জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের (এমপি) আসনে উন্নয়ন তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হবে বিএনপির সংরিক্ষত নারী আসনের এমপিদের। ওই সব আসনের জন্য আধা-সরকারিপত্রও (ডিও লেটার) দিতে পারবেন তারা।
গতকাল সোমবার বিকেলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসনে সরকারি দলের এমপিদের মতবিনিময় সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এমপি সমকালকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
কয়েকজন এমপি জানান, উন্নয়ন ছাড়াও বিরোধীদলীয় এমপিদের আসনের অন্যান্য কার্যক্রমে সরকারি দলের নারী এমপিদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি। তবে সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানিয়েছে, দুই ঘণ্টাব্যাপী সভায় ৩৬ জন এমপি উপস্থিত ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, উন্নয়ন তদারকি করা সরকারি বা বিরোধী দলের এমপিদের কাজ নয়। উন্নয়নের দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের। তারপরও এমপিরা এ কাজে যুক্ত থাকেন। এখন যদি নারী এমপিদের রাজনৈতিক কারণে বিরোধী দলের এমপিদের আসনের উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে তা শুধু অনৈতিক নয়; গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থি।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এ উদ্যোগ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বাড়াবে। সরকার যদি ক্ষমতাসীন দলের নারী এমপিদের বিভিন্ন আসনের দায়িত্ব দেয়, তাহলে বিরোধীদলীয় জোটের নারী এমপিদের কোন কোন আসনের দায়িত্ব দেবে?
বিরোধী জোট বলছে, গণতন্ত্র হরণ
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনাও সংরক্ষিত আসনের আওয়ামী লীগ এমপিদের জেলার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তাদের মাধ্যমে বিরোধীদলীয় এমপিদের আসনে অযাচিত হস্তক্ষেপ করানো হতো। তারেক রহমান যদি শেখ হাসিনা হতে চান, তাহলে তো কিছু বলার নেই। কিন্তু এর ফল পাবেন।’
নবম সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংরক্ষিত আসনের সরকারদলীয় ৩৮ নারী এমপিকে বিভিন্ন জেলার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এতে ওইসব জেলার সাধারণ আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ এমপিদের সঙ্গে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বিরোধ তৈরি হয়েছিল নারী এমপিদের। যেসব আসন থেকে তৎকালীন বিরোধী জোট শরিক বিএনপি, জামায়াত, এলডিপি ও বিজেপির এমপিরা নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেখানেও অলিখিতভাবে সরকারদলীয় নারী এমপিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এনসিপির মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ সমকালকে বলেন, ‘জনগণ নির্বাচিত করেছে একজনকে, আর সংসদীয় আসনে দায়িত্ব পালন করবে আরেকজন! এটা তো হতেই পারে না। সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক। যেসব আসনে সরকারি দলের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন, সেখানে জনপ্রতিনিধিকে বাদ দিয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকার জনগণের ওপর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিচ্ছে।’
বিরোধীদের আসনে দায়িত্ব
বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, সভায় সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নারী এমপিদের বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত রেকর্ড সংখ্যক আসন পেতে সক্ষম হয়েছে ধর্মকে ব্যবহার করে, বিশেষ করে নারী ভোটারকে তারা কৌশলে প্রভাবিত করে জয়ী হয়েছে। এ অবস্থায় যেসব এলাকায় জামায়াত জিতেছে, সেসব আসনে বিএনপির নারী এমপিদের গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে।
নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে বণ্টন হয় নারী আসন। ২১৩ আসন পাওয়া বিএনপি জোট নারী আসন পেয়েছে ৩৬টি। ৭৭ আসন পাওয়া জামায়াত পেয়েছে ১২টি। ছয় স্বতন্ত্র এমপির জোট পেয়েছে বাকি একটি নারী আসন। তবে তিনিও বিএনপি নেত্রী। ৫০ নারী শপথ নিলেও সংসদে যোগ দেননি। আগামী ৫ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া বাজেট অধিবেশনে যোগ দেবেন তারা।
সাধারণ আসনের এমপিরা সংসদীয় এলাকাভুক্ত স্থানীয় সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারের সঙ্গে যোগাযোগে মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন তারা। এর মাধ্যমে উন্নয়নকাজের তদারকি করেন।
আওয়ামী লীগ আমলে এমপিদের বছরে পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল নিজ নিজ আসনের উন্নয়নে। এই বরাদ্দে এমপিরা পছন্দ অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারতেন। সরকারদলীয় নারী এমপিদের নির্দিষ্ট আসন না থাকায় তারা বিরোধীদলীয় এমপিদের আসনে এসব বরাদ্দ দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সোমবারের বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন নারী এমপি সমকালকে বলেন, এলাকা ভাগ করে দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে কবে নাগাদ তা হবে, বলা হয়নি। যেসব জেলায় বিরোধী দল প্রভাব বিস্তার করেছে, সেসব এলাকাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে আলোচনা হয়েছে সভায়।
প্রধানমন্ত্রীর নানা নির্দেশনা
সভায় নারী এমপিরা যে এলাকার বাসিন্দা, সেখানকার সমস্যার কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানান। তাদের বক্তব্য শুনে সরকারপ্রধান দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। নারী এমপিরা বলেন, লোকজন তাদের কাছে বিভিন্ন কাজ ও দাবি নিয়ে আসছে। এসব বিষয় কীভাবে সমাধান করবেন, তা জানতে চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন কয়েকজন। প্রধানমন্ত্রী নারী এমপিদের নির্দেশনা দেন নিজ নিজ এলাকার বিএনপির এমপিদের সঙ্গে সমন্বয় করে উন্নয়মূলক কাজ করতে। শিগগিরই তিনি এ বিষয়ে আরও নির্দেশনা দেবেন।
সরকারের উন্নয়ন কাজের তথ্য তৃণমূলে পৌঁছে দিতে নারী এমপিদের সক্রিয় ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। তাই জাতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে নারীর অংশীদারিত্ব নিশ্চিত না করে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। শুধু সংসদে উপস্থিত থাকলেই চলবে না, মাঠ পর্যায়ের নারীদের বঞ্চনা ও অধিকারের কথা উচ্চকণ্ঠে তুলে ধরতে হবে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
সভায় নারীর অর্থনৈতিক-সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। সাধারণ নারীদের সমস্যার কথা শোনা এবং তা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার বিষয় তদারকি, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনের কঠোর প্রয়োগ হচ্ছে কিনা– এসব বিষয়ে সংসদীয় নজরদারি বাড়ানো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বিএনপি ঘোষিত উন্নয়ন রূপকল্প বাস্তবায়নে নারীরাই হবেন অন্যতম চালিকাশক্তি– এ ঘোষণা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা নির্দিষ্ট দলের প্রতিনিধি নন, বরং তারা দেশের সব নারীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবেন।
জানতে চাইলে সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি সমকালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্দেশনা এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নারী অধিকার আদায় ও ক্ষমতায়নে গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
দেওয়া হবে প্রশিক্ষণ
নবনির্বাচিত এবং প্রথমবার এমপি হওয়া নারী সদস্যদের সংসদীয় রীতিনীতি ও কার্যপ্রণালি সম্পর্কে দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করবে বিএনপি। সংসদে কীভাবে পয়েন্ট অব অর্ডার উত্থাপন করতে হয়, বিল প্রণয়ন, বাজেট আলোচনা, প্রশ্নোত্তরে অংশ নিতে হয়, তা তাদের অবহিত করা হবে।
নোটিশ প্রদান, মন্ত্রীদের সংসদীয় দায়িত্ব, স্থায়ী কমিটির কার্যক্রম পরিচালনা ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজের সমন্বয়, নিজ এলাকার সমস্যা সংসদে তুলে ধরা এবং স্থানীয় উন্নয়নে করণীয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে বলে সভা সূত্রে জানা গেছে।
বৈঠকে বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নারী এমপিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সেলিমা রহমান, শিরিন সুলতানা, রেহানা আক্তার রানু, শাম্মী আক্তার, রাশেদা বেগম হীরা, বিলকিস ইসলাম, হেলেন জেরিন খান, নিলোফার চৌধুরী মনি, নেওয়াজ হালিমা আর্লি, সুলতানা আহমেদ, ফরিদা ইয়াসমিন, শাকিলা ফারজানা, নিপুণ রায় চৌধুরী, জীবা আমিনা খান, মাহমুদা হাবীবা, সাবিরা সুলতানা (মুন্নী), সানসিলা জেবরিন (প্রিয়াঙ্কা), সানজিদা ইসলাম তুলি, ফাহমিদা হক, আন্না মিনজ্, সুবর্ণা শিকদার (ঠাকুর), শামীম আরা বেগম স্বপ্না, ফেরদৌসী আহমেদ, বিথীকা বিনতে হুসাইন, সুরাইয়া জেরিন, মানছুরা আক্তার, জহরত আদিব চৌধুরী, মমতাজ আলম (আলো), ফাহিমা নাসরিন, আরিফা সুলতানা (রুমা), সানজিদা ইয়াসমিন (তুলি), নাদিয়া পাঠান পাপন, শওকত আরা আক্তার (ঊর্মি), মাধবী মারমা, সেলিনা সুলতানা (নিশিতা) ও রেজেকা সুলতানা।




