বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভা বাংলাদেশের ঋণের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হবে সংস্কার

আজ সোমবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শুরু হচ্ছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভা। আগামী ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত  ব্যাংককের কুইন সিরিকিট ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে সংস্থা দুটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই আয়োজন চলবে। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল সভায় যোগ দিচ্ছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল প্রবৃদ্ধি, বাড়তে থাকা ঋণের চাপ, বাণিজ্য উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বিশ্বের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা এবারের সভায় গুরুত্ব পাবে। সভার ফাঁকে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত নতুন ঋণ এবং এর সঙ্গে যুক্ত নীতিগত শর্ত নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হবে। বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আলাদা বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় বিভিন্ন খাতে সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

এদিকে সেপ্টেম্বরের শেষভাগে ব্যাংককজুড়ে হওয়া রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত ও ভয়াবহ প্লাবনের ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। তার ওপর অক্টোবরের শুরুতেই তাদের আবহাওয়া দপ্তর নতুন করে ভারী বৃষ্টি ও সম্ভাব্য বন্যার পূর্বাভাস দেওয়ায় আয়োজক প্রশাসনের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত প্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল জরুরি ভিত্তিতে কড়া নির্দেশনা জারি করে সম্ভাব্য মহাবিপর্যয় মোকাবিলায় জলমগ্ন রাস্তায় চলাচলের উপযোগী সাঁজোয়া ট্রাক, ফোর-হুইল-ড্রাইভ যান এবং বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা প্রস্তুত রেখেছিলেন।

শেষ পর্যন্ত আবহাওয়ায় দেখা দিয়েছে ইতিবাচক পরিবর্তন। প্রধান নদী চাও ফ্রায়ার জলসীমা সার্বিক বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধের নিরাপদ দূরত্বে রয়েছে। শহরের আকাশও পুরোপুরি পরিষ্কার। ফলে উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হচ্ছে সপ্তাহব্যাপী  বিশ্ব সম্মেলন।

বিশ্বের ১৯১টি সদস্য দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিব এবং আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ১৫ হাজারেরও বেশি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি সভায় অংশ নিচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতি, বাণিজ্য উত্তেজনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা মোকাবিলায় কার্যকর নীতি প্রণয়নই এই বার্ষিক সভার মূল লক্ষ্য।

সম্মেলনে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য এবারের বৈঠকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থ সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ বিশেষ প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যে ব্যাংককে পৌঁছেছে এবং মূল অধিবেশনের পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী পার্শ্ববৈঠকে অংশ নিতে শুরু করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাইডলাইন বৈঠকে আইএমএফের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি নতুন ঋণ সহায়তা প্যাকেজ নিয়ে বিস্তারিত ও চূড়ান্ত পর্যায়ের দরকষাকষি শুরু হচ্ছে। ইতোপূর্বে বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঋণ প্রস্তাব আইএমএফ দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ঢাকা ও আইএমএফের মধ্যকার চলমান আলোচনায় আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হলে আগামী ডিসেম্বরেই দ্বিপক্ষীয় ঋণ চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে পারে।

নতুন এই ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সংস্কারকে প্রধান শর্ত হিসেবে সামনে এনেছে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাটি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো– জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার ও রাজস্ব নীতি পৃথক্‌করণ, ব্যাংকিং খাতের তদারকি বৃদ্ধি ও খেলাপি ঋণ হ্রাস, করছাড় প্রক্রিয়া যৌক্তিককরণ এবং বিভিন্ন জরুরি খাতে প্রদেয় সরকারি ভর্তুকি ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনা। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা টেকসই করতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে এসব সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে নীতিগত সম্মতি প্রকাশ করেছে।

আইএমএফের ঋণ সুবিধার পাশাপাশি এবারের বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ বার্ষিক সভার একটি বিশেষ অধিবেশনে স্থান পাচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জিডিপি সম্প্রসারণ ও ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপকল্প বিশ্বমঞ্চে বিশদভাবে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে বর্তমান অবস্থা থেকে ‘এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে’ উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

লক্ষ্যমাত্রা পূরণে দেশের বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৯ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি স্থানীয় ও বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করার বিশদ রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে। সম্মেলনের নির্ধারিত সেশনগুলোতে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল দেশের শিল্প খাতের বিকাশ, ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি স্থিতিশীল রাখার মাধ্যমে কীভাবে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব, তা বিশ্বনেতা ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরবে।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সভায় আরও স্থান পাচ্ছে উদ্ভাবনী প্রযুক্তির বিকাশ এবং ডিজিটাল ফিন্যান্স খাতের নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা বিধানের বিষয়টি। বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল লেনদেনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘ব্যাংকক ব্লু-প্রিন্ট’ প্রণয়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

সার্বিকভাবে, দুর্যোগের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে রূপকথার মতোই সেজে ওঠা ব্যাংকক শহর এখন বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে বিশ্বনেতাদের সরব উপস্থিতি ও কূটনৈতিক তৎপরতায় মুখর হয়ে উঠেছে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় খবর