বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক সরকারি প্রতিবেদনে ফলের দাম বাজারের চেয়ে অনেক কম

কয়েক দিনের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারে আমদানি করা কমলা ও মাল্টার দাম বেশ বেড়েছে। বর্তমানে কেজিপ্রতি ৫০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ফলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত ও বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে গতকাল শনিবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

বৈঠকে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এতে মাল্টার দাম কেজিপ্রতি ২৪০ থেকে ৩২০ টাকা এবং কমলার দাম ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু রাজধানীর বাজারের বাস্তব চিত্রের সঙ্গে ফলের দামে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। কোন তথ্যের ভিত্তিতে কমিশন এ দাম নির্ধারণ করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলের দাম কম দেখালেও দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বেশি।

সভায় মাল্টার বর্তমান বাজারদর নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনার পরও খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মাল্টার দাম কীভাবে ৫২০ টাকায় পৌঁছায়, ব্যবসায়ীদের কাছে তার ব্যাখ্যা চান তিনি।

বাজারদরের সঙ্গে বড় ফারাক

কারওয়ান বাজারের খুচরা ফল বিক্রেতা শরিফুল ইসলাম সমকালকে জানান, গতকাল তিনি কেজিপ্রতি মাল্টা বিক্রি করেছেন ৪০০ থেকে ৪২০ টাকায়। প্রতিকেজি কমলা বিক্রি করেছেন ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকায়। জিগাতলার ট্যানারি মোড়ের ফল বিক্রেতা আমিনুল হকও এ দুই ফলের দামের বিষয়ে প্রায় একই রকম তথ্য দেন।

ট্যারিফ কমিশন কেন ফলের দাম এত কম উল্লেখ করেছে জানতে চাইলে কমিশনের চেয়ারম্যান (সচিব) নাসির-উদ-দৌলা সমকালকে বলেন, বিষয়টি ভালোভাবে জানতে হবে, প্রয়োজন আছে। তিনি প্রতিবেদনটি যে তৈরি করেছেন, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। কিন্তু ওই কর্মকর্তাকে ফোন ও এসএমএস করলে তিনি সাড়া দেননি।

পাঁচ ফলের  বেশির ভাগই  আমদানি 
সভায় মাল্টা, কমলা, আপেল, আঙুর ও খেজুর– এই পাঁচটি তাজা ফল নিয়ে আলোচনা হয়। কমিশনের উপস্থাপনা অনুযায়ী, দেশে আমদানি করা তাজা ফলের বার্ষিক চাহিদা পাঁচ থেকে ছয় লাখ টন। এর মধ্যে আপেল ও মাল্টার চাহিদা প্রায় ৭৭ শতাংশ। রমজান ও ধর্মীয় উৎসবের কারণে খেজুরের বার্ষিক চাহিদা দাঁড়ায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টনে, যার ৬০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় রমজানে।

আপেল, সাধারণ মাল্টা, কমলা, আঙুর ও খেজুর জলবায়ু ও বাণিজ্যিক কারণে বাংলাদেশে অত্যন্ত সীমিত বা নগণ্য পরিমাণে উৎপাদিত হয়। তাই এসব ফলের চাহিদার ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশ আমদানি করে মেটাতে হয়। যদিও পেয়ারা, ড্রাগন ও আমের দেশীয় উৎপাদন পর্যাপ্ত।

মূলত চীন, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ব্রাজিল, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসব ফল আসে। আমদানির ওপর নির্ভর করায় আমদানি পর্যায়ের শুল্ক-করসহ যে কোনো খরচ ও জটিলতার প্রভাব সরাসরি খুচরা বাজারে পড়ে।

শুল্ক-করেই দাম দ্বিগুণ

কমিশনের উপস্থাপনা অনুযায়ী, ফল আমদানিতে বিভিন্ন শুল্ক ও কর মিলিয়ে মোট করভার দাঁড়ায় ৯৬ দশমিক ১০ থেকে ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ আমদানি মূল্যের প্রায় সমান বা এর চেয়ে বেশি কর দিতে হয়।

এই করভারের মধ্যে রয়েছে ২৫ আমদানি শুল্ক, ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর এবং ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক অতিরিক্ত শুল্ক। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শূন্য থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম কর।

উচ্চমূল্যের তিন কারণ
কমিশনের প্রতিবেদনে উচ্চমূল্য ও বাজার অস্থিতিশীলতার তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথম কারণ, বিলাসদ্রব্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধকরণ। জরুরি পুষ্টি উপাদান হওয়া সত্ত্বেও তাজা ফলকে বিলাসদ্রব্য গণ্য করে উচ্চ কর আরোপ করা হচ্ছে। দ্বিতীয় কারণ, শুল্কায়নযোগ্য মূল্য। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রকৃত বুকিং দরের চেয়ে বেশি মূল্য ধরে কাস্টমসে শুল্কায়ন করা হচ্ছে। এতে একই শুল্কহারেও আমদানিকারককে বেশি কর দিতে হয়।

তৃতীয় কারণ, সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধা। আমদানিকারকের সংখ্যা সীমিত, তার ওপর হিমাগার সংকট রয়েছে। এতে সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং দাম বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি দাম
কমিশনের উপস্থাপনায় দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশের সঙ্গে ফলের দামের তুলনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের তুলনায় বাংলাদেশে সব ফলের দাম অনেক বেশি।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি কেজি আপেলের দাম ২৮০ থেকে ৩৮০ টাকা। যেখানে ভারতে ১৫০ থেকে ২২০, পাকিস্তানে ১১০ থেকে ১৭০ এবং নেপালে ১৬০ থেকে ২৪০ টাকা। শ্রীলঙ্কায় এর দাম ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা।

আঙুরের দাম বাংলাদেশে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা, ভারতে ১৩০ থেকে ২০০, পাকিস্তানে ১০০ থেকে ১৬০, নেপালে ১৫০ থেকে ২৩০ এবং শ্রীলঙ্কায় ৩৮০ থেকে ৫০০ টাকা।

সাধারণ খেজুর বাংলাদেশে ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, ভারতে ১৬০ থেকে ২৬০, পাকিস্তানে ১২০ থেকে ২০০, নেপালে ১৮০ থেকে ২৮০ এবং শ্রীলঙ্কায় ৩২০ থেকে ৪৫০ টাকা। উপস্থাপনায় শুধু শ্রীলঙ্কাতেই দাম বাংলাদেশের চেয়ে বেশি বা কাছাকাছি দেখানো হয়েছে।

সমাধানে তিন প্রস্তাব
পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্যারিফ কমিশন সম্ভাব্য কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা হিসেবে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে। প্রথমত, শুল্ক কাঠামো যৌক্তিকীকরণ। এর আওতায় তাজা ফল ও খেজুরকে জরুরি নিত্যপণ্যে রূপান্তর এবং নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি) ও সম্পূরক শুল্ক (এসডি) প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় ইনভয়েস মূল্যে শুল্কায়ন। আন্তর্জাতিক দর অনুযায়ী শুল্কায়ন এবং তাজা ফলকে পচনশীল পণ্য বিবেচনায় ‘গ্রিন চ্যানেল’-এর মাধ্যমে খালাসের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তৃতীয়ত, এলসি সহজীকরণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের এলসি সুবিধা দেওয়া এবং কোল্ড স্টোরেজ সুবিধার আওতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

শুল্ক পর্যালোচনার আশ্বাস বাণিজ্যমন্ত্রীর
সভায় ব্যবসায়ীরা জানান, মাল্টার বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ সরবরাহের ঘাটতি। তাদের হিসাবে, কোনো কোনো সপ্তাহে দেশে মাত্র ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার মাল্টা এসেছে। অথচ স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কনটেইনার মাল্টা প্রয়োজন হয়।

উচ্চ শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ও বন্দরের জটিলতা এবং আগের চালানে লোকসানের কারণে অনেক ব্যবসায়ী মাল্টা আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন বলেও জানান। পচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন ও সংরক্ষণ পর্যায়ে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য শুনে মাল্টার শুল্কসংক্রান্ত বিষয়টি পর্যালোচনার আশ্বাস দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত এলসি খুলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর তাগিদ দেন।

বাজারে মাল্টা, খেজুরসহ আমদানিনির্ভর ফলের সরবরাহ বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানিকারকদের দ্রুত ঋণপত্র খুলে আমদানি বাড়ানোর আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, খেজুর আমদানিতে শুল্ক-কর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চলতি সপ্তাহেই জানানো হবে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর