যেখানে একসময় শৈশবের দুরন্ত কোলাহল আর জীবনের ব্যস্ততা ছিল, আজ সেখানে কেবলই ধূসর বালুকারাশি। গাজার আঁকাবাঁকা গলি, হাজার বছরের প্রাচীন মসজিদ, সবুজ ফসলের ক্ষেত কিংবা ভূমধ্যসাগরের তীরে মাছ ধরার ব্যস্ত চত্বর– সব যেন এখন নিছক ইতিহাসের ধূসর পাতা।
আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, তিন বছর ধরে চলা ইসরায়েলের গণহত্যার পর অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা এখন কেবলই এক বিশাল ধ্বংসস্তূপ। গুগল ম্যাপসের নতুন উপগ্রহ চিত্রে ফুটে উঠেছে এমন এক নিদারুণ দৃশ্য, যেখানে দূর থেকে গাজার এক প্রান্তের সঙ্গে অন্য প্রান্তের পার্থক্য করাও অসম্ভব।
ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে, পুরো অঞ্চলের বসতিগুলো মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রধান সড়কগুলোর অস্পষ্ট রেখা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। জাতিসংঘের উপগ্রহ কেন্দ্রের (ইউনোস্যাট) সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এক বছর আগে নামমাত্র ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পরও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা থামেনি। বরং তা আরও ৯ শতাংশ বেড়েছে। ফিলিস্তিন শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, গাজার প্রায় ৮২ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার দুই-তৃতীয়াংশই পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
তাল আস-সুলতান ও আল-মাওয়াসির চিত্র
দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফা একসময় লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল ছিল। কিন্তু রাফার পশ্চিমাঞ্চলের জনবহুল তাল আস-সুলতান এলাকাটি আজ বিলুপ্ত। উপগ্রহের ছবিতে ঘরবাড়ির বদলে কেবল বালুর স্তূপ দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, রাফা ও খান ইউনিসের উপকূলীয় বালুময় অঞ্চল আল-মাওয়াসিকে ইসরায়েল তথাকথিত ‘মানবিক এলাকা’ ঘোষণা করলেও সেখানে দফায় দফায় বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক চিত্রে দেখা যায়, জনশূন্য অঞ্চলটি এখন প্লাস্টিক ও কাপড়ের তাঁবুতে ঠাসা। সেখানে ঠাঁই নিয়েছে লাখো গৃহহীন ফিলিস্তিনি পরিবার।
ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদ ও গাজা বন্দর
একসময় গাজার প্রধান কৃষিকেন্দ্র খান ইউনিসে ৫০ হাজারেরও বেশি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েলের হামলার মাত্র দুই বছর আগে পুনর্নির্মিত হওয়া ঐতিহ্যবাহী ইন্দোনেশীয় ইস্তিকলাল মসজিদটি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে গাজা সিটির ঐতিহাসিক বন্দরটি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অথচ এই বন্দরটি প্রায় এক লাখ ১০ হাজার মানুষের জীবিকার কেন্দ্র ছিল।
জাবালিয়া শরণার্থী শিবির
উত্তর গাজার অবস্থা আরও ভয়াবহ। মানবিক সহায়তাবিষয়ক জাতিসংঘ কার্যালয়ের মতে, উত্তরের প্রায় ৯৪ শতাংশ কৃষিজমি বিনষ্ট করা হয়েছে। আটটি বড় শরণার্থী শিবিরের মধ্যে সবচেয়ে বড় জাবালিয়া ক্যাম্পের একের পর এক ব্লক উপগ্রহ চিত্রে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে দেখা গেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের এই বর্বর হামলায় এখন পর্যন্ত ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। দখলদার দেশটির হামলায় আহত মানুষের সংখ্যা এক লাখ ৭৫ হাজারের বেশি। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা বহু মানুষের কোনো হদিস না থাকায় প্রকৃত প্রাণহানি আরও অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়। তথাকথিত যুদ্ধবিরতির পরও মৃত্যুর মিছিল থেমে নেই।
ত্রাণ সরবরাহে বাধা
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা গাজায় প্রচুর ত্রাণ প্রবেশ করতে দিচ্ছে। তবে গাজা প্রশাসন একে বিভ্রান্তিকর হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। চুক্তির অধীনে দুই লাখ ১০ হাজার ৬০০টি ত্রাণের ট্রাক প্রবেশের কথা থাকলেও অনুমতি পেয়েছে মাত্র ৭২ হাজার ৮২৬টি (৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ)।
এদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে শত শত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর নজিরবিহীন সহিংসতা ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। নাবলুসের দক্ষিণে জালুদ গ্রামে গতকাল মঙ্গলবার শতাধিক ইসরায়েলি দখলদার একযোগে হামলা চালায়।
আদালতের আদেশে প্রায় দুই মাস পর একটি ফিলিস্তিনি পরিবার নিজ বাড়িতে ফিরে আসার সময়ই এই হামলার শিকার হয়। দখলদাররা সেখানে ঘরবাড়ি ও গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং এক প্রবীণ নারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। এই সহিংসতায় বাধা দিতে গিয়ে ইসরায়েলি সীমান্ত পুলিশের তিন সদস্য আহত হন এবং যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গাজার মানচিত্রের এই পরিবর্তন শুধু ভবন ধ্বংস নয়, একটি জাতির ইতিহাস ও স্মৃতি মুছে ফেলার এক নির্মম দলিল।


