অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সরকার আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন নিশ্চিত করার মাধ্যমে নতুন করদাতা শনাক্ত ও করের আওতায় আনার একটি বড় মিশন হাতে নিচ্ছে সংস্থাটি। তবে অনেক ক্ষেত্রে করছাড় ও বিশেষ সুবিধাও থাকছে।
আজ বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট প্রস্তাব করতে যাচ্ছেন, তাতে কর ও ভ্যাটের আওতা বাড়ানোর নানা প্রস্তাব থাকবে। এর অংশ হিসেবে ব্যবসায়-সংক্রান্ত ব্যাংক হিসাব খোলা, ব্যাংক ঋণ গ্রহণ এবং ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন বা বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হতে পারে।
জানা গেছে, সাধারণ ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন দাখিল বাধ্যতামূলক করা এবং খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম কর সংগ্রহের মাধ্যমে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেন্ট্রাল ডেটা ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে এনবিআরের তথ্যভান্ডারকে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ইউটিলিটি সেবা, ভূমি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় এসব বিষয়ে ঘোষণা থাকছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ক্ষুদ্র করভিত্তি ও কর ফাঁকির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং পদ্ধতিগত সংস্কারের কোনো বিকল্প
নেই। এ লক্ষ্যে এনবিআর সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নেবে। এসব বহুমুখী পদক্ষেপ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের করদাতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও টেকসই ভিত্তি পাবে বলে আশা করছে এনবিআর।
আগামী ৫ বছরের জন্য একটি পূর্বানুমানযোগ্য প্রগতিশীল কর কাঠামো ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী, যাতে করদাতারা ভবিষ্যতে তাদের করের বোঝা সম্পর্কে নিশ্চিত থাকতে পারেন। ব্যক্তি এবং কোম্পানি উভয় ক্ষেত্রে ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত করহারের প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী।
ব্যবসায়িক লেনদেনে বাধ্যতামূলক হবে ‘বিন’
ভ্যাটের জাল বিস্তার করতে সরকার নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসায় শনাক্তকরণ সংখ্যা বা বিন উপস্থাপন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব বাজেটে থাকছে। এর মধ্যে রয়েছে–যেকোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব বা এসটিডি হিসাব খোলা ও পরিচালনা, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন এবং আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক হিসেবে নিবন্ধন, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা, বাণিজ্যিক সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ বা নবায়ন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ গ্রহণ এবং বিআরটিএ থেকে বাণিজ্যিক যানবাহনের নিবন্ধন গ্রহণ।
ব্যাংক হিসাব খোলা ও সরকারি সেবায় টিআইএন
নতুন করদাতা শনাক্তে টিআইএন ব্যবহারের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে এনবিআর। এক্ষেত্রে স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট ও নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট ছাড়া অন্য যেকোনো ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন সনদ দাখিল বাধ্যতামূলক হবে। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া, জমি কেনাবেচা এবং নির্দিষ্ট কিছু পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রেও টিআইএন ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকছে।
খুচরা পর্যায়ে কর আদায়ের নতুন কৌশল
সরকার করভিত্তি সম্প্রসারণের জন্য নতুন বাজেটে অর্থমন্ত্রী উৎপাদক, আমদানিকারক বা পরিবেশকদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতারা যখন পণ্য কিনবেন, তখন সরবরাহ মূল্যের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম আয়কর সংগ্রহের প্রস্তাব করতে পারেন। এর ফলে খুচরা বিক্রেতাদের লেনদেনের তথ্য এনবিআরের কাছে চলে আসবে, যা নতুন করদাতা শনাক্ত করতে সহায়তা করবে।
সেন্ট্রাল ডেটা ইন্টিগ্রেশন ও ডিজিটাল নজরদারি
এনবিআর তার তথ্যভান্ডারকে অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করারও একটি বড় ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নেবে। এর অংশ হিসেবে সেন্ট্রাল ডেটা ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক লেনদেন, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্য এনবিআরের সিস্টেমে চলে আসবে।
এনবিআর চাইলে যেকোনো কর্তৃপক্ষ বা ব্যক্তিকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্যের এক্সেস দিতে বাধ্য করতে পারবে–এমন ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও বাজেটে থাকবে বলে জানা গেছে। তামাক পণ্যের অবৈধ বাণিজ্য রোধে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ পদ্ধতি চালুরও প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্টক ডিভিডেন্ড ও সংরক্ষিত আয়ের কর
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি স্টক ডিভিডেন্ড ও সংরক্ষিত আয়ের (রিটেইন্ড আর্নিংস) ওপর কর ওপর করারোপ আরও বাড়াতে চায় সরকার। এক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য যেকোনো কোম্পানি যদি নগদ লভ্যাংশের পরিবর্তে স্টক ডিভিডেন্ড বা বোনাস শেয়ার ঘোষণা করে, তবে সেই স্টক ডিভিডেন্ডের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর প্রদানের প্রস্তাব করা হচ্ছে।
এ ছাড়া কোনো কোম্পানি যদি তার কর-পরবর্তী নিট মুনাফার অন্তত ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ হিসেবে না দেয়, তবে অর্জিত নিট মুনাফার বিপরীতে রাখা সংরক্ষিত আয়, তহবিল বা উদ্বৃত্তের ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আরোপের বিধান রাখা হচ্ছে।
স্বর্ণ ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক খাতে আনার উদ্যোগ
উৎসে করের উচ্চ হারের কারণে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের বাজার অনানুষ্ঠানিক থাকায় সরকার এই খাত থেকে তেমন রাজস্ব পায় না। এবার স্বর্ণ সরবরাহে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হতে পারে, যাতে ব্যবসায়ীরা আনুষ্ঠানিক খাতে আসতে আগ্রহী হন। জুয়েলারি খাতে ভ্যাট নির্ধারণে বড় পরিবর্তন এনে ৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে প্রতি ভরিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হতে পারে।
তরুণ ও নতুন উদ্যোক্তাদের করজালে আনতে ছাড়
নতুন উদ্যোক্তাদের করের আওতায় আনতে কর ছাড়ের প্রণোদনাকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে এনবিআর। এক্ষেত্রে স্টার্টআপ, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত।
আয়করের ক্ষেত্রে স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবসায় টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হতে পারে। আইটি ফ্রিল্যান্সিং থেকে সম্প্রসারিত করে সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয়ে কর অব্যাহতি দেওয়া এবং সব ধরনের কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে আয়কে করমুক্ত করার প্রস্তাব করা হতে পারে।




