ভারতে তরুণদের আন্দোলনের মধ্যেই পৃথক বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পদত্যাগের দাবি তুলেছে কংগ্রেস। সংসদের প্রধান বিরোধী দলটির নেতারা গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছিলেন। কয়েক ঘণ্টা পর সেখান থেকে পুলিশ বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবসহ একাধিক শীর্ষ নেতাকে আটক করে।
ইন্ডিয়া টুডে জানায়, আটক করার পর রাহুল গান্ধী ও অখিলেশ যাদবকে উত্তর দিল্লির ছত্রশাল স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়। আর প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে আটকে রাখা হয় মন্দির মার্গ থানায়, যেখানে পরে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধী। দীর্ঘ সময় চত্বরে কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনী ও আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাতে একে একে সবাইকে ছেড়ে দেয় দিল্লি পুলিশ। মুক্তি পাওয়ার পরপরই ছত্রশাল স্টেডিয়াম ত্যাগ করেন রাহুল গান্ধী ও অখিলেশ যাদব। অন্যদিকে, মন্দির মার্গ থানা থেকে বেরিয়ে যান সোনিয়া ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও।
গত সোমবার সংসদ ভবন অভিমুখে তরুণদের মিছিল ও পুলিশের লাঠিপেটার পর গতকালের ঘটনাটি ভারতের রাজনীতিকে আরও অস্থির করে তুলল। শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক মঞ্চ ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। বিপরীতে সোমবারের কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া সবার বিরুদ্ধে এফআইআর (লিখিত অভিযোগ) দায়েরের ঘোষণা দিয়েছে দিল্লি পুলিশ।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সকালে ক্ষমতাসীন এনডিএ জোটের এমপিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষা করতে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দেন। বৈঠক সূত্রের বরাত দিয়ে হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের কঠোর শাস্তি এবং বিরোধীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কেও শিক্ষার্থীদের সচেতন করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
মোদির পদত্যাগ দাবি
আগের দিনের লাঠিপেটা ঘটনার পর মঙ্গলবার সকালে দিল্লির যন্তর-মন্তরে শিক্ষার্থীদের তেমন উপস্থিতি দেখা যায়নি। বিকেলে হঠাৎ করেই লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে জড়ো হয়ে একাধিক দাবি জানাতে শুরু করেন কংগ্রেসের নেতারা।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, লোক কল্যাণ মার্গে জড়ো হওয়ার পর সামাজিক মাধ্যম এক্সে পোস্ট দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পদত্যাগের দাবি তোলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল। তিনি লেখেন, সোমবার তরুণ ও শিক্ষার্থীদের ওপর যে বর্বরতা হয়েছে, সেটির জবাব চাইতে প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির সামনে মিছিল করছেন। সরকার কোনো দায়িত্ব নিতে চায় না, আর সংসদে এ নিয়ে আলোচনাও করতে চায় না। ভারতের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত।
ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, কংগ্রেসের ওই কর্মসূচির বিষয়ে আগে থেকে কোনো ঘোষণা ছিল না। বিকেলে রাহুল, প্রিয়াঙ্কাসহ শীর্ষ নেতারা দলটির সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবন রাজাজি মার্গে যান। এদিন ছিল খাড়গের ৮৪তম জন্মদিন। কিন্তু এর পর সবাই রাজাজি মার্গ থেকে দুই কিলোমিটার দূরের লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে যান। সেখানে কংগ্রেস নেতারা বিক্ষোভ শুরু করেন এবং ছাত্রদের ওপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদে মোদি ও অমিতের পদত্যাগ চেয়ে স্লোগান দেন।
কয়েক ঘণ্টা ধরে অবস্থান চলার পর দিল্লি পুলিশ কংগ্রেস এমপিদের আটক করতে শুরু করে। শুরুতে আটক করা হয় কংগ্রেস নেতা কানহাইয়া কুমারসহ কয়েকজনকে। এর পর আটক হন এমপি সুখজিন্দর সিং। একাধিক এমপি আটক হলেও রাহুল, প্রিয়াঙ্কাসহ আরও কয়েকজন কর্মসূচি চালিয়ে যেতে থাকেন। পরে তাদেরও আটক করা হয়।
দিল্লি পুলিশ রাহুলকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে যায়। তবে তাঁকে কোথায় নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ কোনো তথ্য দিচ্ছে না বলে গতকাল সন্ধ্যায় অভিযোগ করে কংগ্রেস। দলের সংসদ সদস্য পবন খেরা বলেছিলেন, রাহুল গান্ধীকে কোথায় নেওয়া হচ্ছে, তা পুলিশ আমাদের জানাতে রাজি নয়।
যন্তর-মন্তরে শিক্ষার্থীরা
দিল্লির আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত যন্তর-মন্তর থেকে প্রায় এক মাস ধরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। কংগ্রেস মোদির বাসভবনের সামনে অবস্থান নিলে যন্তর-মন্তরেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ে।
দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানাতে গতকাল যন্তর-মন্তরে গিয়েছিল পার্লামেন্টের বাম ধারার এমপিদের একটি প্রতিনিধি দল। সেখান থেকে তারা সোমবারের ঘটনা নিয়ে পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে বিবৃতি দেওয়ার দাবি জানান।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘২০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর মৃত্যুর জন্য দায়ী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে (শিক্ষামন্ত্রী) বাঁচাতে সরকার আরও অনেক তরুণের রক্ত ঝরাতেও রাজি …। আমরা আপনাদের সবার জন্য লড়াই চালিয়ে যাব।’
সিজেপি এদিন আবারও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, সরকার নিজেরাই নিজেদের লজ্জায় ফেলছে। তারা চাইলে অনেক আগেই পদত্যাগের (শিক্ষামন্ত্রীর) ঘটনা ঘটত। কিন্তু বিজেপি নেতারা অহঙ্কারে ডুবে আছেন।
‘দেশটা মোদির বাপের নয়’
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন আম আদমি পার্টির (এএপি) জাতীয় আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়াল। গতকাল তিনি বলেন, ভারতের মানুষ স্বৈরশাসকদের ঐতিহাসিক শিক্ষা দিতে পারে।
কেজরিওয়াল বলেন, ‘একটু আগে মোদি সরকারের পুলিশ একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, সোমবারের প্রতিবাদে যারা অংশ নিয়েছিল, তাদের সবার বিরুদ্ধে এফআইআর দাখিল করা হবে।’ সংবাদ সম্মেলনে কেজরিওয়াল বলেন, ‘মোদিজি, এই দেশ আপনার বাপের নয়; এটি ১৪০ কোটি মানুষের। হুমকি দেওয়া বন্ধ করুন, অন্যথায় এ দেশের মানুষ আপনাকে এমন শিক্ষা দেবে যে, একনায়কের শোচনীয় পরিণতির কথা ইতিহাস মনে রাখবে।’
উল্লেখ্য, সোমবার দিল্লিতে সংসদ ভবন অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল বের করে সিজেপি। এতে প্রায় ৫০ হাজার তরুণ ও শিক্ষার্থী অংশ নেন। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্ত ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে ওই কর্মসূচি পালন করা হয়। পুলিশ বাধা দিতে গেলে উভয়পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়।



