বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে বিজিএমইএ পোশাকশিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা ৩০% কমেছে

0
5

জ্বালানি সংকটে তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উৎপাদন। অন্যদিকে সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ায় ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী পণ্য জাহাজীকরণ সম্ভব হচ্ছে না। আবার জ্বালানি সংকটের কারণে কাঁচামালের দাম ও পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। সব মিলিয়ে গড়ে উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত।

গতকাল সোমবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ও প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে বৈঠকে এসব কথা জানিয়েছেন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ নেতারা। গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি অনুরোধ করেছেন তারা। মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সংগঠনের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। সংগঠনের প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান ও সহসভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান আলোচনায় অংশ নেন। বৈঠকে জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ক্রেতার আস্থা ফিরে এলেও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার পুনরায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলো জ্বালানি নিরাপত্তায় এগিয়ে থাকার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এক নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে।
তিনি বলেন, চাহিদা মতো গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ার কারণে বর্তমানে কারখানাগুলোতে উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে। এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে গাজীপুর ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে। লোডশেডিংয়ের বিপরীতে জেনারেটর চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় উৎপাদন ও পণ্য শিপমেন্ট ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কাঁচামালের দাম ও পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।

উদ্যোক্তাদের সমস্যাগুলো গুরুত্ব সহকারে শোনেন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। তারা দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের অবদানের কথা বিবেচনা করে সংকট সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় জরুরি ভিত্তিতে নিকটবর্তী ফিলিং স্টেশন থেকে ডিজেল সরবরাহ করার জন্য বিজিএমইএর পক্ষ থেকে দেওয়া ফরম্যাট অনুমোদন করা হয়।
সংকট মোকাবিলায় বিজিএমইএর পক্ষ থেকে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরা হয় বৈঠকে। এর একটি হচ্ছে জরুরি জ্বালানি সরবরাহ করা। এ ব্যবস্থায় তৈরি পোশাক কারখানায় বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ফিলিং স্টেশন থেকে দ্রুত ডিজেল সরবরাহের নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আরেকটি প্রস্তাব হচ্ছে গ্যাস সংযোগ ও সমবণ্টন নিশ্চিত করা। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্প যেগুলোর বয়লার সক্ষমতা ৩০০-৫০০ কেজির মধ্যে সেগুলোতে জরুরি গ্যাস সংযোগ দেওয়া ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী সব শিল্প অঞ্চলে সমতার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। এছাড়া অবকাঠামো উন্নয়ন ও অটোমেশনের অংশ হিসেবে দ্রুততম সময়ে অন্তত দুটি অতিরিক্ত ফ্লোটিং স্টোরেজ রিগ্যাজিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপন এবং শিল্প খাতে ইলেক্ট্রনিক ভলিউম কারেক্টর (ইভিসি) মিটার স্থাপন প্রক্রিয়া সহজ করার অনুরোধ করা হয় বিজিএমইএর পক্ষ থেকে।

আমদানি করা জ্বালানির ওপর আমদানি ও ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরনের ট্যাক্স ও ভ্যাট প্রত্যাহার করে উৎপাদন খরচ কমানোর অনুরোধ করা হয়েছে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে।
পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন নিশ্চিত করতে পোশাকশিল্পে সোলার পিভি সিস্টেমের সরঞ্জাম আমদানিতে বিশেষ শুল্ক রেয়াতি সুবিধা দেওয়ারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ডিসি কেবলের মতো অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রপাতির ওপর বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক ১ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেন বিজিএমইএর নেতারা। বর্তমানে এ সব যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক ২৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ পর্যন্ত।

জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সমকালকে বলেন, পোশাক কারখানার নিকটবর্তী ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ যাতে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে কারখানায় জ্বালানি সরবরাহ করে সে ব্যাপারে সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তারা। পোশাক শিল্পের সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত টানা আট মাস রপ্তানি কমছে। খুব শিগগিরই এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসারও সুযোগ দেখা যাচ্ছে না। মার্কিন পাল্টা শুল্ক আরোপের পর প্রতিযোগী দেশগুলোর আগ্রাসী বাণিজ্য নীতি এবং দেশে উৎপাদন ব্যয় বাড়া, জাতীয় নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং সর্বশেষ সমস্যা মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব রয়েছে রপ্তানি খাতে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের অনুমান ছিল, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হওয়ার পর অনেক অনিশ্চয়তা কেটে যাবে। এপ্রিল কিংবা মে মাস থেকে সন্তোষজনক রপ্তানি আদেশ আমরা পাব, যা আগস্ট মাস নাগাদ রপ্তানি চিত্রে দেখা যাবে। কিন্তু এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য সংকট আবার সব কিছু ওলট-পালট করে দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কবে নাগাদ রপ্তানি খাতে সুখবর আসবে সেটি বলা যাচ্ছে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here