কেন খাদ্য ব্যবসায়ীদের আতঙ্কের নাম তুকারাম মুণ্ডে রেহাই পায়নি ডমিনোজ-পিৎজা হাটও

বন্ধুর সঙ্গে রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়েছিলেন তুকারাম মুণ্ডে। খাবার আসার পরই তার চোখ আটকে গেল পনিরের দিকে। বন্ধুকে বললেন, এটি অর্ডার না করতে। কারণ, তার চোখে এটি আসল পনির মনে হয়নি। শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা করে তার সন্দেহই সত্যি হলো-পনিরটি আসল নয়।

ঘটনাটি কোনো সাধারণ ক্রেতার নয়। তুকারাম মুণ্ডে ভারতের মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) কমিশনার। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই খাবারের মান ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন তিনি। রেস্তোরাঁয় খেতে গেলেও তার চোখ খুঁজে বেড়ায় অনিয়ম। আর সেই কারণেই এখন মুম্বাইয়ের খাদ্য ব্যবসায়ীদের কাছে তার নামটি আতঙ্কের।

দায়িত্ব নেওয়ার পর গত তিন মাসে মুণ্ডের নেতৃত্বে ৩ হাজার ১০০টির বেশি খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন হয়েছে। প্রায় ১৬৫টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। ৭৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে সংশোধনের নোটিশ।

ডমিনোজ ও পিৎজা হাটের একাধিক আউটলেটও তার অভিযানের হাত থেকে রেহাই পায়নি। সাম্প্রতিক সময়ে চারটি ডমিনোজ ও একটি পিৎজা হাটের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। ম্যাকডোনাল্ডসের একটি আউটলেটের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেখানে তেলাপোকার উপস্থিতি ও পচা খাবার পাওয়ার কথা জানিয়েছে এফডিএ।

তবে তুকারাম মুণ্ডের অভিযান শুধু বড় ব্র্যান্ডকেন্দ্রিক নয়। হোটেল, রেস্তোরাঁ, আইসক্রিমের দোকান, ডেইরি, ক্রিকেট ক্লাব থেকে শুরু করে পথের খাবারের দোকান ও অনলাইন ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানের গুদাম-সবই পড়ছে তার নজরে।

মুণ্ডে রয়টার্সকে বলেন, নিয়ম মানতে যারা ব্যর্থ হবে, তাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা মোকাবিলা করতে হবে। তার ভাষায়, বিষয়টি মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

একবার মুম্বাইয়ের এক বিচারক মুণ্ডের বিরুদ্ধে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর বেছে বেছে কঠোর হওয়ার অভিযোগ তোলেন এবং আদালতের ক্যানটিনগুলো পরীক্ষা করা হয় কি না, তা জানতে চান। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার দলের সদস্যরা আদালতের ক্যানটিনে পরিদর্শন চালান। সেখানে লাইসেন্স ছাড়া চলা কয়েকটি ক্যানটিন বন্ধ করে দেওয়া হয়।

মুণ্ডের এমন কঠোর অবস্থান তাকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে খাবারের মান ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে যে অসন্তোষ ছিল, তার অভিযানে সেটিই যেন প্রকাশ্যে এসেছে।

চশমা পরা ও গোঁফের জন্যও পরিচিত মুণ্ডের কাজের ধরন কিছুটা ব্যতিক্রমী। ২১ বছরের প্রশাসনিক ক্যারিয়ারে তাকে একাধিকবার বদলি করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ঘুষ না নেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা বলেছেন।

এখন তার নেতৃত্বে খাদ্য নিরাপত্তা দলের অভিযান প্রায় প্রতিদিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও খাবারের গুদামের ভেতরের ছবি প্রকাশ করা হচ্ছে। এসব ছবিতে ময়লা দেয়াল, ঘুরে বেড়ানো তেলাপোকা ও ইঁদুর এবং মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার দেখা গেছে।

মুণ্ডে নিজেও বলেন, এত বেশি অনিয়ম তিনি প্রত্যাশা করেননি।

রয়টার্স গত সপ্তাহে মুম্বাইয়ের ২৫টি পথের খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁ পরিদর্শন করে দেখতে পেয়েছে, ব্যবসায়ীদের মধ্যে মুণ্ডের অভিযানের বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একজন বিক্রেতা চীনা খাবারে কৃত্রিম লাল রঙের পরিবর্তে প্রাকৃতিক মরিচ ব্যবহার শুরু করেছেন। আরেকজন দিনে তিনবার ভাজার তেল পরিবর্তন করছেন। কর্মীদের গ্লাভস ও মাথা ঢাকার টুপি পরাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

মুম্বাইয়ের জনপ্রিয় খাবার বড়া পাও-ও মুণ্ডের নজর এড়ায়নি। জুনে তিনি সংবাদপত্রে মুড়িয়ে বড়া পাও বিক্রি নিষিদ্ধ করেন। এখন অনেক দোকানেই এটি তুলনামূলক পরিষ্কার বাটার পেপারে মোড়ানো হচ্ছে। এতে ক্রেতাদেরও কেউ কেউ স্বস্তি প্রকাশ করছেন।

খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে মুণ্ডের কঠোর অবস্থান তাকে জনপ্রিয় করলেও ব্যবসায়ীদের একাংশ তার সমালোচনা করছে। তাদের অভিযোগ, নিয়ম মেনে চলার জন্য ব্যবসাগুলোকে সময় না দিয়ে প্রশাসন অতিরিক্ত কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ নিয়ে হাইকোর্টেরও দ্বারস্থ হয়েছে।

মুণ্ডের অভিযানের আওতায় এসেছে ব্রিটিশ আমলের একটি ক্রিকেট ক্লাব, ৭০ বছরের পুরোনো একটি আইসক্রিমের দোকান এবং ১১০ বছরের পুরোনো পারসি ডেইরিও।

একটি ঘটনায় নিয়ম মেনে চলার উন্নতি করার পরও একটি খাবারের দোকানের লাইসেন্স স্থগিত রাখায় মুণ্ডের দপ্তরকে ৫ লাখ রুপি জরিমানা করেন আদালত। এ বিষয়ে মুণ্ডে বলেন, আদালতের পর্যবেক্ষণকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে নেন এবং উন্নতির সুযোগ থাকলে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করেন।

তবে কঠোর অভিযানের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। দিল্লিতে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অনেকে তার সঙ্গে সেলফি তুলতে এবং হাত মেলাতে ভিড় করেন। একজন তাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে জাতীয় পর্যায়ে দায়িত্ব দেওয়ার পরামর্শও দেন।

নিজেকে অবশ্য তারকা মনে করেন না মুণ্ডে। রয়টার্সকে তিনি বলেন, তিনি শুধু একজন খাদ্য নিরাপত্তা কমিশনার।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর