নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব (বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন) জমা দেয়নি এনসিপিসহ নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধিত সাতটি রাজনৈতিক দল। এ অবস্থায় দলগুলোর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইসি।
ইসি সূত্র বলছে, ২০২৫ পঞ্জিকা বছরের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে ব্যর্থ হওয়া দলগুলোর মধ্যে তিনটি নতুন নিবন্ধিত, যারা গত বছরের শেষভাগে নিবন্ধন নিয়েছে। এই দল তিনটি হচ্ছে- জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জনতার দল ও আমজনতার দল। আর বাকি চারটি ২০২৩ সালে নিবন্ধন নিয়েছিল। দলগুলো হচ্ছে- বাংলাদেশ জাসদ, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, তৃণমূল বিএনপি এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি।
এই সাতটি দলই গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। সবগুলো দল ইসিতে তাদের নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব জমা দিয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের দল এনসিপি গত বছরের ১৯ নভেম্বর নিবন্ধিত হয়। আগের পঞ্জিকাবর্ষে দলটির কার্যক্রমের মেয়াদ ছিল মাত্র এক মাস ২১ দিন। এ বিষয়ে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে আমাদের কিছুটা দেরি হয়ে গিয়েছিল। তবে, আমার জানামতে দলটির সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা ইসিতে এই হিসাব পাঠিয়ে দিয়েছেন।’
নিবন্ধনের দাবিতে আমজনতার দলের সাধারণ সম্পাদক তারেক রহমানের ১৩৪ ঘণ্টার অনশন কর্মসূচির পর গত বছরের ২১ ডিসেম্বর দলটি ইসির নিবন্ধন পায়। এ হিসাবে আগের পঞ্জিকাবর্ষের মাত্র ১০ দিনের হিসাব জমা দিতে হবে দলটিকে। এ বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘ইসি জানিয়েছে, তারা ডাকযোগে চিঠি পাঠায়। কিন্তু আমি তা কখনোই পাইনি। নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়টি আমার জানা আছে। তাই আমরা এখন প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করেছি এবং নির্বাচন কমিশনে দলের ৯ দিনের আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
গত ১১ ডিসেম্বর নিবন্ধিত জনতার দলকে আইন অনুযায়ী ২০ দিনের হিসাব জমা দিতে হবে। দলটির মহাসচিব আজম খান জানান, নিয়ম-কানুন সম্পর্কে তারা অবগত আছেন। তবে ইসি থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পাননি তারা।
এর আগে গত ৭ জুলাই নিবন্ধিত ইসিতে নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫৯টিকে চলতি বছরের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে তাদের ২০২৫ পঞ্জিকা বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব (বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন) জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল ইসি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় তারা এই নির্দেশ পায়নি। আইনি বাধ্যবাধকতা ও জরিমানার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে ৫৯টি দলের কাছে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠানো হয়। তবে ৩১ জুলাই শুক্রবার সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় পরবর্তী প্রথম কার্যদিবস ২ আগস্ট পর্যন্ত সময় পেয়েছিল দলগুলো।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী ঘোষিত ‘রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮’-এর ৯(খ) বিধি অনুযায়ী, নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলকে আগের পঞ্জিকাবর্ষের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দিতে হয়। আর আরপিওর ৯০(এইচ) ধারা অনুযায়ী, কোনো দল টানা তিন বছর নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে ব্যর্থ হলে তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হতে পারে।
ইসি সূত্র বলছে, ইসির চিঠি পাওয়ার পর ৫৯টি দলের মধ্যে ৩৮টি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দিয়েছে। আর ১৩টি দল সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন করে। এ ছাড়া জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) শুরুতে সময়সীমার মধ্যে হিসাব জমা দিতে ব্যর্থ হলেও পরে গত ১৩ আগস্ট জমা দেয়। এনসিপিসহ বাকি সাতটি দল হিসাব জমা দেয়নি, সময় বাড়ানোর আবেদনও করেনি।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন করা ১৩টি দলকে আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়েছে ইসি। এই দলগুলোর মধ্যে রয়েছে- কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), গণফোরাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) প্রভৃতি।
ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ সমকালকে বলেছেন, ইসির চিঠি পাওয়ার পর বেশ কয়েকটি দল সময় বাড়ানোর আবেদন করেছিল। কমিশন তাদের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়েছে। আর যেসব দল প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা আইন লঙ্ঘন করছে। আমরা তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠাব। সেই অনুযায়ী আইনানুগ পদক্ষেপ নেব।


