এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা এই সরকারের প্রথম ও প্রধান কাজ। বিরোধী দলের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা ব্যর্থ হওয়া মানেই আমি ব্যর্থ হওয়া, আর আমাদের কেউ একজন ব্যর্থ হলে পুরো বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়ে যাবে।
তাই আসুন, আমরা একে অপরকে ব্যর্থ করার প্রতিযোগিতায় না নেমে একসঙ্গে এই সংসদকে সফল করি। কোনোভাবেই এই সংসদকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না।’
সংসদের দিকে সমগ্র দেশ তাকিয়ে আছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, পৃথিবীর প্রতিটি স্থানে যেখানেই একজন বাংলাদেশি আছেন, তারা এই সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃঢ় প্রত্যাশা ও আশা পোষণ করেন। আমরা বিভিন্ন সময়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছি; কিন্তু শুধু শ্রদ্ধা নিবেদন করলেই আমাদের কর্তব্য শেষ হয়ে যাবে না। প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মানুষ মুক্তভাবে কথা বলতে পারবে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে– সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই আমাদের আসল লক্ষ্য।
কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা কৃষকদের সমস্যার কথা বলেছেন। আমি তাঁকে আশ্বস্ত করতে চাই, আমাদের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো অনুযায়ী কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু করেছি। শুধু ধান চাষি নয়; মৎস্য ও গবাদি পশু পালনকারীসহ সব পর্যায়ের কৃষকের কাছে আমরা পর্যায়ক্রমে পৌঁছাব।’
শিক্ষা খাতে আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার করে তারেক রহমান বলেন, ‘বিদেশে থাকার সময় দেখেছি, সেখানকার স্কুল ও শিক্ষার্থীদের পরিবেশ কতটা উন্নত। আমার দেশের বাচ্চারা কেন এমন সুযোগ পাবে না? ইনশাআল্লাহ, সেই আশা আমরা পূরণ করব। আগামী জুলাই মাস থেকে পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আমরা স্কুল ব্যাগ, ড্রেস ও জুতার ব্যবস্থা করব। শিক্ষাঙ্গনে সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশে আমাদের সন্তানরা লেখাপড়া করবে– এটিই আমাদের কাম্য।’
নারী শিক্ষার প্রসারে সরকারের বিশেষ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারীকে পেছনে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আমরা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নারী শিক্ষা অবৈতনিক করেছিলাম। বর্তমান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, স্নাতক বা ডিগ্রি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করা হবে; পাশাপাশি মেধাবীদের উপবৃত্তি দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড চালু করায় গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী হবে। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, এত টাকা কীভাবে আসবে? আমি বলব, এটি ইনভেস্টমেন্ট; এর রিটার্ন গ্রামীণ অর্থনীতির মাধ্যমে ফিরে আসবে।’ দেশে জলাবদ্ধতা নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার উদাহরণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীকে সেখানে পাঠিয়েছি। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বর্ষণে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ত্রাণমন্ত্রীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং স্থানীয় প্রশাসনকে দুদিন আগেই বলা হয়েছিল তালিকা তৈরি করে কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে। এটিই প্রমাণ করে, এই সরকার জনগণের সরকার।’
বিরোধী দলের গঠনমূলক প্রস্তাবের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে বিরোধী দলের দেওয়া প্রস্তাব আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। উভয় পক্ষ মিলে যৌথ কমিটি গঠন করেছি। আমরা বিশ্বাস করি, একসঙ্গে বসে আলোচনা করলে দেশের মানুষের স্বস্তির জন্য যে কোনো সমস্যার সমাধান বের করা সম্ভব। তিনি বিরোধী দলের নেতা ও উপনেতাকে তাদের এলাকার সমস্যার তালিকা পাঠানোর অনুরোধ করেন এবং তা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা ও প্রথম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে বিরোধী দলের নেতা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য– এ দুই খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলের সহযোগিতা চেয়ে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
’৭১-এর পরবর্তী বাংলাদেশ যে রকম শহীদের রক্তের ওপরে দাঁড়িয়েছিল, বর্তমান বাংলাদেশ ও বর্তমান সংসদ একইভাবে হাজারো শহীদের রক্তের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আমার সরকারের অবস্থান থেকে আবার পরিষ্কার করে দিতে চাই যে, আমরা সব সময় প্রস্তুত আছি বিরোধী দলের সদস্যের সঙ্গে, দেশের মানুষের সঙ্গে যে কোনো আলাপ-আলোচনায় অংশগ্রহণ করার জন্য। আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতেই আমরা সবাই একসঙ্গে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব। দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করব। দেশ ও জনগণকে সম্মান যদি আমরা না করি, তাহলে আমাদের রাজনীতি হয়তো ব্যর্থ হয়ে যাবে। সে জন্যই আমাদের সবচেয়ে প্রথম হচ্ছে দেশের জনগণ এবং প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।’
২৫ কার্যদিবসে ৯৪ বিল পাস
১২ মার্চ শুরু হওয়া ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে ২৫ দিন বসেছে বৈঠক। এ সময় বিল পাস হয়েছে ৯৪টি। এর অধিকাংশই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ-সংক্রান্ত। গতকাল রাত সোয়া ৯টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অধিবেশন সমাপ্ত-সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির চিঠি পড়ে শোনান। এর আগে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব কণ্ঠভোটে পাস হয়। এতে সরকারি দলের সদস্যরা ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলেও বিরোধী দল ‘না’ ভোট দেয়।
রাষ্ট্রপতির আদেশ পাঠ করার আগে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে যে সহমর্মিতা ও সহযোগিতা তিনি এই অধিবেশনে দেখেছেন, অতীতের কোনো সংসদে তেমন দৃশ্য দেখা যায়নি। দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করে স্পিকার সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মতের ভিন্নতা থাকলেও দেশের স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দিতে হবে।
স্পিকার বলেন, সংসদে একটি আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ ছিল, যেখানে অংশগ্রহণকারী সদস্যরা সক্রিয়ভাবে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। তিনি বলেন, এই সংসদে মোট ২২০ জন প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। এর পরও সদস্যদের গঠনমূলক আলোচনা ও সহনশীল আচরণ স্পিকারকে মুগ্ধ করেছে।
স্পিকার জানান, কার্যপ্রণালি বিধির ৬২ বিধিতে ১৬টি নোটিশ পাওয়া যায়, যার মধ্যে দুটি গৃহীত হয় এবং দুটি নিয়েই আলোচনা হয়। ৬৮ বিধিতে ৯টি নোটিশ পাওয়া যায়; এর মধ্যে একটি গৃহীত হয় এবং সেটির ওপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়। জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশে ৭১ বিধিতে মোট এক হাজার ১৯৮টি নোটিশের মধ্যে ৪২টি গৃহীত হয় এবং ৩৮টির ওপর আলোচনা হয়। ৭১(ক) বিধিতে দুই মিনিট করে বক্তব্য দেওয়া হয় ২০৭ বার। ১৬৪ বিধিতে ১৪টি নোটিশের মধ্যে একটি গৃহীত হয়ে বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। ২৬৬ বিধিতে একটি নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ কমিটি গঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীকে ৯৩, মন্ত্রীদের জন্য ২৫০৯ প্রশ্ন
স্পিকার বলেন, এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর উত্তর দেওয়ার জন্য মোট ৯৩টি প্রশ্নের নোটিশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৩৫টির উত্তর তিনি সংসদে দিয়েছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের উত্তর দেওয়ার জন্য মোট দুই হাজার ৫০৯টি প্রশ্নের নোটিশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে এক হাজার ৭৭৮টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে।
স্পিকার বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই চেতনায় গড়ব দেশ–এই প্রতিপাদ্য এবং সবার আগে বাংলাদেশ– এই নীতি সামনে রেখে সবাইকে এগোতে হবে। একই সঙ্গে ফ্যাসিস্ট আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন সুসংহত করাও রাষ্ট্রের অঙ্গীকার।




