পুরোনো হিসাব বদলে দেবে ইরান যুদ্ধ আলি খামেনির উত্তরসূরিরা যুদ্ধ নিয়ে ভীত নয়

0
4

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর অনেকেই এর সঙ্গে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভার্সাই চুক্তির সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন। বিশেষ করে ফ্রান্সে বসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের বিষয়টি নজর কেড়েছিল সবার। ১৯১৯ সালের ওই চুক্তি ইউরোপকে বদলে দিয়েছে। সমঝোতায় ছিল ব্যাপক ক্ষতিপূরণের শর্ত, যা পরবর্তী সময় ইউরোপকে নিয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে।

অনেকেই সে কারণে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন, ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারক কি তাহলে সেদিক থেকে ভিন্ন হবে? নাকি একই ধরনের কিছু দেখা যাবে? সমঝোতার পর তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কোনো না কোনোভাবে টিকে আছে। এর মধ্যে একদফায় হামলা হয়ে গেলেও তা পরিপূর্ণ সংঘাতে রূপ নেয়নি।

এদিকে, ইরান বড় মাপের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটি নিজেদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে রয়েছে। দেশটিতে এরই মধ্যে নতুন নেতৃত্ব এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় আগের শাসক শ্রেণির অনেকেই মারা গেছেন। যদিও নতুন নেতৃত্ব পুরোনো ঘরানার বাইরে নন, তার পরও এটি বড় পরিবর্তন।

এ প্রসঙ্গে জন হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড মিডল ইস্ট স্টাডিজের অধ্যাপক ভালি নাসর বলেন, ‘এই যুদ্ধকে আমরা যতটা না স্বীকৃতি দিই, এটির তার চেয়েও বেশি প্রভাব ও বৃহৎ পরিণতি রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, এ মাত্রার সব বড় যুদ্ধ আদতে দাবার ঘুঁটি আবার সাজানোর মতো। এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে সে প্রভাব রাখবে।

ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি তেহরানে শাসক শ্রেণি পরিবর্তন করেছেন। ভালি নাসরের মতে, এটি মূলত ইরানের জন্য লাভজনক হয়েছে। তিনি বলেন, ‘একেবারে নতুন একটি প্রজন্ম নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তাদের অত্যন্ত স্পষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। তারা এই যুদ্ধ সামলেছে, এখন তারা শান্তিও সামলাবে।’

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বয়স ৫৬। প্রয়াত আলি খামেনির সঙ্গে তাঁর বয়সের পার্থক্য অন্তত ৩০ বছর। তাঁর শারীরিক সক্ষমতাও বেশি দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বয়স ৭১, পার্লামেন্টের স্পিকার ও মুখ্য আলোচক বাঘের গালিবাফ এবং রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের আহমাদ ভাহিদি– দুজনের বয়সই ৬০-এর ঘরে। লন্ডনের চ্যাথাম হাউস থিঙ্ক ট্যাঙ্কের মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকা প্রোগ্রামের সানাম ভাকিল বলেন, ‘তারা বিপ্লবের ফসল। ৮৬ বছরের একজন আর ইসলামী প্রজাতন্ত্রের দিকনির্দেশনা ঠিক করছেন না। ইরানের ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় হ্যান্ডব্রেক ছিলেন আলি খামেনি। দশক ধরে সতর্ক খামেনি ‘যুদ্ধও নয়, শান্তি নয়’ নীতি অনুসরণ করেছেন। তবে তাঁর উত্তরসূরিরা আরও দৃঢ়। তারা উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালাতে পিছপা হননি। আবার কয়েক সপ্তাহ পরে যুদ্ধ অবসানে আলোচনার টেবিলে বসা থেকেও নিজেদের গুটিয়ে নেননি। বরং তারা এমন শর্তে পুরো বিষয়টিকে অবসানের পথে নিয়ে গেছেন, যা তেহরানের জন্য বিব্রতকর নয়।

এদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যে ভরসা রেখেছিল, তাতে চিড় ধরতে শুরু করেছে। এ প্রসঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্প পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, অনেক দেশই ভেবেছিল, তাদের দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকলে সেটি তাদের সুরক্ষা দেবে। উপসাগরীয় দেশগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষা বলয়ের নির্ভরযোগ্যতা ও নিজেদের প্রতিরোধ সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।

হরমুজে ‘বন্ধুদের’ বিশেষ ছাড়

চীনে নিযুক্ত ইরানের দূত জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়া জাহাজের আগামীতে খরচ দিতে হবে। তবে চীন ও অন্যান্য বন্ধু দেশ বিশেষ ছাড় পাবে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, ৬০ দিন হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজের কাছ থেকে টোল আদায় করতে পারবে না ইরান। তবে এর পরে কী হবে, সে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি।

আঞ্চলিক সমর্থন ছাড়া শান্তি আসবে না

এদিকে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান বলেছেন, আঞ্চলিক সমর্থন ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সফলতা আসবে না। পাশাপাশি তিনি বলেন, ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির ক্ষতি করতে দেওয়া উচিত হবে না।

গত শনিবার এরদোয়ান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে বলেন, আঞ্চলিক দেশগুলোর ইচ্ছা ও অবদান থেকে শক্তি আহরণ করে না এমন কোনো সমাধান দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে না। খবর বিবিসি ও আলজাজিরার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here