সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বৈদেশিক খাতের চাপ মোকাবিলা এবং বাজেট সহায়তা জোরদারের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পেতে পারে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ডিসেম্বরে নতুন ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে।
তবে আইএমএফের সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচি থেকে সরে এসে সম্পূর্ণ নতুন চুক্তিতে যাওয়ার এই উদ্যোগকে সরকারের জন্য বড় ধরনের আস্থার পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, আগের কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার শর্তগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ায় নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে সরকার দ্রুত কিছু বাস্তব ও দৃশ্যমান সংস্কার কার্যক্রম শুরু করলে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা সম্ভব হবে।
এদিকে নতুন ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল আগামী ১২ থেকে ১৭ জুলাই ঢাকা সফর করবে। আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন। সফরকালে তারা সরকারের সংস্কার এজেন্ডা, নীতিগত অগ্রাধিকার, সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০২২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শুরু হওয়া আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান সরকার। কারণ কর্মসূচির বেশ কয়েকটি শর্ত সরকারের অর্থনৈতিক নীতি ও নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করা হচ্ছে। এ কারণে বিদ্যমান কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন করে তিন বছর মেয়াদি একটি ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
অর্থ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, আগামী মাসে আইএমএফ মিশনের সফরের সময় সার্বিক বিষয়ে আলোচনা হবে। অক্টোবরে আরেকটি পর্যালোচনা মিশন আসতে পারে। পরে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভায় আলোচনার পর আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড অনুমোদন দিলে ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন ঋণ কর্মসূচি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, সাধারণত আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচি অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়ায় ছয় থেকে ৯ মাস সময় লাগে। তবে বাংলাদেশ দ্রুত এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা করছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণের কাজ চলছে। তিন বছর মেয়াদি কর্মসূচির আওতায় কোন কোন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে, তার একটি অগ্রাধিকার তালিকাও প্রস্তুত করা হচ্ছে। আগের কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত অনেক সংস্কার পদক্ষেপ বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাস্তবায়ন করা কঠিন। নতুন কর্মসূচিতে আইএমএফ এসব সংস্কার পুরোপুরি বাদ দিতে রাজি নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়া বা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে। রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, এনবিআর ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বিনিময় হার ব্যবস্থাকে আরও নমনীয় করার মতো বিষয়গুলো নতুন কর্মসূচিতেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাবে।
বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পরে কর্মসূচির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে প্রায় ৩৬০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ছাড় হয়েছে। তবে রাজস্ব আহরণ, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাত সংস্কারে সন্তোষজনক অগ্রগতি না হওয়ায় পঞ্চম ও ষষ্ঠ কিস্তির প্রায় ১৩০ কোটি ডলার ছাড় স্থগিত হয়ে যায়।
সরকার ও আইএমএফের মধ্যে মতপার্থক্যের প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে অভিন্ন ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার চালু, টার্নওভার কর চালু, কর অব্যাহতি কমানো, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও সারের ভর্তুকি কমানো, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পুনর্গঠন।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক সমকালকে বলেন, আইএমএফের একটি কর্মসূচি মাঝপথে বন্ধ করে নতুন কর্মসূচিতে যাওয়া সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, আগের ঋণ কর্মসূচির শর্তগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে কিছুটা বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি
রয়েছে। আইএমএফ স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাইবে, আগের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন না করে নতুন চুক্তিতে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। তাঁর মতে, আগের অভিজ্ঞতার কারণে নতুন ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত খুব একটা সহজ হবে না। তবে সরকারের
জন্য সুযোগও রয়েছে। আলোচনা শুরুর আগেই যদি কিছু দৃশ্যমান সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে আইএমএফের সঙ্গে দর কষাকষিতে সুবিধা পাওয়া সম্ভব হবে এবং শর্তের কঠোরতাও কিছুটা কমানো যেতে পারে।
- বিষয় :
- ঋণ




