কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ছাপানো টাকার চাহিদা বেড়ে যায়। এবার ঈদের আগে টাঁকশালের কাছে অন্তত ১৬ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সেখান থেকে জানানো হয়েছে, কাগজ-কালির সংকটের কারণে সর্বোচ্চ আট হাজার কোটি টাকার নোট দেওয়া সম্ভব। অবশ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনে বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত পুরোনো নকশার ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা পড়ে আছে। এই নোট চাইলে দুই সপ্তাহের মধ্যে বাজারে দেওয়া সম্ভব। যদিও আপাতত বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত নোট না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
প্রসঙ্গত, ছাপানো টাকার সংকট এবং তারল্য সংকট এক জিনিস নয়। সব মিলিয়ে এখন সঞ্চয় রয়েছে ২৪ লাখ কোটি টাকার মতো। ছাপানো টাকার চাহিদা রয়েছে তিন লাখ ২০ হাজার থেকে তিন লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবছর ঈদ সামনে রেখে ছাপানো নোটের চাহিদা বাড়ে। যে কারণে এ সময় সর্বোচ্চ সংখ্যক নতুন নোট বাজারে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত নোটের বদলে একযোগে নতুন নকশার নোট আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। নতুন নোট বাজারে আনতে প্রক্রিয়া শুরুর পর ১০ থেকে ১৮ মাস সময় লাগে। স্বাভাবিক সময়ে নোটের নকশা বদলের ক্ষেত্রে একযোগে না করে একটি-একটি করে বদল করা হতো। তবে এবার বিশেষ পরিস্থিতির কারণে একযোগে সব
মূল্যমানের নতুন ডিজাইনের নোট বাজারে আনার চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে পুরোনো নকশার নোট ছাড়া অনেক দিন বন্ধ রাখা হয়। এ কারণে চাহিদার সঙ্গে জোগানে বড় পার্থক্য তৈরি হয়ে এ রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত দুই ঈদে কোনো নতুন নোটই বাজারে ছাড়া হয়নি।
ব্যাংকাররা জানান, ছাপানো নোটের বড় একটি অংশ ব্যবসায়িক কাজে কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে মানুষের কাছে থাকে। আর ব্যাংকগুলোর ১২ হাজার মতো শাখার ভল্টে থাকে ১৬ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বিনিময় করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট এবং সোনালী ব্যাংকের চেস্ট শাখার কাছে থাকে ১৪ থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব হলো, বাজার থেকে প্রতিনিয়ত পুরোনো, ছেঁড়া-ফাটা, অধিক দাগ বা ময়লাযুক্ত টাকা তুলে তা বাংলাদেশ ব্যাংক বা সোনালী ব্যাংকে জমা দেওয়া। তবে ব্যাংকগুলো অনেক ক্ষেত্রে চাহিদামতো নোট না পাওয়ায় এখন বাজারে প্রচুর ছেঁড়া-ফাটা নোট পাওয়া যাচ্ছে।
জানা গেছে, এবার ঈদের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ বিভিন্ন মূল্যমানের অন্তত ১৬ হাজার কোটি টাকার নতুন নোটের চাহিদা দিয়েছে। এই চাহিদা দেওয়া হয় টাকা ছাপানোর একমাত্র প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন, যা টাঁকশাল নামে পরিচিত প্রতিষ্ঠানের কাছে। তবে টাঁকাশাল থেকে জানানো হয়েছে, ঈদের আগে সর্বোচ্চ আট হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করা সম্ভব।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরোনো নকশার বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত নোট বাজারে ছাড়তে চাইলে চাহিদার চেয়ে বেশি সরবরাহ করা সম্ভব। কেননা, বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত অর্ধপ্রস্তুত অবস্থায় ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকার মতো পড়ে আছে। এর বিপরীতে নতুন নকশার নোটের জন্য কালি-কাগজের সংকট রয়েছে। এ সংকট মেটাতে এখন বেশি খরচ করে বিমানযোগে কাগজ-কালি আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই নোট ছাপা শেষ করে ঈদের আগে বাজারে দেওয়া সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী নতুন নকশার নোট আনতে গিয়ে কিছুটা সময় লেগেছে। যে কারণে বাজারে নোটের কিছুটা সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, সাধারণভাবে ছেঁড়া-ফাটা বা ত্রুটিযুক্ত নোট বাজার থেকে তুলে পুড়িয়ে ফেলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে তা করতে না পারায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে শিগগিরই ব্যাংকগুলোকে নতুন টাকা দেওয়া শুরু হবে। ফলে এ সংকট আর থাকবে না।
ব্যাংকগুলোর বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকা জমা ও উত্তোলন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। আবার চাহিদার বিপরীতে নতুন টাকা ছাপানো হয়। এই টাকা যে নতুন নোট ইস্যুর বিপরীতে ছাপানো হয়, তেমন নয়। বরং পুরোনো নোটের বদলে নতুন টাকা বাজারে ছাড়া হয়। ছেঁড়া-ফাটা, ত্রুটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোট ব্যাংকগুলোর কাছে এলে নতুন করে তা আর বাজারে দেওয়ার নিয়ম নেই। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফেরত দিয়ে সমমূল্যের ‘ফ্রেশ’ নোট নিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত নভেম্বর মাসে ‘ক্লিন নোট পলিসি’ করেছে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ত্রুটিযুক্ত নোট বদলে দেওয়ার বিভিন্ন নির্দেশনা রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তবে ব্যাংকগুলো চাহিদামতো ‘ফ্রেশ’ নোট না পাওয়ায় প্রতিনিয়ত প্রচুর ছেঁড়া-ফাটা, অধিক দাগযুক্ত নোট আসছে।
কীভাবে নোট বদলাতে হবে এর একটি নীতিমালা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংক গ্রাহককে টাকা বদলে দেবে। আর ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বদলে নিয়ে আসবে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা পরিপালন করে না অনেক ব্যাংক। নানা অজুহাতে গ্রাহককে ফেরত দেওয়া হয়। ছোট নোটের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর এ অনীহা আরও বেশি। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সাধারণ গ্রাহকরা সরাসরি নোট বদলে নেওয়ার সুযোগ থাকলেও গত বছরের নভেম্বর থেকে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।




