আরব ও অনারব মিলে মধ্যপ্রাচ্যে দেশের সংখ্যা ১৮টি। এসব দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি খুব বেশি নয়। মোট রপ্তানির ১ শতাংশেরও কম। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলের হামলার পর এসব বাজারে রপ্তানি কার্যত বন্ধ। প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ। যদিও রপ্তানি তালিকায় টুপিসহ অন্যান্য ছোট কিছু পণ্য এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
ইরানে হামলার পর যুদ্ধ পরিস্থিতি গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আকাশ ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। রপ্তানিকারকরা জানান, পরিস্থিতির ভয়াবহতায় মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ব্র্যান্ড-ক্রেতারা রপ্তানি আদেশ স্থগিত করে দেয়। কবে নাগাদ এসব রপ্তানি আদেশ ফিরবে, বলা যাচ্ছে না। বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বাজার ধীরে ধীরে বাড়ছিল। বিশেষ করে উপসাগরীয় সহযোগী পরিষদ (জিসিসি)ভুক্ত দেশের রপ্তানি দ্রুত বাড়ছিল। ১০০ কোটি ডলারের রপ্তানি গন্তব্য এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত। সম্প্রতি স্বল্প পরিসরে আকাশপথে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। যদি শিগগির যুদ্ধ বন্ধ হয়ও, তবু মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি শিগগিরই স্বাভাবিক হবে না। দেশগুলোতে যে পরিমাণ অবকাঠামোর ক্ষতি হলো, তা সেরে উঠতে বহু বছর লাগতে পারে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে গত মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে মধ্যপ্রাচ্যে ৬৬ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে; ২৮ কোটি ১১ লাখ ডলারের। মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় প্রধান গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। দেশটিতে রপ্তানি হয় ২৫ কোটি ১৬ লাখ ডলারের। কুয়েতে ২ কোটি ডলারের মতো। যুদ্ধের মূল ক্ষেত্র ইরানে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮১ লাখ ডলারের কিছু বেশি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসব দেশে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের কিছু বেশি। ইপিবির মধ্যপ্রাচ্য ব্লকে ১২টি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে।
মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হয় এর মধ্যে প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক। পোশাকের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের জোব্বা, শেরওয়ানি, আম্মামা, পাগড়ি, সিরওয়াল ইত্যাদি। এ ছাড়া শার্ট, প্যান্ট, স্যুট, ব্লেজারের চাহিদাও রয়েছে সেখানে। সরাসরি আমদানি ছাড়াও বহুজাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের মাধ্যমে অন্যান্য দেশ থেকেও মধ্যপ্রাচ্যে যায় মেড ইন বাংলাদেশের পোশাক। অন্যদিকে পর্যটন আকর্ষণে সৌদি আরবসহ অন্য দেশগুলো নানা পরিকল্পনা নিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে স্থানীয়দের চাহিদার পাশাপাশি পর্যটকদের মাধ্যমেও রপ্তানি বাড়ানোর বড় ধরনের সুযোগ রয়েছে। পোশাকের বাইরে সবজি, ফল, বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে।
জানতে চাইলে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. মাসরুর রিয়াজ গতকাল সমকালকে বলেন, গত অর্থবছরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশ থকে যে পরিমাণ রপ্তানি হয়েছে তার মধ্যে ৮৯ শতাংশই ছিল তৈরি পোশাক। মূলত ছিল জিসিসিভুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব। এই বাজারের পুরোটাই প্রায় বন্ধ। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশই যুদ্ধে আক্রান্ত। আবার বিমান চলাচল কিছুদিন বন্ধই ছিল। তারপর সীমিত আকারে শুরু হয়েছে। জাহাজ চলাচল তো একেবারেই বন্ধ। সবকিছু মিলিয়ে প্রায় শতকোটি ডলারের সর্বশেষ বাজারটা এই মুহূর্তে আর কার্যকর নয়। ইউরোপ ও আমেরিকানির্ভর রপ্তানি বাজার বাস্তবতায় এই বাজারগুলো ধীরে ধীরে বাড়ছিল।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেশি। উচ্চ মূল্যের পোশাকের চাহিদা রয়েছে সেখানে। এই মুহূর্তে সেটা বন্ধ এবং দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর অভিঘাত এসেছে। যেমন সৌদি আরব বা কুয়েতের বেশ কিছু তেল-গ্যাসের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত। এগুলো ঠিক হতে সময় লাগবে। সেখানে পর্যটনের গতি ফিরতেও অনেক সময় লাগবে। সে জন্য আমাদের পণ্যের যে চাহিদা সেখানে ছিল, সেটা হয়তো খুব সহজেই আগের পর্যায়ে ফেরত আসবে না।
ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘আমি বলব, স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে আমাদের বাজারে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের একটা সম্ভাবনা ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল। সেটা পিছিয়ে গেল। আর যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এ বাজার আর ফিরবে কিনা, বলা মুশকিল।
তৈরি পোশাকের অপ্রচলিত শ্রেণি বা নতুন বাজারের মধ্যে সম্ভাবনাময় বাজারের তালিকায় মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশ রয়েছে– সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব। তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের গত ৯ মাসে এই দেশ দুটির মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রপ্তানি হয়েছে ২০ কোটি ডলারের পোশাক। সৌদি আরবে এ সময় রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৫ কোটি ডলারের মতো। যুদ্ধের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের মতো এই দেশ দুটিতে রপ্তানি বন্ধ রয়েছে।
অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান সমকালকে বলেন, অনন্ত গার্মেন্টস গত এক দশকের বেশি সময় ধরে নিয়মিত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে আসছিল। এখন সেখানে তাদের রপ্তানি একেবারেই বন্ধ। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ব্র্যান্ড-ক্রেতারা আপাতত তাদের দেওয়া আদেশের রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরপরই সুইডিশ ব্র্যান্ড এইচ অ্যান্ড এম তাদের রপ্তানি আদেশের পণ্য উৎপাদন বন্ধ রাখতে বলেছে। মধ্যপ্রাচ্য আসলে এখনও বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বড় বাজার হয়ে ওঠেনি। মোট রপ্তানি আয়ের ১ শতাংশেরও কম রপ্তানি হয় সেখানে। তিনি জানান, কবে নাগাদ আবার এসব বাজার খুলবে, বলা মুশকিল।
দীর্ঘ দিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক নতুন বাজার গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বিজিএমইএ। মধ্যপ্রাচ্যের ১৮ দেশের উপযোগী পণ্য সরবরাহে স্থানীয় চাহিদা বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে। কোন মৌসুমে কী ধরনের রঙের প্রাধান্য, তা নিয়েও গবেষণা চলছে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা সৃষ্টিতে কূটনীতিকদের কাজে লাগানো হচ্ছে। চাহিদা বোঝা এবং সরকার ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়াতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন বিজিএমইএ নেতারা। প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি নতুন বাজার সৃষ্টিতে মনোযোগ দিচ্ছেন তারা। অন্যদিকে পর্যটন আকর্ষণে সৌদি আরবসহ অন্য দেশগুলো নানা পরিকল্পনা নিয়েছে।




