Home Blog

ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ভবন ধ্বংস, নিহত ৫

ইসরায়েলি বিমান হামলায় আগুন লেগে গাজা সিটির একটি আবাসিক ভবন ধ্বংস হয়েছে। এতে অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। স্বাস্থ্য ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গতকাল শনিবার ভোরে নিহতদের মধ্যে এক খ্রিষ্টান মা, মেয়েসহ চারজন নারী রয়েছেন। হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

নিহত বেড়েছে ১১৪ শতাংশ
২০২৬ সালের শুরু থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে ইসরায়েলি দখলদারদের হামলায় ৩০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। শুক্রবার ফিলিস্তিনের কলোনাইজেশন অ্যান্ড রেজিস্ট্যান্স কমিশন জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা ২০২৫ সালের পুরো বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বা প্রায় ১১৪ শতাংশ বেড়েছে। নিহতের ৭৩ শতাংশই রামাল্লাহ ও আল-বিরেহ এবং নাবলুস প্রদেশের।

কমিশন জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি ও তাদের জমি-সম্পত্তির ওপর ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা মোট ২ হাজার ৫১টি হামলা চালিয়েছে। গত মাসে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের ধ্বংসযজ্ঞে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৩২০ ফিলিস্তিনি। তাদের মধ্যে ১৬৪ শিশু ও ৬৪ নারী রয়েছেন।

জুনে জাতিসংঘের ১৪ জন বিশেষ প্রতিবেদক সতর্ক করে বলেন, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের সমর্থন ও সহযোগিতায় বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাস উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক সরকারি প্রতিবেদনে ফলের দাম বাজারের চেয়ে অনেক কম

কয়েক দিনের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারে আমদানি করা কমলা ও মাল্টার দাম বেশ বেড়েছে। বর্তমানে কেজিপ্রতি ৫০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ফলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত ও বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে গতকাল শনিবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

বৈঠকে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এতে মাল্টার দাম কেজিপ্রতি ২৪০ থেকে ৩২০ টাকা এবং কমলার দাম ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু রাজধানীর বাজারের বাস্তব চিত্রের সঙ্গে ফলের দামে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। কোন তথ্যের ভিত্তিতে কমিশন এ দাম নির্ধারণ করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলের দাম কম দেখালেও দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বেশি।

সভায় মাল্টার বর্তমান বাজারদর নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনার পরও খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মাল্টার দাম কীভাবে ৫২০ টাকায় পৌঁছায়, ব্যবসায়ীদের কাছে তার ব্যাখ্যা চান তিনি।

বাজারদরের সঙ্গে বড় ফারাক

কারওয়ান বাজারের খুচরা ফল বিক্রেতা শরিফুল ইসলাম সমকালকে জানান, গতকাল তিনি কেজিপ্রতি মাল্টা বিক্রি করেছেন ৪০০ থেকে ৪২০ টাকায়। প্রতিকেজি কমলা বিক্রি করেছেন ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকায়। জিগাতলার ট্যানারি মোড়ের ফল বিক্রেতা আমিনুল হকও এ দুই ফলের দামের বিষয়ে প্রায় একই রকম তথ্য দেন।

ট্যারিফ কমিশন কেন ফলের দাম এত কম উল্লেখ করেছে জানতে চাইলে কমিশনের চেয়ারম্যান (সচিব) নাসির-উদ-দৌলা সমকালকে বলেন, বিষয়টি ভালোভাবে জানতে হবে, প্রয়োজন আছে। তিনি প্রতিবেদনটি যে তৈরি করেছেন, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। কিন্তু ওই কর্মকর্তাকে ফোন ও এসএমএস করলে তিনি সাড়া দেননি।

পাঁচ ফলের  বেশির ভাগই  আমদানি 
সভায় মাল্টা, কমলা, আপেল, আঙুর ও খেজুর– এই পাঁচটি তাজা ফল নিয়ে আলোচনা হয়। কমিশনের উপস্থাপনা অনুযায়ী, দেশে আমদানি করা তাজা ফলের বার্ষিক চাহিদা পাঁচ থেকে ছয় লাখ টন। এর মধ্যে আপেল ও মাল্টার চাহিদা প্রায় ৭৭ শতাংশ। রমজান ও ধর্মীয় উৎসবের কারণে খেজুরের বার্ষিক চাহিদা দাঁড়ায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টনে, যার ৬০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় রমজানে।

আপেল, সাধারণ মাল্টা, কমলা, আঙুর ও খেজুর জলবায়ু ও বাণিজ্যিক কারণে বাংলাদেশে অত্যন্ত সীমিত বা নগণ্য পরিমাণে উৎপাদিত হয়। তাই এসব ফলের চাহিদার ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশ আমদানি করে মেটাতে হয়। যদিও পেয়ারা, ড্রাগন ও আমের দেশীয় উৎপাদন পর্যাপ্ত।

মূলত চীন, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ব্রাজিল, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসব ফল আসে। আমদানির ওপর নির্ভর করায় আমদানি পর্যায়ের শুল্ক-করসহ যে কোনো খরচ ও জটিলতার প্রভাব সরাসরি খুচরা বাজারে পড়ে।

শুল্ক-করেই দাম দ্বিগুণ

কমিশনের উপস্থাপনা অনুযায়ী, ফল আমদানিতে বিভিন্ন শুল্ক ও কর মিলিয়ে মোট করভার দাঁড়ায় ৯৬ দশমিক ১০ থেকে ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ আমদানি মূল্যের প্রায় সমান বা এর চেয়ে বেশি কর দিতে হয়।

এই করভারের মধ্যে রয়েছে ২৫ আমদানি শুল্ক, ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর এবং ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক অতিরিক্ত শুল্ক। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শূন্য থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম কর।

উচ্চমূল্যের তিন কারণ
কমিশনের প্রতিবেদনে উচ্চমূল্য ও বাজার অস্থিতিশীলতার তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথম কারণ, বিলাসদ্রব্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধকরণ। জরুরি পুষ্টি উপাদান হওয়া সত্ত্বেও তাজা ফলকে বিলাসদ্রব্য গণ্য করে উচ্চ কর আরোপ করা হচ্ছে। দ্বিতীয় কারণ, শুল্কায়নযোগ্য মূল্য। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রকৃত বুকিং দরের চেয়ে বেশি মূল্য ধরে কাস্টমসে শুল্কায়ন করা হচ্ছে। এতে একই শুল্কহারেও আমদানিকারককে বেশি কর দিতে হয়।

তৃতীয় কারণ, সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধা। আমদানিকারকের সংখ্যা সীমিত, তার ওপর হিমাগার সংকট রয়েছে। এতে সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং দাম বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি দাম
কমিশনের উপস্থাপনায় দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশের সঙ্গে ফলের দামের তুলনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের তুলনায় বাংলাদেশে সব ফলের দাম অনেক বেশি।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি কেজি আপেলের দাম ২৮০ থেকে ৩৮০ টাকা। যেখানে ভারতে ১৫০ থেকে ২২০, পাকিস্তানে ১১০ থেকে ১৭০ এবং নেপালে ১৬০ থেকে ২৪০ টাকা। শ্রীলঙ্কায় এর দাম ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা।

আঙুরের দাম বাংলাদেশে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা, ভারতে ১৩০ থেকে ২০০, পাকিস্তানে ১০০ থেকে ১৬০, নেপালে ১৫০ থেকে ২৩০ এবং শ্রীলঙ্কায় ৩৮০ থেকে ৫০০ টাকা।

সাধারণ খেজুর বাংলাদেশে ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, ভারতে ১৬০ থেকে ২৬০, পাকিস্তানে ১২০ থেকে ২০০, নেপালে ১৮০ থেকে ২৮০ এবং শ্রীলঙ্কায় ৩২০ থেকে ৪৫০ টাকা। উপস্থাপনায় শুধু শ্রীলঙ্কাতেই দাম বাংলাদেশের চেয়ে বেশি বা কাছাকাছি দেখানো হয়েছে।

সমাধানে তিন প্রস্তাব
পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্যারিফ কমিশন সম্ভাব্য কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা হিসেবে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে। প্রথমত, শুল্ক কাঠামো যৌক্তিকীকরণ। এর আওতায় তাজা ফল ও খেজুরকে জরুরি নিত্যপণ্যে রূপান্তর এবং নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি) ও সম্পূরক শুল্ক (এসডি) প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় ইনভয়েস মূল্যে শুল্কায়ন। আন্তর্জাতিক দর অনুযায়ী শুল্কায়ন এবং তাজা ফলকে পচনশীল পণ্য বিবেচনায় ‘গ্রিন চ্যানেল’-এর মাধ্যমে খালাসের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তৃতীয়ত, এলসি সহজীকরণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের এলসি সুবিধা দেওয়া এবং কোল্ড স্টোরেজ সুবিধার আওতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

শুল্ক পর্যালোচনার আশ্বাস বাণিজ্যমন্ত্রীর
সভায় ব্যবসায়ীরা জানান, মাল্টার বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ সরবরাহের ঘাটতি। তাদের হিসাবে, কোনো কোনো সপ্তাহে দেশে মাত্র ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার মাল্টা এসেছে। অথচ স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কনটেইনার মাল্টা প্রয়োজন হয়।

উচ্চ শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ও বন্দরের জটিলতা এবং আগের চালানে লোকসানের কারণে অনেক ব্যবসায়ী মাল্টা আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন বলেও জানান। পচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন ও সংরক্ষণ পর্যায়ে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য শুনে মাল্টার শুল্কসংক্রান্ত বিষয়টি পর্যালোচনার আশ্বাস দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত এলসি খুলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর তাগিদ দেন।

বাজারে মাল্টা, খেজুরসহ আমদানিনির্ভর ফলের সরবরাহ বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানিকারকদের দ্রুত ঋণপত্র খুলে আমদানি বাড়ানোর আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, খেজুর আমদানিতে শুল্ক-কর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চলতি সপ্তাহেই জানানো হবে।

বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকটের শুরু মিয়ানমারে সমাপ্তিও হতে হবে সেখানে বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা দেওয়া হবে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ এখনও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রধান লক্ষ্য মিয়ানমারে তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত রাজনৈতিক সমর্থন ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংকটের মূল কারণগুলোরও সমাধান করতে হবে। যে সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, এর সমাপ্তিও হতে হবে মিয়ানমারে।

গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স অ্যান্ড ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন আ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’। আগামীকাল সোমবার পর্যন্ত চলবে এই সম্মেলন। এতে শতাধিক দেশের দুইশ বক্তা, তিনশর বেশি প্রতিনিধি এবং সহস্রাধিক অংশগ্রহণকারী যোগ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আমাদের অগ্রাধিকার। আমরা এখন প্রতিশ্রুতি থেকে সরাসরি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করার পাশাপাশি দেশকে শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন, সেবা, রপ্তানিসহ সব খাতে আমরা ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই।

বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত নিশ্চয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতায়ই বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ অগ্রাধিকার পান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। যা সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু হবে। কৃষক কার্ড কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, কৃষিসেবা ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করবে। হেলথ কার্ড সবার জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করবে এবং চূড়ান্তভাবে ইউনিভার্সাল কার্ডের মাধ্যমে নাগরিকরা এক ছাতার নিচে সমন্বিত সরকারি সেবা নিতে পারবেন।

স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগে কাজ করছে, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই নারী হবেন। তারা তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা দেবেন।

মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের জন্য নয়, শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করারও মাধ্যম হতে হবে। আমরা আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছি। সরকার প্রথম শ্রেণি থেকে বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে জাতীয় অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে দক্ষতা, উন্নয়ন ও উপযুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। সরকার ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও স্টার্টআপগুলোকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আমরা চাই আমাদের তরুণরা বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করুক এবং ব্রেইন ড্রেনকে ব্রেইন সার্কুলেশনে রূপান্তর করুক।

কৃষিকে অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারসংযোগ আরও সহজলভ্য করা হচ্ছে। তিনি বলেন, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তার পরিপূরক হিসেবে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্য রপ্তানি শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। একটি শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতিই গড়ে তুলতে পারে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ।

পানি নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ কৃষি খাতকে সহায়তা করার পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।

পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ করা হবে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের পাশাপাশি বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড সার্টিফায়েড ফ্যাক্টরির মধ্যে ৫৩টিই এখন বাংলাদেশে।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। আমরা প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে সুদৃঢ় করছি। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে।

আইনের শাসন প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা হবে, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবে।

বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রেখে চলেছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সরবরাহ চেইনে অপার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, আঞ্চলিকভাবে অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে আরও গভীর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব। নতুন বাজার উন্মুক্ত করার পাশাপাশি তরুণদের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। সমতা, ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে আমরা আরও শক্তিশালী সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি।

বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ তার সব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করে যাবে। কারণ শান্তি ও সম্প্রীতিই হলো যৌথ সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি।

প্রধানমন্ত্রী বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে এমন একটি এলাকায় পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র একসঙ্গে বিকশিত হবে, পারস্পরিক সমান সুবিধা গ্রহণ করবে এবং নাগরিকরা অর্থবহ সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে তার যথাযথ ভূমিকা পালনে  প্রস্তুত।

সিজিএস আয়োজিত এবারের বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের পাঁচটি মূল আলোচ্য বিষয়– ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবারস্পেস ও তথ্যক্ষমতা, বাণিজ্য, সংযোগ ও কৌশলগত প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু, সহনশীলতা ও মানব নিরাপত্তা। সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর পারভেজ করিম আব্বাসী।

সম্মেলনে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ, মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারাসহ বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ স্থিতিশীলতা চায়: তথ্যমন্ত্রী
সংলাপে অংশ নিয়ে তথ্যমন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, বাংলাদেশ কোনো যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক সংঘাতে জড়াতে চায় না। বাংলাদেশ বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা চায়। কারণ, উন্নতির জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরানসহ বিভিন্ন দেশের সংঘাতের প্রভাব বিশ্বজুড়ে পড়ছে। এসব সংঘাতের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও জ্বালানি কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। ফলে এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই দেশের দ্বন্দ্ব সহজে শেষ হওয়ার নয়। একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতাই এর অন্যতম কারণ। তবে পরাশক্তিগুলো ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সামলাতে পারলেও বাংলাদেশের মতো ভোক্তানির্ভর দেশের জন্য এর প্রভাব সামলানো কঠিন। চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতা করবে এটাই প্রত্যাশা।

জনগণের স্বার্থই গুরুত্বপূর্ণ : শামা ওবায়েদ
সংলাপে অংশ নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের খেলার দাবার বোর্ড হতে চায় না। মাথা উঁচু রেখে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনা, সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বে প্রস্তুত রয়েছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে জনগণের স্বার্থই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের স্বার্থকে সামনে রেখেই আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, সংসদের প্রধান হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সাতজনকে দাফন, শোকে মুহ্যমান চার গ্রাম

ময়মনসিংহ থেকে গত শুক্রবার গভীর রাতে সাতটি মরদেহ পৌঁছায় জামালপুরে গ্রামের বাড়িতে। ভোর থেকে শোকাহত মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করেন। গতকাল শনিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর পর্যন্ত দুটি ইউনিয়নের চার গ্রামে জানাজা শেষে মরদেহগুলো দাফন করা হয়। মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় সাতজনকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান গ্রামগুলোর বাসিন্দারা।

গত শুক্রবার দুপুরে ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া বাইপাস মোড়ে রাজীব পরিবহনের বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে সাতজন নিহত হন। বাসের চালককে আসামি করে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা হয়েছে।

নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন। তারা হলেন– জামালপুর সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নের দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের রাশিদা বেগম (৭০), তাঁর ছেলে মোফাজ্জল হোসেন (৫০), মোফাজ্জল হোসেনের মেয়ে মর্জিনা আক্তার (২৫) এবং মর্জিনার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মিনান। নিহত অন্য তিনজন হলেন– ওই ইউনিয়নের বীর গোবিন্দ গ্রামের অটোরিকশাচালক মো. সুজন আলী এবং শরিফপুর ইউনিয়নের বাদেচাঁন্দি গ্রামের আকরাম আলী ও তাঁর স্ত্রী মমতা বেগম। মরদেহগুলো গ্রামে পৌঁছালে স্বজনের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ। এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
সকালে মোফাজ্জল হোসেন ও রশিদা বেগমের জানাজা দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়ায় অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। মর্জিনা বেগম ও তাঁর ছেলে মিনানের জানাজা ও দাফন হয় মর্জিনার শ্বশুরবাড়ি রানাগাছা ইউনিয়নের ঘোড়ার কান্দা গ্রামে। একই ইউনিয়নের বীর গোবিন্দ গ্রামে দাফন করা হয় অটোরিকশাচালক সুজন মিয়াকে। এ ছাড়া শরিফপুর ইউনিয়নের বাদেচাঁন্দি গ্রামে দাফন করা হয় আকরাম হোসেন ও তাঁর স্ত্রী মমতা বেগমকে। এসব জানাজা ও দাফনে স্থানীয় এমপি শাহ ওয়ারেছ আলী মামুনসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন।
স্থানীয়রা জানান, আকরাম হোসেন গাজীপুরে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর স্ত্রী মমতা বেগম গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। প্রায় এক মাস আগে তারা বাড়িতে এসেছিলেন। শুক্রবার তারা ওই অটোরিকশায় কর্মস্থলে ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন। তাদের দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে।

পেশায় রাজমিস্ত্রি মোফাজ্জল হোসেন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গাজীপুরের হোতাপাড়ায় থাকতেন। মা রাশিদা বেগম, অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে মর্জিনা ও নাতিকে গাজীপুর নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি বাড়ি এসেছিলেন। শুক্রবার  নান্দিনা থেকে অটোরিকশায় করে ময়মনসিংহ বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

জানাজায় অংশ নেওয়া স্থানীয়রা জামালপুর-ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়কে বাসের বেপরোয়া চলাচল বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন। বিশেষ করে, রাজীব পরিবহনের বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
রানাগাছা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান কেরামতউল্লাহ উজ্জলসহ স্থানীয়দের অভিযোগ, জামালপুর-ময়মনসিংহ সড়কে রাজীব পরিবহনের বাসের অদক্ষ চালক ও বেপোরোয়া গতির কারণে  দুর্ঘটনা ঘটছে। গত এক মাসে শুধু রাজীব পরিবহনের বাসের চাপায় প্রাণ গেছে ১১ জনের। কিন্তু কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

গভীর রাতে মামলা, গ্রেপ্তার নেই
প্রাণহানির ঘটনায় গত শুক্রবার বাসচালককে আসামি করে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা হয়েছে। তবে গতকাল শনিবার পর্যন্ত পুলিশ বাসচালককে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
জামালপুর সদর উপজেলার দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের মো. মোবারক আলী মামলাটি করেন। ওইদিন রাত ১২টার পর পুলিশ লিখিত অভিযোগটি মামলা হিসেবে রুজু করে। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় পরিবারের চার সদস্য– মা, ভাই, ভাতিজি ও নাতিকে হারিয়েছেন মোবারক আলী।

জামালপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) ইয়াহিয়া আল মামুন বলেন, ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহ সদরে। তাই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা ময়মনসিংহ পুলিশ নেবে।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার পর রাজীব পরিবহনের বাসটি আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, দুর্ঘটনার পরপরই বাস ও ক্ষতিগ্রস্ত অটোরিকশাটি জব্দ করে থানায় নেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার পর চালক ও হেলপার পালিয়ে যায়। মামলা করা হয়েছে। চালককে দ্রুত গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে।
রাজীব পরিবহনের গায়েবানা জানাজা
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঢাকা-জামালপুর রুটে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য রাজীব পরিবহনের কুখ্যাতি রয়েছে। মর্মান্তিক ওই দুর্ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার রাত ১০টার দিকে জামালপুর শহরের ফৌজদারি এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা রাজীব পরিবহনের গায়েবানা জানাজা ও প্রতীকী লাশ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির তলে তলে যোগাযোগ আখতারের মুক্তি দাবিতে সমাবেশে জামায়াত নেতারা

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির তলে তলে যোগাযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, জামায়াতকে গুপ্ত বলার আগে নিজের এবং নিজের দলের চেহারা আয়নায় দেখুন।

দলের সহযোগী সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের মুক্তির দাবিতে গতকাল শনিবার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে বিক্ষোভ মিছিলপূর্ব সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। জামায়াতে যোগ দেওয়ায় আখতারকে সরকার গ্রেপ্তার করেছে বলে অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার।

বিএনপি নেতারা আঁতাত করে চলায় শেখ হাসিনাকে সরাতে ১৫ বছর লেগে যায় বলে দাবি করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার ঘোষিত কর্মসূচিতে বিএনপির নেতারা লুকিয়ে থাকলেও জামায়াত-শিবির রাজপথে জীবন দিয়েছিল। রাজপথের কর্মসূচিতে বিএনপি নেতাদের পাওয়া যেত না। অনেকে মোবাইল ফোন পর্যন্ত বন্ধ রাখতেন। ক্ষমতায় এসে সরকারপ্রধানসহ তাঁর মন্ত্রীদের কেউ কেউ জামায়াত-শিবিরকে গুপ্ত বলছেন, স্বাধীনতা বিরোধী বলছেন।’

প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি অভিযোগ করেন, জামায়াত এবং আওয়ামী লীগের তলে তলে যোগাযোগ রয়েছে। তা নাকচ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপি সরকারের তলে তলে যোগাযোগ ও সখ্য রয়েছে। সে কারণে আওয়ামী লীগ রাজপথে মিছিলের সুযোগ পাচ্ছে।’
গত বৃহস্পতিবার বিমানবন্দরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে উচ্চবাচ্য করে তাদের ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার যে হুমকি দিয়েছিলেন তা সমর্থন করেন জামায়াত সেক্রেটারি। তিনি বলেন, একজন জ্যেষ্ঠ নাগরিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক এমপি হিসেবে মেজর আখতার বিমানবন্দরে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অদক্ষতা নিয়ে কথা বলতেই পারেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর আখতার সাহসিকতা দেখিয়েছেন।

ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে সমাবেশে দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, আখতারুজ্জামানকে রিমান্ডে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধকে অসম্মান করেছে সরকার। হাতকড়া পরানোর কথা ছিল বিএনপি নেত্রী মিষ্টিকে। রিমান্ডে নেওয়ার কথা ছিল মিষ্টি ও তাঁর অনুসারী দখলবাজ সন্ত্রাসীদের।
সমাবেশ শেষে কয়েক হাজার নেতাকর্মীর মিছিল পল্টন মোড়-প্রেস ক্লাব হয়ে মৎস্য ভবন মোড় পর্যন্ত যায়। তারা সরকারকে স্বৈরাচার আখ্যা দিয়ে স্লোগান দেয়।
এদিকে আখতারুজ্জামানের মুক্তির দাবিতে গতকাল বিকেলে তাঁর নিজ জেলা কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা শহরে উপজেলা জামায়াতের উদ্যোগে ও সন্ধ্যার পর কিশোরগঞ্জ জেলা শহরে জেলা জামায়াতের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে।

হেফাজতের দাবিনামায় বড় পরিবর্তন, নারীদের বিষয়ে দৃশ্যত নমনীয় প্রতিটি দাবির ভাষা, পরিধি ও রাজনৈতিক তাৎপর্যে পরিবর্তন আনা হয়েছে

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নারীদের বিষয়ে তাদের অবস্থান দৃশ্যত নমনীয় করেছে। ২০১৩ সালে দেওয়া ১৩ দফায় নারীর বিষয়ে কঠোর ও রক্ষণশীল অবস্থান ছিল সংগঠনটি। গত আগস্টে সরকারকে দেওয়া নতুন ৯ দফায় নারীর প্রসঙ্গ বাদ দেওয়া হয়েছে। দফাগুলো বিশ্লেষণ করে এই তথ্য জানা গেছে।

হেফাজত নেতারা বলছেন, নারীর বিষয়ে ইসলাম সব সময় উদার। তারাও বিষয়টিকে সেই উদারতার জায়গা থেকে দেখছেন। তবে ধর্মীয় অনুশাসন থেকে তারা সরে আসেননি। সংগঠনের এই পরিবর্তন কোনো আদর্শিক পরিবর্তন নয়, বরং দাবিগুলোকে সময়োপযোগী করতে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।

সংবিধান, সংস্কৃতি, নারী-পুরুষের সামাজিক আচরণ, গণমাধ্যম ও মূর্তি-ভাস্কর্য নিয়ে ২০১৩ সালে হেফাজতের যে দাবিগুলো ছিল, সেগুলোর বড় অংশই নতুন ৯ দফায় নেই। ১৩ দফা থেকে শুধু চারটি দফা বাদ দেওয়াই নয়, প্রায় প্রতিটি দাবির ভাষা, পরিধি ও রাজনৈতিক তাৎপর্যে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এই পরিবর্তনে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিধিনিষেধ-সংক্রান্ত দাবি কমেছে। আর বিচার, কওমি শিক্ষা, রাষ্ট্রীয় কাজে আলেমদের অংশগ্রহণ এবং সংগঠনটির অভ্যন্তরীণভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাবলিগ জামাত ইস্যু বেশি স্পষ্ট হয়েছে। তবে ধর্মীয় অবমাননার বিরুদ্ধে আইন, কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা এবং ইসলাম ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার মতো মূল দাবিগুলো বহাল রেখেছে তারা।

হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ সাজেদুর রহমান সমকালকে বলেন, হেফাজতের ১৩ দফাকে ৯ দফায় কমিয়ে আনা হয়েছে। এতে যেমন কিছু বিষয় নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে, তেমনি কিছু বাদও দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নারীর বিষয়ে ইসলাম সব সময় উদার। আমরা ইসলামের মূলনীতি ঠিক রেখে নারীর শালীনতায় বিশ্বাসী। তাই এই পরিবর্তনকে ভিন্নভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।’

তবে সুশাসনের জন‍্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী সমকালকে বলেন, সরকারের সঙ্গে যাতে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিতে যেতে না হয়, সেজন্য কৌশল হিসেবে সংগঠনটি এই পরিবর্তন এনে থাকতে পারে।

সময়োপযোগী দাবির তালিকা প্রণয়ন করতে হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ সাজেদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি ৯ দফা দাবি প্রণয়ন করে। পরে হেফাজত আমিরের অনুমোদনক্রমে তা চূড়ান্ত হয়।

গত ৯ আগস্ট চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে হেফাজত আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ৯ দফাসংবলিত লিখিত তালিকা প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। সে সময় সরকারের কার্যক্রম, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়।

হেফাজতের বর্তমান ও অতীতের দাবিগুলো বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে হেফাজতের দাবিনামায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের দাবিনামায় প্রথম পরিবর্তন আনা হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দাবিনামায় আরেক দফা পরিবর্তন আনে তারা।

হেফাজতের একাধিক নেতা ও বিএনপির একটি সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সংসদ নির্বাচনের আগে থেকে বিএনপির সঙ্গে হেফাজতের দৃশ্যমান বোঝাপড়া তৈরি হয়। ফলে আগের কয়েকটি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ দাবি সংগঠনটি নিজে থেকে বাদ দেয়।

সার্বিকভাবে কী বদলেছে
বিশ্লেষকরা বলছেন, হেফাজতের এই পরিবর্তনে অন্তত চারটি প্রবণতা স্পষ্ট। প্রথমত, ২০১৩ সালের তালিকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ন্ত্রণে অনেক দাবি যেমন, নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, বিজাতীয় সংস্কৃতি, মূর্তি-ভাস্কর্য, গণমাধ্যমে দাড়ি-টুপি নিয়ে ব্যঙ্গ, শাহবাগ ও ব্লগার প্রসঙ্গ নতুন তালিকায় নেই।

দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় দাবিগুলোর মধ্যে কিছু বিষয় রাখা হলেও ভাষা পরিবর্তন করা হয়েছে। যেমন মৃত্যুদণ্ডের জায়গায় সর্বোচ্চ শাস্তি; ইসলামবিরোধী শিক্ষানীতি বাতিলের বদলে মুসলিম শিক্ষার্থীদের ইসলাম ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি তোলা হয়েছে।

তৃতীয়ত, নতুন তালিকায় অতীতের রাজনৈতিক ঘটনা ও বিচার একটি বড় জায়গা নিয়েছে। বিশেষ করে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর, ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে হত্যাযজ্ঞ– এই তিন সময় পর্বকে বিচারের দাবির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

চতুর্থত, কওমি মাদ্রাসা ও আলেম সমাজ ঘিরে দাবির ধরনও বদলেছে। শুধু মামলা প্রত্যাহার বা হয়রানি বন্ধ নয়; দাওরায়ে হাদিসের স্বীকৃতি বাস্তবায়ন, সরকারি চাকরি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে আলেমদের অংশীদার করার দাবি যুক্ত হয়েছে।

নারী-পুরুষের সামাজিক আচরণ ও বিজাতীয় সংস্কৃতি প্রসঙ্গ বাদ
১৩ দফার চতুর্থ দফায় ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে ‘বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার’, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বালনসহ ‘বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ’ বন্ধের দাবি ছিল। ৯ দফায় এই দাবির কোনো অংশই নেই। পরিবর্তনের অন্যতম বড় দিক– ব্যক্তিজীবন, সামাজিক আচরণ ও সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ন্ত্রণের দাবি থেকে সরে এসেছে হেফাজত।

নারীনীতি ও শিক্ষানীতির বিরোধিতার বদলে শুধু ধর্মশিক্ষা
পুরোনো পঞ্চম দফায় ‘ইসলামবিরোধী নারীনীতি’ ও ‘ধর্মহীন শিক্ষানীতি’ বাতিলের পাশাপাশি প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি ছিল। নতুন তালিকায় নারীনীতি বাতিলের দাবি নেই। শিক্ষানীতি বাতিলের কথাও নেই। শুধু বলা হয়েছে, প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

জানতে চাইলে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক সমকালকে বলেন, ‘তারা বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। এতে তাদের চিন্তার জায়গাতেও কিছু পরিবর্তন এসেছে বলে আমি মনে করি।’

সংবিধান সংশোধনের দাবি বাদ
১৩ দফার প্রথম দফায় ছিল সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিলের দাবি। ৯ দফায় এর প্রথম অংশটি রাখা হয়নি। সেখানে বলা হয়েছে, ‘কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস করা যাবে না।’

অর্থাৎ আগের দাবিতে সংবিধানের মূলনীতিতে পরিবর্তনের কথা স্পষ্টভাবে বলা হলেও নতুন দাবিতে তা থেকে সরে কেবল আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হওয়ার কথা বলা হয়। হেফাজত নেতারা বলছেন, বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ কারণে দাবিটি আর রাখা হয়নি।

‘মৃত্যুদণ্ড’ থেকে ‘সর্বোচ্চ শাস্তি’
দুই তালিকাতেই আল্লাহ, রাসুল (সা.), কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননার বিরুদ্ধে আইন প্রণয়নের দাবি করা হয়েছে। ১৩ দফার দ্বিতীয় দফায় ‘সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে’ আইন করার কথা বলা হয়েছিল। ৯ দফায় বলা হয়েছে, ‘সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে’ আইন করতে হবে। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড শব্দটি নেই।

আরেকটি পরিবর্তন হলো, ১৩ দফায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘কুৎসা’ রোধের কথাও ছিল। নতুন দাবিতে মূলত আল্লাহ, রাসুল (সা.), পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননার বিষয়টি রাখা হয়েছে। ১৫ আগস্ট ঢাকায় জাতীয় ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলনেও এ ধরনের দাবি উত্থাপিত হয়েছিল।

শাহবাগ, ব্লগার ও ‘নাস্তিক-মুরতাদ’ প্রসঙ্গ নেই
১৩ দফার তৃতীয় দফায় শাহবাগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী ‘স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ’, ব্লগার ও ইসলামবিদ্বেষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ছিল। ৯ দফায় বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে।

কাদিয়ানিদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হিযবুত তওহিদ
কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা– পুরোনো ও নতুন দুই তালিকাতেই আছে। তবে পুরোনো দাবিতে কাদিয়ানিদের প্রচারণা ও ‘ষড়যন্ত্রমূলক অপতৎপরতা’ বন্ধের কথা ছিল। ৯ দফায় কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের সঙ্গে হিযবুত তওহিদকে নিষিদ্ধ করার দাবি যুক্ত হয়েছে।

মূর্তি-ভাস্কর্যের দাবি পুরোপুরি বাদ
পুরোনো তালিকার অন্যতম দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক দাবি ছিল (১৩ দফার সপ্তম দফা) ঢাকাকে ‘মসজিদের নগর’ থেকে ‘মূর্তির নগর’-এ রূপান্তর এবং রাস্তার মোড়, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপনের বিরোধিতা করা হয়েছিল। ৯ দফায় মূর্তি বা ভাস্কর্য নিয়ে কোনো দাবি নেই।

মসজিদ, ওয়াজ ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতার দাবি ছিল ১৩ দফায়। ৯ দফায় এটিও বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৩ সালের নবম দফায় রেডিও-টেলিভিশনসহ গণমাধ্যমে দাড়ি-টুপি ও ইসলামী সংস্কৃতি নিয়ে হাসিঠাট্টা এবং নাটক-সিনেমায় ধর্মীয় পোশাককে নেতিবাচক চরিত্রে ব্যবহারের মাধ্যমে ইসলামবিদ্বেষ সৃষ্টি বন্ধের দাবি ছিল। এই সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমকেন্দ্রিক অংশ ৯ দফায় রাখা হয়নি।

এনজিও-মিশনারি থেকে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম
পুরোনো দশম দফায় পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও ও খ্রিষ্টান মিশনারিদের ধর্মান্তরকরণসহ সব কর্মকাণ্ড বন্ধের দাবি ছিল। এখন বিষয়টি অনেক বেশি নির্দিষ্ট ও সীমিত করে বলা হয়েছে– ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি মিশনারিদের ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে।’ ধর্মান্তর কার্যক্রম বন্ধের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে।

নতুন সংযোজন– শাপলা ও জুলাই-আগস্ট
৯ দফায় স্পষ্ট পরিবর্তন এসেছে বিচারসংক্রান্ত দাবিতে। এর তৃতীয় দফায় বলা হয়েছে, শাপলা চত্বরে ‘গণহত্যায়’ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার করতে হবে। চতুর্থ দফায় ২০২১ সালের মোদিবিরোধী (ভারতের প্রধানমন্ত্রী) আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-হত্যাযজ্ঞে জড়িত হুকুমের আসামি ও খুনিদের বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ হেফাজত নেতাকর্মীদের মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার ও হামলার বিচারকেন্দ্রিক দাবি রাজনৈতিক সহিংসতার বিচার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

এ বিষয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক বলেন, ‘শাপলা চত্বরে সেদিন কী ঘটেছিল, তা নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হওয়াকে আমি স্বাগত জানাই। কারণ, সেদিন যেভাবে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আমরা সত্য জানতে চাই। প্রকৃত সত্য জানার অধিকার নাগরিক হিসেবে আমাদের রয়েছে।’

কওমি মাদ্রাসা নিয়ে নতুন অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দাবি
১৩ দফায় ছিল কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মামলা, হুমকি ও হয়রানি বন্ধের দাবি। ৯ দফায় যুক্ত হয়েছে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ। দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করে দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করার পাশাপাশি সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রিকে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করা হয়েছে।

আলেমদের পুনর্গঠনে অংশীদার করার দাবি
নতুন নবম দফায় মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের পাশাপাশি বলা হয়েছে, আলেম-ওলামাকে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে অংশীদার করতে হবে। এটি ভাষাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। পুরোনো দাবিতে আলেমদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ ও মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছিল। নতুন দাবিতে তাদের রাষ্ট্র পরিচালনা ও পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় অংশীদার করার একটি রাজনৈতিক ভূমিকার দাবি যুক্ত হয়েছে।

সাদ কান্ধলভী ও তাবলিগ জামাত নতুন করে দাবির কেন্দ্রে
হেফাজত বলছে, বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম ও বিশ্ব ইজতেমা ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে এসেছে। একই সঙ্গে ভারতের মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বাংলাদেশে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থিদের ইজতেমার অনুমতি না দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও হেফাজত সাদ কান্ধলভীর বাংলাদেশে আসা এবং তাবলিগের বিরোধ নিয়ে অবস্থান জানিয়েছে।

যা বললেন হেফাজত নেতা
হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘হেফাজতের দাবির তালিকায় কী আছে, কী নেই, সেটি বড় কথা নয়। ইসলাম নারীকে সবচেয়ে বেশি অধিকার দিয়েছে। তথাকথিত সেকুলাররা নারীর অধিকারের নামে, আধুনিকতার নামে তাদের পণ্যে পরিণত করতে চায়। আমরা সব সময় তার বিরোধিতা করে আসছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ভাস্কর্যের নামে মূতি নির্মাণ করা হয়েছিল। আমরা তার প্রতিবাদ করেছিলাম। তাদের পতন ঘটেছে। বর্তমান সরকার ভাস্কর্যের নামে মূর্তি নির্মাণ করবে না বলে আমাদের বিশ্বাস। একই কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে কথিত শাহবাগে আন্দোলনকারী স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদদের শাস্তি দাবির বিষয়টিও।

হিযবুত তওহিদ নিষিদ্ধের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, তারা ইসলামকে বিকৃত করছে, বিভিন্ন ফিতনামূলক কর্মকাণ্ড করছে। এ জন্য সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করতে দাবির তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।

সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার দাবি হুতিদের

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের দক্ষিণে জ্বালানি তেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। গোষ্ঠীটির দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

গতকাল শনিবার ওই স্থাপনার আশপাশ থেকে আগুনের শিখা ও ধোঁয়ার বড় কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। তবে আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে সৌদি কর্তৃপক্ষ বা সৌদি আরামকোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন এলাকায় সৌদি আরব হামলা চালাচ্ছে। এর জবাবে রিয়াদের কাছে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালানো হয়েছে।

ইয়াহিয়া সারির দাবি, হুতিদের হামলার কারণে রিয়াদের দক্ষিণে ওই তেল স্থাপনায় আগুন ধরে যায়। গত ২৪ ঘণ্টায় হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোয় সৌদি আরব প্রায় ৬০টি বিমান হামলা চালিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে গত জুলাইয়ে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। এরপর থেকে দুই পক্ষই পরস্পরের বিভিন্ন অবস্থানে হামলা চালিয়ে আসছে।

হুতিরা ইয়েমেনের আরও কিছু এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পাশাপাশি লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালিতে নিজেদের অবস্থান জোরদার করেছে। ওই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে হুতিদের ওপর বড় ধরনের অভিযান চালাচ্ছে সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী। সাম্প্রতিক এসব হামলায় হাজারো হুতি যোদ্ধা হতাহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে বাহিনীটি।

হুতিদের কোণঠাসা করতে বড় ধরনের অভিযান শুরুর পরিকল্পনাও করছে সৌদি আরব। ইরানপন্থী এই গোষ্ঠীকে পরাস্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে সৌদি আরব সহযোগিতা পাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে ব্যর্থতার পর পদ ছাড়ছেন টেনেসির কারাপ্রধান

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর পদত্যাগ করছেন রাজ্যের কারা বিভাগের প্রধান ফ্রাঙ্ক স্ট্রাডা। গত বুধবার প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার পরও পাইকের মৃত্যু হয়নি। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন।

শনিবার টেনেসির গভর্নর বিল লি ফ্রাঙ্ক স্ট্রাডার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। টেনেসি ডিপার্টমেন্ট অব কারেকশনের কমিশনার স্ট্রাডার সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি।

স্ট্রাডা বলেন, তার পদত্যাগ টেনেসি অঙ্গরাজ্যের স্বার্থেই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থতার ঘটনা নিয়ে যে তদন্ত চলছে, সেটি যথাযথ ও প্রয়োজনীয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন গভর্নর। পাশাপাশি চলতি বছরের জন্য অঙ্গরাজ্যে সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছেন তিনি।

পাইকের আইনজীবীরা স্ট্রাডার পদত্যাগকে ‘ন্যায্য’ সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তারা বলেছেন, এতে এখন ক্রিস্টা পাইকের কোনো উপকার হবে না।

আইনজীবীদের বিবৃতিতে বলা হয়, বুধবার পাইকের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা শুধু একজন ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়; এর সঙ্গে টেনেসির পুরো মৃত্যুদণ্ড ব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতা জড়িত। গভর্নরের নির্দেশ দেওয়া পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে অঙ্গরাজ্যের মৃত্যুদণ্ড ব্যবস্থার গুরুতর সমস্যাগুলো বেরিয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।

বুধবার ক্রিস্টা পাইকের শরীরে প্রাণঘাতী ওষুধ পেন্টোবারবিটালের দুটি ডোজ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু দুই দফা ইনজেকশন দেওয়ার পরও তিনি বেঁচে ছিলেন। পরে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইনজেকশন দেওয়ার সময় পাইকের কান্না, কাতর শব্দ ও জোরে শ্বাস নেওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত তিনি অচেতন ছিলেন এবং তাকে ভেন্টিলেটরে রাখা হয়েছিল।

বর্তমানে টেনেসির ন্যাশভিলের একটি হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। আইনি নথিতে বলা হয়েছে, চিকিৎসকেরা তার শরীর থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে ব্যবহৃত ওষুধের প্রভাব দূর করার চেষ্টা করছেন। তার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

এদিকে পাইকের মৃত্যুদণ্ড আবার কার্যকর করার চেষ্টা করা হবে কি না, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ এখনো কিছু জানায়নি। ব্যর্থতার কারণ সম্পর্কেও কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। পাইকের আইনজীবীরা শুক্রবার জরুরি আবেদন করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘সব ধরনের প্রমাণ’ সংরক্ষণের অনুরোধ করেছেন।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পাইকের আইনজীবীরা তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, পাইকের চিকিৎসা ইতিহাস ও শারীরিক গঠনের কারণে প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগে অতিরিক্ত ব্যথা ও কষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাইকের থ্রম্বোসাইটোসিস নামের একটি রক্তজমাট-সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে এবং তার শিরাগুলোও তুলনামূলকভাবে ছোট। এসব কারণে ইনজেকশন প্রয়োগের সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছিলেন।

তবে একাধিক দফায় আইনি চ্যালেঞ্জের পরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের জন্য পাইকের আইনজীবীদের করা দুটি পৃথক আবেদনও যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রত্যাখ্যান করেন। পরে টেনেসির গভর্নরও তার ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন নাকচ করেন।

পাইকে টেনেসির মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারীদের মধ্যে একমাত্র বন্দী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯৯৫ সালে ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে ক্রিস্টা পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ঘটনার সময় পাইকের বয়স ছিল ১৮ বছর। সে সময় তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল টাডারিল শিপের। তারা দুজন মিলে স্লেমারকে মারধর, নির্যাতন ও হত্যা করেন বলে মামলায় উঠে আসে।

পরের বছর, ১৯৯৬ সালে পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। টেনেসির নক্সভিলে ওই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে সে সময় ব্যাপক সংবাদমাধ্যমের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

সরকারি দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রিতে অভিযান, ১৬ জেলায় ৩৯ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা

সরকার নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী বিশেষ তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করেছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ঢাকা মহানগরসহ দেশের ১৬ জেলায় পরিচালিত এ অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

শনিবার অধিদপ্তরের ২৩টি টিম একযোগে ডিলার, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় অভিযান পরিচালনা করে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখা, গ্যাস সিলিন্ডারের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় ঠেকাতে এ তদারকি চালানো হয়।

অভিযানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় মূল্যতালিকা প্রদর্শন, ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ ও প্রদান, সিলিন্ডারের নিরাপত্তা বিধি প্রতিপালন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে কিনা তা যাচাই করা হয়।

একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অযৌক্তিক মজুত ও সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দৃশ্যমান স্থানে হালনাগাদ মূল্যতালিকা প্রদর্শন এবং সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রির বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।

ভোক্তাদের গ্যাস সিলিন্ডার কেনার আগে ওজন, সিল, মেয়াদ ও দৃশ্যমান ত্রুটি পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছে অধিদপ্তর। পাশাপাশি মূল্যতালিকা যাচাই এবং ক্রয়ের সময় রশিদ বা ভাউচার সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।

গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রিতে কোনো অনিয়ম দেখা গেলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১-এ অভিযোগ জানাতে পারবেন ভোক্তারা। অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাজারে শৃঙ্খলা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহারকারী এক বছরে বেড়ে তিন গুণ

দেশের ব্যাংকগুলোতে অ্যাপ ব্যবহারকারী গ্রাহক দ্রুত বাড়ছে। গত জুলাই শেষে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের প্রধান মাধ্যম অ্যাপে গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে প্রায় দুই কোটি ১০ লাখ হয়েছে। গত বছরের আগস্টে যা ছিল ৭২ লাখের কম। এর মানে এক বছরের ব্যবধানে অ্যাপ ব্যবহারকারী গ্রাহক এক কোটি ৩৮ লাখের বেশি বেড়ে প্রায় তিন গুণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অ্যাপভিত্তিক লেনদেন ও গ্রাহক বৃদ্ধির সঙ্গে বাংলা কিউআরের সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৩ সালে আন্তঃব্যাংক কোডভিত্তিক লেনদেন নিষ্পত্তিতে বাংলা কিউআর চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে সব প্রতিষ্ঠানের কোডভিত্তিক লেনদেন বাংলা কিউআরে প্রতিস্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়।

গত বছরের নভেম্বরে বাংলা কিউআরে লেনদেন আরও গতিশীল করতে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা বিভিন্ন নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ করে বাংলা কিউআরে লেনদেনের অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হিসাবে জমা দিতে বলা হয়। এ ছাড়া বাংলা কিউআরের কারণে যে কোনো ব্যাংক বা এমএফএসের অ্যাপ থাকলেই পরিশোধ করা যায়। এসব কারণে দ্রুত বেড়েছে। গত জুলাইয়ের পর এখনও তথ্য আপডেট করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এটা আরও অনেক বেড়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, এক সময় অ্যাপভিত্তিক লেনদেন কেবল এমএফএসের জন্য মনে করা হতো। তবে বাংলা কিউআর আসার পর ব্যাংক, এমএফএসসহ সবাই এর গুরুত্ব বুঝেছে। গত ১ জুলাই থেকে সব প্রতিষ্ঠানের কিউআর বাংলা কিউআরে প্রতিস্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি যেসব ব্যাংকের অ্যাপ ছিল না, তাদের এ ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অ্যাপের দৃশ্যমান স্থানে বাংলা কিউআর আইকন যুক্ত করাসহ বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যে কারণে সামগ্রিকভাবে অ্যাপ ব্যবহারী গ্রাহক ও লেনদেন বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী গত বছরের নভেম্বরের পর অ্যাপ ব্যবহারকারী গ্রাহক লাফিয়ে বেড়েছে। গত বছরের নভেম্বরে মোট অ্যাপ ব্যবহারী গ্রাহক ছিল ৮৫ লাখ ৭২ হাজার। পরের মাস ডিসেম্বরে তা বেড়ে এক কোটি ৪৯ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এরপর প্রতি মাসে বেড়ে গত জুলাইতে দুই কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার ৩২৫টিতে ঠেকেছে। এর মধ্যে পুরুষ এক কোটি ৬৭ লাখ ৭২ হাজার। আর নারী ৩৮ লাখের বেশি। এ ছাড়া বিভিন্ন করপোরেট গ্রাহকসহ অন্যান্য অ্যাপ ব্যবহারী আছেন চার লাখের বেশি।

গত বছরের আগস্টে মোট ৭১ লাখ ৬৬ হাজার ৫৮৯ জনের মধ্যে যেখানে মাত্র ৫২ লাখ ৬৫ হাজার ছিলেন পুরুষ অ্যাপ ব্যবহারকারী। নারী ছিলেন মাত্র ১৪ লাখ ৩৫ হাজার। আর করপোরেটসহ অন্যান্য গ্রাহক ছিল চার লাখ ৬৭ হাজার। এ সময়ে মোট ব্যবহারকারী বেড়ে প্রায় তিন গুণ হলেও করপোরেট, তৃতীয় লিঙ্গের গ্রাহকসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে কমেছে।

ব্যাংকগুলোর ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারের প্রধান মাধ্যম এখন অ্যাপ। অ্যাপ ছাড়াও শুধু ব্রাউজারভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারকারী গ্রাহকও আছে। মূলত ব্যাংকের ওয়েব পোর্টাল বা ইন্টারনেট ব্রাউজারে ব্যাংকের ওয়েবসাইটে লগইন করে এসব গ্রাহক লেনদেন ও দাপ্তরিক কাজ করে থাকে। এক সময় ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে অ্যাপের অনুপাতে এ রকম গ্রাহক সংখ্যা যা ছিল, সে তুলনায় এখন কমছে। মূলত বাড়তি ঝামেলা, বেশির ভাগ ব্যাংকে অ্যাপভিত্তিক লেনদেনের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন কারণে এখন ব্রাউজভিত্তিক গ্রাহক কমে এসেছে।

গত জুলাইতে কেবল ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের ব্রাউজারভিত্তিক গ্রাহক সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৮৯ হাজার। অ্যাপ এবং ব্রাউজারভিত্তিক মিলিয়ে এখন ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ৩৪ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি। গত বছরের আগস্টে ব্রাউজারভিত্তিক গ্রাহক ছিল ৪৮ লাখ। সব মিলিয়ে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক ছিল এক কোটি ১৯ লাখ ৬৭ হাজার।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের লেনদেনও অনেক বেড়েছে। চলতি বছরের জুলাইতে অ্যাপ থেকে মোট এক লাখ ৭৪ হাজার ১২৯ কোটি টাকার লেনদেন হয়। গত বছরের আগস্টে যা ছিল এক লাখ ১২ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। এ সময়ের মধ্যে কোনো একক মাসে সর্বোচ্চ গত জুনে এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। ওই মাসে কোরবানি ঈদ ছিল।

ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান সমকালকে বলেন, ‘অর্থনীতির আকার যত বড় হবে নগদবিহীন লেনদেনের প্রয়োজনীয়তা তত বাড়বে। বিশ্বের অনেক দেশে এখন নগদ লেনদেন করা যায় না। বাংলাদেশকেও সেদিকেই যেতে হবে। এখন বাংলা কিউআর এসেছে। গ্রাহকদের যত স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়া যাবে, ক্যাশলেস লেনদেন তত বাড়বে।’

তিনি বলেন, ব্র্যাক ব্যাংক শুরু থেকেই ডিজিটাল লেনদেনের ওপর জোর দিয়ে আসছে। ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যক্তি গ্রাহকদের ‘আস্থা’ অ্যাপে প্রতি মাসে এখন গড়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং করপোরেট গ্রাহকদের ‘কর্পনেট’ অ্যাপে ৩০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। আরও উন্নত ও মানসম্মত সেবার মাধ্যমে এ ব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।