সাতজনকে দাফন, শোকে মুহ্যমান চার গ্রাম

ময়মনসিংহ থেকে গত শুক্রবার গভীর রাতে সাতটি মরদেহ পৌঁছায় জামালপুরে গ্রামের বাড়িতে। ভোর থেকে শোকাহত মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করেন। গতকাল শনিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর পর্যন্ত দুটি ইউনিয়নের চার গ্রামে জানাজা শেষে মরদেহগুলো দাফন করা হয়। মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় সাতজনকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান গ্রামগুলোর বাসিন্দারা।

গত শুক্রবার দুপুরে ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া বাইপাস মোড়ে রাজীব পরিবহনের বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে সাতজন নিহত হন। বাসের চালককে আসামি করে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা হয়েছে।

নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন। তারা হলেন– জামালপুর সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নের দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের রাশিদা বেগম (৭০), তাঁর ছেলে মোফাজ্জল হোসেন (৫০), মোফাজ্জল হোসেনের মেয়ে মর্জিনা আক্তার (২৫) এবং মর্জিনার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মিনান। নিহত অন্য তিনজন হলেন– ওই ইউনিয়নের বীর গোবিন্দ গ্রামের অটোরিকশাচালক মো. সুজন আলী এবং শরিফপুর ইউনিয়নের বাদেচাঁন্দি গ্রামের আকরাম আলী ও তাঁর স্ত্রী মমতা বেগম। মরদেহগুলো গ্রামে পৌঁছালে স্বজনের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ। এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
সকালে মোফাজ্জল হোসেন ও রশিদা বেগমের জানাজা দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়ায় অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। মর্জিনা বেগম ও তাঁর ছেলে মিনানের জানাজা ও দাফন হয় মর্জিনার শ্বশুরবাড়ি রানাগাছা ইউনিয়নের ঘোড়ার কান্দা গ্রামে। একই ইউনিয়নের বীর গোবিন্দ গ্রামে দাফন করা হয় অটোরিকশাচালক সুজন মিয়াকে। এ ছাড়া শরিফপুর ইউনিয়নের বাদেচাঁন্দি গ্রামে দাফন করা হয় আকরাম হোসেন ও তাঁর স্ত্রী মমতা বেগমকে। এসব জানাজা ও দাফনে স্থানীয় এমপি শাহ ওয়ারেছ আলী মামুনসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন।
স্থানীয়রা জানান, আকরাম হোসেন গাজীপুরে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর স্ত্রী মমতা বেগম গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। প্রায় এক মাস আগে তারা বাড়িতে এসেছিলেন। শুক্রবার তারা ওই অটোরিকশায় কর্মস্থলে ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন। তাদের দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে।

পেশায় রাজমিস্ত্রি মোফাজ্জল হোসেন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গাজীপুরের হোতাপাড়ায় থাকতেন। মা রাশিদা বেগম, অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে মর্জিনা ও নাতিকে গাজীপুর নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি বাড়ি এসেছিলেন। শুক্রবার  নান্দিনা থেকে অটোরিকশায় করে ময়মনসিংহ বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

জানাজায় অংশ নেওয়া স্থানীয়রা জামালপুর-ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়কে বাসের বেপরোয়া চলাচল বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন। বিশেষ করে, রাজীব পরিবহনের বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
রানাগাছা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান কেরামতউল্লাহ উজ্জলসহ স্থানীয়দের অভিযোগ, জামালপুর-ময়মনসিংহ সড়কে রাজীব পরিবহনের বাসের অদক্ষ চালক ও বেপোরোয়া গতির কারণে  দুর্ঘটনা ঘটছে। গত এক মাসে শুধু রাজীব পরিবহনের বাসের চাপায় প্রাণ গেছে ১১ জনের। কিন্তু কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

গভীর রাতে মামলা, গ্রেপ্তার নেই
প্রাণহানির ঘটনায় গত শুক্রবার বাসচালককে আসামি করে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা হয়েছে। তবে গতকাল শনিবার পর্যন্ত পুলিশ বাসচালককে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
জামালপুর সদর উপজেলার দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের মো. মোবারক আলী মামলাটি করেন। ওইদিন রাত ১২টার পর পুলিশ লিখিত অভিযোগটি মামলা হিসেবে রুজু করে। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় পরিবারের চার সদস্য– মা, ভাই, ভাতিজি ও নাতিকে হারিয়েছেন মোবারক আলী।

জামালপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) ইয়াহিয়া আল মামুন বলেন, ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহ সদরে। তাই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা ময়মনসিংহ পুলিশ নেবে।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার পর রাজীব পরিবহনের বাসটি আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, দুর্ঘটনার পরপরই বাস ও ক্ষতিগ্রস্ত অটোরিকশাটি জব্দ করে থানায় নেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার পর চালক ও হেলপার পালিয়ে যায়। মামলা করা হয়েছে। চালককে দ্রুত গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে।
রাজীব পরিবহনের গায়েবানা জানাজা
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঢাকা-জামালপুর রুটে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য রাজীব পরিবহনের কুখ্যাতি রয়েছে। মর্মান্তিক ওই দুর্ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার রাত ১০টার দিকে জামালপুর শহরের ফৌজদারি এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা রাজীব পরিবহনের গায়েবানা জানাজা ও প্রতীকী লাশ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর