চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যেই পারস্য উপসাগরে আবারও বড় ধরনের সংঘাতে জড়াল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং শান্তি আলোচনায় নিজেদের পাল্লা ভারী করতে দুই দেশই আক্রমণাত্মক পথ বেছে নিয়েছে। খবর রয়টার্স ও আলজাজিরার।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির দিকে ধেয়ে আসা ইরানের চারটি আত্মঘাতী ড্রোন ভূপাতিত করেছে মার্কিন নৌবাহিনী। দেশটির সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এই ড্রোনগুলো বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সরাসরি হুমকি তৈরি করছিল। ড্রোন ভূপাতিত করার পরপরই মার্কিন বাহিনী ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় নজরদারি রাডার স্টেশন এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কুশ ও কেশম দ্বীপে অবস্থিত আইআরজিসির যোগাযোগ কেন্দ্রে বিমান হামলা চালায়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার জবাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ইরানের ইসলামী রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। তারা কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটি ‘আলি আল সালেম’ এবং বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের প্রধান সদরদপ্তর লক্ষ্য করে সাতটি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। তাদের দেশের সীমানার ভেতরে মার্কিন আগ্রাসনের জবাব দিতেই এই পাল্টা হামলা বলে জানিয়েছে আইআরজিসি।
কুয়েত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করা হলেও এর বড় বড় ধ্বংসাবশেষ বেশ কিছু আবাসিক এলাকায় পড়েছে। এতে দুটি স্থানে অগ্নিকাণ্ডসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কুয়েত এই ঘটনাকে ‘নগ্ন আগ্রাসন’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
যুদ্ধ নাকি শান্তিচুক্তি : কোন পথে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ দিনে পা দিয়েছে। পাকিস্তানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তির চেষ্টা চলছে। তবে মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তির শর্তে কিছু আকস্মিক পরিবর্তন চাওয়ায় আলোচনা বর্তমানে পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন প্রতিনিয়ত তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে এবং একের পর এক পরস্পরবিরোধী দাবি সামনে আনছে। তেহরান জানিয়েছে, তারা তাদের বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার এবং অবরুদ্ধ থাকা ২৪ বিলিয়ন ডলারের তেল বিক্রির তহবিল ফেরত চায়। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায় ইরান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিবারই যখন দুই দেশ একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছায়, তখনই কোনো না কোনো সামরিক হামলা আলোচনার টেবিলকে ভেস্তে দেয়। ফলে এই অঞ্চল স্থায়ী শান্তি নাকি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে, তা এখনও অনিশ্চিত।
ইরানের কাছে এখনও ২২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে: ট্রাম্প
ইরানের বর্তমান সামরিক সক্ষমতা নিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, মার্কিন হামলায় ইরানের অধিকাংশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে তাদের কাছে এখনও প্রায় ২১ থেকে ২২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত অক্ষত রয়েছে।
চুক্তির টেবিলে ইরানের অনমনীয় মনোভাবের কারণ ব্যাখ্যা করে ট্রাম্প বলেন, ইরানি নেতৃত্ব অত্যন্ত গর্বিত ও শক্তিশালী। তাই তারা সহজে ছাড় দিতে চাচ্ছে না। তবে তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই এবং অবশেষে তারা চুক্তিতে আসতে বাধ্য হবে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে ট্রাম্পের দেওয়া এ হিসাব গত মাসের চেয়ে বেশি। মে মাসে তিনি এ হার ১৮ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছিলেন। যদিও ট্রাম্প প্রায়ই দাবি করে থাকেন, তিনি ইরানের যুদ্ধ করার সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছেন।
ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় মার্কিন ‘অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম’ কিনছে কুয়েত
গত বুধবার কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরানি ড্রোনের এক ভয়াবহ হামলায় একজন নিহত এবং ৬০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন। ওই হামলায় আন্তর্জাতিক টার্মিনালটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই ঘটনার পর কুয়েত নিজের আকাশসীমা সুরক্ষিত করতে এবং ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ভবিষ্যৎ হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অত্যাধুনিক ‘অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম’ বা আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।




