নির্বাচনে কোনো সুস্পষ্ট বিজয়ী উঠে না আসার পর, জনমত জরিপে রেকর্ডসংখ্যক সমর্থনের কারণে ইসরায়েলের পরবর্তী পার্লামেন্টে (নেসেট) ‘কিংমেকার’ হতে পারে আরব দলগুলো। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাপক ভোট জালিয়াতি ও ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ তুলে পুলিশ ও দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের তদন্ত দাবি করেছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। দলটির অভিযোগ, আরব দলগুলো নির্বাচন ‘চুরি’ করেছে।
বুধবার দেওয়া এক বিবৃতিতে লিকুদ পার্টি দাবি করে, ঘুষ, হুমকি, সহিংসতা, জালিয়াতি এবং ভোটারদের সংগঠিত করতে অবৈধ সফটওয়্যার ব্যবহারের মতো গুরুতর অপরাধের মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রভাবিত করা হয়েছে। দলটি আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগও আনে।
তবে এর কয়েক ঘণ্টা আগে চ্যানেল টুয়েল্ভ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের (সিইসি) এক কর্মকর্তা ভোট জালিয়াতির অভিযোগ নাকচ করেছিলেন।
নিয়মিত নির্বাচনে অংশ নেওয়া আরব নেতৃত্বাধীন দল রাআম (Ra’am) ও জয়েন্ট লিস্ট মঙ্গলবার রেকর্ডসংখ্যক ভোট পেয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, জোট দুটি ১৯টি আসন পেতে পারে। বর্তমানে তাদের সম্মিলিত আসনসংখ্যা ১০।
এই ফলাফল কার্যকর হলে নেতানিয়াহুর জোট কিংবা তার বিরোধী ইহুদি-নেতৃত্বাধীন দলগুলো—কোনো পক্ষের পক্ষেই সহজে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব হবে না। তবে আরব দলগুলোর সমর্থন পেলে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট সরকার গঠনের সুযোগ পেতে পারেন।
বিরোধী দলগুলোর কয়েকটি অবশ্য আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় নেতানিয়াহু ও তার দলও এমন সম্ভাবনাকে বারবার নাকচ করার চেষ্টা করেছে।
মঙ্গলবার ভোট গ্রহণের আগেই হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছিল, নেতানিয়াহু নির্বাচনে জয়ী না হলে আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোর ভোটের ফল চ্যালেঞ্জ করতে পারে লিকুদ। দলটি নির্বাচন ‘চুরি’ হওয়ার অভিযোগও তুলতে পারে। এ জন্য তারা আগেই বিভিন্ন অভিযোগ ও জালিয়াতির দাবি প্রস্তুত করে রেখেছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
ভোট জালিয়াতির অভিযোগে তদন্ত দাবি
বুধবারের বিবৃতিতে লিকুদ জানায়, তারা পুলিশ, শিন বেত ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে ‘শত শত সাক্ষ্য’ এবং অন্যান্য প্রমাণ জমা দিয়েছে।
দলটির দাবি, এসব প্রমাণের মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ ও রাআম দলের স্লিপসহ হাজার হাজার খাম, ভোটকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের হুমকি ও তাদের ওপর হামলা, ভোট দেওয়ার গোপন কক্ষে একাধিক ভোটারের উপস্থিতি, একই ব্যক্তির একাধিকবার ভোট দেওয়া এবং খামের সংখ্যা ও ভোটারের সংখ্যার মধ্যে অসংগতি।
এ ছাড়া ভোটারদের সংগঠিত করতে অবৈধ সফটওয়্যার ব্যবহারের অভিযোগও তুলেছে দলটি। লিকুদ এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করেছে।
জবাবে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন জানায়, প্রতিটি নির্বাচনের মতো এবারও নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠুতা যাচাইয়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিভিন্ন দলের উত্থাপিত অভিযোগ এবং ভোটের ফলাফলে সম্ভাব্য অনিয়মের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।
কমিশন আরও জানায়, নির্বাচনের দুই দিন আগে ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিন লিভন সব নির্বাচনী তালিকাকে এ প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। যেসব ভোটকেন্দ্রের ফলাফল পুনরায় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে দলগুলো মনে করে, সেগুলোর বিস্তারিত তথ্যও চাওয়া হয়েছিল।
কমিশনের ভাষ্য, লিকুদের অভিযোগ তারা পেয়েছে এবং নিয়মিত পর্যালোচনা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সেগুলো পরীক্ষা করছে।
‘আমাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে’
নির্বাচনে জোট গঠন নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন বলেছেন, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধীদের নেতৃত্বাধীন সরকারকে সহযোগিতা করতে তারা প্রস্তুত। তবে সরাসরি কোনো সরকারি জোটে যোগ দেওয়ার পক্ষে নন তারা।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে জাবারিন বলেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে গাজায় চলমান যুদ্ধ, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় আমরা ইসরায়েলের কোনো সরকারি জোটের অংশ হওয়ার সম্ভাবনা দেখছি না।’
তবে তিনি মনে করেন, ইসরায়েলের জনগণ নতুন নেতৃত্বের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তাই নেতানিয়াহুর সরকারের বিকল্প গঠন করতে আগ্রহী রাজনৈতিক দলগুলোকে আরব দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
জাবারিন বলেন, ‘নেতানিয়াহুর রক্তমাখা সরকারের একটি বাস্তব ও কার্যকর বিকল্প দিতে চায়—এমন যে কাউকেই আমাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’
রাআম দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ইয়োভ সেগালোভিটজও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। মঙ্গলবার রাতে বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পর তিনি টাইমস অব ইসরায়েলকে বলেন, তাদের দল পরবর্তী সরকার গঠনের জোটে থাকতে আগ্রহী। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যাকে মনোনীত করা হবে, তাকে রাআম দলের ভোটারদের প্রত্যাশাও বিবেচনায় নিতে হবে।
ইসরায়েলের জায়নবাদ বিরোধী দলগুলোর মধ্যে বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টিই একমাত্র দল, যারা রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে ইহুদি ও আরব দলগুলোর যৌথ জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। দলটির নেতা ইয়াইর গোলান বুধবার তার ‘চেঞ্জ ব্লক’-এর শরিকদের রাআম ও জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে সম্ভাব্য জোট গঠনের বিরোধিতা থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দূরে দুই পক্ষই
বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৮৫ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষে জয়েন্ট লিস্ট ১২টি এবং রাআম সাতটি আসন পেতে যাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি আসনে এগিয়ে ছিল। গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ও তার শরিকদের আসনসংখ্যা ছিল ৪৮।
ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। কিন্তু ভোট গণনার ওই পর্যায়ে কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে সরকার গঠনে আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


