স্বাস্থ্য বিভাগের একটি প্রকল্পের আওতায় কেনা হয়েছিল ৮৭৯টি গাড়ি। সেই প্রকল্প শেষ হয়েছে প্রায় দুই বছর হলো। সেই থেকে গাড়িগুলো বসে আছে। কোনোটা এখন গ্যারেজবন্দি, কোনোটা খোলা জায়গায় পড়ে আছে। অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হতে থাকা সরকারি এসব গাড়ি সচল করার কার্যকর উদ্যোগ নেই।
এই গাড়িগুলো স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের। এগুলো ফেলে রাখায় শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই), যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে মাঠ পর্যায়ের তদারকিতে ধাক্কা লেগেছে। রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় বাড়ছে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৮ সাল থেকে অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে ৩৮টি রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালিত হয়ে আসছিল। এসব তদারকির জন্য ওপির অর্থেই ধাপে ধাপে ৮৭৯টি গাড়ি কেনা হয়। তবে ২০২৪ সালের জুনে আওয়ামী লীগ সরকার এসব কর্মসূচি গুটিয়ে নেয়।
পরে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পরবর্তী দুই বছরের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ওপি প্রস্তুত করে পরিকল্পনা কমিশনে জমা দিলেও গত বছর ৫ মার্চ তা বাতিল করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বাতিল হওয়া কর্মসূচির গুরুত্ব বুঝে বিএনপি সরকার তা ফের চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে পাঁচটি রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শুরুও হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট গাড়িগুলোর বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, সঠিক তদারকি না থাকায় মাঠ পর্যায়ে রোগ নির্ণয় ও টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে গাড়ির টায়ার, ব্যাটারি ও ইঞ্জিন বিকল হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
গত বছর ১৫ জুন অর্থ মন্ত্রণালয় এক চিঠিতে ওপির টাকায় কেনা সব গাড়ি সরকারি পরিবহন পুলে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ এখন পর্যন্ত একটি গাড়িও জমা দেয়নি। সংশ্লিষ্টদের শঙ্কা, গাড়িগুলো একবার পরিবহন পুলে চলে গেলে অন্য দপ্তরে বরাদ্দ হয়ে যাবে। এতে স্বাস্থ্য বিভাগ তার সম্পদ স্থায়ীভাবে হারাবে।
গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক বৈঠকে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এসব গাড়ি সচল ও চালক নিয়োগের দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী ওই বৈঠকে গাড়ি সচলের ব্যাপারে কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, গাড়ির প্রয়োজন আছে। আমাদের একটু সময় দেন। আমরা চেষ্টা করছি, দ্রুততম সময়ে সমাধান হয়ে যাবে।
কত রকমের গাড়ি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্টের সাবেক লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. জয়নাল আবেদীন টিটো জানান, ২০১৬ সালে নারী ইউএইচএফপিওদের জন্য প্রায় ৫০টি টয়োটা র্যাব ফোর, ২০১৮ সালে ৫০টি মিতসুবিশি এক্সপান্ডার এবং ২০২০ সালে করোনার শুরুতে ৩৪০টি মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার গাড়ি কেনা হয়েছিল। করোনার সময় গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তত্ত্বাবধান ও মূল্যায়নে এসব গাড়ি বেশ কাজে দিয়েছিল। গাড়ির কারণে যাতায়াত সহজ হয়ে যাওয়ায় করোনার টিকা, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যের মানোন্নয়ন, পুষ্টির কার্যক্রমে গতিশীলতা বেড়েছিল। এখন এসব গাড়ি অচল পড়ে আছে। ফলে সেবা তদারকি ব্যবস্থা গতি হারিয়েছে।
অচল থাকা যানবাহনের মধ্যে আরও রয়েছে অ্যাম্বুলেন্স, মাইক্রোবাস, জিপ এবং ওষুধ সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত কাভার্ডভ্যান। সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, মাঠপর্যায়ে সেবার জন্য কেনা এসব যানবাহনের বড় একটি অংশ যথাযথ ব্যবহার না হওয়ায় এখন কার্যত অচল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে এই কর্মসূচিতে ৫৭৩টি যানবাহন কেনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি জীপ, ১০টি মাইক্রোবাস, ৫০টি অ্যাম্বুলেন্স, ২০টি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর জন্য ৪৯০টি যানবাহন। এসব যানবাহনের বড় অংশই এখন নিয়মিত কাজে ব্যবহার হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরেও একই চিত্র। সেখানে রয়েছে ৪৯টি অডিও-ভিজ্যুয়াল ভ্যান, তিনটি জীপ ও তিনটি মাইক্রোবাস। সিসিএসডিপি ইউনিটের জন্য ৭১টি জিপের মধ্যে ৬৪টি জেলা পর্যায়ে রিজিওনাল ও ডিস্ট্রিক্ট কনসালট্যান্টদের তদারকির কাজে ব্যবহৃত হলেও বাকি সাতটি পড়ে আছে অধিদপ্তরে। এ ছাড়া এমসিএইচ-সার্ভিসেস ইউনিটে সাতটি জিপ, একটি মাইক্রোবাস ও ৬৭টি অ্যাম্বুলেন্স, পরিকল্পনা ইউনিটে দুটি জিপ ও একটি মাইক্রোবাস, এফপি-এফএসডি ইউনিটে চারটি জিপ এবং পিএসএসএম-এফপি ইউনিটে ছয়টি জিপ রয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য ৪৩টি পিকআসহ (কাভার্ডভ্যান) এই অধিদপ্তরে ৩০৩টি গাড়ি পড়ে আছে।
টিকা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণসামগ্রী সরবরাহে ৪৩টি কাভার্ডভ্যান ব্যবহারের কথা থাকলেও কেন্দ্রীয় পণ্যাগারসহ ২৩টি আঞ্চলিক পণ্যাগার থেকে ৪৯৬টি উপজেলায় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও ওষুধ পৌঁছানোর কাজে এসব যানবাহনের ব্যবহার হচ্ছে না। এদিকে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ১৬টি গাড়িও দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে।
মাঠপর্যায়ের তদারকির এখনকার হাল
মাঠপর্যায়ের তদারকি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, এর প্রমাণ মিলেছে গত ১২ এপ্রিল। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) শংকর প্রসাদ অধিকারী মোটরসাইকেলে করে কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শনে যাওয়ার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পান। অথচ ২২ মাস আগেও তিনি হাসপাতালের গাড়িতে করে পরিদর্শনে যেতেন। গাড়ি সচল না থাকায় বাধ্য হয়ে তাঁকে মোটরসাইকেলে চেপে পরিদর্শনে যেতে হয়েছিল। এখন তিনি ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
বরিশালের ইউএইচএফপিও ডা. মনির শাওন বলেন, আমাদের কাজই হলো মাঠপর্যায়ে চলমান সেবা কার্যক্রম সচল রাখা। সপ্তাহে ছয় দিন আমরা টিকাদান কেন্দ্র পরিদর্শন করে থাকি। আমার অধীনে ২৪টি চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে, এসব কেন্দ্রে মানুষ ঠিকমতো সেবা পাচ্ছে কিনা, তা তদারকি করা জরুরি। এ ছাড়া মাসে আট দিন উপজেলা পরিষদে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। এতেও গাড়ির প্রয়োজন হয়। ২২ মাস গাড়ির সুবিধা না থাকায় এখন নিজ খরচে এসব কাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে।
সিলেটের ইউএইচএফপিও ডা. ইয়াসিন আরাফাত বলেন, গাড়িগুলো সচল থাকা জরুরি হলেও ২২ মাস ধরে অচল। এখন ব্যক্তিগত খরচে বা অন্যের মোটরসাইকেলে গিয়ে তদারকি করতে হচ্ছে। গাড়ি থাকলে তদারকি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা যেত।
বোয়ালখালী উদাহরণ
ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু কর্মকর্তা প্রকল্পের গাড়ি সচল রেখেছেন। তেমনই এক কর্মকর্তা চট্টগ্রামের বোয়ালখালী ইউএইচএফপিও ডা. জাফরিন জাহেদ জিতি। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সচল রাখতে ব্যক্তিগত খরচে সরকারি গাড়ির ব্যবস্থাপনা আমি নিজেই করছি। আমি আর্থিক ক্ষতিতে পড়লেও বোয়ালখালীবাসীর স্বাস্থ্যসেবার পথ সুগম রাখতে আমার এই উদ্যোগ।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকের মত
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, একটি গাড়ি শুধু লোহার কাঠামো নয়, এটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার সচল মাধ্যম। ২২ মাস এই গাড়ির বহর অকেজো রাখা মানে হলো আমাদের সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ এবং টিকাদান কর্মসূচির ওপর সরাসরি আঘাত। যখন তদারকি বন্ধ হয়ে যায়, তখন মাঠকর্মীদের মধ্যে জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয়, যার প্রমাণ আমরা এখন হামের প্রাদুর্ভাবের মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি। অচিরেই এই সংকটের সমাধান না হলে শুধু সরকারি সম্পদই অপচয় হবে না, বরং গত তিন দশকে শিশু ও মাতৃমৃত্যু রোধে আমাদের যে অর্জন, তাতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে।
কারা কী বলছেন
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সচিব বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ওপি বন্ধ হওয়ায় পুরো স্বাস্থ্য খাতেই এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছিল। তবে সেটি থেকে ক্রমেই বেরিয়ে আসছে সরকার। ইতোমধ্যে কয়েকটির অনুমোদন হয়েছে। বাকিগুলোও দ্রুত হয়ে গেলে গাড়ির বিষয়ে আর কোনো সংকট থাকবে না।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গাড়ির সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।




