জীবন যখন চরম অনিশ্চয়তায় মোড়ানো, চারপাশে যখন কেবলই অভাবের কালো ছায়া—এমন এক কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়েও হার মানেননি হাওয়া বেগম। স্বামীকে হারিয়ে জীবনযুদ্ধের ময়দানে একদম একা হয়ে পড়েছিলেন তিনি। কোনো সন্তান না থাকায় নিজের কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার কিংবা বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোর মতো আপনজনও ছিল না। তবে অভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি হাওয়া বেগম। জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। সেই সুযোগই একসময় তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তাঁর পাশে দাঁড়ায় সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট (সিজেডএম)। প্রতিষ্ঠানটির ‘জীবিকা উন্নয়ন কেন্দ্র, সান্তানপাড়া, নরসিংদী’প্রকল্পের সহায়তায় শুরু হয় তাঁর জীবনে পরিবর্তনের নতুন অধ্যায়।
১৫ হাজার টাকা থেকে স্বপ্নের সূচনা
স্বাবলম্বী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সিজেডএম থেকে প্রথমে ১৫ হাজার টাকা তহবিল সহায়তা পান হাওয়া বেগম। এই অর্থের মধ্য থেকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে দুটি ছাগল কিনে শুরু করেন ছাগল পালন। অভাবের জীবনে এটিই ছিল তাঁর নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রথম অবলম্বন।
শুরুটা ছিল ছোট। কিন্তু স্বপ্নটা ছিল বড়। নিজের হাতে থাকা সামান্য সম্পদকে যত্ন, শ্রম ও ধৈর্যের মাধ্যমে কীভাবে বড় করে তোলা যায়, সেই চেষ্টাই করতে থাকেন তিনি। ছাগল দুটির পরিচর্যায় কোনো ধরনের অবহেলা করেননি। খাবার, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার দিকে নজর রেখেছেন নিয়মিত। ধীরে ধীরে সেই ছোট উদ্যোগেই সম্ভাবনার আলো দেখতে শুরু করেন তিনি।
হাওয়া বেগমের কাছে দুটি ছাগল ছিল শুধু দুটি প্রাণী নয়; ছিল নিজের জীবনের নতুন অধ্যায়ের ভিত্তি। তাই প্রতিদিনের পরিশ্রমের পাশাপাশি তিনি খামারটিকে আরও বড় করার স্বপ্ন দেখতে থাকেন।
মেধা ও পরিশ্রমে মিনি খামার
হাওয়া বেগমের একাগ্রতা, পরিশ্রম ও যত্নশীলতায় প্রথম পদক্ষেপটি সফল হতে শুরু করে। এরপর তাঁকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। কাজের ধারাবাহিকতায় ধাপে ধাপে তিনি আরও সহায়তা গ্রহণ করেন এবং ছাগলের খামারের পরিধি বাড়াতে থাকেন।
এভাবে মোট পাঁচটি ধাপে মোট এক লাখ টাকা সহায়তা পান তিনি। সেই অর্থের সঙ্গে নিজের শ্রম ও অভিজ্ঞতা যুক্ত করে ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন একটি সমৃদ্ধ ‘মিনি ছাগলের খামার’। তাঁর নিরলস পরিচর্যা ও ভালোবাসায় আজ খামারটিতে শোভা পাচ্ছে ছোট-বড় ১২টি সুস্থ-সবল ছাগল।
একসময় যে নারী অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, সেই তিনিই এখন নিজের একটি উদ্যোগের মালিক। খামারের প্রতিটি ছাগল তাঁর কাছে সম্ভাবনার প্রতীক। একটি ছাগল বিক্রি করে পাওয়া অর্থ যেমন তাঁর দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করে, তেমনি নতুন ছাগল কেনার মাধ্যমে ব্যবসা আরও সম্প্রসারণের সুযোগও তৈরি হয়।
হাওয়া বেগম বলেন, “যখন প্রথম ১৫ হাজার টাকা সাহায্য পাইলাম, মনে হইলো যেন একটা খড়কুটো আঁকড়ে ধরলাম। ১০ হাজার টাকা দিয়া দুইটা ছাগল কিইন্যা নিজের সন্তানের মতো যত্ন করতে লাগলাম। এরপর ধাপে ধাপে টাকা পাইছি আর খামার বড় করছি। ভাবতেও পারি নাই, আমার মতো অভাবী মানুষেরও একদিন ১২টা ছাগলের একটা খামার হবে।”
অভাব থেকে আত্মমর্যাদার পথে
হাওয়া বেগমের গল্প শুধু একটি ছাগলের খামার গড়ে ওঠার গল্প নয়; এটি একজন অসহায় নারীর নিজের ভাগ্য বদলে নেওয়ার গল্প। একসময় যেখানে প্রতিদিনের খাবারের চিন্তাই তাঁকে তাড়া করত, সেখানে আজ তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারেন। নিজের পরিশ্রমে আয় করার সুযোগ তাঁকে শুধু আর্থিক স্বস্তিই দেয়নি, ফিরিয়ে দিয়েছে আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাও।
ছাগল পালনকে তিনি এখন আর শুধু সহায়তার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেন না। এটি তাঁর কাছে একটি নিয়মিত জীবিকা ও ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। ছাগলের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে তাঁর সম্ভাবনাও। খামারের প্রতিটি ছাগলের যত্ন, খাবারের ব্যবস্থা, পরিচর্যা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিক্রির সিদ্ধান্ত—সবকিছুতেই এখন তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে তাঁর মানসিকতায়। অন্যের সাহায্যের অপেক্ষায় থাকা একজন নারী আজ নিজের উদ্যোগে আয় করছেন। ফলে জীবনের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে গেছে। এখন তিনি বিশ্বাস করেন, সুযোগ ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে অভাবগ্রস্ত মানুষও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন।
সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন
হাওয়া বেগমের চোখে এখন আরও বড় স্বপ্ন। তাঁর ছোট্ট খামারটিকে আরও বড় করা, ছাগলের সংখ্যা বাড়ানো এবং নিয়মিত আয় নিশ্চিত করাই তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য। একদিন যে নারী ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার সুযোগই পেতেন না, আজ তিনিই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করছেন।
হাওয়া বেগমের জীবনসংগ্রাম তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি সম্ভাবনার গল্প, ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প এবং আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার গল্প। তাঁর ছোট্ট খামারের প্রতিটি ছাগলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর সংগ্রাম, পরিশ্রম, স্বপ্ন ও নতুন জীবনের প্রত্যয়।
অভাবের কঠিন পথ পেরিয়ে হাওয়া বেগম আজ প্রমাণ করছেন—সুযোগের একটি দরজা খুলে দিলে একজন মানুষ নিজেই নিজের জন্য আরও অনেক দরজা খুলে দিতে পারেন। সঠিক দিকনির্দেশনা, শ্রম এবং জাকাতভিত্তিক উৎপাদনমুখী সহায়তা একজন অসহায় মানুষকে শুধু সাহায্যপ্রার্থী নয়, একজন স্বাবলম্বী উদ্যোক্তায় পরিণত করতে পারে।
সিজেডএমের জীবিকা কর্মসূচির প্রধান এনামুল হক বলেন, “জীবিকা কর্মসূচির মাধ্যমে সিজেডএম এ পর্যন্ত প্রায় ৩৩ হাজার পরিবারের জীবনমান পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। এসব পরিবারের আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন ও উন্নত জীবন গঠনের পথে পাশে থাকতে পেরে আমরাও সম্মানিত ও গর্বিত বোধ করছি।“


