বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে রেললাইন। এই রেললাইনের কারণে উত্তর-দক্ষিণ দুই অংশে বিভক্ত নগরী। সেই রেললাইনের ওপর নির্মিত একটি সেতু সংযুক্ত করেছে উত্তর-দক্ষিণকে। নগরীর টাইগারপাস ও দেওয়ানহাটের ঠিক মাঝখানে থাকা সেতুটি দেওয়ানহাট ব্রিজ নামে পরিচিত। মূলত এটি একটি ওভারব্রিজ। অর্ধশত বছর আগে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল। তার পর থেকে সেতুটির নিচে ট্রেন এবং ওপরে গাড়ি চলাচল করছে।
১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে সেই সেতুটি কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা সংস্থা নির্মাণ করেছিল, তা বলতে পারছে না কেউ। ফলে সেতুটির দায়-দায়িত্বও নিচ্ছে না কেউ। বছরের পর বছর বড় ধরনের কোনো মেরামত না করায় নড়েবড়ে সেতুটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারী ট্রাক-লরিসহ হাজার হাজার যানবাহন পারাপারের এই সেতুটি কোনো কারণে ভেঙে পড়লে নগরীর মূল যান চলাচল ব্যবস্থাও ভেঙে পড়তে পারে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে রেললাইনের ওপরে যানবাহন চলাচলের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগকে সেতুটি নির্মাণের অনুমতি দিয়েছিল রেলওয়ে। পরবর্তীকালে ১৯৭৪ সালে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে সড়ক ও জনপথ বিভাগ চট্টগ্রামের প্রথম ওভারব্রিজটি নির্মাণ করেছিল। ব্রিজটি ১ হাজার ২২০ ফুট দীর্ঘ এবং ৫৬ ফুট প্রস্থ।
নির্মাণের পর থেকে শক্তপোক্ত সেতুটি দিয়ে যানবাহন চলাচল করে আসছে। কিন্তু সেতুটির ‘অভিভাবক’ কে– এ প্রশ্ন উঠেছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক), সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে; কেউই সেতুটির দায়িত্ব নেয়নি। ফলে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও নিয়মিত মেরামত না করায় এটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে।
সরেজমিন দেখা গেছে, ওভারব্রিজটির পিলার থেকে সিমেন্ট-বালুর আস্তর খসে পড়ছে। বেরিয়ে আসছে রড। স্থানে স্থানে জন্মেছে আগাছা। সব মিলিয়ে ব্রিজটির এখন ভঙ্গুর দশা। আর ব্রিজের ওপর দিয়ে চলাচল করছে কাভার্ডভ্যান, লরি, ট্রাক, বাস, কারসহ বিভিন্ন ধরনের ভারী ও হালকা যানবাহন।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হলে ২০২৪ সালের শুরুতে সেতুটি নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নেয় চউক। পুনর্নির্মাণের আগে সেতু দিয়ে যাতে ভারী যানবাহন চলাচল করতে না পারে, সে জন্য তখন সেতুর দুই পাশে নির্দিষ্ট উচ্চতায় ‘হাইট ব্যারিয়ার’ স্থাপন করার কথা ছিল চসিকের। এর মাধ্যমে নতুন সেতু নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত শুধু ছোট যান চলাচল করবে এই সেতু দিয়ে। আর ভারী যানবাহনগুলোর জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ওই বছরের ১৫ জানুয়ারি চিঠি দিয়ে বিষয়টি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগকে অবহিতও করা হয়। কিন্তু সে উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়নি।
চউকের সংশ্লিষ্ট এক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, চউক সড়ক কিংবা স্থাপনা নির্মাণ করে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চসিককে হস্তান্তর করে। তাই উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ব্রিজটি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে চায়নি চউক।
সেতুটির দুরবস্থার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় এবার টনক নড়েছে চসিকের। গত ২ আগস্ট সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের উপস্থিতিতে একটি বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল দেওয়ানহাট ওভারপাসের বিদ্যমান বিপজ্জনক অবস্থা (কংক্রিট ক্ষয়, রডের মরিচা ও সারফেস ক্র্যাকিং) নিয়ে একটি তথ্যপত্র উপস্থাপন করে। এতে বলা হয়, প্রতিদিনের ভারী কনটেইনার ও পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে সেতুটি বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সমস্যা সমাধানে ‘স্ট্রেংদেনিং’ ও ‘রেট্রোফিটিং’ কৌশল উপস্থাপন করা হয়। এতে বিদ্যমান অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ ও আধুনিকায়ন করা হবে। তাতে সেতুর পিলারের লোড ক্ষমতা ৪৫ শতাংশ এবং মেয়াদ ৩০ বছর বাড়বে বলে উল্লেখ করা হয়।
বিদ্যমান কোনো কাঠামোতে আধুনিক পদ্ধতি ও নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করে সেটির কার্যক্ষমতা ও নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রক্রিয়াকে রেট্রোফিটিং বলা হয়। এ ছাড়া কোনো কাঠামোর নির্দিষ্ট অংশ যেমন কলাম, বিম বা ফাউন্ডেশনের ভার বহন করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে অতিরিক্ত লোড নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাকে স্ট্রেংদেনিং বলা হয়ে থাকে।
এ ব্যাপারে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন সমকালকে বলেন, বিদ্যমান দেওয়ানহাট ওভারপাস বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। আরও আগেই সেতুটির কাজ করা খুবই প্রয়োজন ছিল। এখন রেট্রোফিটিং ও স্ট্রেংদেনিং প্রক্রিয়ায় সেতুটির অবকাঠামো মজবুত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।



