যাত্রী নামিয়ে ফিরে যেতে যেতে উবার চালক যা বলে গেলেন, তা অনেকটা এ রকম– ‘ভাই, ওরা তো সবাই চলে গেছে নতুন বাড়িতে। এখানে আর কেউ থাকে না এখন।’ ঠিক তাই; ইন্টার মায়ামি তার পুরোনো মাঠ চেস স্টেডিয়াম ছেড়ে এখন নতুন ঠিকানা ‘ন্যু স্টেডিয়াম’-এ। তবু কোথাও গিয়ে এই চেজ স্টেডিয়ামেই গন্ধ শোঁকা যায় লিওনেল মেসির। তাঁর পায়ের চিহ্ন খুঁজে নেওয়া যায়। তাই হিউস্টন থেকে এই শহরে পা রেখেই ছুটে আসা মেসির বাড়ির আদি মাঠে! চোখে দেখে উত্তর খুঁজে নেওয়া– প্যারিসের সেই করপোরেট ফুটবলের আকাশ ছেড়ে কেন আটলান্টিক পাড়ের এই নোনা শহরে এসেছিলেন মেসি? কীসের টানে এই চেজ স্টেডিয়ামকেই দ্বিতীয় বাড়ি বলে মেনে নিয়েছিলেন?
আমেরিকার এই রৌদ্রকরোজ্জ্বল শহরে যখন বিকেল ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামে, তখন ফোর্ট লাউডারডেলের এই পুরোনো চেস স্টেডিয়ামের চারপাশটা বড্ড বেশি নিঃসঙ্গ লাগে। গা ছমছম করা একটা নীরবতা। দুটি কথা বলার জন্য মানুষ নেই সেখানে। অথচ আড়াই বছর আগের একটা জুলাইয়ের সন্ধ্যায় কী জলসাই না হয়েছিল এখানে! এই মাঠ থেকেই শুরু হয়েছিল মেসির ‘আমেরিকান ড্রিম’। সেদিনের সেই মেসিকে বরণ করে নেওয়ার সন্ধ্যায় আকাশ ভেঙে নেমেছিল বৃষ্টি, সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া; যেন প্রকৃতিও জানত কোনো সাধারণ মানুষ না, মায়ামির এই মাঠে পা রেখেছেন ফুটবলের ঈশ্বর! সেদিন সমস্ত ঝড়-জল উপেক্ষা করে গ্যালারিতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। আর যখন সেই চেনা জাদুকর গায়ে গোলাপি জার্সি চাপিয়ে মাঠে ঢুকলেন, পাশে দাঁড়ানো ডেভিড বেকহামের চোখের কোণটা চিকচিক করে উঠেছিল। ‘আপনি তো এখন ভেতরে যেতে পারবেন না’– সম্বিত ফিরে পেছনে তাকাতেই এক নিরাপত্তারক্ষীর গলা। ‘সেটি জানি’– উত্তরের পর বেড়ে যায় কৌতূহল, ‘এখানে কি এখন মেসিরা আর আসেন না খেলতে?’ বাংলাদেশি সাংবাদিক আর ফিফা বিশ্বকাপ কাভার করতে এসেছি শুনে কথা বলতে উৎসাহ পান তিনি। ‘স্টেডিয়ামে খেলা না হলেও এখানে এই অনুশীলন গ্রাউন্ডেই তারা প্রতি সপ্তাহে অনুশীলন করেন।’
চেস স্টেডিয়ামের খাঁ খাঁ করা গ্যালারি আর নিঃসঙ্গতার ঠিক পাশে চোখ ফেরালেই ইন্টার মায়ামির অফিসিয়াল প্র্যাকটিস ডেরা, যার নাম ‘ফ্লোরিডা ব্লু ট্রেনিং সেন্টার’। প্রায় ৫০ হাজার বর্গফুট এলাকাজুড়ে বিস্তৃত বিশ্বমানের স্পোর্টস কমপ্লেক্স। বোঝা যায়, গল্পটা এখনও ফুরিয়ে যায়নি। ইন্টার মায়ামি তাদের অফিসিয়াল ম্যাচের জন্য মায়ামি ফ্রিডম পার্কের সেই ঝাঁ-চকচকে ‘ন্যু স্টেডিয়ামে’ চলে গেছে বটে, কিন্তু লিওনেল মেসির প্রতিদিনের ফুটবল সাধনার আসল মন্দিরটা আজও রয়ে গেছে এই পুরোনো চত্বরেই। রোজ সকালে যখন পামগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়ে এই ট্রেনিং গ্রাউন্ডের সাত-সাতটি নিখুঁত পিচে, তখনও সেখানে এসে থামে কালো কাচঢাকা বিলাসবহুল গাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে আসেন সেই চেনা জাদুকর। ম্যাচের চড়া গ্ল্যামার আজ অন্য স্টেডিয়ামে উধাও হতে পারে; কিন্তু মেসির পায়ের ঘাম, লুই সুয়ারেজের সঙ্গে মেট চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আড্ডা দেওয়া আর ফুটবলের নিত্যদিনের যে জ্যামিতি– তার আসল আঁতুড়ঘর আজও এই পুরোনো মাঠের পাশের সবুজগালিচাটাই। স্টেডিয়ামটা হয়তো আজ একা দাঁড়িয়ে ম্যাচ না হওয়ার আফসোসে ভোগে, কিন্তু তার ঠিক পাশেই প্রতিদিন সকালে পরম তৃপ্তিতে নিজের ঈশ্বরকে ছুঁয়ে দেখার আনন্দটুকু আজও মায়ামির এই পুরোনো মাটি হাতছাড়া করেনি!
এখানে ঘাসে কান পাতলে এখনও সুয়ারেজের সঙ্গে মেসির সেই চেনা হাসির শব্দ পাওয়া যায়। অনুশীলন শেষে দুই বন্ধুর গোল হয়ে বসে ‘মেট চা’ খাওয়ার আড্ডা কিংবা লকার রুমে রদ্রিগো ডি পলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার সেই বিশ্বকাপ জয়ের গল্পগাথা–এই মাঠের ধুলোবালিতে সব মাখামাখি হয়ে আছে। এই মাঠেই ক্রুজ আজুলের বিরুদ্ধে সেই অবিশ্বাস্য ফ্রিকিকে মায়ামি জীবনের খাতা খুলেছিলেন মেসি। তার পর থেকে এই গোলাপি জার্সিতে গোল আর অ্যাসিস্টের যে সুনামি তিনি তুলেছেন, তাতে এই ক্লাবটার আলমারিতে প্রথম ট্রফিটা (লিগস কাপ) এসে জুটেছে।
মায়ামি এখন আর স্রেফ হলিউডি সিনেমার শুটিং স্পট কিংবা ধনকুবেরদের হলিডে ডেস্টিনেশন নয়। এই শহর এখন বিশ্ব ফুটবলের মক্কা। ইউরোপের রাজকীয় সিংহাসন, প্যারিসের সেই বিষাদময় রাতগুলো ছুড়ে ফেলে মেসি যখন এখানে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তখন অনেকেই ভ্রু কুঁচকেছিলেন। কিন্তু সাগরের নোনাজল আর এই রুপালি সৈকতের শহরে পা রেখেই বোঝা যায়, জাদুকর কেন এখানে এসেছিলেন। তিনি একটা আশ্রয় খুঁজছিলেন, যেখানে ফুটবল থাকবে, অথচ প্রতিমুহূর্তে মিডিয়ার কর্কশ আলো তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে খুবলে খাবে না। যে উত্তরের খোঁজে আসা হয়েছিল এখানে, উবার অ্যাপসে হোটেলে ফেরার কল দিতে দিতে মনে হলো সেটি বোধ হয় পেয়ে গিয়েছি।




