উন্নয়ন সহযোগীদের সাড়া কম বাজেট ব্যবস্থাপনা চাপে

0
3

চলতি অর্থবছরের জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে ৬৭৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৮৩ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বাজেট সহায়তা পাওয়ার লক্ষ্যে দরকষাকষি চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। কিন্তু অর্থবছরের শেষ প্রান্তে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ সহায়তা পাওয়া অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে বাকি প্রায় ৪৭৫ কোটি ডলার ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মূল বাজেট প্রণয়নের সময় সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে প্রায় ৩৭৫ কোটি ডলার বা ৪৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট সহায়তা পাওয়ার আশা করেছিল। এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতায় জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার আইএমএফের কাছে অতিরিক্ত ২০০ কোটি ডলার এবং বিশ্বব্যাংকের কাছে আরও ১০০ কোটি ডলারের জরুরি ঋণ সহায়তা চেয়েছে। তবে এসব ঋণের শর্ত নিয়ে সরকার ও দাতা সংস্থাগুলোর মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। ফলে সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনা এখন বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ইতোমধ্যে ২৫ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা অনুমোদন করেছে। আরও ৭৫ কোটি ডলারের সহায়তা চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী ২৪ মে এ বিষয়ে এডিবির সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে ২৫ কোটি ডলার এবং জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (জাইকা) কাছ থেকে আরও ৫০ কোটি ডলারের সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে, যা আগামী জুনের মধ্যেই ছাড় হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, আইএমএফের আগের দুই কিস্তির ১৩০ কোটি ডলারের পাশাপাশি নতুন করে চাওয়া ২০০ কোটি ডলার জুনের আগে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।  বিশ্বব্যাংকের কাছে জরুরি সহায়তা হিসেবে ১০০ কোটি ডলার চাওয়া হলেও তারা আপাতত ৫০ কোটি ডলার দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করছে। এর সঙ্গে আগের ১২০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তার ক্ষেত্রেও  শর্ত নিয়ে জটিলতা রয়েছে। ফলে জুনের মধ্যে অর্থছাড় পাওয়া কঠিন হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, প্রত্যাশিত বাজেট সহায়তা না এলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে। এতে একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এমন বাস্তবতায় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে সামনে রেখে বড় আকারের নতুন বাজেট পরিকল্পনাও চাপের মুখে পড়তে পারে।

দাতা সংস্থার শর্তে অস্বস্তি
জানা গেছে, ঋণের জন্য আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে বেশ কয়েকটি কঠিন শর্ত দিয়েছে। দাতারা ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিলের শর্ত দিয়েছে। এ ধারার মাধ্যমে একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিকদের আবারও নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

আইএমএফের অন্যতম শর্ত হলো, প্রতিবছর জিডিপির অন্তত দশমিক ৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। কিন্তু এখনও সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এ জন্য রাজস্ব খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিলুপ্ত করে রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের কাজ শুরু হয়। এ লক্ষ্যে অধ্যাদেশ জারি হলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। নতুন সরকার সেই অধ্যাদেশ বাতিল করে দেয়। তবে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক চায়, আগামী জুনের মধ্যেই এ-সংক্রান্ত আইন কার্যকর করা হোক।

অর্থ বিভাগের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ব্যাংক খাত ও রাজস্ব খাত সংস্কারে নতুন সরকারের অবস্থান নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ সংশোধনের পর তারা একে আর্থিক খাত সংস্কারের ক্ষেত্রে পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। অধ্যাদেশটি আইএমএফের পরামর্শেই করা হয়েছিল।
শুধু ব্যাংক খাত নয়, রাজস্ব খাত সংস্কার নিয়েও চাপ বাড়ছে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, ভ্যাটের অভিন্ন ১৫ শতাংশ হার চালু, কর অব্যাহতি কমানো, টার্নওভার কর চালু এবং করপোরেট কর পুনর্বিন্যাসের মতো বিষয়ে দাতারা দ্রুত অগ্রগতি চাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে ভর্তুকি সীমিত করার ওপরও জোর দিচ্ছে। তাদের মতে, সর্বজনীন ভর্তুকি অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে। তারা দরিদ্রদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির সুপারিশ করছেন।

আইএমএফের ঋণ নিয়ে অনিশ্চয়তা
বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পরে ২০২৫ সালে এর পরিমাণ বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার পাওয়া গেছে। বাকি রয়েছে আরও ১৮৬ কোটি ডলার। তবে রাজস্ব আদায়, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাত সংস্কারে অগ্রগতি সন্তোষজনক না হওয়ায় আইএমএফের পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন গত মার্চে ঢাকা সফরে এসে সরকারের কাছে তাদের অসন্তোষের বিষয়টি স্পষ্ট করেন।

গত মাসে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল অতিরিক্ত ঋণ এবং চলমান কর্মসূচির কিস্তি ছাড় নিয়ে আলোচনা করে। পরে আরও কয়েক দফা আলোচনা হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। অন্য দাতা সংস্থাগুলোর বাজেট সহায়তার ক্ষেত্রেও আইএমএফের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

কেন বাজেট সহায়তা প্রয়োজন
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা সমকালকে বলেন, রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি না থাকা এবং বৈদেশিক প্রকল্প ঋণের প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ার কারণে বাজেট সহায়তা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীলতার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে অতিরিক্ত প্রায় ৩১৫ কোটি ডলার প্রয়োজন হবে। কারণ প্রকল্প ঋণ নির্দিষ্ট প্রকল্পের বাইরে ব্যবহার করা না গেলেও বাজেট সহায়তার অর্থ সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে ব্যবহার করতে পারে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) উন্নয়ন সহযোগীদের বৈদেশিক প্রকল্প ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় দুটিই কমেছে। অন্যদিকে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে অর্থছাড় কমেছে ১৯ শতাংশ। প্রতিশ্রুতি কমেছে ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

এদিকে এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা, যা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ। এর আগে গত অর্থবছরের পুরো সময়ে এনবিআরের ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসেই সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস তথা ব্যাংক ও অন্যান্য খাত থেকে মোট এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের ১২ মাসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে যত টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল, তার প্রায় পুরোটা ৯ মাসেই নিয়েছে সরকার। এই সময়ে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে গত এপ্রিলে ৪৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। এ সময়ে ট্রেজারি বিলে আগের ঋণ পরিশোধ করেছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। নিট ঋণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞ মত 
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, বাজেট সহায়তার প্রতিশ্রুত অর্থ আটকে থাকার প্রধান কারণ হচ্ছে সরকারের প্রতিশ্রুত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে ধীরগতি। তাঁর মতে, এসব সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড়ের সম্ভাবনা খুবই সীমিত থাকবে।
বৈদেশিক সহায়তার বিকল্প হিসেবে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে সুদের হার এমনিতেই উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় সরকার যদি আরও বেশি ঋণ নেয়, তাহলে সুদের হার বাড়তে পারে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, যা আগেই মন্থর হয়ে পড়েছে, তা আরও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। তিনি মনে করেন, রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো না গেলে শেষ পর্যন্ত সরকারের সামনে ব্যয় সংকোচন ছাড়া খুব বেশি বিকল্প থাকবে না।

ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ডলার ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে পারলে একদিকে যেমন করদাতাদের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে অর্থনীতির সামগ্রিক দক্ষতাও বাড়ানো সম্ভব হবে। তিনি বিশেষভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন জোরদার এবং মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থাপনা উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাতের সুশাসন, রাজস্ব সংস্কারসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কারে কার্যকর অগ্রগতি না হলে চলমান সংকটের স্থায়ী সমাধান আসবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here