বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বস্তি ও আস্থার পরিবেশ জরুরি

এবারের বাজেটে বেশ কিছু ভালো পদক্ষেপের পরও তা নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় ও সন্দেহ পোষণ করেছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি)। সংগঠনটি বলেছে, নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ডাকার আগে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের স্বস্তি ও আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। যখন বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগ শুরু করবেন, তখনই নতুন বিনিয়োগকারীরাও আসতে উৎসাহিত হবেন।

বাজেটে ব্যবসা সহজ করার বিষয়ে বেশ কিছু ভালো উদ্যোগ নেওয়ার প্রশংসা করে ফিকি বলছে, শেষ পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে এর প্রতিফলন থাকবে কিনা, তা এখন দেখার বিষয়। দেশে নতুন করে বিনিয়োগ না হওয়ার কারণ তুলে ধরতে গিয়ে সংগঠনটির নেতারা বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় এ দেশে করহার বেশি। তার ওপর লোকসান হলেও ‘টার্নওভার ট্যাক্স’ নামে বাধ্যতামূলক কর দিতে হয়। ব্যবসার শুরু করতে অনেক লাইসেন্স নিতে হয়, পদে পদে হয়রানি হতে হয়।
প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে ফিকি। এতে সংগঠনটির সভাপতি রূপালী চৌধুরী, সহসভাপতি মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক টি.আই.এম নুরুল কবির উপস্থিত ছিলেন। ফিকির পক্ষে বাজেটের মূল পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া।

প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছে ফিকি। কাস্টমস পর্যায়ে এইও সরলীকরণ, গ্রিন চ্যানেলে পণ্য খালাস এবং ফ্রি ট্রেড জোন-সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ নিয়মাবলি জারি করাকে তারা আধুনিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য বড় অর্জন হিসেবে দেখছে সংগঠনটি।
রূপালী চৌধুরী বাজেটকে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক ও পূর্বানুমানযোগ্য হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ ও গ্রিন এনার্জি খাতে প্রণোদনা বাজেটের ইতিবাচক বলে মনে করেন।
রূপালী চৌধুরী বলেন, বিদ্যমান ব্যবসা পরিবেশে নতুন করে কেউ বিনিয়োগ করছে না। কিন্তু সরকার চায় বিনিয়োগ বাড়ুক, যাতে কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির আকার বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারে। বাজেটে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব বাধা রয়েছে, তা দূর করার কিছু চেষ্টা আছে, তবে তা পুরো সংকট কমাতে বা বিনিয়োগকারীদের চাহিদার খুবই অপ্রতুল।
রূপালী চৌধুরী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে পুরো পৃথিবীই একটি বিনিয়োগ ক্ষেত্র। তারা যেখানে সুবিধা বেশি পাবে সেখানেই যাবে। বাংলাদেশে কেবল সস্তা শ্রম আছে দেখে কেউ বিনিয়োগ করতে আসবে না। বিনিয়োগের আরও অনেক পূর্ব শর্ত রয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে গ্যাসের সুবিধা থাকলেও পানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউটিলিটি সুবিধা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে ইউটিলিটির ওপর ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যার ফলে সেখানে উৎপাদন খরচ বাইরের তুলনায় বেশি। তাহলে ইপিজেড বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে কোনো বিনিয়োগকারী কেনো বিনিয়োগ করবে?
বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুমতি পেতে দীর্ঘ সময় লাগা এবং ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও পদ্ধতিগত জটিলতা, দীর্ঘমেয়াদি কোনো করকাঠামো না থাকায় বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে সমস্যায় পড়া, লোকসানের সময়ও বিক্রয়ের ওপর বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কর দেওয়া বিনিয়োগের জন্য বড় বোঝা হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।
মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বাজেটে ‘ডিরেগুলেশন’ বা লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করা, যেমন–সাত দিনের মধ্যে অনুমোদন না দিলে তা অনুমোদিত বলে গণ্য করার উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন। এ ছাড়া শুধু বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে নতুন নতুন করদাতা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

স্নেহাশীষ বড়ুয়া আগামী ৫ বছরের জন্য করপোরেট করের হার নির্দিষ্ট করার মাধ্যমে পূর্বাভাসযোগ্য করকাঠামো নিশ্চিত করার প্রশংসা করেন। এছাড়া আপিলের ক্ষেত্রে বিতর্কিত করের জামানত ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ থেকে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা, মামলা নিষ্পত্তির জন্য ‘এক্সিট ক্লজ’ এবং ভ্যাট ও কাস্টমস প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগগুলোকে তিনি স্বাগত জানান।
সংবাদ সম্মেলনে খুচরা বিক্রেতাদের ওপর প্রস্তাবিত শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হারে উৎসে কর এবং তামাক ও কোমল পানীয় খাতের বৈষম্যমূলক কর কমানো, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের আগে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের আস্থার পরিবেশ বজায় রাখা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমিয়ে আনা দরকার বলে জানিয়েছে ফিকি।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর