বড় দুই রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা দুই সহোদর। ক্ষমতার পালাবদলে তাই তাদের আধিপত্যে ভাটা পড়ে না। এর জোরেই পালাক্রমে বিয়ানীবাজারের শেওলা ইউনিয়নের চারাবই গ্রামে ভোগ-দখলের তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। সম্প্রতি স্থানীয় একটি মার্কেটের দখল নিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে ওই দুই সহদোর আফসার খান সাদেক ও আখতার খান জাহেদ।
সম্প্রতি চারাবই বাজারের হাজী মুজম্মিল আলী নামের একটি মার্কেটের দখলকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত। জানা গেছে, মার্কেট দখলের নেপথ্যে রয়েছেন আখতার ও আফসার। তারা দুই ভাই বিদেশে থেকে দেশে নিজেদের লোকজন দিয়ে মার্কেটটি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, আখতার ও আফসার দীর্ঘদিন প্রবাসে অবস্থান করায় দেশে তাদের কর্মকাণ্ড তদারকি করছেন আরেক ভাই দিলদার হোসেন খান বেলাল ও ভাতিজা হাবিবুর রহমান খান। অভিযোগ রয়েছে, দিলদার হোসেন খান বেলাল আদালতের নিষ্পত্তির আগেই ওই মার্কেটের দখল প্রতিষ্ঠায় সেখানকার দোকান থেকে জোরপূর্বক ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করেন।
এ ঘটনায় বর্তমান মালিকপক্ষ মৃত মুজম্মিল আলীর ছেলে ডালিম আহমদ ও শাহীন আহমদের সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডা হয়; যা পরে হাতাহাতির পর্যায়ে গড়ায়। এ ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয় রাজনৈতিক ক্ষমতার খেলায়। বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতায় থাকায় ভাই আখতার খান জাহেদ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিয়ানীবাজার থানায় বর্তমান মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে ডাকাতির মামলা দায়ের করেন।
সরেজমিন চারাবই বাজার ঘুরে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা জানা যায়, মূলত মার্কেটের বর্তমান মালিকপক্ষকে কোণঠাসা করতে এই মামলা করা হয়েছে। তারা সেদিনের মারামারির ঘটনাকে ‘ডাকাতি’ হিসেবে মানতে নারাজ।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কেটের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, এখানে কোনো ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। মার্কেটের জায়গা নিয়ে দুই পক্ষের ঝামেলা ছিল। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন থেকে বৈধ মালিক হিসেবে ডালিমদের ভাড়া দিয়ে আসছেন। হঠাৎ ১৭ মে বেলাল খান মার্কেটে এসে ভাড়া দাবি করেন। এই নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়।
তারা জানান, দখলের প্রাথমিক চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ডালিমদের বিরুদ্ধে ডাকাতি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে শুনেছেন তারা। ব্যবসায়ীরা এই সমস্যা দ্রুত সমাধান চান।
ভুক্তভোগী ডালিম আহমদ বলেন, জায়গাটি তাঁর দাদার। বাবার বরাতে পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে তারা মার্কেটের মালিক হন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভুয়া কাগজ ও রাজনৈতিক বলপ্রয়োগে আফসার খান সাদেক তাদের নামে রেকর্ড করেন।
২০১৭ সালে নকল তুলে এর সত্যতা জানতে পেরে ২০১৮ সালে সিলেটের তপশিলি আদালতে মামলা করেন। বর্তমানে বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। এর মধ্যে আখতার খান জাহেদ ও আফসার খান সাদেক তাদের ভাই ও ভাতিজাদের দিয়ে জায়গা দখল করতে এলে বাধা দেন ডালিম ও তাদের স্বজনরা। তারা দখল করতে এসে ব্যর্থ হয়ে উল্টো রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন। এর উদ্দেশ্য পুলিশ দিয়ে তাদের বাড়িছাড়া করে জায়গার দখল নেওয়া।
ভুক্তভোগী শাহিন উদ্দিন বলেন, জায়গা দখল করতে না পেরে দিলদার হোসেন ও তাঁর সঙ্গীরা দুই ভাইয়ের ওপর হামলা চালান। এ ঘটনায় বিয়ানীবাজার থানায় অভিযোগ করা হলেও তা আমলে নেয়নি থানা পুলিশ।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তির প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এতে সাধারণ মানুষ বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বাজারের ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত মার্কেট নিয়ে কোনো পক্ষ যেন প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সে বিষয়েও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আখতার খান জাহেদ, আফসার খান ও বেলাল খানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তাদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন দাবি করেছেন, মামলা সম্পূর্ণ আইনগত প্রক্রিয়ায় করা হয়েছে।
বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক বলেন, এ ঘটনায় একটি অভিযোগ পেয়েছেন সেটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে তদন্ত চলছে। এর বাইরে কোনো অভিযোগ তাঁর কাছে আসেনি।
জানা গেছে, লন্ডনে নিজ বাসভবনের সামনে বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ভাস্কর্য স্থাপন করে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের সহযোগিতায় জমিয়ে বসেন তিনি। ছিলেন বিগত সরকারের সুনজরে। স্থানীয় পর্যায়ে সেই ক্ষমতা খাটিয়ে আধিপত্য বিস্তার করেন দলের সমাজসেবাবিষয়ক উপকমিটির সদস্য আফসার খান সাদেক। অপর দিকে সাদেকের ভাই আখতার খান জাহেদ উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি। দুই ভাই ভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা হলেও এলাকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার ও আধিপত্য ধরে রাখতে একসঙ্গেই কাজ করেন।




