সারাদেশে আইনজীবী সমিতির নির্বাচন যেভাবে হচ্ছে

0
4

দেশের ৮৪টি আইনজীবী সমিতির মধ্যে চলতি বছর ৪১টিতে নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টিতে আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীরা অংশ নিয়েছেন। তার ৯টিতে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ পদে বিজীয় হয়েছেন। বাকিগুলোতে একাধিক পদে জয়লাভ করেছেন।

সর্বশেষ ১৬ এপ্রিল পিরোজপুর জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ১৩টি পদের মধ্যে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সাতটি পদে জয় পান আওয়ামীপন্থিরা। এরপর আর আওয়ামীপন্থিদের নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।

১৬ এপ্রিলের পর থেকে ২৬টি আইনজীবী সমিতির নির্বাচন হয়েছে। ২৩টিতে বিএনপিপন্থিরা জয়লাভ করেছেন। এর মধ্যে ১০টি সমিতির সবকটি পদে তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। মাদারীপুরসহ পাঁচ জেলায় জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা এক বা একাধিক পদে জয় পেয়েছেন। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল সূত্রে মোট ৩৮টি বারের ফলাফল নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনটির ফল জানা যায়নি।

আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরে বিরোধী দলের ওপর নানা দমনপীড়ন চালানো হলেও আইনজীবী সমিতির মতো পেশাজীবী সংগঠনগুলোয় বিএনপিসহ অন্যান্য দলের প্রার্থীরা নির্বাচন করতে পেরেছেন। তখন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী এএম মাহাবুব উদ্দিন খোকন সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে তিনি ছয়বার এই আইনজীবী সমিতির সম্পাদক নির্বাচিত হন। একইভাবে সারাদেশে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা চাপে থাকলেও সমিতিগুলোর নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন ও জয়লাভ করেছেন।

সর্বশেষ গত ২৯-৩০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। নির্বাচনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ২৩টি পদে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা বিজয়ী হয়েছেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত ঢাকা আইনজীবী সমিতির অ্যাডহক কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, বারের সভাপতির অনুমতি ছাড়া কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। নির্বাচনের ঠিক আগে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আওয়ামীপন্থি ১৬ জন আইনজীবীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। ফলে আওয়ামীপন্থি আর নির্বাচন করতে পারেনি। ফলে ২৪টি পদের মধ্যে ২৩টিতে বিএনপি এবং একটি পদে জামায়াতের প্রার্থী জয়লাভ করে।

আগামীকাল থেকে দুই দিনব্যাপী (১৩-১৪ মে) সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির অ্যাডহক কমিটি ২৪ ঘণ্টার নোটিশে বিশেষ সাধারণ সভা করে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। এর মাধ্যমে আওয়ামীপন্থি ৪২ আইনজীবীর মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেওয়া হয়। ফলে সুপ্রিম কোর্ট বারেও ঢাকা আইনজীবী সমিতির মতো একতরফা নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি একটি পেশাজীবী সংগঠন। এখানে আইনজীবী হিসেবে সবাই নির্বাচন করে থাকেন। সুপ্রিম কোর্ট বারের ৭৮ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দলের প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হলো।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু সমকালকে বলেন, এই স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে কলঙ্কজনক, যা আইনজীবীরা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না।

আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের বাদ দিয়ে এই প্রথম সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল সমকালকে বলেন, সারাদেশে সব জেলা বারে যেভাবে নির্বাচন হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্ট বারেও একইভাবে নির্বাচন হবে। তিনি বলেন, যে কারণে ওনারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি, একই কারণে বারে নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছেন না।

গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাসান তারিক চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘আমরা চাই সুপ্রিম কোর্ট বারে স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নির্বাচন হোক। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সুপ্রিম কোর্ট বার সমিতি সংবিধান লঙ্ঘন করে অন্যায়ভাবে বহুযোগ্য প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে। এর মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার আমলের ধারাবাহিকতায় একটি প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ১৪টি পদে আগামী এক বছরের জন্য নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন আইনজীবীরা। মোট ভোটার ১১ হাজার ৮৯ জন।

১৫ জেলায় আওয়ামীপন্থিরা জয় পেয়েছেন
১৫টি জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামীপন্থিরা ৯টিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এর মধ্যে মাদারীপুরে গত ৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১৫টি পদের মধ্যে ১৩টিতে জয় পেয়েছেন আওয়ামীপন্থিরা। সভাপতি এবং আপ্যায়ন ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদে জামায়াতপন্থিরা জয় লাভ করেন।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সিলেটে সাধারণ সম্পাদকসহ ১০টি পদে আওয়ামীপন্থিরা জয়লাভ করেন। সভাপতিসহ ৭টি পদে জয় পান বিএনপিপন্থিরা। জামায়াতপন্থিরা বিজয়ী হন তিনটিতে।
নোয়াখালী জেলা বারে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদকসহ ৯ পদে আওয়ামীপন্থিরা জয়লাভ করেছেন। সভাপতিসহ পাঁচটি পদে বিএনপি এবং একটি সদস্য পদে জামায়াতের প্রার্থী নির্বাচিত হন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৫ পদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদকসহ ৯টি পদে জয়লাভ করেন আওয়ামীপন্থিরা। বিএনপিপন্থিরা পেয়েছেন ৫টি পদ। লক্ষ্মীপুরে আওয়ামীপন্থি আটজন আইনজীবী বিজয়ী হয়েছেন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ছয়টি পদে বিএনপিপন্থিরা জয়লাভ করেন।
পিরোজপুরে গত ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছেন আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা। ১৩টি পদের মধ্যে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ সাতটি পদে বিজয়ী হয়েছেন তারা। বিএনপিপন্থিরা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদসহ ছয়টি পদে জয়ী হন।

কক্সবাজারে ১৭টি পদের মধ্যে সাতটিতে আওয়ামীপন্থি বিজয় হয়েছেন। চারটিতে বিএনপিপন্থি ও ছয়টি পদে জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা বিজয়ী হন।

ঠাকুরগাঁওয়ে গত ৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১২টি পদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদকসহ পাঁচটিতে আওয়ামীপন্থিরা জয় পেয়েছেন। সভাপতিসহ সাতটিতে জয়ী হয়েছেন বিএনপিপন্থিরা।
এ ছাড়া ফরিদপুরে চারটি, কুষ্টিয়ায় তিনটি, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ ও কুমিল্লায় দুটি করে পদে আওয়ামীপন্থিরা জয়লাভ করেন। সুনামগঞ্জে শুধু সাধারণ সম্পাদক পদে আওয়ামীপন্থি আইনজীবী জয় পান।

আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে ১০ জেলায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপিপন্থিরা নির্বাচিত
শরীয়তপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, চাঁদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, মেহেরপুর, পাবনা, টাঙ্গাইল ও মুন্সীগঞ্জে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। ফলে সবকটি আইনজীবী সমিতিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন বিএনপপিন্থিরা।

১৩ জেলায় বিএনপি-জামায়াত
শেরপুর বারে ১৫টি পদের মধ্যে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১১টিতে বিএনপিপন্থিরা জয়ী হন। বাকি পদে জামায়াতসহ অন্যরা জয়ী হয়েছেন। একইভাবে খুলনায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১৪টি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপিপন্থিরা।

ঝালকাঠিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১১ পদে এবং নড়াইলে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছেন বিএনপিন্থিরা।

রাজশাহীতে ২১টি পদের মধ্যে ২০টিতে জয়লাভ করেছেন বিএনপিপন্থিরা। সহসভাপতি পদে গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি মনোনীত প্যানেল থেকে জয়লাভ করেছেন। নওগাঁয় সভাপতিসহ ১২টি পদে জয় পেয়েছেন বিএনপিপন্থিরা। সাধারণ সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হন।

সিরাজগঞ্জে ১৭টি পদের মধ্যে ১৬টিতে জয়লাভ করেন বিএনপিপন্থিরা। অন্যজন স্বতন্ত্র। ফেনীতে ১৫ পদের মধ্যে সভাপতি-সম্পাদকসহ ১০টিতে জয়লাভ করেছেন বিএনপিপন্থিরা। জামায়াতপন্থিরা পেয়েছেন চারটি পদ। একটি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এ ছাড়া মাগুরা, দিনাজপুর, পঞ্চগড়ে বিএনপি ও জামায়াতপন্থিরা নির্বাচিত হন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here