পাবনার বেড়া উপজেলার দক্ষিণ চরপেঁচাকোলা গ্রামের আশকার প্রামাণিক ছয়বার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। হারিয়েছেন বসতভিটা, জমিজমা। এক সময় নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন। এখন যমুনার বুকে জেগে ওঠা চরে ১০ বিঘা জমিতে বাদাম চাষ করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। এক সময় যে যমুনা কেড়ে নিয়েছিল সবকিছু; আজ সেই যমুনাই ফিরিয়ে দিচ্ছে স্বপ্ন।
আশকার প্রামাণিক বলেন, ‘নদীভাঙনে সব হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখন বাদাম চাষই আমার পরিবারের প্রধান ভরসা। ফলন ভালো হলে সংসারও ভালো চলে।’
যে যমুনা একদিন কেড়ে নিয়েছিল আশকার প্রামাণিকদের সবকিছু, সেই যমুনার বুকেই আজ জন্ম নিচ্ছে নতুন স্বপ্ন। ভাঙনের কান্না পেরিয়ে চরজুড়ে এখন বাদামের সুবাস, আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। বেড়ার যমুনা চরাঞ্চলের অসংখ্য ভাঙনদুর্গত পরিবার এখন বাদাম চাষে নতুন আশার আলো দেখছেন। যমুনার চরে উৎপাদিত বাদাম এবার প্রায় ৫৫ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চরাঞ্চলের ১১ হাজার ৭০০ বিঘা জমিতে বাদামের চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৯৩ হাজার ৬০০ মণ। বর্তমান বাজারে যার দাম প্রায় ৫৫ কোটি টাকা। চলতি মৌসুমে প্রতি মণ বাদাম বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকায়; যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত বছর একই সময়ে প্রতি মণ বাদামের দাম ছিল ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা।
নাকালিয়া বাজারের আড়তদার আব্দুল বাতেন প্রামাণিক বলেন, ‘আমার জীবনে এত দামে বাদাম বিক্রি হতে দেখিনি। ফলনও ভালো, দামও ভালো। কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।’ চরনাকালিয়ার কৃষক আব্দুল হাকিম বলেন, ‘এত দামে বাদাম বিক্রি হবে ভাবিনি। এবার বাদাম আমাদের ঘরে আনন্দ নিয়ে এসেছে।’
এক সময় যেসব বালুময় জমি অনাবাদি মনে করা হতো, এখন সেগুলোই বাদাম চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। কম খরচ, কম পরিচর্যা এবং ভালো দামের কারণে বাদাম এখন চরাঞ্চলের অন্যতম লাভজনক ফসল।
বাদামকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় অর্থনৈতিক চক্র। জমি থেকে বাদাম উত্তোলন, শুকানো, বস্তাবন্দি করা, পরিবহন, আড়তদারি, খোসা ছাড়ানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ–সব মিলিয়ে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
নাকালিয়া বাজারের খোসা ছাড়ানো কারখানায় কাজ করেন বিলকিস বেগম ও চম্পা খাতুন। নদীভাঙনে নিঃস্ব এই দুই নারী বলেন, ‘চরের বাদাম আমাদের জীবিকা দিয়েছে। এই কাজ না থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যেত।’
নাকালিয়া বাজার বণিক সমিতির সহসভাপতি আব্দুল হক বলেন, ‘যমুনার চর এখন শুধু ফসলের ক্ষেত নয়, এটি হাজারো মানুষের জীবিকার ভিত্তি। বাদামকে ঘিরে এখানে বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে।’
বেড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত কবীর বলেন, ‘বেড়ার চরাঞ্চলের মাটি বাদাম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানকার বাদামের মানও ভালো। বাদাম এখন উপজেলার অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে।’




