৯০ দিনের জ্বালানি মজুদের উদ্যোগ

0
7

দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে এবার ন্যূনতম ৯০ দিনের কৌশলগত জ্বালানি তেল মজুদ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, যুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ এ উদ্যোগ নিয়েছে।

এর আওতায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন স্টোরেজ নির্মাণ, ভূগর্ভস্থ মজুতের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং রেলওয়ে ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আলাদা জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক সংকটেও দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল ও নিরাপদ রাখা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টদের আশা। জ¦ালানি বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ নিজস্ব চাহিদার অধিকাংশ পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের জ্বালানি সরবরাহে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৮০ লাখ টন জ¦ালানি তেলের চাহিদা, যার অধিকাংশই আমদানিনির্ভর।

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। একই সময়ে ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের ওপরও চাপ তৈরি হয়। তখন জ্বালানি খাতে ব্যয় মেটানো এবং পর্যাপ্ত মজুত ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো কয়েক মাসের চাহিদা পূরণের সক্ষমতা রেখে তেল সংরক্ষণ করে। এর উদ্দেশ্য হলোÑ জরুরি পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা। বাংলাদেশে এতদিন এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত মজুত নীতিমালা ছিল না।

বর্তমান মজুত সক্ষমতা কত

বাংলাদেশে জ্বালানি তেল সংরক্ষণের প্রধান দায়িত্বে রয়েছে বিপিসি এবং এর অধীনস্থ তিন তেল বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন ডিপো, অয়েল ইনস্টলেশন ও বিপণন কোম্পানির ট্যাঙ্কে জ্বালানি তেল সংরক্ষণ করা হয়। তবে দেশের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা এখনও আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় সীমিত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। বর্তমানে গড়ে ১৫ থেকে ২৫ দিনের জ¦ালানি তেল মজুত সক্ষমতা রয়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখন বিদ্যমান ট্যাঙ্কের পাশাপাশি অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত বা অতিরিক্ত সংরক্ষণ সুবিধাও ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বিপিসি, বাংলাদেশ রেলওয়ে, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিটিকে ৯০ দিনের রোডম্যাপ প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ আমদানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল। অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী, নিয়মিত আমদানি করে সরবরাহ বজায় রাখা হতো। কিন্তু কয়েকটি কারণে এ পদ্ধতির ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে; যার মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের বাজারের অস্থিরতা, বৈশ্বিক তেলের মূল্যবৃদ্ধি; ডলার সংকট; জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন; ভূরাজনৈতিক সংঘাত; অভ্যন্তরীণ আর্থিক সংকট। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরবরাহ ব্যবস্থায়ও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে আসে। তখনই দেশে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়।

সরকারের নতুন পরিকল্পনা

জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের নির্দেশনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। দেশে ন্যূনতম তিন মাসের জ্বালানি তেল মজুত নিশ্চিত করতে একটি পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে নতুন স্টোরেজ নির্মাণের জন্য উপযুক্ত জায়গা চিহ্নিত করতে বলা হয়। আন্ডারগ্রাউন্ড স্টোরেজ ট্যাঙ্ক নির্মাণের সম্ভাবনা যাচাইয়ে বিস্তারিত ফিজিবিলিটি স্টাডি করার উদ্যোগ নিতে বলা হয়। প্রসঙ্গত, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৌশলগত মজুতের জন্য ভূগর্ভস্থ গুহা বা ট্যাঙ্ক ব্যবহৃত হয়; যা যুদ্ধ বা দুর্যোগের সময় তুলনামূলক নিরাপদ থাকে। মোংলা অয়েল ইনস্টলেশনের ট্যাঙ্ক সংস্কার করে সেখানে অধিক পরিমাণ জ্বালানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। নির্মাণাধীন ও সংস্কারাধীন ট্যাংকগুলো দ্রুত ব্যবহার উপযোগী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিপণন কোম্পানিগুলোকে নিজস্ব সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিতে বলা হয়।

রেলওয়ে ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভূমিকা

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ রেলওয়েকে তাদের নিজস্ব চাহিদার কমপক্ষে এক মাসের জ্বালানি মজুত রাখতে হবে। অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী, ন্যূনতম দুই মাসের জ্বালানি সংরক্ষণ করতে হবে। এতে জাতীয় পর্যায়ের মোট মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছে, তিন মাসের কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়। অতিরিক্ত তেল কিনে সংরক্ষণ করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে এ ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া বৃহৎ আকারের ট্যাঙ্ক, পাইপলাইন, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তুলতে সময় লাগবে। নতুন স্টোরেজ নির্মাণের জন্য উপযুক্ত জায়গা নির্বাচনও বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত জ্বালানির মান বজায় রাখা এবং কার্যকর রোটেশন ব্যবস্থা চালু করাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দরকার দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাত জ্বালানি তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে যে কোনো অস্থিরতা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে তিন মাসের কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার উদ্যোগকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জ্বালানি বিভাগ ইতোমধ্যে বিপিসিকে কৌশলগত মজুত নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সংকট, যুদ্ধ, সরবরাহ বিঘ্ন কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মধ্যেও বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখতে সক্ষম হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here