যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়েছে আনন্দধারা আর্টসের শারদোৎসব ‘অরুণ আলোর অঞ্জলি’। গত শনিবার লন্ডনের রেডব্রিজ মেথডিস্ট চার্চ মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সংগীত, কবিতা, আবৃত্তি ও নৃত্যের পরিবেশনায় তুলে ধরা হয় বাংলার চিরচেনা শরৎকালকে। সোনালি ধানখেত, নীল আকাশে সাদা মেঘ, কাশফুল ও শরতের স্নিগ্ধ প্রকৃতির চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয় বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্ক।
অনুষ্ঠানের শুরুতে আনন্দধারা আর্টসের পরিচালক ডা. ইমতিয়াজ আহমেদ সংগঠনটির ঋতুভিত্তিক সাংস্কৃতিক আয়োজনের উদ্দেশ্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘ঋতুভিত্তিক উৎসব উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে আমরা প্রকৃতির প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে চাই। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের একটি স্নেহময়, সংবেদনশীল ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।’
তিনি আরও বলেন, শিশুদের মধ্যে শৈশব থেকেই সংগীত, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক শিক্ষার মাধ্যমে প্রকৃতিপ্রেম এবং পরিবেশসচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। বাংলার ষড়ঋতুকে কেন্দ্র করে এ ধরনের আয়োজন সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক সেলিম জাহান। বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতিতে উৎসবের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে তার সর্বজনীনতায়। ধর্ম, বর্ণ ও সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে একত্র করার মধ্য দিয়েই উৎসব সম্প্রীতি, ঐক্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রকাশ হয়ে ওঠে।
প্রায় আড়াই ঘণ্টার এ আয়োজনে অংশ নেন সংগঠনটির শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সের শিল্পীরা। অতিথিশিল্পী হিসেবে সংগীত পরিবেশন করেন নূপুর কাজী। শিশু শিল্পীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও আত্মবিশ্বাসী পরিবেশনা দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়। গান, কবিতা ও নৃত্যের সমন্বয়ে তারা প্রকৃতির বিচিত্র রূপ, ঋতুপরিবর্তন ও শরতের সৌন্দর্য তুলে ধরে। আনন্দধারা আর্টসের জ্যেষ্ঠ শিল্পীরা পরিবেশন করেন বাংলা সাহিত্য ও সংগীতনির্ভর একটি সংগীতালেখ্য। এতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের নির্বাচিত গান, কবিতা ও সাহিত্যকর্মের অংশ স্থান পায়।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নৃত্য পরিবেশনা। এতে অংশ নেন আর্থিকা চৌধুরী, নিহারিকা ভৌমিক, মাটি সিদ্দিকী, আনিকা ফাতিহা, রওনক আলভী, ইউসুফ রাতুল ও মনিরুল ইসলাম মুকুল। নৃত্য পরিকল্পনা, পরিচালনা ও কোরিওগ্রাফির দায়িত্ব পালন করেন মনিরুল ইসলাম মুকুল। তাঁর পরিকল্পিত নৃত্যবিন্যাস সংগীত ও আবৃত্তির পরিবেশনায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে অতিথিশিল্পী হিসেবে মঞ্চে আসেন সংগীতশিল্পী নূপুর কাজী। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, বাংলা লোকসংগীত ও আধুনিক গানের সমন্বয়ে সাজানো তার একক পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। তার পরিবেশনার মধ্য দিয়েই শেষ হয় শারদোৎসবের সাংস্কৃতিক আয়োজন।
অনুষ্ঠানে যন্ত্রসংগীতে অংশ নেন কিবোর্ডে প্রীতম সাহা, তবলায় সন্দীপ চক্রবর্তী, পারকাশনে কিংশুক দাস, গিটারে অমি ইসলাম এবং সেতারে দেবীপ্রিয়া সরকার। তাঁদের যন্ত্রসংগত সংগীত পরিবেশনাগুলোকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
আয়োজনের শব্দ পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণে ছিলেন আরাফাত কীর্তি। মঞ্চসজ্জার দায়িত্ব পালন করেন গোলাম আকবর মুক্তা। আলোকচিত্র ধারণ করেন জিআর সোহেল। অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার ছিল এআরটিভি নেটওয়ার্ক।
দর্শকপূর্ণ মিলনায়তনে শিল্পীদের পরিবেশনা প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে স্বদেশের প্রকৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।


